লোকমান (আ.) এর সাথে গাছ কথা বলতেন এমনকি কোন গাছের ফলের কোন ঔষুধি গুন আছে সেটিও গাছ বলে দিত।
লোকমান হাকিমের নাম শোনেননি—এমন মানুষ খুব কমই আছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। অনন্তকাল জ্ঞানপিপাসুরা তার জ্ঞান দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করবেন। তাঁকে আল্লাহ তা’আলা বিশেষ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন এবং পবিত্র কোরআনে মানুষের নসিহত হিসেবে তাঁর কথাগুলো বর্ণনা করেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তিনি এমনই সম্মানিত যে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও উপদেশনামা দিয়ে মহাগ্রন্থ আল–কোরআনে সুরা লোকমান নামে একটি সুরা অবতীর্ণ করেছেন।
লোকমান হেকিম কে?
হযরত লোকমান নবী ছিলেন কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এ কথা সর্বসম্মত, তিনি নবী নন তিনি একজন প্রজ্ঞাবান এবং পুন্যবান একজন ব্যক্তি। কথিত আছে কাতাদা (রা.) বর্ণিত, মহান আল্লাহ লোকমান (আ.)-কে ‘নবুয়ত’ ও ‘হিকমাতে’র মধ্যে একটির সুযোগ দিলে তিনি হিকমত গ্রহণ করেন।
কেউ একজন তাকে নবুয়ত গ্রহণ না করার কারণ জিজ্ঞাস করলে তিনি বলেন, ‘যদি আমাকে নবুওয়াত দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হত; তাহলে আমি তা গ্রহণ করলে আল্লাহর সাহায্য পেয়ে তাতে সফল হতাম। কিন্তু তা চূড়ান্ত না করে ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে, যে কারণে এ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে আমি শঙ্কিত ছিলাম। তাই আমি হেকমতকে অগ্রাধিকার দিয়ে তা গ্রহণ করেছি।’
হিকমাত বা হিকমত বা হেকমত শব্দের অর্থ হল ‘প্রজ্ঞা’। সকলের কাছে হাকিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন হজরত লোকমান (আ.)। হাকিম মানে হচ্ছে যার থেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বের হয়। তার কথা ছিল অর্থবহ এবং মানুষের মাঝে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। এখনো তার কথাকে বাণী হিসেবে লিখে রাখা হয়।
হজরত লোকমান আ. পেশাগত দিক থেকে একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। জাবির (রা.) তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তিনি বেঁটে, চেপ্টা নাকবিশিষ্ট। আবার ইমাম মুজাহিদ (রহ.) বলেন, তিনি ফাটা পা ও পুরো ঠোঁটবিশিষ্ট ছিলেন।
লোকমান (আ.) সামান্য আয়ের মানুষ হলেও তিনি কখনো অর্থের জন্য অনৈতিক কাজে জড়াননি। সৎভাবে অর্জিত অর্থ দিয়েই তিনি জীবন চালাতেন।
হজরত ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বেহ (রহ.) এর মতে, লোকমান (আ.) আইয়ুবের (আ.) ভাগ্নে ছিলেন। তিনি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। ইমাম বায়জাবি (রহ.), অন্য মতানুসারে, তিনি দাউদ (আ.)-এর সময়ও জীবিত ছিলেন। ইবনু আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, লোকমান (আ.) আবিসিনীয় ক্রীতদাস।
লোকমান হেকিমের গল্প
লোকমান হেকিমকে নিয়ে অনেক রূপকথার মত গল্প রয়েছে। তার মধ্যে বহু প্রচলিত গল্প হল-
লোকমান (আ.) ও অমরত্বের ফল
তিনি কোনো গাছের নিচ দিয়ে গেলেই ওই গাছ তার সঙ্গে কথা বলত। বলত, আসসালাতু আসসালামু ইয়া লোকমান হেকিম। আমি এই রোগের কাজ করি, আমাকে এই কাজে লাগান। পৃথিবীর সকল গাছ কথা বললেও একটি গাছ তার সঙ্গে কথা বলেন নি। ওই গাছের কথা – লোকমান হেকিম আমাকে জিজ্ঞেস করুক আমি কি কাজে লাগি। অন্যদিকে লোকমান হেকিম বলছেন, একদিন না একদিন ওই গাছকে কথা বলতেই হবে।
কিন্তু লোকমান হেকিম তো জানেন না ওই গাছ মহাশক্তিধর। নিজ থেকে ওই গাছ তার সাথে কথা বলবে না। দেখতে দেখতে লোকমান হেকিমের মৃত্যুর সময় চলে এসেছে। স্বজনদের ডেকে বললেন, আমার মৃত্যুর পর সেই গাছের নিচে লাশটি রেখে আসবে। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে লোকমান আর্জি জানালেন মৃত্যুর পর ফের কিছু সময়ের জন্য তার প্রান ফিরে পাওয়ার।
একসময় লোকমান হেকিম মারা গেলেন। কথা অনুযায়ী তার লাশ রেখে আসা হল সেই গাছের নিচে। এবার গাছ কথা বলল – আসসালামু আসসালামু ইয়া লোকমান হেকিম। জীবিতকালে যদি আমার সঙ্গে কথা বলতেন তাহলে আজ আপনাকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হত না; লাভ করতেন অমরত্ব। আমার গাছের পাকা একটি ফল খেলেই যে কেউ অমরত্ব লাভ করবে।
কথা অনুযায়ী লোকমান হেকিম কিছু সময়ের জন্য প্রান ফিরে পেলেন। তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন – হে আল্লাহ, আমার শেষ চাওয়া আপনার কাছে এ গাছের ফল যেন কখনোই না পাকে। সত্যি সত্যিই এ গাছের ফল কখনো পাকে না। ফল হওয়ার পর পাকার আগেই তা শুকিয়ে মাটিতে পরে যায়। মানুষ সেই ফল এখনো খায়। তবে পাকা খাওয়ার সৌভাগ্য কারো হয়না।
লোকমান হেকিম ও ফল চুরির অভিযোগ
হজরত লোকমান হাকিম ছিলেন হালকা–পাতলা কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। যুবক বয়সেই তিনি দায়িত্বের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিলেন। তাঁর মালিক তাঁকে অন্যান্য শ্রমিকের সঙ্গে বাগানে ফল তোলার কাজ করাতেন। তাঁর সঙ্গে যেসব শ্রমিক কাজ করত, তারা হজরত লোকমানকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারত না। তারা বাগানের ফল তোলা শেষ হলে সেখান থেকে অনেকগুলো ফল খেয়ে মালিকের কাছে হজরত লোকমান (আ.) এর নামে বদনাম করত।
একদিন বাগানের মালিক দেখতে পেলেন, যে পরিমাণ ফল তার বাগান থেকে তোলা হয়, সে পরিমাণ ফল তার বাসায় এসে পৌঁছায় না। তাই তিনি অন্যদের কথা বিশ্বাস করে হজরত লোকমানকে সন্দেহ করতে লাগলেন।
পরদিন মালিকের আচরণে হজরত লোকমান পুরো বিষয়টি বুঝতে পারলেন। এরপর তিনি, মালিককে বললেন, ‘আমি আপনার বাগানের কোনো ফল নষ্ট করি না কিংবা খাই না। আপনি আমাকে যা কিছু প্রদান করেন, তা–ই আমার জন্য হালাল, বাকি সবকিছুকে আমি হারাম মনে করি।’ মালিক তাঁর কথায় তুষ্ট না হওয়ায় তিনি প্রস্তাব দিলেন যে বাগান থেকে ফল তুলে আনার পর আপনি সবাইকে গরম পানি পান করিয়ে মাঠে দৌড়াতে বলবেন, এতে করে কারা অপরাধী, তা প্রমাণিত হয়ে যাবে।
লোকমান হাকিমের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর মনিব সবাইকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। একদিন বাগানে কাজ শেষে শ্রমিকেরা যখন বাড়ি ফিরে এল, তিনি সবাইকে গরম পানি খেতে দিলেন। মালিকের নির্দেশমতো সবাই গরম পানি খেল। এরপর সবাইকে খোলা মাঠে দৌড়ানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি তাদের পেছনে ঘোড়ায় করে ছুটতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর শ্রমিকেরা হাঁপিয়ে উঠে অসুস্থ হয়ে সবাই বমি করে দিল। এতে সবার পেট থেকে আঙুর ও আপেলের টুকরা বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু লোকমান হাকিমের পেট থেকে শুধু পানি বের হলো। এভাবেই তিনি নিজ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মালিকের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করলেন।
পবিত্র কোরআনে লোকমান হাকিম
মক্কায় অবতীর্ণ কোরআনের ৩১তম সুরা হলো সুরা লোকমান, এর আয়াতের সংখ্যা ৩৪। এই সুরায় লোকমান হাকিমের কিছু প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ থাকায় সুরাটির নাম রাখা হয়েছে সুরা লোকমান।
সুরা লোকমানের ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে সন্তানের প্রতি লোকমান হাকিমের ১২টি উপদেশের বর্ণনা রয়েছে। যেমন—
- শিরক করো না,
- মা–বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ করো,
- তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে বললে তাঁদের কথা গ্রহণ করো না,
- আল্লাহর জিকির করো,
- নামাজ কায়েম করো,
- ভালো কাজে আদেশ দাও,
- মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো,
- বিপদে ধৈর্য ধারণ করো,
- মানুষকে অবজ্ঞা করো না,
- গর্বভরে চলাফেরা করো না,
- মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, এবং
- কণ্ঠস্বর নিচু রেখে জীবন যাপন করো।
লোকমান হেকিমের নসিহত
লোকমান হাকিমের নসিহত আরও বিভিন্ন কিতাবের পরতে পরতে পাওয়া যায়।
প্রথম: নামাজে দাঁড়ালে অন্তরের হেফাজত করা
আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই তখন মনকে স্থির রাখা কষ্ট হয়ে পড়ে। আপনি একটা জিনিস হারিয়ে ফেললেন, কিন্তু খুঁজে পেলেন না। দেখা যায়, নামাজে দাঁড়াতেই মনে পড়ে, ‘ও আমি জিনিসটা অমুক জায়গায় রেখেছিলাম।’ শয়তান আপনার মনকে স্থির থাকতে দেয় না। নামাজে দাঁড়ালেই মনে ভেসে উঠে সারা দিনের হিসাব। এজন্য লোকমান হাকিম বলেন, ‘নামাজের সময় অন্তরের হেফাজত করো।’
দ্বিতীয়: খাওয়ার সময় হলকের হেফাজত করো
হলক বলা হয় খাদ্যনালিকে। অনেক সময় এমন হয়, তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে গলায় আটকে যায়, অথবা, ওপরে খানা উঠে নাক জ্বালাপোড়া করে। অনেক সময় মাথায় উঠে যায়। মাছ খেতে গিয়ে গলায় কাঁটা আটকে যায়।
একটু অসতর্কতা অনেক বড় বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে। এজন্য লোকমান (আ.) খাওয়ার সময় হলকের হেফাজত করতে বলেছেন। হলকের হেফাজত মানে আস্তে-ধীরে খাওয়া, তাড়াহুড়ো না করা।
তৃতীয় : অন্যের ঘরে চোখের হেফাজত করো
আমাদের একটা বদ-অভ্যাস হলো, কারও ঘরে গেলে এদিক-ওদিক তাকানো, যে কারোর বেডরুমে চলে যাওয়া, যে কারোর ঘরে অনুমতি ছাড়া রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যাওয়া। এই অভ্যাসটা আমাদের থেকে দূর করা উচিত।
অনেক সময় ঘরে এমন কিছু জিনিস এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে যা আপনার চোখে পড়লে একটা বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হতে পারে। তাই আমাদের উচিত, যে কাজের জন্য যাওয়া সে কাজ অতিদ্রুত শেষ করে ফিরে আসা। লোকমান হাকিম বললেন, অন্যের ঘরে গিয়ে চোখের হেফাজত করা উচিৎ, যেন আপনার জন্য তারাও যেন লজ্জিত হতে না হয়, এবং আপনিও যাতে লজ্জিত না হন!
চতুর্থ: লোকালয়ে জবানের হেফাজত করো
লোকালয়ে কথা বলার সময়, ভাষণ দেওয়ার সময় জবানকে সংযত রাখার চেষ্টা করবেন। আপনার অসতর্কতায় মুখ দিয়ে বের হওয়া একটা শব্দ কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে। মন্ত্রীপদ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন, চাকরিচ্যুত হতে পারেন। বর্তমান মিডিয়ার যুগ, ভাইরাল হতে বেশি সময় লাগবে না।
লোকমান হাকিম (রহ.) যখন এই নসিহত করেছিলেন, তখন না ছিল মোবাইল, না ছিল মিডিয়া। কিন্তু তাও, তিনি এ বিষয়টি তখনই উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
পঞ্চম: মৃত্যুকে এক মুহূর্তের জন্য না ভোলা
মানুষ দুনিয়ার পেছনে ছোটা তখন বন্ধ করবে, যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ থাকবে। কারণ সে জানে মৃত্যুই সমাপ্তি নয়, বরং মৃত্যুই হলো প্রবেশের মূল ফটক।
ষষ্ঠ: আল্লাহকে স্মরণ করো
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ —সুরা বাকারা: ১৫২
যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর জিকির থাকবে, যার জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহতায়ালা তাকে প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করে নেবেন। তার জন্য দুনিয়া-আখেরাত সহজ করে দেবেন।
সপ্তম: এহসান করলে সেটা একেবারের জন্য ভুলে যাও
মানুষের অভ্যাস হলো, দশ টাকা দিয়ে একশ টাকার খোঁটা দেওয়া। কেউ কারও কাছে সহজে হাত পাতে না, অভাবে পড়ে কিংবা বিপদে পড়ে মানুষ সাহায্য চায়। আর আপনি এহসান করে সবার সামনে আবার খোঁটা দিচ্ছেন। অথচ আপনার ওপর আল্লাহ কত এহসান করেছেন, সে ব্যাপারে আপনি বেখেয়ালি, অকৃতজ্ঞ!
অষ্টম : কেউ আঘাত দিলে ভুলে যাওয়া
ধরুন আপনাকে কেউ আঘাত দিল, আপনি তার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। আপনি ভেতরে-ভেতরে সেটা পুষে রেখেছেন, পুষে পুষে বড় করেছেন। যেই সুযোগ পাবেন, প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে হাতাহাতি হলো, অজ্ঞতাবশত আপনার আঘাতে তার প্রাণ গেল। পরিশেষে আপনার ফাঁসি হলো। এতে কার লাভ হলো?
এরকম অর্থবহ কথার কারনেই তিনি সকলের কাছে সমাদৃত।
সুত্রঃ
- https://dhakamail.com/religion/67897
- https://www.dhakapost.com/religion/161422
- https://mzamin.com/article.php?mzamin=219563&fbclid=IwY2xjawImcTxleHRuA2FlbQIxMAABHb4lFZ6M2ajSSuGGwzFoek9AfwODHBQEhw3s0v4nPFRIYMgxVDe2pnYw9Q_aem_LgCW6ERMlLvSQL1fk6E12w#gsc.tab=0
- https://www.prothomalo.com/religion/islam/j6s0bai6bw
- https://www.prothomalo.com/religion/islam/vlp9brcoht
- https://www.deshrupantor.com/412049/%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%A4