Image default
প্রযুক্তি

কীভাবে চলে মেট্রোরেল? জানুন বিশ্বের প্রথম মেট্রো থেকে ঢাকার মেট্রোরেলের গল্প পর্যন্ত!

ঢাকা শহরে মানুষের দিন শুরু হয় অসহ্য জ্যাম, রাস্তার ধোঁয়া, হর্নের শব্দ আর ক্লান্তির ভেতর দিয়ে। কিন্তু সেই চেনা কষ্টের মধ্যেই এক নতুন স্বস্তির বাতাস এনে দিয়েছে মেট্রোরেল। 

সকাল সকাল বিশাল ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে অফিসে যাওয়ার দিন যেন অতীত। যে শহরে একসময় মানুষ সকালে বের হয়ে দুপুরে অফিসে পৌঁছাত, সেখানে এখন ঘড়ির কাঁটা মেপে নিশ্চিন্তে যাত্রা শুরু করা যায়। এ যেন ঢাকাবাসীর জীবনে এক ম্যাজিক। 

মেট্রোরেল সত্যিই শহুরে জীবনের গতি বদলে দেওয়া এক আশ্চর্য আবিষ্কার। জনবহুল নগরীতে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে, মেট্রোরেলের জুড়ি নেই। মেট্রোরেল আসলে একটি দ্রুতগতির ট্রানজিট সিস্টেম, যা নির্দিষ্ট রুটে বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলে। এটি মাটির নিচে , মাটির উপর বা উঁচু সেতুর ওপর দিয়ে চলতে পারে। যেহেতু এটি অন্য যানবাহনের সঙ্গে রাস্তা ভাগাভাগি করে না, তাই সময় ও নিরাপত্তা দুই দিক থেকেই এটি কার্যকর।

মেট্রোরেল ধারণার সূচনা 

মেট্রোরেল ধারণার সূচনা হয়েছিল প্রায় দেড়শো বছর আগে। ১৮৬৩ সালের ১০ জানুয়ারি, ইংল্যান্ডের লন্ডনে বিশ্বের প্রথম ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে চালু হয়, যার নাম ছিল মেট্রোপলিটন রেলওয়ে। এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম যাত্রীবাহী পাতাল ট্রেন। এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রকৌশলী জন ফাওলার এবং উদ্যোক্তা চার্লস পিয়ারসন।

প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল

তবে, শুরুর দিকে ট্রেনটি চলত বাষ্পচালিত ইঞ্জিনে, অর্থাৎ কয়লা পোড়ানোর শক্তিতে। ফলে টানেলের ভেতর ধোঁয়া আর গরমের কারণে যাত্রীদের অনেক সময় ভয়াবহ অস্বস্তিতে পড়তে হতো। তবে সেটিই ছিল এক বিপ্লবের সূচনা, যা পরবর্তীতে বদলে দিয়েছে নগর পরিবহনের পুরো ধারণা।

যদিও লন্ডনের মানুষ প্রথমে ভূগর্ভে ট্রেন চলার ধারণা শুনে ভয় পেয়েছিল। অনেকেই ভাবত, টানেলের ভেতরে বাতাস থাকবে না, মানুষ দম বন্ধ হয়ে যাবে! তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম দিনেই প্রায় ৩০ হাজার যাত্রী এই নতুন যাত্রা অভিজ্ঞতা নিতে স্টেশনে হাজির হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লন্ডনবাসী বুঝে গেল, এই ব্যবস্থাই শহরের যানজটের প্রকৃত সমাধান হতে পারে।

বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মেট্রোরেলও বদলে যায়। স্টিম ইঞ্জিনের জায়গায় আসে বিদ্যুৎচালিত রেল ব্যবস্থা। ১৮৯০ সালে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল চালু করে লন্ডনের সিটি অ্যান্ড সাউথ লন্ডন রেলওয়ে। এটি-ই আধুনিক মেট্রোরেলের ভিত্তি স্থাপন করে। 

এরপর দ্রুতই ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বড় শহরগুলো এই ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯০৪ সালে নিউইয়র্ক সাবওয়ে, ১৯১৯ সালে প্যারিস মেট্রো এবং ১৯২৭ সালে টোকিও মেট্রো চালু হয়।

প্রথম বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল

কীভাবে চলে মেট্রোরেল

মেট্রোরেল চালানোর প্রযুক্তি শুনতে জটিল মনে হলেও, এর কাজের মূল ধারণা আসলে বেশ সহজ। প্রতিটি মেট্রো ট্রেন চলে বিদ্যুৎচালিত মোটরে, যা শক্তি পায় দুটি উপায়ে। কখনও রেললাইনের পাশে থাকা তৃতীয় রেল থেকে, আবার কখনও ওভারহেড ক্যাথেনারি বা ট্রেনের উপরের তার থেকে। এই বিদ্যুৎই চাকার ঘূর্ণনের মাধ্যমে ট্রেনকে সামনে এগিয়ে দেয়। 

আর পুরো সিস্টেমটা নিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটারাইজড কন্ট্রোল ও অটোমেটিক সিগন্যালিং ব্যবস্থায়, যার ফলে ট্রেন কখন কোথায় থামবে, কত গতিতে চলবে সবই নির্ভুলভাবে নির্ধারিত থাকে। তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেক কম। 

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুবাই আর কোপেনহেগেনের মতো অনেক আধুনিক শহরে এখন মেট্রো ট্রেনগুলো সম্পূর্ণ চালকবিহীন। সবকিছু পরিচালিত হয় অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে, যেন সত্যি কোনো স্মার্ট রোবট চালাচ্ছে এই ট্রেন।

সবচেয়ে বড় মেট্রোরেল

এবার একটু আসি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর ব্যস্ত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কগুলোর কথায়। জাপানের টোকিও মেট্রোতে প্রতিদিন প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ যাতায়াত করে। সময়নিষ্ঠা আর শৃঙ্খলার দিক থেকে টোকিও মেট্রোর জুড়ি নেই। টোকিওর মেট্রোতে পিক আওয়ারে এমন ভিড় হয় যে, ট্রেনের দরজা বন্ধ করাই মুশকিল হয়ে পড়ে! মজার বিষয় হলো, এই দরজা বন্ধ করার জন্য বিশেষ কিছু কর্মচারী থাকে, যাদের “পুশারস” বলা হয়। তাদের কাজই হলো যাত্রীদের হালকা ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করা। শুনে একটু অস্বাভাবিক লাগলেও, টোকিওর মানুষদের কাছে এটা একদম স্বাভাবিক বিষয়!

অন্যদিকে চীনের সাংহাই মেট্রো হলো বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নেটওয়ার্ক। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় আটশো কিলোমিটার। আর রাশিয়ার মস্কো মেট্রো দেখলে মনে হবে যেন একেবারে ভূগর্ভের রাজপ্রাসাদ। কারণ, এখানকার প্রতিটি স্টেশন মার্বেল, ঝাড়বাতি আর শিল্পকর্মে সাজানো থাকে। 

সাংহাই মেট্রো

বাংলাদেশে মেট্রোরেল

বাংলাদেশেও মেট্রোরেল চালু হওয়ার মাধ্যমে শহুরে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যানজট, মানুষের জীবনে বিরক্তিকর বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই নেওয়া হয় ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, যা সরকার ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়। 

২০২২ সালের শেষের দিকে ঢাকার উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম অংশটি উদ্বোধন করা হয়। ধীরে ধীরে লাইনটি সম্প্রসারিত হয়ে এখন মতিঝিল পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে রয়েছে ১৬টি আধুনিক স্টেশন, যেগুলোর প্রতিটিতে যাত্রীদের আরাম ও নিরাপত্তার জন্য যুক্ত করা হয়েছে সব আধুনিক সুবিধা। আছে এয়ার-কন্ডিশনড ওয়েটিং এরিয়া, লিফট ও এস্কেলেটর, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা, এবং স্মার্ট কার্ড টিকিটিং সিস্টেম। আর এসব কিছু পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে করেছে সহজ। প্রতিটি ট্রেনের কোচও সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, শব্দহীন ও পরিবেশবান্ধব, তাই গরমে বা ভিড়ে যাত্রা আর আগের মতো কষ্টকর নয়।

বাংলাদেশের মেট্রোরেল

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বাংলাদেশের মেট্রোরেল কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে  ১৫০০ ভোল্ট ডিসি ক্যাথেনারি সিস্টেম, যা ট্রেনকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, স্ট্যান্ডার্ড গেজ ট্র্যাক, এবং অত্যাধুনিক অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোল প্রযুক্তি। যা ট্রেনের গতি, নিরাপত্তা ও সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করে। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এর রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম এর মাধ্যমে ট্রেন যখন থামে, তখন যে শক্তি তৈরি হয়, সেটি পুনরায় বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, এই মেট্রোরেল শুধু সময়ই বাঁচায় না, বরং শক্তিও সাশ্রয় করে। পাশাপাশি পরিবেশকেও রক্ষা করে। 

মেট্রোরেল চ্যালেঞ্জ

তবে বাস্তব দিক থেকে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। যেমন, মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি, এবং যাত্রী ভাড়ার আয় দিয়ে পুরো প্রকল্পের ঋণ শোধ করা কঠিন। অর্থাৎ যাত্রীসংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলেও আয়ের দিক থেকে প্রকল্পটি এখনো লাভজনক নয়। তবে একথা সত্য যে, ঢাকা মেট্রোরেলের বাস্তব সুফল এখন অনেকেই অনুভব করছেন। আগে যেখানে উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে লেগে যেত প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, সেখানে এখন ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটেই যাত্রা সম্পন্ন হচ্ছে। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, অফিসগামী মানুষ চাপমুক্তভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, আর শহরের যানজটও কিছুটা কমছে।

প্রকৌশলী জন ফাওলার এবং উদ্যোক্তা চার্লস পিয়ারসন

এভাবে মেট্রোরেল শুধু এক পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং শহুরে জীবনের গতি, সময় ও পরিকল্পনার প্রতীক হয়ে উঠছে। লন্ডনের ধোঁয়াটে টানেল থেকে শুরু করে ঢাকার ঝকঝকে স্টেশন পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রা মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত উন্নতির এক চমৎকার উদাহরণ। ভবিষ্যতে হয়তো বাংলাদেশও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে স্মার্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সব ধরনের যানবাহন বাস, ট্রেন, মেট্রো ও রিকশা একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে। 

তথ্যসূত্রঃ

Related posts

ইউটিউবে ভিউ পড়ে যাওয়ার কারণ

শেষ হয়ে এলো উইন্ডেজ ১০ এর যুগ

Google Pay এখন বাংলাদেশে! জানুন কীভাবে এটি বদলে দেবে আপনার পেমেন্ট পদ্ধতি

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More