Image default
আফ্রিকাদেশ পরিচিতি

সাও তোমে ও প্রিন্সিপি- আফ্রিকার একমাত্র দেশ যেখানে নেই মসজিদ, নেই অপরাধ!

আপনি কি জানেন আফ্রিকায় এমন একটি দেশ রয়েছে, যেখানে কোন মসজিদ নেই। শুধু তাই নয়, এই দেশে নেই কোন অপরাধ। 

একসময় এই দেশটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকো উৎপাদনকারী দেশ। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এটি আফ্রিকার সেই বিরল দেশগুলোর একটি, যেখানে ম্যালেরিয়া প্রায় নির্মূল করা হয়েছে। হ্যাঁ, বলছি আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা দুইটি ছোট্ট দ্বীপ—সাও তোমে ও প্রিন্সিপি কথা। 

নামটা শুনে হয়তো খুব পরিচিত মনে নাও হতে পারে, কিন্তু এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের বুকে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য, উপনিবেশের করুণ ইতিহাস, আর মানুষের এক শান্ত-নিরিবিলি জীবন। 

সাও তোমে ও প্রিন্সিপি আয়তন ও জনসংখ্যা

মূলত সাও তোল এবং প্রিন্সিপি এই দুই দ্বীপই মিলে গঠন করা হয়েছে আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও সুন্দর দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর একটি সাও তোমে ও প্রিন্সিপি প্রজাতন্ত্র । এই দেশটির রাজধানীর নাম সাও তোমে, যা মূল দ্বীপ সাও তোমের উত্তর উপকূলে অবস্থিত। 

মজার বিষয় হলো, দেশটি আয়তন মাত্র ১,০০১ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের ঢাকার জেলার থেকেও আয়তনে কম। আর দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ্য ৩০ হাজার এর কাছাকাছি, যা একে বিশ্বের অন্যতম জনবিরল দেশে পরিণত করেছে। 

জেনে আরও অবাক হবেন, দ্বীপটি আবিষ্কারের সময় এখানে কোন জনবসতি ছিলো না। কিভাবে এই দেশটিতে মানুষের বসবাস শুরু হলো, তা জানতে আমাদের চলে যেতে হবে দেশটির ইতিহাসের গল্পে। 

সাও তোমের ইতিহাস

সাও তোমের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ১৪৭০ সালের কাছাকাছি, পর্তুগিজ অভিযাত্রী জোয়াও দে সান্তারেম  ও পেরো এসকোভেল প্রথম এই দ্বীপদ্বয় আবিষ্কার করেন। তখন সাও তোমে ও প্রিন্সিপিতে কোনো মানুষ ছিল না। তখন এখানে ছিল শুধু ঘন জঙ্গল, আগ্নেয়গিরির শিলা, আর অসংখ্য পাখির ডাক। এই দ্বীপগুলো ছিল একেবারে নির্জন। কিন্তু পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা দ্রুত বুঝে যায়, নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অবস্থিত এই ভূমি কৃষির জন্য আদর্শ স্থান।

আর তাই পর্তুগীজরা প্রথমে এখানে অপরাধীদের নির্বাসনে পাঠাত। তাদের মূল কাজ ছিলো এই দ্বীপে চাষাবাদ করা। ৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে ইউরোপে চিনি ছিল সোনার মতো মূল্যবান পণ্য। ফলে পর্তুগিজরা সাও তোমেকে বানালো “চিনির দ্বীপ”। এরপর আফ্রিকার কঙ্গো ও অ্যাঙ্গোলা থেকে হাজার হাজার মানুষকে এখানে দাস হিসেবে এনে চিনি চাষ করানো শুরু হলো। তবে, এই দাস শ্রমিকদের অনেকেই, কঠোর পরিশ্রম, রোগব্যাধি ও অমানবিক আচরণের কারণে অল্প বয়সেই প্রাণ হারায়।

দাসপ্রথা ছিল সাও তোমের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। এই দাসেরা সামান্য খাবার ও ঘুমের আশায়, সূর্য ওঠা থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত, বাগানে কাজ করত। সাও তোমের দাসপ্রথা এতটাই নির্মম ছিল যে, পরে যখন ইউরোপ দাসপ্রথা বিলুপ্তির দাবি তুলল, তখন সাও তোমে হয়ে উঠল এই অন্যায়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিনির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে উঠলে, সাও তোমের অর্থনীতি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে।

সাও তোমে দ্বীপে পর্তুগীজদের আগমন

পরবর্তীতে ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে পর্তুগিজরা নতুন ফসল আবিষ্কার করে। আর তা হলো কোকো। দ্বীপের আগ্নেয়গিরির মাটি, আর্দ্র জলবায়ু আর উষ্ণ আবহাওয়া কোকো চাষের জন্য ছিল একদম নিখুঁত। তাই অল্প সময়েই সাও তোমে ও প্রিন্সিপি হয়ে ওঠলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকো উৎপাদনকারী দেশ। এমনকি একসময় বিশ্বের মোট কোকো রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ আসত এখান থেকে!

২০শ শতাব্দীতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হয়। সাও তোমে ও প্রিন্সিপির জনগণও ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে,তাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে। এরই মধ্যে ১৯৫৩ সালে ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা, যা দ্বীপের ইতিহাসে “বাত্তা কিলু গণহত্যা” নামে পরিচিত। স্থানীয় কৃষকরা যখন পর্তুগিজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে, তখন ঔপনিবেশিক সরকার নির্মমভাবে সেই আন্দোলন দমন করে। শত শত কৃষককে হত্যা করা হয়, হাজারো মানুষ নির্যাতিত হয়। এই হত্যাযজ্ঞ সাও তোমের স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

মুভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ সাও তোমে এন্ড প্রিন্সিপি

এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৬০ সালে কিছু শিক্ষিত ও সচেতন তরুণ মিলে MLSTP বা মুভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ সাও তোমে এন্ড প্রিন্সিপি নামে, একটি রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করে। এটি ছিলো পর্তুগালের শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও সাংগঠনিক আন্দোলন শুরু করে। দীর্ঘ দুই দশকের সংগ্রামের পর, অবশেষে ১৯৭৪ সালে পর্তুগালে রাজনৈতিক পরিবর্তন  ঘটে। অবশেষে, ১২ জুলাই ১৯৭৫ সালে, সাও তোমে ও প্রিন্সিপি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে।

সাও তোমের পর্যটন

সাও তোমে এবং প্রিন্সিপি ছোট দেশ হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, এবং অনন্য পরিবেশগত বৈচিত্র্য একে, আফ্রিকার এক “লুকানো স্বর্গ” হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখানে নীল সমুদ্রের ঢেউ এসে মিশে গেছে সবুজ পর্বতের পাদদেশে, আর আগ্নেয়গিরির ঢালে জন্মেছে অগণিত রঙিন ফুল ও বিরল প্রাণী। 

বলা যায়, সাও তোমে ও প্রিন্সিপির ভৌগোলিক অবস্থানই, এর প্রকৃতিকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী রূপ। যেহেতু উভয় দ্বীপই আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে গঠিত, তাই এখানে একসাথে পাহাড়, জলপ্রপাত ও উর্বর ভূমি দেখা যায়।

পিকো দে সাও তোমে

সাও তোমে দ্বীপের মূল আকর্ষণ হলো পিকো দে সাও তোমে, যার উচ্চতা প্রায় ২,০২৪ মিটার।  স্থানীয়রা একে “দ্বীপের মুকুট” বলেন, কারণ মেঘের ভেতর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই চূড়াটি যেন সত্যিই সাও তোমে দ্বীপের রাজা। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়, সবুজ জঙ্গলের বুকে আঁকাবাঁকা নদী। আর দূরে দেখা যাবে সাদা বালির সৈকত আর নীল আটলান্টিকের অনন্ত দিগন্ত। 

মজার বিষয়, পুরো সাও তোমে দ্বীপই আসলে প্রায় ১৩ মিলিয়ন বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে শুরু হওয়া আগ্নেয় উৎস থেকে তৈরি। এর ফলে দ্বীপজুড়ে কালো লাভার পাথর, খাড়া ঢাল, ঘন জঙ্গল ও উর্বর ভূমি দেখা যায়।

পিকো দে সাও তোমে

প্রিন্সিপি দ্বীপ

প্রিন্সিপি দ্বীপটিরও সৌন্দর্য কম নয়। এখানে রয়েছে ওবো ন্যাশনাল পার্ক, যা সাও তোমে ও প্রিন্সিপির জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র। এই পার্কের মোট আয়তন প্রায় ১৯৫ বর্গকিলোমিটার। এই উদ্যানের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট। রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, এই রেইন ফরেস্টে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে এখনও কোন মানুষ পা রাখেনি। আর এই জঙ্গলেই পাওয়া যায় সাও তোমে গ্রোসবিক, প্রিন্সিপি কিংফিশার, এবং সানবার্ড নামের বিরল সব পাখি। জেনে অবাক হবেন, এইসব পাখি নাকি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না!!

প্রাইয়া জালেয়া

এছারাও, এই দেশটির প্রকৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর সৈকতগুলো। সাও তোমে দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে প্রাইয়া জালেয়া। যেখানে সমুদ্রের নীল জলে ভেসে আসে সামুদ্রিক কচ্ছপ। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এখানে হাজার হাজার সবুজ কচ্ছপ, লগারহেড ও লেদারব্যাক কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে। রাতে সৈকতের বালু খুঁড়ে তারা ডিম দেয়, আর কিছুদিন পর ডিম ফুটে বের হওয়া ছোট্ট বাচ্চা কচ্ছপগুলো, সমুদ্রের দিকে দৌড় দেয়। এই দৃশ্য পর্যটকদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা তাই এটি দেখতে প্রতি বছর পর্যটকরা প্রাইয়া জালেয়াতে ভিড় জমান। 

প্রাইয়া জালেয়া

প্রাইয়া ইনহামি

প্রাইয়া জালেয়ার পাশেই রয়েছে প্রাইয়া ইনহামি। যা স্থানীয়দের মতে, এই স্থানটি দ্বীপের সবচেয়ে শান্ত সৈকত। এটি ওবো ন্যাশনাল পার্ক এর সীমান্ত অঞ্চলে পড়ে। আর তাই, এখানকার পুরো এলাকা সবুজ বন, পাহাড় ও সাগরের সংযোগে এক অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করে। পাশাপাশি এখানে দাঁড়িয়ে আপনি শুনতে পাবেন ঢেউয়ের শব্দ আর হাওয়ার ফিসফাস। 

বোমবম দ্বীপ

এদিকে, প্রিন্সিপি দ্বীপে রয়েছে বোমবম দ্বীপ। বোম-বোম দ্বীপের আয়তন খুবই ছোট। মাত্র ১ বর্গকিলোমিটার এরও কম, কিন্তু এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশ একে পুরো দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র বানিয়েছে। এই ছোট্ট দ্বীপটি একটি কাঠের সেতুর মাধ্যমে মূল দুটি দ্বীপকে যুক্ত করেছে। এই দ্বীপে রয়েছে বোমবম রিসোর্ট, যা বিশ্বের অন্যতম নিরিবিলি ও রোমান্টিক রিসোর্ট হিসেবে পরিচিত। অনেক নবদম্পতি বা প্রকৃতিপ্রেমী নির্জনে কিছু সময় কাটাতে এখানে আসেন। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল, নারকেল গাছের সারি আর সূর্যাস্তের সোনালি আভা এই দ্বীপকে পরিণত করেছে স্বপ্নের এক গন্তব্যে। 

তবে শুধুই সমুদ্র সৈকতেই নয় শহরেও এর আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। পর্তুগিজ স্থাপত্যে নির্মিত এখানকার পুরনো সব ভবন, রঙিন দেয়াল, সরু গলি আর হাসিখুশি মানুষের মুখ …সব মিলিয়ে শহরটি দিয়েছে এক নিরিবিলি চিত্রপট। 

বোমবম দ্বীপ

ইম্যাকুলেট কনসেপশন ক্যাথেড্রাল

শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ইম্যাকুলেট কনসেপশন ক্যাথেড্রাল। এটি দেশের অন্যতম প্রধান গির্জা এবং সাও তোমে শহরের একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা। ধারণা করা হয়, এই গির্জাটি ১৫শ শতকের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল। এই গির্জার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো উঁচু টাওয়ার, রঙিন কাঁচের জানালা, এবং অভ্যন্তরের নীরবতা এবং পবিত্র পরিবেশ। প্রতিদিন স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এখানে প্রার্থনা করতে আসে, এবং পর্যটকরাও এই গির্জার শান্ত পরিবেশ, স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপভোগ করতে আসে। রাতের বেলা আলোয় ঝলমল করে ওঠা এই গির্জাটি, সাও তোমে শহরের কেন্দ্রস্থলে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে।

ফোর্টালেজা দে সাও সেবাস্তিয়াও 

এছাড়াও, এখানে ফোর্টালেজা দে সাও সেবাস্তিয়াও নামের একটি পুরনো দুর্গ রয়েছে, যা এখন জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দুর্গটি ১৫৭৫ সালে পর্তুগিজরা আফ্রিকায়, তাদের বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য নির্মাণ করেছিল। শত্রুদের আক্রমণ ও দস্যুদের হাত থেকে দ্বীপ রক্ষার জন্যই মূলত এই দুর্গটি তৈরি করা হয়। পুরু পাথরের প্রাচীর, কামানের আস্তানা, ও দারোয়ানদের টাওয়ারগুলো, আজও সেই ঔপনিবেশিক অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। তাই দুর্গটির নামকরণ করা হয় সেন্ট সেবাস্তিয়ান এর নামে, যিনি পর্তুগিজ ঐতিহ্যে এক পবিত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে বিবেচিত।

রোসা সুন্দ্রা প্ল্যান্টেশন

এখানকার আরেকটি জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো রোসা সুন্দ্রা প্ল্যান্টেশন। এটি একসময় ছিল একটি কোকো উৎপাদন কেন্দ্র। আর এখানেই ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। তাই ইতিহাস ও বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বর্তমানে রোসা সুন্দ্রা প্ল্যান্টেশনকে একটি ঐতিহাসিক রিসোর্ট ও জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে রয়েছে সংরক্ষিত পুরনো ভবন, বাগানবাড়ি, আর বিজ্ঞান ইতিহাস সম্পর্কিত প্রদর্শনী। পর্যটকরা এখানকার সবুজ পাহাড়, পুরনো ইউরোপীয় স্থাপত্য, আর শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

ছবি- উপরের তিনটি পর্যটন স্থান একসাথে

সাও তোমে ও প্রিন্সিপির পর্যটন শিল্প এখনো খুব বড় নয়, কিন্তু সেটিই এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। এখানে আপনি পাবেন না জনাকীর্ণ সৈকত, বিশাল শহরের কোলাহল বা বাজারের ভিড়। বরং পাবেন নিস্তব্ধতা, প্রকৃতির অমলিন রূপ, আর মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। স্থানীয়রা পর্যটকদের খুব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে, আর দেশটির শান্তিপূর্ণ পরিবেশও, বিদেশিদের কাছে এক স্বস্তির জায়গা।

সাও তোমের খাবার

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার খাবারদাবারও বেশ আকর্ষণীয়। তাদের খাবারে আফ্রিকান ঐতিহ্যের সঙ্গে পর্তুগিজ উপনিবেশের প্রভাব দেখা যায়। এখানকার মানুষের খাদ্যতালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মাছ। আটলান্টিক মহাসাগরের জলে প্রতিদিন ধরা পড়ে টুনা, গ্রুপার, ফ্লাইং ফিশ কিংবা অক্টোপাস এর মতো তাজা মাছ। আর এই মাছ দিয়েই তৈরি হয় স্থানীয় জনপ্রিয় খাবার “ক্যালুলু”। এটি এক প্রকার স্যুপ, যেখানে মাছের সঙ্গে মেশানো হয় তাজা শাকসবজি, টমেটো, পেঁয়াজ, পাম অয়েল ও বিভিন্ন স্থানীয় মশলা। 

জনপ্রিয় খাবার “ক্যালুলু”

আরেকটি বহুল জনপ্রিয় পদ হলো “পেপে সোপা”। এটি একটি ঝাল মাছের স্যুপ, যা প্রায় প্রতিটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টেই পাওয়া যায়। সাও তোমের মানুষরা ঝাল পছন্দ করেন, আর এই স্যুপের ঝাঁঝালো স্বাদ তারই প্রমান। এর সঙ্গে গরম ভাত পরিবেশন করা হয়।

এছাড়াও তাদের খাবারের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে আছে নারকেল। দ্বীপের প্রায় সর্বত্রই নারকেল গাছ দেখা যায়, আর সেই নারকেল থেকেই তৈরি হয় নানা রকমের পদ। যেমন নারকেল দুধে রান্না করা মাছ, বা ডেজার্টে ব্যবহৃত নারকেল ক্রিম। গ্রীষ্মের গরমে ঠান্ডা নারকেল পানি এখানে প্রাকৃতিক রিফ্রেশমেন্টের মতো। 

খাবারের সঙ্গে পানীয়ের কথাও বলতেই হয়। এখানকার সবচেয়ে পরিচিত পানীয় হলো “পাম ওয়াইন”, যা তাজা তাল বা পাম গাছের রস থেকে তৈরি এক প্রাকৃতিক ফারমেন্টেড পানীয়। এটি হালকা মিষ্টি এবং কিছুটা টক স্বাদের। স্থানীয়রা সাধারণত এটি বিশেষ উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানে পান করে থাকে। এছাড়া বিয়ার ও রাম-ও এখানে বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাম, যার ঘ্রাণে থাকে কোকো ও মশলা।

সাও তোমের সংস্কৃতি

ছোট, নিরিবিলি এই দ্বীপে বাস করা মানুষদের বেশিরভাগই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত, তবে ইউরোপীয় উপনিবেশের ইতিহাসের কারণে এখানে গড়ে উঠেছে এক মিশ্র জাতিগোষ্ঠী, যাদের বলা হয় “মেস্তিকো”। তবে এই দ্বীপের প্রধান ধর্ম হলো খ্রিষ্টান ধর্ম, বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক মতবাদ এখানে বেশ জনপ্রিয়। কারণ পর্তুগাল একসময় সাও তোমে ও প্রিন্সিপির উপনিবেশ ছিল। সেই সময় থেকেই ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব এখানে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। তাই দ্বীপের প্রায় প্রতিটি শহর বা গ্রামে ছোট-বড় গির্জা দেখা যায়। 

এই দ্বীপের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এখানে কোনো মসজিদ নেই। কারণ মুসলিম জনসংখ্যা এখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, প্রায় ১% এরও কম। আর ইতিহাসে এই দ্বীপের সঙ্গে আরব বণিকদের তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না, ফলে ইসলাম এখানে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও পায়নি।

আওয়ার লেডি অফ গ্রেস ক্যাথেড্রাল

আবার, যেসব দেশে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের মধ্যে ইসলাম বিস্তার লাভ করেছিল সাও তোমে তাদের থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। এর ফলে আজও এই দ্বীপে মসজিদের গম্বুজ বা আজানের সুর শোনা যায় না। তবে, স্থানীয়রা এ নিয়ে তেমন কোনো ধর্মীয় বিভাজন অনুভব করে না, বরং ধর্মীয় সহনশীলতা এখানে জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

আরও মজার বিষয়,দ্বীপের মানুষজন গানের মতো করে কথা বলে। তাদের উচ্চারণে থাকে ছন্দ, হাসিতে থাকে উষ্ণতা, যেন ভাষা নয়, বরং গান গাইছে তারা। এই ভাষার নাম হলো ক্রেওল বা ফোরো। এছাড়াও, তাদের দৈনন্দিন জীবনে গান, নাচ আর উৎসব যেন রক্তে মিশে আছে। এখানকার স্থানীয় সংগীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা হলো “তচিললি ”, যা এক ধরনের নাটকীয় নাচগান। এতে ইউরোপীয় রাজকীয় গল্প আফ্রিকান ঢঙে অভিনীত হয়। মানুষ মুখোশ পরে, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নাচে, আর ড্রামের তালে তালে বাজে জীবনের গল্প।

আরেকটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য হলো “কোনগা” যেখানে দলবদ্ধভাবে ছন্দে ছন্দে মানুষ নাচে, গলায় ঝোলে রঙিন মালা, মুখে ফুটে ওঠে এক অজানা আনন্দ। উৎসবপ্রিয় এই দ্বীপবাসীরা প্রায়ই ধর্মীয় বা মৌসুমি উৎসব আয়োজন করে। বড়দিন, নতুন বছর, ফসল কাটার সময় কিংবা স্থানীয় উৎসব, প্রতিটি উপলক্ষই হয়ে ওঠে আনন্দের রঙিন মিছিল।

কোনগা নৃত্য

সাও তোমে ও প্রিন্সিপির মানুষদের পোশাক তাদের আবহাওয়া ও জীবনযাত্রার মতোই সরল ও স্বাভাবিক। যেহেতু দেশটি নিরক্ষরেখার কাছাকাছি, সারা বছরই এখানে থাকে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া। ফলে স্থানীয়রা সাধারণত হালকা, রঙিন ও বাতাস চলাচলযোগ্য পোশাক পরে। পুরুষরা সাধারণত ঢিলেঢালা শার্ট, ছোট প্যান্ট বা লুঙ্গির মতো কাপড় পরে। নারীরা পরে রঙিন স্কার্ট, ব্লাউজ বা আফ্রিকান প্রিন্টের পোশাক, যাকে তারা বলে “পানো”। অনেক নারী মাথায় কাপড় জড়িয়ে রাখে, যা একদিকে সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করে।

সাও তোমে ও প্রিন্সিপি এমন একটি দেশ, যেখানে ইতিহাসের অন্ধকার থেকেও উঠে এসেছে আলোর বার্তা। একটি দেশ, যেখানে দাসপ্রথা ছিল, তবু মানুষ আজ স্বাধীন। যেখানে মসজিদ নেই, তবুও হৃদয়ে আছে সহানুভূতি, ভালোবাসা আর শান্তি। এই দেশ আমাদের শেখায় মানুষের মধ্যে পার্থক্য যতই থাকুক, মানবিকতার বন্ধনই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্ম। সাও তোমে ও প্রিন্সিপি এভাবেই সম্পৃতি আর সৌন্দর্যের বার্তা ছড়াতে থাকুক। 

রেফারেন্সঃ

Related posts

ফ্রান্সের অজানা গল্প: মৃত ব্যক্তিকে বিয়ে থেকে আইফেল টাওয়ার পর্যন্ত

আফগানিস্তান: সমালোচনা ও সম্ভাবনা যেখানে মিলেমিশে একাকার

মরুভূমি থেকে বিশ্ব রাজনীতির ময়দান ইরাক

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More