Image default
ঘটমান বর্তমান

কোভিড ভ্যাকসিন – ষড়যন্ত্র নাকি সুস্থতা?

“ভ্যাকসিন নিবেন না, এতে মাইক্রোচিপ ঢোকানো আছে!” – এমন কথা কি আপনারও কানে এসেছে?

ভ্যাকসিন কি আসলেই আমাদের রক্ষা করছে নাকি এটি বড় কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ? কোভিড ভ্যাকসিনকে ঘিরে প্রশ্নগুলো শুরু থেকেই ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও, ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোও বেশ প্রভাব ফেলেছিল মানুষের মনে। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মাইক্রোচিপ লাগানো, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বা বিশ্বব্যাপী ইচ্ছাকৃত মহামারি তৈরির তত্ত্বগুলো কি আসলেই বিশ্বাসযোগ্য? আসুন, আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করি এবং কিছু তথ্য তুলে ধরি যা হয়তো অজানা এখনো। 

কোভিড ভ্যাকসিন কী? 

ভ্যাকসিন হলো এমন একটি পদার্থ, যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে আসল ভাইরাসটি আক্রমণ করলে যেন শরীর এটাকে মোকাবিলা করতে পারে। কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিনও একইভাবে কাজ করে। এটি মূলত শরীরকে শেখায় কীভাবে ভাইরাসটির সাথে লড়াই করতে হয়।

বর্তমানে তিন ধরনের কোভিড ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি প্রচলিত mRNA ভ্যাকসিন (যেমন: ফাইজার, মডার্না), ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন (যেমন: অ্যাস্ট্রাজেনেকা), এবং প্রোটিন সাবইউনিট ভ্যাকসিন (যেমন: নোভাভ্যাক্স)। প্রতিটি ভ্যাকসিনের লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো আমাদের শরীরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। 

mRNA ভ্যাকসিনগুলো একটি নতুন ধরনের ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিনগুলো ভাইরাসের দেহের কোনো একটি অংশের RNA বা কোড শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়। যার ফলে শরীর সেই অংশের ভিত্তিতে প্রতিরোধী প্রোটিন তৈরি করে। ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিনগুলো আবার ভিন্নভাবে কাজ করে। যেখানে ভাইরাসের ক্ষতিকর অংশটি অন্যান্য ভাইরাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এটি আমাদের দেহকে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা জানান, ভ্যাকসিন গ্রহণের পরও আপনি সংক্রমিত হতে পারেন, কিন্তু আপনার রোগের তীব্রতা অনেক কমে যাবে। ভ্যাক্সিন নেয়ার ফলে মৃত্যুহার অনেক দ্রুত কমে গেছে।

বিভিন্ন ভ্যাকসিন সমূহ

ভ্যাকসিনের উন্নয়ন প্রক্রিয়া

অনেকেই ভেবেছিলেন, “ভ্যাকসিন এত দ্রুত কীভাবে তৈরি হলো?” এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ভ্যাকসিন যেন দ্রুত তৈরি করতে পারে সেই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। কোভিড মহামারির ক্ষেত্রে, এই প্রযুক্তির ব্যবহার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা ভ্যাক্সিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। 

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দ্রুত বিকাশ অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। এই কারনে অনেকেই এটা বিশ্বাস করে যে, করোনা ভাইরাস আসলেই ল্যাবে তৈরি হয়েছিল। ২০০৯ সালে যখন সোয়াইন ফ্লু  মহামারি শুরু হয়, তখনও বিজ্ঞানীরা দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন। সেসময় প্রায় ছয় মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন জনগণের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। অপরদিকে, পোলিও ভ্যাকসিন তৈরির জন্য বিজ্ঞানীদের প্রায় ১৫ বছর গবেষণা করতে হয়েছিল। এছাড়াও হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সময় লেগেছিলো প্রায় ১০ বছর। ভ্যাকসিন তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাধারণত ভাইরাসের প্রকৃতি, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং গবেষণার নির্ভরযোগ্যতার উপর নির্ভর করে।

বিভিন্ন পর্যায়ে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা করেন। কোভিড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও প্রতিটি ধাপে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পুর্ন করা হয়েছে। এর পরে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো (যেমন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, WHO এবং সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, CDC) নিশ্চিত করেছেন যে ভ্যাকসিনগুলি সুরক্ষিত এবং কার্যকর।

ভ্যাকসিন উন্নয়ন প্রক্রিয়া

জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব 

ভ্যাকসিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এর সাথে জড়িত ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো নিয়ে। একটি বহুল প্রচারিত তত্ত্ব ছিল ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মাইক্রোচিপ ইনজেক্ট করা হচ্ছে। যদিও এই তত্ত্বের কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবু্ও  অনেক মানুষই এটি বিশ্বাস করেছে। এ নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেছিল যে কোভিড ভ্যাকসিনের মধ্যে মাইক্রোচিপ রয়েছে।

একটি অদ্ভুত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছিল যে, ৫জি মোবাইল টাওয়ার থেকে বিকিরণ ছড়িয়ে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ বাড়ছে। ৫জি টাওয়ার এবং কোভিড সংক্রমণের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছিল, যা কিছু মানুষের ভয় এবং অজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ছড়ানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) এবং বিজ্ঞানীরা একাধিকবার বলেছেন, ৫জি টাওয়ারের বিকিরণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

আরেকটি জনপ্রিয় গুজব ছিল যে, ভ্যাকসিন নিলে ডিএনএ পরিবর্তন হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন mRNA ভ্যাকসিন কেবল কোষকে প্রোটিন তৈরি করার পদ্ধতি শিখায়।  এটি কোনও ভাবেই কোষের DNA পরিবর্তন করে না। mRNA ভ্যাকসিন কোষের নিউক্লিয়াসের বাইরে কাজ করে এবং DNA এর সাথে কোনও ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি (CDC) এই ভুল তথ্যগুলো দূর করতে কাজ করে যাচ্ছে।

টিকা দেওয়ার সময়

ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: বাস্তব বনাম ভুল ধারণা

ভ্যাকসিন নেওয়ার পর বেশিরভাগ মানুষেরই সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যেমন, হালকা জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০% ভ্যাকসিন গ্রহীতার মধ্যেই এই মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে এইগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। এসব লক্ষণ শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার সক্রিয়তার প্রমাণ। 

সামাজিক মাধ্যমে অনেক ভুল ধারণা ছড়িয়ে গেছে। যেমন এই ভ্যাকসিন হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে গুরুতর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। যা প্রায় ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১ জনেরও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং CDC-এর মতে, ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের মধ্যে গুরুতর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার হার মাত্র ০.০০০১%।

ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার পরিসংখ্যানগত চার্ট

মহামারি শেষ করতে ভ্যাকসিনের ভূমিকা

বিশ্বব্যাপী কোভিড ভ্যাকসিনের গ্রহণযোগ্যতা শুরু থেকেই ভিন্ন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইইউ দেশগুলো তাদের প্রায় ৭০-৮০% জনগণকে দ্রুত টিকা দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে ভ্যাকসিনের সরবরাহ ও বিতরণে সময় লেগেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং কোভ্যাক্স উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভ্যাকসিন সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ভারতে ব্যাপক ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়েছিল। বাংলাদেশে এক দিনে প্রায় ৮০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল। যেখানে ২ বিলিয়নেরও বেশি ডোজ দেওয়া হয়। ফাইজার ও মডার্না ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ছিল প্রায় ৯৫%। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিভিন্ন দেশের ভ্যাকসিনেশন চার্ট

কেন এখনো মানুষ ভ্যাকসিন নিতে দ্বিধাগ্রস্ত?

কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে আরেকটি বিতর্ক ছিল ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার নৈতিকতা নিয়ে। বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিনের বাধ্যতামূলক নিয়ম নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। কিছু মানুষ এটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে। বিশেষ করে যখন কর্মক্ষেত্রে বা ভ্রমণে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

অনেক মানুষ ভ্যাকসিন সম্পর্কে ভুল ধারণা পেয়েছেন এবং তারা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। কেউ কেউ সরকার বা স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এর ফলে অনেকেই ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে বিরত আছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কোভিড ভ্যাকসিন শুধু একটি প্রতিষেধক নয়, এটি ছিল বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টা।  যদিও বিভিন্ন গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বারবার। সচেতনতা এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে মহামারি থেকে মুক্তি পেতে পারি।

আপনি কী বিশ্বাস করেন? ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নাকি বিজ্ঞান?

ভ্যাকসিনের অজানা ও চমকপ্রদ তথ্য

ভ্যাকসিন সম্পর্কে কয়েকটি অজানা তথ্য আছে যা অধিকাংশ মানুষ জানেন না:

  • ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড ভ্যাকসিন গ্রহণের পর ৮০ শতাংশ মানুষের মধ্যে হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেমন জ্বর, ক্লান্তি বা মাথা ব্যথা। এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে।
  • ফাইজার এবং মডার্না ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।
  • কিছু দেশের মধ্যে ভ্যাকসিন বিতরণ ব্যবস্থায় বৈষম্য ছিল। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন পায়নি। যার জন্য ওইসব অঞ্চলে সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

Related posts

ফেক নিউজ ও পৃথিবীজোড়া যত অদ্ভুত কাণ্ড

পুশরাম চন্দ্র

ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত দল কী জনপ্রিয় হয়ে উঠবে?

চীনের ডিপসিক – মার্কিন শেয়ার মার্কেটে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধ্বস

আবু সালেহ পিয়ার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More