ষাট গম্বুজের মসজিদের নামের ভেতর একটি মজার বিষয় লুকিয়ে আছে। “ষাট গম্বুজ” হলেও এখানে মোট ষাটটি গম্বুজ নেই। এটি একটি সাধারণ ভুল ধারণা।
ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই মসজিদ শুধু ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন নয়, এটি বাংলার অতীত গৌরব এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক। যদি আপনি ইতিহাস, স্থাপত্য, এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসাথে দেখতে চান তবে, এসব কিছু একসাথে পাবেন শুধুমাত্র বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদে।
ইতিহাসের সাক্ষী ষাট গম্বুজ মসজিদ:
ষাট গম্বুজ মসজিদের বিস্তীর্ণ এলাকা; এর শান্ত পরিবেশ এবং সৌন্দর্য দেখে এক মুহুর্তেই হারিয়ে যাওয়া যায় ইতিহাসের গহীনে। মসজিদের নির্মাতা খান জাহান আলী এই স্থানটিকে তৎকালীন খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত করেছিলেন।
ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ হয়েছিলো আনুমানিক ১৪৪২ থেকে ১৪৫৯ সালের মধ্যে। সেইসময় এই স্থানটি ধর্মীয় উপাসনা ছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মসজিদটি তার আকার-আকৃতি, নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় প্রসিদ্ধ।
ষাট গম্বুজ মসজিদের নামকরণ
ষাট গম্বুজের মসজিদের নামের ভেতর একটি মজার বিষয় লুকিয়ে আছে। “ষাট গম্বুজ” হলেও এখানে মোট ষাটটি গম্বুজ নেই। এটি একটি সাধারণ ভুল ধারণা। মূলত এর অভ্যন্তরে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ থাকার কারণে স্থানীয়রা একে ষাট গম্বুজ মসজিদ বলে ডাকতে শুরু করে। এছাড়াও, মসজিদের ছাদে অসংখ্য গম্বুজ থাকার কারণেও এর নাম “ষাট গম্বুজ” মসজিদ হয়ে গেছে।
যা যা দেখা যাবে ষাট গম্বুজ মসজিদে
ষাট গম্বুজ মসজিদ স্থাপত্যশৈলীতে সুলতানি আমলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। চুন-সুরকি এবং ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। পুরো মসজিদের ছাদে ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে ৭৬টি ছোট এবং কেন্দ্রে একটি বড় গম্বুজ রয়েছে।
মসজিদটির অভ্যন্তরে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। এই স্তম্ভগুলোর উপর খিলান তৈরি করা হয়েছে, যা মসজিদের ছদের স্থায়িত্ব বজায় রাখে। মসজিদের দেয়ালের খোদাই করা নকশা, ফুলের ডিজাইন এবং ক্যালিগ্রাফি তৎকালীন ইসলামি শিল্পকলার উৎকর্ষ প্রদর্শন করে।
মসজিদের পূর্ব দিকে তিনটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাশে আরও কয়েকটি দরজা রয়েছে। এই দরজা এবং জানালা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভেতরে প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। যার ফলে মসজিদের অভ্যন্তরে একটি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়।
মসজিদের পাশের দীঘিঃ গায়েবি পুকুর
ষাট গম্বুজ মসজিদের ঠিক পাশেই রয়েছে একটি বিশাল দীঘি, যা খান জাহান আলীর শাসনামলের আরেকটি নিদর্শন। এই দীঘি স্থানীয়ভাবে “গায়েবি পুকুর” নামে পরিচিত। মসজিদ পরিদর্শনের পর দীঘির পাড়ে বসে বিশ্রাম নেওয়া এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কারণ, দীঘির পাড়ের ঠাণ্ডা বাতাস এবং পাখির কিচিরমিচির আপনাকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এনে দিবে।
এই দীঘি শুধু ঐতিহাসিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা কল্পকাহিনি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই দীঘির পানি কখনো শুকায় না।
খান জাহান আলীর মাজার ভ্রমণঃ মাঝি কুমির
ষাট গম্বুজ মসজিদের কাছেই অবস্থিত খান জাহান আলীর মাজার। এটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীদের জন্য একটি পবিত্র স্থান। এখানে খান জাহান আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসেন। মাজারের স্থাপত্যশৈলীও আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
মাজারের পাশে রয়েছে আরেকটি দীঘি, যেখানে স্থানীয়রা “মাঝি কুমির” নামে পরিচিত কুমির দেখতে পান। এই কুমিরকে খাবার দেওয়ার দৃশ্য অনেক পর্যটকের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণ।
UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’
১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ষাট গম্বুজ মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর পেছনে মূল কারণ হলো, এর স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এটি সুলতানি আমলের একটি অমূল্য নিদর্শন। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার পর থেকে এটি সারা বিশ্বে বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
ষাট গম্বুজ মসজিদ যেভাবে যাবেন
ইতিহাসের চাদরে মুড়ি দিয়ে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণের জন্য প্রথমে আপনাকে যেতে হবে খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায়। ঢাকা থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত বাসে যাওয়া সহজ এবং সাশ্রয়ী। বাসে যেতে প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগে। খুলনা শহর থেকে বাগেরহাট মাত্র ৩০ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত। সেখানে স্থানীয় পরিবহন, যেমন রিকশা বা অটোরিকশায় সহজেই মসজিদে পৌঁছানো যায়।
সকালের দিকে যাত্রা শুরু করলে আপনি সারাদিন ধরে মসজিদ ও এর আশপাশের জায়গা ঘুরে দেখতে পারবেন। যারা সময় বাঁচাতে চান, তারা ট্রেনে খুলনা পর্যন্ত এসে সেখান থেকে বাসে বাগেরহাট যেতে পারেন।
ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ১০টা এবং সন্ধা ৭টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহণের বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায়। এছাড়াও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকেও বেশ কিছু পরিবহন খুলনার উদ্দ্যেশ্যে ঢাকা থেকে ছেরে যায়।
এই বাসগুলোতে জনপ্রতি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা ভাড়া লাগে। বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা রিকশা ভাড়ায় ষাটগম্বুজ মসজিদে যাওয়া যায়।
এছাড়াও ঢাকা থেকে সরাসরি খুলনাগামী আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস যায়। সেক্ষেত্রে খুলনা থেকে বাস বা সিএনজিতে করে করে ষাট গম্বুজ মসজিদ যেতে পারবেন। খুলনা ষাট গম্বুজ মসজিদ যেতে সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘন্টার মত।
ষাট গম্বুজ মসজিদ খোলা ও বন্ধের সময়
গরমকালে পর্যটকদের জন্য মসজিদ খোলা থাকে সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত। আর শীতকালে খোলা হয় সকাল ৯ টা থেকে আর বিকেল ৫ টায় বন্ধ করা হয়। শীত ও গরমকাল উভয় সময়ই দুপুর ১টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত মসজিদটি বন্ধ রাখা হয়।
তবে, শুক্রবারে জুম্মার নামাযের জন্যে ১২ টা ৩০ মিনিট থেকে থেকে ৩ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত মসজিদটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। রবিবারে পুরোদিন মসজিদ বন্ধ থাকে এবং সোমবার খোলা হয় বেলা ২.০০ থেকে।
খাওয়া-দাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থা
বাগেরহাট শহরে এবং এর আশপাশে রয়েছে বেশ কিছু মানসম্মত হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট আছে। স্থানীয় রেস্টুরেন্টে সুলভ মূল্যে সুস্বাদু বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ভাত, মাছ, এবং মাংসের পদ এখানে খুব জনপ্রিয়।
থাকার জন্য বাগেরহাটে বিভিন্ন হোটেল এবং অতিথিশালা রয়েছে। যদি আরও ভালো মানের থাকার ব্যবস্থা খুঁজতে চান, তাহলে খুলনা শহরেও থাকতে পারেন। সেখান থেকে দিনে দিনে মসজিদ দেখে ফিরে যাওয়া সম্ভব।
ষাট গম্বুজ মসজিদের আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ করতে গিয়ে দর্শনার্থীরা চাইলে এর আশেপাশের আরও কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে আসতে পারেন। এসব দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে-
- বাগেরহাট জাদুঘর
- মোংলা বন্দর
- নয় গম্বুজ মসজিদ
ভ্রমণে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
১. মসজিদ একটি পবিত্র স্থান, তাই এর পরিবেশ ও নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য অনুরোধ রইল।
২. ভ্রমণের সময় মসজিদের ভেতরে বা বাইরে আবর্জনা ফেলবেন না।
৩. মাজার প্রাঙ্গণে কুমির দেখতে গেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
৪. স্থানীয়দের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করুন এবং তাদের কাছ থেকে ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন।
বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং প্রকৃতির সঙ্গে একটি অনন্য সংযোগ। খান জাহান আলীর সৃষ্ট এই স্থাপত্য নিদর্শন বাংলার গৌরব এবং মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর এক অমূল্য সম্পদ। তাই ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ অবশ্যই তালিকায় রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতা।
রেফারেন্সঃ
- https://www.banglanews24.com/tourism/news/bd/541685.details
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%9F_%E0%A6%97%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%9C_%E0%A6%AE%E0%A6%B8%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%A6
- https://whc.unesco.org/en/list/321/
- https://faruqueengpoint.weebly.com/the-lsquoshat-gambuj-mosquersquo.html