Image default
যাপন

ঢিলেঢালা পোশাক পরার যত উপকারিতা

করোনা পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে স্টাইলিশ পোশাকের ধারণা পাল্টেছে। সেই পরিবর্তনের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। টাইট-ফিট পোশাকের পরিবর্তে আমরা এখন ঢিলেঢালা পোশাকেই নিজেদের স্টাইলিং করছি। কিন্তু কেন?

ফ্যাশন নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করে। ঠিক এ কারণেই, নিয়ম ভাঙার খেলায় আলমারিতে একের পর এক যুক্ত হতে থাকে ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক। 

কারণ, রোজকার যান্ত্রিক জীবনে নিজের শরীরকে স্বস্তি দেওয়ার প্রথম ধাপটি শুরু হয় পোশাকের মাধ্যমে। বহু বছর ধরে ফ্যাশনের জগতে টাইট ফিটিং পোশাকের দাপট থাকলেও, বর্তমানে ফ্যাশনে ঢিলে-ঢালা পোশাক দারুণ ট্রেন্ড তৈরি করেছে। 

আঁটসাঁট কাটের পোশাক আর উঁচু হিলের বদলে বেছে নেওয়া হচ্ছে ঢিলেঢালা ম্যাক্সি ড্রেস আর ব্যালে জুতা; যেখানে আছে স্বাধীনতা, স্বস্তি আর অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের অনুভূতি। 

পোশাক স্বস্তিদায়ক হলে আপনার মেজাজ যেমন ঠিক থাকবে, তেমনিভাবে আপনার কাজেও মনযোগ আসবে কারণ স্বস্তিদায়ক পোশাক আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণভাবে।

আসুন জেনে নেওয়া যাক ঢিলেঢালা পোশাকের ৭টি উপকারিতা যা আপনার স্টাইল এবং স্বস্তি দুটোকেই দেয় সমান গুরুত্ব- 

ঢিলেঢালা পোশাকের ৭টি  উপকারিতা

উপকারিতা ১: ত্বকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ঘামমুক্তি

টাইট ফিট পোশাক আপনার শরীরের ত্বকের সাথে আটকে থাকে এবং শরীরে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে ঘাম ত্বকের উপরে আটকে থাকে, যা র‍্যাশ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা এক্সিমার মতো ত্বকের সমস্যার সৃষ্টি করে। 

মূলত, ঢিলেঢালা পোশাক পরলে যে কয়টি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে, তার মধ্যে এটিই প্রধান। ঢিলেঢালা কাপড় ত্বকের সাথে লেগে থাকে না এবং শরীরের সাথে বাতাসের সরাসরি প্রবাহ বজায় রাখে। এই মুক্ত বায়ু চলাচল অতিরিক্ত ঘামকে দ্রুত বাষ্পীভূত হতে সাহায্য করে, ফলে ত্বক শুষ্ক ও সুস্থ থাকে। 

ঢিলেঢালা পোশাকে কাজ করছে তরুনী

উপকারিতা ২: স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা

আপনার পোশাক যদি খুব বেশি টাইট হয়, তবে তা শরীরের নানান জটিল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

যেমন- অতিরিক্ত টাইট পোশাক কোমর, হাত বা পায়ের অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা রক্তনালীগুলিকে সংকুচিত করে ফেলে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ক্লান্তি, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা, বা এমনকি ভ্যারিকোজ ভেইনের মতো সমস্যা হতে পারে। আরামদায়ক কাপড় বা ঢিলেঢালা পোশাক রক্তনালীর উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করে না, ফলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। এটি দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা বা ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

উপকারিতা ৩: হজম প্রক্রিয়া সহজ করে

আপনি হয়ত ভাবছেন হজম প্রক্রিয়ার সাথে পোশাকের আবার কী সম্পর্ক? 

কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, সম্পর্ক আছে। খাবার খাওয়ার পর পেট সামান্য ফুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু টাইট পোশাক, বিশেষত টাইট প্যান্ট বা স্কার্ট পরলে তা পেটের উপর চাপ সৃষ্টি করে যা হজম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুক জ্বালার মতো সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। ঢিলেঢালা পোশাক পেটের অংশে কোনো চাপ দেয় না, ফলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। দুপুরে ভরপেট খাওয়ার পর দুপুরে আরামদায়ক পোশাক পরা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

উপকারিতা ৪: স্ট্রেস ও উদ্বেগ হ্রাস

পোশাকের সাথে মনের সম্পর্ক অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। আপনি যেদিন আপনার প্রিয় পোশাকটি পরেন, তখন আপনার আত্মবিশ্বাস এমনিতেই অনেক বেড়ে যায়।  

কখনো যদি এমন পোশাক পরেন যা আপনাকে শারীরিকভাবে দেয়, তখন তা আপনার মনের পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রের উপরও চাপ সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বস্তিকর পোশাক বা আরামদায়ক ঢিলেঢালা পোশাক পরলে শরীরে ‘কোর্টিসল’ (স্ট্রেস হরমোন) নিঃসরণের মাত্রা কমে, যা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি এক ধরণের মানসিক আরাম দেয়, যা কাজে মনোযোগ বাড়ায়।

উপকারিতা ৫: সহজে নড়াচড়ার সুবিধা

খেলাধুলা বা ব্যায়ামের সময় যেমন ঢিলেঢালা পোশাক প্রয়োজন, তেমনি দৈনন্দিন জীবনেও স্বাভাবিক নড়াচড়া করার সুবিধা থাকা জরুরি। টাইট পোশাকে হাঁটা, বসা, বা কাজ করতে খুব স্বাভাবিকভাবেই দারুণ অস্বস্তি হয়। কিন্তু ঢিলেঢালা পোশাক পরার সুবিধ হলো, এটি আপনার শরীরকে খুব সহজে নড়াচড়া করার সুবিধা দেয়। শুনতে হাস্যকর শোনালেও বিষয়টি আপনার দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে দারুণ কার্যকর। 

ঢিলেঢালা পোশাকে স্টাইলিং

উপকারিতা ৬: আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি

অনেকের ধারণা, শুধুমাত্র টাইট-ফিটিং পোশাকই আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু সত্যিকারের আত্মবিশ্বাস আসে আপনার স্বস্তি আর স্বাচ্ছন্দ্য থেকে। যখন আপনি আপনার পরিহিত পোশাকে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এবং আরাম পান, তখন আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ে। এই স্বাচ্ছন্দ্যই আপনার ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে। 

উপকারিতা ৭: ফ্যাশনে বৈচিত্র্য

ঢিলেঢালা পোশাক এখন কেবল আরামদায়ক নয়, এটি ফ্যাশনের অন্যতম উপাদান। ঠিকঠাক স্টাইলিং জানলে ঢিলা কুর্তা  বা ওভারসাইজড শার্টও আপনাকে ফ্যাশনেবল ও আকর্ষনীয় করে তুলতে পারে। এটি আপনার পোশাকে আধুনিক, মিনিমালিস্টিক এবং রুচিশীল লুক যোগ করে।

ফ্যাশনে ঢিলেঢালা পোশাকের ট্রেন্ড এবং স্টাইল টিপস

শুধু ঢিলেঢালা পোশাক পরলেই যে আপনি আশপাশের মানুষ থেকে ট্রেন্ডি বা স্টাইলিশ তকমা পাবেন, তেমনটা কিন্তু নয়। ঢিলেঢালা, অভারসাইজড পোশাকে স্টাইল বজায় রাখার জন্য সঠিক ফেব্রিক ও স্টাইলিং কৌশলও জানা প্রয়োজন। আপনার পোশাকটি কেবল ‘ঢিলা’ হলেই চলবে না, সেটিকে সঠিক জায়গায় ও সঠিক উপায়ে পরতেও জানতে হবে। স্টাইলিং বজায় রাখার কিছু টিপস-

ভারসাম্য বজায় রাখুন: ঢিলেঢালা পোশাক পরার মূল চাবিকাঠিই হলো ঠিকঠাক ব্যালেন্স বা ভারসাম্য। আপনি যদি ঢিলেঢালা টপস পরেন, তবে নিচের অংশটি সামান্য ফিটিং বা কম ঢিলে রাখুন। আবার, Wide-Leg প্যান্ট পরলে উপরে একটি তুলনামূলক ফিটিং বা সুন্দরভাবে টাক-ইন করা টপস পরুন।

সঠিক লেয়ারিং: ওভারসাইজড পোশাককে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করুন। যেমন, একটি ঢিলে শার্টের উপরে একটি হালকা জ্যাকেট বা কোট চাপিয়ে নিন।

অ্যাক্সেসরিজ (Accesories)- যেহেতু পোশাক ঢিলে, তাই নজর দিন অ্যাক্সেসরিজের দিকে। একটি স্টেটমেন্ট জুয়েলারি, একটি স্টাইলিশ বেল্ট (যা কোমরে বেঁধে পোশাকের আকার দেবে) বা একটি ট্রেন্ডি হ্যান্ডব্যাগ আপনার লুকে স্টাইল যোগ করবে।

ঢিলেঢালা পোশাক পরার সময় কী ধরনের ফেব্রিক ভালো হবে

আপনার জন্য সঠিক পোশাক বেছে নিতে সঠিক ফেব্রিক নির্বাচন করা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। 

গ্রীষ্মকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় পাতলা সুতি জাতীয় ফেব্রিক বেছে নিন। এক্ষেত্রে লিনেন কাপড়ও হতে পারে আপনার জন্য মানানসই। কারণ এই কাপড়টি অত্যন্ত হালকা এবং দ্রুত ঘাম শোষণ করতে পারে।

ঢিলেঢালা পোশাক এর জন্য বিভিন্ন ধরনের ফেব্রিক

এছাড়া, শীতকালে শরীরের উষ্ণতা বজায় রাখতে উলের কাপড়, ফ্ল্যানেল বা জর্জেট কাপড়ও ভালো।

তবে আবহাওয়া যাই হোক না কেন, ফেব্রিক নির্বাচনে পলিয়েস্টার বা নাইলনের মতো কৃত্রিম ফাইবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো দেহে বাতাস চলাচলে বাধা দেয়।

ঢিলেঢালা পোশাক নিয়মিত ধোয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের টিপস

সঠিক যত্নের অভাবে ঢিলেঢালা পোশাক দ্রুত তার আকার বা গুণগত মান হারাতে পারে। এজন্য দরকার সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ। যেমন- 

হ্যান্ড ওয়াশ বা জেন্টল সাইকেল: ঢিলেঢালা পোশাকগুলো প্রায়শই নরম ফেব্রিকের হয়। এগুলি ওয়াশিং মেশিনের জেন্টল সাইকেলে বা হাতে ধোয়ার চেষ্টা করুন, যাতে কাপড়ের আঁশ বা শেপ নষ্ট না হয়।

কাপড় শুকানো: ঢিলেঢালা কাপড় ঝোলানোর সময় তার ওজন ও আকার যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

রক্ষণাবেক্ষণ: কটন, লিনেন বা সিল্কের মতো ঢিলেঢালা পোশাক সরাসরি সূর্যের আলোতে দীর্ঘক্ষণ রাখবেন না, এতে পোশাকের রং ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।

স্টাইল ও আরাম একসাথে পেতে চাইলে ঢিলেঢালা পোশাকের বিকল্প নেই। এছাড়া এটি এখন হালের ট্রেন্ডেও নতুন গতি দিয়েছে। কারণ এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে স্বস্তির চেয়ে বড় ফ্যাশন আর নেই, হতে পারে না। সঠিক ফেব্রিক, স্টাইলিং আর যত্নের মাধ্যমে ঢিলেঢালা পোশাক আপনার শরীর আর মনকে দারুণ ইতিবাচক অনুভূতি দিতে পারে। 

তথ্যসূত্র –

Related posts

ইনডোর প্ল্যান্ট নাকি জাদুর কাঠি?

admin

মিনিমাল লিভিং: কম জিনিসে কেমন করে বাড়ে সুখ?

আপনি কি সত্যিই Introvert? নাকি শুধুই ক্লান্ত?

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More