বিখ্যাত সিনেমা থেকে শহরের পরিচিতি। মসজিদ,চার্চ থেকে নাইটক্লাব, বার! আবার মুসলিম সংস্কৃতি থেকে ইহুদি সংস্কৃতি; সব আছে এ শহরে।
মরক্কো উত্তর আফ্রিকার একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এটি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ের দেশ। আরবি শব্দ ‘মরক্কো’ মানে হলো ‘পশ্চিমের রাজ্য’। আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি দেশকে মাগরেব (অর্থ ‘পশ্চিম’ বা ‘সূর্যাস্ত’এর দেশ) বলা হয়, মরক্কো এদের মধ্যে অন্যতম। আর এই মরক্কোর বৃহত্তম শহর কাসাব্লাঙ্কা। নামটি যদিও ‘কাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার পর থেকে অধিক পরিচিত, কিন্তু সিনেমা দিয়ে তো সবটা জানা বা বোঝা যায় না। এই শহরের আরও অনেক কিছু জানার আছে।
চলুন দেখা যাক কি কি রয়েছে এখানে-
দেশ | মরক্কো |
অঞ্চল/রাজ্য | কাসাব্লাঙ্কা |
আয়তন | ৩৮৬ বর্গকিলোমিটার |
জনসংখ্যা | ৪২,৭০,৭৫০ জন |
সরকারি ভাষা | আরবি ফারসি |
প্রধান মুদ্রা | দিরহাম |
সময় অঞ্চল | ইউটিসি +১ |
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | – |
কাসাব্লাঙ্কার আয়তন ও জনসংখ্যা
কাসাব্লাঙ্কা শহরটি আয়তনের দিক দিয়ে বেশ বড়ো। মরক্কোর সবচেয়ে বড় শহর তো বটেই, আফ্রিকা মহাদেশেরও অন্যতম বড় শহর এটি। ৩৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই শহরটিতে জনসংখ্যাও নেহায়েত কম না। প্রায় ৪,২৭,০৭৫০ জন লোক এখানে বসবাস করে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় কাসাব্লাঙ্কার নগর পরিকল্পনা, যানবাহন, পরিবহন সমস্যা ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কাসাব্লাঙ্কার অবস্থান ও জলবায়ু
কাসাব্লাঙ্কা মরক্কোর একদম কেন্দ্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত। মরক্কোর রাজধানী রাবাত থেকে এটি ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। শহরটির এই উপকূলীয় ও কেন্দ্রিয় অবস্থানের কারণে এই শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মরক্কোর জন্য।
মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলে অবস্থিত এ শহরটির জলবায়ু ভূমধ্যসাগরীয়। এছাড়াও সমুদ্রতীরবর্তী হবার কারণে এখানকার আবহাওয়াও সমভাবাপন্ন। বছরের অধিকাংশ সময়ই এখানে হালকা শীত শীত ভাব বজায় থাকে। শীতকালে এখানে মৃদু শীত থাকে আর গরমকাল শুষ্ক হলেও চরম মাত্রার গরম এখানে পড়েনা।
এখানকার বায়ুতে দূষণ নেই। বছরের পর বছর ধরে কাসাব্লাঙ্কা তাই একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
কাসাব্লাঙ্কার ইতিহাস
কাসাব্লাঙ্কা, শহর আরবিতে “আদ-দার আল-বাইদা” নামে পরিচিত। শহরটির ইতিহাসের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে, যখন ফিনিশীয়রা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের সময়, এই স্থানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। তবে রোমানদের পতনের পর অঞ্চলটি দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বহীন ছিল।
ইসলামি শাসন ও বসতি স্থাপন
৭ম শতকে ইসলামি বিজয়ের পর, কাসাব্লাঙ্কা এক নতুন জীবন লাভ করে। এই সময় শহরটি “আনফা” নামে পরিচিত ছিল এবং এটি একটি সমৃদ্ধ বন্দর নগরী হয়ে ওঠে। আনফা উত্তর আফ্রিকার বারবার উপজাতিদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এবং পরবর্তীতে এটি ইসলামি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।
পর্তুগিজ শাসন
১৫শ শতকে পর্তুগিজরা আনফা দখল করে নেয় এবং এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করে। তারা এর নাম দেয় “কাসা ব্রাঙ্কা” বা “সাদা ঘর।” পর্তুগিজদের শাসনকাল শহরটিতে ইউরোপীয় প্রভাব নিয়ে আসে।
মরক্কোর সুলতানি শাসন ও আধুনিকায়ন
১৭শ শতকে মরক্কোর সুলতানরা পর্তুগিজদের হটিয়ে আনফাকে পুনর্দখল করে এবং এটিকে ইসলামি সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৮শ শতকে সুলতান মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ শহরটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং এর বর্তমান নাম “আদ-দার আল-বাইদা” (সাদা ঘর) দেন।
স্বাধীনতা ও সমসাময়িক কাসাব্লাঙ্কা
১৯১২ সালে ফ্রান্স মরক্কোকে প্রটেক্টরেট হিসেবে ঘোষণা করার পর কাসাব্লাঙ্কা ইউরোপীয় স্থাপত্য ও আধুনিকতার এক নতুন অধ্যায় শুরু করে। ফরাসি শাসনকালে শহরে রেলপথ, বন্দর এবং আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সংযোজন হয়। ১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীনতা অর্জনের পর কাসাব্লাঙ্কা তার অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি বর্তমানে মরক্কোর শিল্প, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার কেন্দ্র।
কাসাব্লাঙ্কার সংস্কৃতি
তরুণদের জন্য খুবই জনপ্রিয় এ শহর৷ কারণ এটি একই সাথে ব্যবসা আবার সৃজনশীল শিল্প,কলা ইত্যাদির সমারোহে সম্ভাবনাময়। এটাই তরুনদের জীবীকার সন্ধানে টানে। বিনোদনের ক্ষেত্রেও জুড়ি নেই এই শহরটির। পুরোনো স্থাপত্যশৈলী, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস থেকে আধুনিক যুগের বার, নাইটক্লাবও রয়েছে এখানটায়। সবমিলিয়ে এই শহরে একেক জায়গায় একেক ভাব বলা যায়।
কাসাব্লাঙ্কার খাবার
মরক্কোর খাবার ও সংস্কৃতি আরব,আলজেরিয়া, বর্বর প্রজাতির খাবার সংমিশ্রণে। আবার যেহেতু কাসাব্লাঙ্কা আটলান্টিক ঘেঁষে রয়েছে, তাই এখানকার খাবারে সী-ফুডও বেশ জনপ্রিয়। পাস্তিলা, হারিরা, ফিস্সা ইত্যাদি মরক্কোন খাবারও খেতে খারাপ লাগবেনা।
কাসাব্লাঙ্কা শহরটা আসলে পুরোটাই জমজমাট শহর। এর সৌন্দর্য সেভাবে উপভোগ করতে চাইলে হাতে সময় নিয়ে ভ্রমণ করতে বের হওয়াই ভালো।
কাসাব্লাঙ্কার ভাষা
ভাষার ক্ষেত্রে দারিজা (মরোক্কান আরবি) এখানকার সরকারি ভাষা। আরবীয় ও ইসলামী সংস্কৃতির সাথে মরোক্কোর আঞ্চলিকতা মিলে সৃষ্টি হয়েছে এ ভাষা। কাসাব্লাঙ্কাতেও এই ভাষা প্রধান তবে আমাজিঘ, বর্বর এবং ফরাসী ভাষার দৌরাত্ম্যও রয়েছে এখানে। বর্তমানে ইংরেজি ভাষাও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কাসাব্লাঙ্কায়।
কাসাব্লাঙ্কার ধর্ম
মরক্কোর প্রধান ধর্ম ইসলাম। ইসলামী সংস্কৃতি (বিশেষ করে সুন্নী) তাই ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে মিশে রয়েছে। তবে, এখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, এ শহরটি ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদার।
সঙ্গীত ও সাহিত্য
মরক্কোর স্বতন্ত্র সঙ্গীত ‘গনগয়া’, ‘শাবি’ ও আন্দালুসিয়ান সঙ্গীত এখানে বেশ জনপ্রিয়। ইসলামী আধ্যাত্মিক ধারা, ‘সুফী ধারা’ এবং আলজেরীয় ‘রাই’ সঙ্গীত এখানে সমাদৃত। বর্তমানের পপ ধারার আধুনিক গানের চর্চাও এখানে হয়ে থাকে।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাসাব্লাঙ্কা ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। এখানকার কবিতা, গল্পে মানুষের আবেগীয় ভাব, অভিবাসন, সামাজিক সমস্যা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াবলি প্রতিফলিত হয়েছে।
কাসাব্লাঙ্কার পোশাক
মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘জেল্লাবা’(Djellaba) এখানে জনপ্রিয়। বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানে মহিলারা কারুকাজ করা ‘কাফতান’ (Kaftan) পরিধান করেন। বর্তমানে নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাকে পশ্চিমা পোশাকের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
সবমিলিয়ে কাসাব্লাঙ্কা সংস্কৃতি ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে বিশ্বায়নের মিশ্রণের এক অপূর্ব নিদর্শন।
কাসাব্লাঙ্কার বিখ্যাত পর্যটন স্থান
হাসান (২য়) মসজিদ
কাসাব্লাঙ্কায় এসেছেন আর এই মসজিদ দেখবেন না এমন হতেই পারে না। কাসাব্লাঙ্কার এই বিখ্যাত মসজিদটি বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি এবং এটি মরক্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনও। এই মসজিদটাকে কাসাব্লাঙ্কার সেরা পর্যটন আকর্ষণ বললেও ভুল বলা হবেনা।
আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষা, ৯ হেক্টর আয়তনের এই মসজিদটি তার স্থাপত্যশৈলীর জন্যও বিশ্বে সমাদৃত। ইতিহাস ঘাটলে, ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৩, পুরো ৭ বছরের পরিশ্রমের ফল এই মসজিদটি। এর ফল যে কেমন তা আপনি যখন মসজিদের ভেতরে ঢুকবেন তখন দেখবেন। ভেতরে প্রার্থনা কক্ষের অসাধারণ কারুকাজ, রঙবেরঙের ঝাড়বাতি ও এদের সঙ্গে রয়েছে ছাদখোলা বিশাল আকাশ।
প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের জন্য এটি এমন ব্যতিক্রমভাবে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও এটি উন্মুক্ত চিন্তার প্রতীকও। সচরাচর মসজিদে মুসলিমদের দেখা গেলেও এই মসজিদে সকল ধর্মের মানুষের ভিড় দেখা যায়। এখানে কোন বাধ্যবাধকতা নেই তাই সাবলীলভাবেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
পুরোনো মেদিনা
মরক্কোর প্রধান বন্দর নগরী কাসাব্লাঙ্কা’। কাসাব্লাঙ্কা তার শক্তির জন্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবেও সমধিক পরিচিত। পুরোনো মেদিনা থেকে আবার এই কাসাব্লাঙ্কার ইতিহাস শুরু। তবে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ব্যতীত অতীত ইতিহাসও এখানে রয়েছে একদম তরতাজা! চলুন দেখা যাক এখানকার দর্শনীয় জিনিসগুলো-
পুরনো মেদিনার নকশা করা ভবন
বুলেভার্ড মোহাম্মদ (৫ম) রোড দিয়ে পুরোনো মেদিনাতে ঢুকতে হয়। এই রাস্তাটা শুধু রাস্তা নয়। এর দুই পাশে ফরাসী স্টাইলের উঁচু উঁচু নকশা আর ভবন রয়েছে। রাস্তা পার হতে হতেই আপনি দেখতে পাবেন এর সবটুকু সৌন্দর্য।
রাস্তা পেরোলেই পুরোনো মেদিনা শহরে ফরাসীদের তৈরি পুরোনো আবাসিক ভবনগুলো দেখতে পাবেন। সরু গলির এ শহরের দেয়ালে দেয়ালে কিছু অসাধারণ, পুরোনো চিত্রকর্মও দেখতে পাবেন। এখানে প্রতিদিন হাজারো চিত্রশিল্পীদের সমাগম হয়। তাঁরা টাকার বিনিময়ে চিত্র এঁকে থাকেন। এখানে পর্যটকরা তাদের নিজেদের ছবিই সচরাচর আঁকিয়ে নিয়ে থাকেন। আপনি চাইলেই সুযোগটা নিতে পারেন।
মার্চ সেন্ট্রাল
এছাড়াও এখানে স্থানীয় মার্কেট বা কাসাব্লাঙ্কার প্রধান মার্কেট ‘মার্চ সেন্ট্রাল’ অবস্থিত। এখানে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক থেকে শুরু করে সবজি, টাটকা ফল, জ্যান্ত মাছ, সী-ফুড সবকিছুরই সমাহার দেখতে পাবেন। রয়েছে খাবারের জন্য রেঁস্তোরা স্টল। একদম সমুদ্রতীরবর্তী হবার কারণে এসব রেঁস্তোরায় বসে জিরিয়ে নেয়াসহ সমুদ্রের সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায়।
হাবোস কোয়ার্টার
পুরোনো মেদিনার একেবারে পাশেই আবার ‘হাবোস কোয়ার্টার’ অবস্থিত। এই স্থানটিতে মরক্কান-ফরাসী স্টাইলের মিশ্রণে নির্মিত নগর-পরিকল্পনা দেখতে দর্শক ভিড় জমান।
নটর-ডেম ডি লর্ডেস চার্চ
১৯৫৪ সালে নির্মিত এই চার্চটি একটি ‘আধুনিকতাবাদী রোমানীয় ক্যাথলিক চার্চ’। এর সব আকর্ষণ আবার এই চার্চটির ভেতরে। বাইরে থেকে খুব সাধারণ লাগে।
ঐতিহাসিক এই চার্চটির প্রধান আকর্ষণ হলো, এর ভেতরের কাঁচের অসাধারণ নিখুঁত কারুকার্য। এছাড়াও এর কংক্রিটের বিশাল প্রবেশদ্বারও এর দর্শনীয় স্থান।
বোয়াজ্জা ও আনফা সৈকত
বোয়াজ্জা সৈকত কাসাব্লাঙ্কার বাইরের দিকে অবস্থিত। এখানটায় স্থানীয়রা একটু রিফ্রেশমেন্টের জন্য সচরাচর যায়। পর্যটকরাও অনেকে নিভৃতে সময় কাটানোর জন্য যায়।
আর আনফা সৈকতটি কাসাব্লাঙ্কা মূল শহর থেকে একদমই কাছে। বেশ জনপ্রিয় এ স্থানটিতে আবার মানুষজনের ভিড় থাকে। বিনোদন হিসাবে এখানে রয়েছে জলক্রীড়ার সুযোগ।
আটলান্টিকের কোল ঘেঁষা এ দুটি সৈকত সৌন্দর্যপিপাসু ও প্রশান্তি খোঁজা মানুষদের জন্য সেরা স্থান। ফুল রিফ্রেশমেন্টের জন্য আবার এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক হোটেল ও রেঁস্তোরা।
এর মধ্যে ফোর সিজন হোটেল, রেডিসন ব্লু হোটেল, কাসাব্লাঙ্কা ম্যার্রিঔট হোটেল ইত্যাদি এখানকার সেরা হোটেল ও রিসোর্ট। তবে সামর্থ্য এবং পছন্দ মোতাবেক রেঁস্তোরা নির্বাচন করতে পারবেন। বিকালের দিকে গেলে ভালো লাগবে।
আরব লীগ পার্ক
কাসাব্লাঙ্কার সবচেয়ে বৃহত্তম ও অনাবিল সবুজের অরণ্য হলো এই পার্কটি। ৩০ হেক্টর আয়তনের এই পার্কটি একদম শহরের মূল কেন্দ্রে অবস্থিত। এই পার্কটির বিশেষত্ব হলো, এখানে রয়েছে নানান গাছ-গাছালির বাগান,পর্বত, ঝর্ণা ও হাঁটার মতো দীর্ঘ সুন্দর পথ। সবুজ ফুলেল বাগানের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেক পর্যটকই এদিকটায় আসতে ভোলেন না।
মরক্কোর ইহুদী জাদুঘর
এটি আরব বিশ্বের একমাত্র ইহুদী জাদুঘর। এটি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটা নির্মাণের মূল লক্ষ্য হলো ইহুদীদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারণ এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রদর্শন করা।
এই জাদুঘরে বিভিন্ন ধরণের ছবি, শিল্পকলা, ধর্মীয় সামগ্রী থেকে ইহুদীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আচার-অনুষ্ঠান সামগ্রী সবই রয়েছে। এছাড়াও, ভাগ্য ভালো থাকলে এখানকার শিক্ষামূলক সেমিনারের দর্শক হবার সুযোগও পেতে পারেন। এখানেও নানা ধর্ম, বর্ণের পর্যটকদের দেখা মিলে।
কাসা ফিন্যান্স সিটি টাওয়ার
এই আকাশচুম্বী বিশাল এই স্থাপনা সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটি আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে তৈরি করা। এর দিকে তাকালে আধুনিকতার ছোঁয়া স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আবার এই টাওয়ারের আধুনিক ডিজাইন কাসাব্লাঙ্কা শহরের ‘অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা’র প্রতীকও।
MACCL (মরোক্কান সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি আর্ট)
এটি একটি জাদুঘর। সচরাচর জাদুঘর জিনিসটায় ঐতিহ্যকে বেশি ধারণ করা হয় বলে আমরা জানি। এই জাদুঘরেও ঐতিহ্যকে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু, এরই সাথে এই জাদুঘরটি বৃহৎভাবে মরক্কোর আধুনিক শিল্পকেও প্রদর্শন করে।
টুইন সেন্টার
টুইন টাওয়ার প্যারিসে রয়েছে আর কাসাব্লাঙ্কায় রয়েছে টুইন সেন্টার। তবে এই টুইন সেন্টারেও দুটি টাওয়ারকে যুক্ত করা হয়েছে। এই স্থাপনাটি খুব পরিস্কার ও স্বতন্ত্রভাবে ‘পোস্টমর্ডান স্টাইল’ কে প্রদর্শন করায়।
অতএব আমরা বলতে পারি যে কাসাব্লাঙ্কার স্থাপত্যসমূহ আধুনিকতার সাথে গতিশীল। তবে, তা ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে নয়।
কাসাব্লাঙ্কা সিনেমা
‘কাসাব্লাঙ্কা’ (Casablanca) হলিউডের একটি আইকনিক সিনেমা যেটাকে সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা হিসাবে মনে করা হয়।মাইকেল কার্টেজ পরিচালিত এই সিনেমা তিনটি একাডেমিক পুরস্কারও পেয়েছে। সিনেমাটির গান ‘As time goes by’এখন অবধি শ্রোতাদের হৃদয়ে ঝড় তোলে।
এই সিনেমার সাথে শহর কাসাব্লাঙ্কার সম্পর্ক ঠিক কতোটা?
‘কাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমায় ক্ল্যাসাবাঙ্কা শহরটা কেবলমাত্র স্থান হিসাবে ভূমিকা রাখেনা। এ শহরের প্রতিটা উত্থান-পতনের সংযোগ হয়েছে মানুষের মনের সাথে। চলুন দেখা যাক-
যুদ্ধপীড়িত মানুষের হতাশা হিসাবে
এই শহর তৎকালীন সময়ে শরনার্থীদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিলো। শরনার্থীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, স্বজন হারানো, অনিরাপদ স্থানে দিনাতিপাত করা, পালিয়ে যাবার প্রস্তুতি ইত্যাদিও পরিস্কারভাবে সিনেমায় উপলব্ধি করা যায়। মূলত এই শহরের বিষণ্নতাই এই সিনেমার ভাবের কেন্দ্রিয় অংশকে উপস্থাপন করে।
সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রদর্শনে
কাসাব্লাঙ্কা এমন একটি স্থান ছিলো যা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং নৈতিকতাকে প্রদর্শন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মরক্কো ছিলো ‘ফরাসীদের সুরক্ষা অঞ্চল’ আর কাসাব্লাঙ্কা ছিলো ‘নাজি’দের অধীনে।রাজনেতিক অস্থিরতার দিক থেকে এই শহরটাও রিকের মতো ট্র্যাজেডিক অবস্থাতেই ছিলো বলা যায়।
আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা সামগ্রিকভাবে সকল যুদ্ধপীড়িত দেশের প্রতিনিধিত্বও করেছিলো।
আশার প্রতীক হিসাবে
কাসাব্লাঙ্কা যেমন অনিশ্চয়তার তেমনি আবার আশার প্রতীকও। কেননা এই স্থানটিতে বসে সকলে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ একদিন পাবে, এই আশা নিয়ে বসে ছিলো। এই অবস্থাও রিকের অবস্থার সাথে মিলে যায়। কারণ রিকও ভেবেছিলো যে সে অতীতের খাতিরে ইলসার দিকে যাবে, নাকি সামনে নতুন আশার অপেক্ষায় থাকবে।
এই শহরের বিষণ্নতা, অস্থিরতা, সংগ্রাম সিনেমার চরিত্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।
একেকটা সিনেমা মানে একেকটা দর্শন। কাসাব্লাঙ্কা সিনেমায় এই মনোজাগতিক দর্শনের সাথে রাষ্ট্রীয় দর্শনকে একত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেটা দর্শকপ্রিয় হতে বাধ্যই ছিলো।
মরক্কোর ব্যবসাকেন্দ্র কাসাব্লাঙ্কা
মরক্কোর মূল ব্যবসায়িক কেন্দ্র মূলত কাসাব্লাঙ্কা শহরে অবস্থিত। এটার পেছনে অবশ্য যথোপযুক্ত কারণও রয়েছে। তা হলো-
মরক্কোর জিডিপির একটি বড় অংশ (৩০%) কাসাব্লাঙ্কা থেকে আসে। এখানে ‘কাসাব্লাঙ্কা স্টক এক্সচেঞ্জ’ অবস্থিত যা আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম পুরাতন স্টক মার্কেট। দেশি-বিদেশি ৬০% বিনিয়োগ এখানে হয়। মরক্কোর ৮০% ব্যাংকিং সম্পদ এখানে রয়েছে। এখানটায় বাণিজ্যের সাথে বৈচিত্র্যময় শিল্প মিশে গিয়েছে। ৫০% শিল্প উৎপাদন হয় এখান থেকে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও কাসাব্লাঙ্কা বেশ জনপ্রিয়। এখানে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। মরক্কোর সমুদ্র বাণিজ্যের ৫০% কাসাব্লাঙ্কা থেকেই পরিচালিত হয়। বর্তমানে মরক্কোর সামগ্রিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো এই কাসাব্লাঙ্কা।
কাসাব্লাঙ্কা নিয়ে আরও কিছু মজার তথ্য
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ
কাসাব্লাঙ্কার হাসান II মসজিদ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং এর মিনারটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার (২১০ মিটার)। মসজিদটি আটলান্টিক মহাসাগরের উপর নির্মিত, যার মেঝের কিছু অংশ কাচ দিয়ে তৈরি, তাই প্রার্থনার সময় আপনি সমুদ্র দেখতে পারেন!
“কাসাব্লাঙ্কা” মুভি কিন্তু এখানে শুট হয়নি!
১৯৪২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিখ্যাত হলিউড মুভি “Casablanca”-এর নাম শহরের নামে হলেও, মুভিটির শুটিং হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে মুভির জন্য এই শহর বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক ফিউশন শহর
কাসাব্লাঙ্কা মরক্কোর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শহর। এখানে আরব, বারবার, ফরাসি, এবং স্প্যানিশ সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়।
ইউরোপের কাছে মরক্কোর দরজা
কাসাব্লাঙ্কা একটি প্রধান বন্দর শহর। এটি আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগের জন্য পরিচিত, যা একে “আফ্রিকার গেটওয়ে” করে তুলেছে।
কাসাব্লাঙ্কার নামের অর্থ “সাদা ঘর”
শহরের নাম এসেছে পর্তুগিজ ভাষা থেকে। “Casa” অর্থ ঘর এবং “Blanca” অর্থ সাদা। এটি শহরের সাদা রঙের ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে।
আধুনিক স্থাপত্যের স্বর্গ
কাসাব্লাঙ্কা আর্ট ডেকো এবং নব্য-মৌরিশ স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিখ্যাত। ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত অনেক ভবন এখনও শহরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলছে।
মরক্কোর অর্থনৈতিক রাজধানী
কাসাব্লাঙ্কা মরক্কোর অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। দেশের বেশিরভাগ বৃহৎ কর্পোরেট অফিস এবং ব্যাঙ্ক এই শহরেই অবস্থিত।
প্রেমের শহর
শহরটি রোমান্টিক গল্প এবং সিনেমার জন্য একটি জনপ্রিয় বিষয়। “কাসাব্লাঙ্কা” মুভি এটি “প্রেমের শহর” হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
কাসাব্লাঙ্কায় হিপ হপ সংস্কৃতি
শহরটি মরক্কোর হিপ হপ সংস্কৃতির কেন্দ্র। এখানে অনেক তরুণ আর্টিস্ট তাদের সঙ্গীত এবং নাচের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে।
বিশালাকার সৌক (বাজার)
কাসাব্লাঙ্কার বাজারগুলো, বিশেষত সেন্ট্রাল মার্কেট, পণ্য কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত। এখানে রঙিন মশলা, স্থানীয় হস্তশিল্প, এবং খাবারের জন্য পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে।
সোর্স
- https://www.encounterstravel.com/blog/10-interesting-facts-about-casablanca
- https://www.nationalgeographic.com/travel/article/fast-facts-63
- https://www.remindmagazine.com/article/10536/8-things-you-didnt-know-about-casablanca/
- https://www.tuljak.com/blog/casablanca-the-real-morocco
- https://www.visitacity.com/en/casablanca/attraction-by-type/all-attractions