সুখবর হলো, এই জলাধারের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ সূর্যালোক পৌছাতে পারে তা সালোকসংশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট! পৃথিবীতেও বরফের মধ্যে তৈরি হওয়া একই রকম জলাধারে শৈবাল, ছত্রাক এবং মাইক্রোস্কোপিক সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার সবকটি সালোকসংশ্লেষণ থেকে শক্তি অর্জন করে থাকে।
কৌতূহল হওক কিংবা মানব সভ্যতার বিকল্প আবাসস্থল হিসেবে হওক, মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার কাজ চলছে প্রাচীন মিশরীয়দের সময় থেকে। একদিন পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ শেষ হয়ে যেতে পারে, তখন মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রে অন্য কোন গ্রহ কাজে আসতে পারে কিনা বা এই মহাবিশ্বে আমরাই কি একা, এরকম বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য নাসা বিভিন্ন সময় মঙ্গল অভিযান চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে।
যদিও মঙ্গল গ্রহে প্রাণের সন্ধান বা প্রকৃত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি কিন্তু নাসার নতুন একটি গবেষণা প্রস্তাব করেছে যে, মঙ্গলে বরফের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে মাইক্রোবিয়াল জীবন!
মাইক্রোবিয়াল জীবন কী
মাইক্রোব বলতে এমন সুক্ষ্ণাকৃতির জীবকে বোঝায় যা খালি চোখে দেখা যায় না। এটি একক কোষীয় বা কোষের একটি উপনিবেশ হিসেবে থাকতে পারে। ডাচ বিজ্ঞানী অন্তনি ভ্যান লিউয়েনহউক ১৬৭০-এর দশকে প্রথম মাইক্রোবের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন।
নাসার গবেষোণা: মঙ্গলে বরফের নিচে প্রাণের সন্ধান
বর্তমানে তরল পানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে না থাকলেও এক ধরনের ধূলিময় বরফের অস্ত্বিতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে, নাসার গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, এই বরফ পৃষ্ঠের নীচে গলিত পানির অগভীর জলাধার রয়েছে। তার থেকেও বড় সুখবর হলো, এই জলাধারের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ সূর্যালোক পৌছাতে পারে তা সালোকসংশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট!
পৃথিবীতেও বরফের মধ্যে তৈরি হওয়া একই রকম জলাধারে শৈবাল, ছত্রাক এবং মাইক্রোস্কোপিক সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার সবকটিই সালোকসংশ্লেষণ থেকে শক্তি অর্জন করে থাকে। এই তথ্যটি মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে আসা জাগিয়েছে ।
তবে, এইসব ব্যাখ্যা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে করা হচ্ছে। নাসার রিপোর্ট অনুযায়ী, মঙ্গল গ্রহে দুই ধরনের বরফ রয়েছে: জমাট বাঁধা পানি এবং জমাট বাঁধা কার্বন ডাই অক্সাইড। Nature Communications Earth & Environment-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে খুল্লার এবং তার সহকর্মীরা মঙ্গলে পাওয়া প্রথম ধরনের বরফ, অর্থাৎ, পানি তৈরির বরফ নিয়ে গবেষণা করেছেন। বরফ যুগে ধূলিকণার সঙ্গে মিশ্রিত তুষারপাতের মাধ্যমে এই বরফ গঠিত হয়েছে। মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে মঙ্গলের পৃষ্ঠে ধীরে ধীরে প্রাচীন তুষার জমে এই বরফ তৈরি হয়েছে।
যদিও বরফের গভীর স্তরে ধূলিকণা আলো পৌছাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে, বরফের নিচে সূর্যের আলো পেয়ে পানির পুকুর তৈরি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা, কালো ধূলিকণা আশেপাশের বরফের চেয়ে বেশি সূর্যালোক শোষণ করে, যা বরফকে উষ্ণ এবং পৃষ্ঠের কিছুটা নিচে গলিয়ে দিতে সক্ষম। ফলে, তৈরি হতে পারে বরফের আস্তরণের নিচে অগভীর জলাধার। আর, এই জলাধারেই মিলতে পারে প্রাণের অস্তিত্ব বলে আশা করছে নাসা।
এখানে একটি বিতর্কের বিষয়েও দাঁড়িয়েছে যে, নাসা অভিযান চালানোর মাধ্যমে ভুলবশত সেখানকার প্রাণের অস্তিত্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে নাকি। গবেষক ডার্ক শুলেজ-মাকুচ আশঙ্কা করেছেন যে, ১৯৭৬ সালে নাসার ভাইকিং ল্যান্ডারদের দ্বারা পরিচালিত পরীক্ষাগুলো অসাবধানতাবশত মঙ্গল শিলায় বসবাসকারী জীবাণুগুলিকে হত্যা করতে পারে। তার ধারণা যখন নাসার ভাইকিং ল্যান্ডার পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র, শুষ্ক-প্রতিরোধী জীবন-রূপগুলোর নমুনা সংগ্রহ করেছিল, তখন সেই মাইক্রোবগুলো পরীক্ষায় শনাক্ত করার আগেই মাইক্রোবগুলো মারা গিয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে ।
মঙ্গলে পানির অস্তিত্ব এবং তার প্রভাব
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, একসময় মঙ্গল গ্রহে ঠিক পৃথিবীর মতোই বায়ুমণ্ডল ছিল। এমনটি হলে অতীতে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি এবং মাইক্রোবিয়াল জীবনের অস্তিত্বও থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। মঙ্গল গ্রহে রোভার ও অরবিটারের গবেষণা এবং মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া প্রমাণ ইঙ্গিত করে যে, প্রায় কয়েক বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলে কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ পুরু বায়ুমণ্ডল ছিল। এই বায়ুমণ্ডল গ্রিনহাউস প্রভাব তৈরি করতে পারে, যা গ্রহটিকে উষ্ণ রাখতে এবং হ্রদ, নদী, এমনকি অগভীর সমুদ্র সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম।
তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল নাটকীয়ভাবে পাতলা হয়ে গেছে। এর একটি কারণ হতে পারে, পৃথিবীর মতো মঙ্গল গ্রহে শক্তিশালী কোন চৌম্বকক্ষেত্র না থাকা। যার ফলে, সৌরঝড় আঘাত হানায় গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে।
মঙ্গলের ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণা করা নাসার একটি গবেষণার নাম ম্যাভেন মিশন। এই গবেষণায় দেখানো হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌর বায়ু কীভাবে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মঙ্গলগ্রহে পানির অস্তিত্বের কিছু প্রধান প্রমাণ হচ্ছে-
প্রাচীন নদী ও হ্রদের চিহ্ন
মঙ্গলের পৃষ্ঠে খাত, উপত্যকা, এবং হ্রদের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা করা হয় যে, একসময় সেখানে পানি প্রবাহ ছিল। এই নদী ও হ্রদগুলির অবশিষ্ট রূপ আজও মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক গঠনে দৃশ্যমান।
বরফের স্তর
মঙ্গলের দুই মেরুতে বিশাল পরিমাণ বরফের স্তর রয়েছে, যেগুলো মূলত হিমায়িত পানি এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের বরফ দিয়ে তৈরি। এটা সম্ভব হতো না, যদি না সেখানে একসময় প্রচুর পরিমাণে পানি না থাকতো।
মাটির নিচে বরফ
২০০৮ সালে নাসার ফিনিক্স মিশনেও মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আবিষ্কার করা হয়। রোভারটি মঙ্গলের মাটির নমুনা নিয়ে গবেষণা করে নিশ্চিত হয় যে মাটির নিচে হিমায়িত পানি রয়েছে।
লবণাক্ত পানির প্রবাহ
নাসার মার্স রিকনাইসেন্স অরবিটার (MRO) মিশনের মাধ্যমে পাওয়া মঙ্গল গ্রহের কিছু ছবিতে অন্ধকার রেখা দেখা যায়। এটা থেকে মনে করা হয় যে, গ্রীষ্মকালে মঙ্গলের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র পরিমাণ লবণাক্ত পানি প্রবাহিত হতে পারে।
হাইড্রেটেড খনিজের উপস্থিতি
মঙ্গলের পৃষ্ঠে এমন কিছু খনিজ পাওয়া গেছে যা সাধারণত পানির সংস্পর্শে এসেই তৈরি হয়। যেমন, ক্লে বা মাটির খনিজ এবং সালফেটের মতো কিছু খনিজ মঙ্গলে রয়েছে, যা প্রাচীনকালে পানি ও মাটির মিশ্রণে তৈরি হয়েছিল।
রোভার এবং অরবিটারের তথ্য
নাসার কিউরিওসিটি এবং পারসিভেরেন্স রোভার মঙ্গলের মাটির মধ্যে পানির প্রাচীন চিহ্ন এবং জীবাশ্মের সন্ধান করছে। তাদের পাঠানো তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচীনকালে মঙ্গলের পরিবেশ হয়তো প্রাণের উপযোগী ছিল।
এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের গণনা অনুসারে মঙ্গল পৃষ্ঠের প্রায় ১১.৫-২০ কিমি নিচে পাথরের মধ্যে বিশাল পরিমাণে তরল পানি আটকে থাকতে পারে। প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এ লিখিত প্রতিবেদনে রাইট ও তার সহকর্মীরা ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে তারা মঙ্গলের জন্য মাধ্যাকর্ষণ ডেটা এবং নাসার ইনসাইট ল্যান্ডারের রেকর্ডকৃত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করেছেন।
তাদের মতে, পৃথিবীর ভূগর্ভে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যেভাবে পানি প্রবেশ করেছে, তেমনটি মঙ্গলেও ঘটতে পারে। কিন্তু ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ড. স্টিভেন ব্যানহাম সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, মানব সভ্যতার নতুন আবাস অনুসন্ধানে এটি তেমন প্রভাব ফেলবে না; কেননা এই পানির ব্যবহার সহজলভ্য নয়।
মঙ্গল মেরু অঞ্চলে প্রাণের সম্ভাবনা
মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রাণের সম্ভাবনা থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ‘মঙ্গল এক্সপ্রেস অরবিটার’ এর রাডার সংকেতের মাধ্যমে দক্ষিণ মেরুর বরফ স্তরের নিচে গভীর ভূগর্ভস্থ হ্রদের উপস্থিতির ইঙ্গিত পায়। আর তরল পানির সন্ধান পাওয়া মানেই সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভবনা অনেক বেশি। তবে, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে যে, এই সংকেতগুলো মাটির বিশেষ ধরনের কাদামাটির থেকেও আসতে পারে।
নাসা মঙ্গল গ্রহে একটি শিলাও আবিষ্কার করেছে যা “Cheyava Falls” নামে পরিচিত। যার গায়ে চিতা বাঘের ছোপের মত চিহ্ন পাওয়া যায়। এমন চিহ্নগুলো পৃথিবীতে সাধারণত মাইক্রোব বা জীবাণু এবং জ্বালানি স্থায়িত্বকাল নির্দেশ করে। এই দাগগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাচীন নোয়াকিয়ান যুগে মঙ্গলের পৃষ্ঠের পরিবেশ জীবাণুদের জন্য বাসযোগ্য ছিল।
মঙ্গল গ্রহে ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের সময়কালকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াকিয়ান যুগকে সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রাথমিক যুগ বলা হয়। ধারণা করা হয়, এই সময়েই মঙ্গলে তরল পানির প্রবাহ ছিল।
নোয়াকিয়ান যুগেরপরেই আসে হেস্পিরিয়ান যুগ। এই যুগে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ কমে আসতে থাকে এবং মঙ্গল গ্রহ ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়। তারপর, বর্তমান যুগকে বলা হচ্ছে আমাজোনিয়ান যুগ।
মঙ্গলে নাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
লাল গ্রহ নামে পরিচিত এই মঙ্গল গ্রহ এখন যেন রোবটের আবাসস্থল। নাসা ইতোমধ্যে লাল গ্রহে যে পরিমাণ রোবট পাঠিয়েছে তাতে মনে হয় মঙ্গল গ্রহে রোবটেরই বিস্তার ঘটছে। তাদের পাঠানো প্রতিটি রোবোটিক অনুসন্ধানকারীর নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা রয়েছে। এই রোভারগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্য মানুষের মতো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যেমন- এদের “মাথা,” “দেহ,” এবং “হাত ও পা” রয়েছে।
নাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূলত মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধান করা, ভূতত্ত্ব ও জলবায়ু সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর জন্য প্রযুক্তি তৈরি করা। এ লক্ষ্যে তারা তাদের মিশনের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে এখন।
রাতের আকাশে অনেক সময় উজ্জ্বল তারা হিসেবে দেখা যায় মঙ্গল গ্রহকে। সবচেয়ে উজ্জল দেখা যায় যখন পৃথিবী এবং সূর্যের কাছাকাছি হয় মঙ্গল গ্রহ। এই উজ্জ্বল তারার দিকে তাকিয়ে অনেকের মনে একটা কৌতূহলী জাগে যে এই উজ্জ্বল তারাতেও কি পৃথিবীর মতো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।পৃথিবীর সবচেয়ে নিকট এই মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে যেমন প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনেক আগ্রহ ছিল তেমনি বর্তমানে জন্ম নেওয়া একটি ছোট শিশুর মনেও তা অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়।
রেফারেন্স:
Could Life Exist Below Mars Ice? NASA Study Proposes Possibilities
Mars Exploration – NASA Science
Mars Exploration Future Plan 2023 – 2043 – NASA Science
New hope of finding life on Mars after indication of water, scientists say
NASA may have unknowingly found and killed alien life on Mars 50 years ago, scientist claims | Space