Image default
যাপন

আপনার ফোকাস কোথায়? মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের সহজ কৌশল

কখনো কি ভেবেছেন, দিনের শেষে কেন এত ক্লান্ত লাগে, অথচ কাজ কিছুই এগোয় না? এর কারণ আপনার বিক্ষিপ্ত মনোযোগ। ডিজিটাল দুনিয়ার হাজারো নোটিফিকেশন আপনার সমস্ত মনোযোগ চুরি করে নিচ্ছে। 

সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে গভীর মনোযোগ দেবেন, তার মনস্তাত্ত্বিক উপায়গুলো জানুন।

আপনার যেকোনো সাধারণ একটি দিনের কথা ভাবুন। আপনি হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বসেছেন, হঠাৎ করেই মোবাইলে একটি নোটিফিকেশনের শব্দ। আপনি ভাবলেন, “শুধু এক মিনিট দেখে নিই।” সেই এক মিনিট কখন যে পনেরো মিনিটে পরিণত হয়ে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অন্তহীন স্ক্রোলিং-এ হারিয়ে যায়, তা আমরা টেরও পাই না। যখন হুঁশ ফেরে, তখন কাজের প্রতি মনোযোগ পুরোপুরি নষ্ট, আর মনে এক ধরনের অপরাধবোধ।

আজকের ডিজিটাল যুগে, আমাদের মনোযোগ বা ফোকাস এক ভয়ংকর সংকটের মুখে পড়েছে। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছে হাজারো অ্যাপ, যেগুলো  আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। এর ফলে, আমাদের প্রোডাক্টিভিটি কমছে, পড়াশোনায় মন বসছে না এবং এর ফলস্বরূপ, লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আজকের লেখায় আমরা মনোযোগ ধরে রাখার এমন কিছু সহজ ও কার্যকরী কৌশল নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে বিক্ষিপ্ত মনযোগকে কেন্দ্রীভূত করতে দারুণ সহায়ক হতে পারে। 

শত্রুকে চিনুন: আপনার ফোকাস কোথায় চুরি হচ্ছে?

সমস্যার সমাধান করার আগে, সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। আমাদের মনোযোগ মূলত দুই ধরনের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়:

১. বাহ্যিক শত্রু (External Distractions)

 এর মধ্যে রয়েছে স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়ার আকর্ষণ, সহকর্মীর অহেতুক কথাবার্তা, বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ।

মোবাইল ফোনে সোশাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন

২.অভ্যন্তরীণ শত্রু (Internal Distractions)

এটি আরও বেশি ভয়ঙ্কর। এর মধ্যে রয়েছে আপনার দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বা অতীতের কোনো স্মৃতি। প্রায়শই, কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই আমাদের মন এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় লাফিয়ে বেড়ায়।

প্রথম ধাপ হিসেবে, এক বা দুই দিন সচেতনভাবে লক্ষ্য করুন, আপনার মনোযোগ ঠিক কোন কোন জায়গায় সবচেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। আপনি কি প্রতি দশ মিনিট পরপর ফোন চেক করছেন? নাকি কোনো একটি নির্দিষ্ট চিন্তা আপনাকে বারবার বিরক্ত করছে? এই আত্ম-বিশ্লেষণই আপনাকে সঠিক কৌশল বেছে নিতে সাহায্য করবে।

কৌশল ১: পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করুন (Control Your Environment)

“ইচ্ছাশক্তি” একটি সীমিত সম্পদ। শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তির উপর ভরসা করে মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর উপায় হলো, আপনার পরিবেশকে এমনভাবে সাজানো, যাতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার সুযোগই কমে যায়। যেমন-

নোটিফিকেশন বন্ধ করুন: আপনার ফোনের এবং কম্পিউটারের অপ্রয়োজনীয় সকল অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। প্রতিটি নোটিফিকেশন আপনার মনোযোগে একটি ছোট আঘাতের মতো কাজ করে।

ড্রয়ারে ফোন

ফোনকে দূরে রাখুন: যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বসবেন, তখন আপনার ফোনটিকে অন্য ঘরে বা চোখের আড়ালে রেখে দিন। ‘Out of sight, out of mind’ এই নীতিটি এখানে দারুণভাবে কাজ করে।

নির্দিষ্ট সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন: দুপুরে ৩০ মিনিট এবং সন্ধ্যায় ৩০ মিনিট) বরাদ্দ করুন। বাকি সময় অ্যাপগুলো থেকে লগ আউট থাকুন।

একটি নির্দিষ্ট কাজের জায়গা তৈরি করুন: আপনার পড়া বা কাজ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখুন। সেই জায়গাটি যেন পরিষ্কার, গোছানো এবং আরামদায়ক হয়।

 শব্দ নিয়ন্ত্রণ করুন: যদি আপনার কাজের পরিবেশে কোলাহল থাকে, তবে নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন ব্যবহার করতে পারেন।

কৌশল ২: পোমোডোরো টেকনিক (The Pomodoro Technique)

এটি মনোযোগ ধরে রাখার বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও কার্যকর একটি কৌশল। ইতালীয় শব্দ ‘পোমোডোরো’-র অর্থ ‘টমেটো’। ফ্রান্সেসকো সিরিলো নামে একজন ছাত্র তার পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য টমেটো-আকৃতির একটি কিচেন টাইমার ব্যবহার করতেন, সেখান থেকেই এই নামের উৎপত্তি।

এটি যেভাবে কাজ করে:

    ১. প্রথমে, আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বেছে নিন।

    ২. একটি টাইমার ২৫ মিনিটের জন্য সেট করুন।

    ৩. এই ২৫ মিনিট, অন্য কোনো দিকে মনোযোগ না দিয়ে, শুধুমাত্র ওই একটি কাজই করুন। ফোন, ইমেইল, বা অন্য কোনো চিন্তা; সবকিছুকে দূরে সরিয়ে রাখুন।

    ৪. ২৫ মিনিট পর, টাইমার বাজলে, কাজটি থামিয়ে দিন এবং ৫ মিনিটের একটি ছোট বিরতি নিন। এই সময়ে আপনি হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, পানি খেতে পারেন বা চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে পারেন।

    ৫. চারটি ‘পোমোডোরো’ সেশন (অর্থাৎ, ৪ x ২৫ মিনিট) শেষ করার পর, ১৫-৩০ মিনিটের একটি লম্বা বিরতি নিন। 

২৫ মিনিটের টাইমার চলছে

পোমোডোরো টেকনিক কেন এটি কার্যকর?

এই কৌশলটি আমাদের মস্তিষ্ককে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোকাস করতে প্রশিক্ষণ দেয়। এটি বড় আর কঠিন কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ফেলে, যা কাজ শুরু করার মানসিক চাপ কমায়। এছাড়াও, নিয়মিত বিরতি মস্তিষ্ককে সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখে।

কৌশল ৩: টাইম ব্লকিং এবং একটিমাত্র কাজ (Time Blocking and Single-Tasking)

আমাদের মস্তিষ্ক একসাথে একাধিক কাজ বা মাল্টিটাস্কিং করার জন্য তৈরি হয়নি। যখন আমরা একসাথে গান শোনা, চ্যাট করা এবং কাজ করার চেষ্টা করি, তখন আমরা আসলে কোনো কাজই ভালোভাবে করতে পারি না। এর পরিবর্তে, আমাদের মনোযোগ এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত লাফাতে থাকে, যা আমাদের মানসিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়।

টাইম ব্লকিং: এই সমস্যার সমাধান হলো টাইম ব্লকিং। আপনার ক্যালেন্ডার বা ডায়েরিতে দিনের প্রতিটি ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট কাজ বরাদ্দ করুন। যেমন-সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আপনি শুধু ‘প্রজেক্ট A’-এর কাজ করবেন, ১১টা থেকে ১১:৩০ পর্যন্ত ইমেইল চেক করবেন, ইত্যাদি। এর ফলে, আপনার পুরো দিনের একটি পরিষ্কার চিত্র থাকবে এবং আপনি বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করার প্রবণতা থেকে মুক্তি পাবেন।

সিঙ্গেল-টাস্কিং:  যখন যে কাজটি করার জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন, তখন শুধুমাত্র সেই একটি কাজই করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে অন্য কাজে গিয়ে, আবার আগের কাজে ফিরে আসতে মস্তিষ্কের প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় লেগে যায়। এই সময়টুকুকে বলা হয় ‘অ্যাটেনশন রেসিডিউ’ (Attention Residue)। সিঙ্গেল-টাস্কিং এই মূল্যবান সময় এবং মানসিক শক্তির অপচয় রোধ করে।

কৌশল ৪: মাইন্ডফুলনেস এবং মেডিটেশন (Mindfulness and Meditation)

অনেক সময় আমাদের মনোযোগের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরে নয়, বরং আমাদের ভেতরেই থাকে, আর সেটি হলো আমাদের অস্থির মন। মাইন্ডফুলনেস বা মননশীলতা হলো সেই অস্থির মনকে শান্ত করার এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর কৌশল।

মেডিটেশন

মাইন্ডফুলনেস কী?

কোনো ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ না করে, শুধুমাত্র বর্তমান মুহূর্তে কী ঘটছে (যেমন-আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীরের অনুভূতি, বা চারপাশের শব্দ) তার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার নামই মাইন্ডফুলনেস।

কীভাবে অনুশীলন করবেন

  • প্রতিদিন মাত্র ৫-১০ মিনিটের জন্য শান্ত হয়ে বসুন।
  • চোখ বন্ধ করে আপনার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ দিন। বাতাস কীভাবে নাক দিয়ে প্রবেশ করছে এবং বেরিয়ে যাচ্ছে, তা অনুভব করুন।
  • যখনই আপনার মন অন্য কোনো চিন্তায় চলে যাবে (যা খুবই স্বাভাবিক), তখন আলতো করে আবার মনোযোগকে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে ফিরিয়ে আনুন।

নিয়মিত এই অনুশীলন আপনার মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’-কে শক্তিশালী করে, যা মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং আবেগ ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী। এটি আপনার ফোকাসকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ক্ষমতাকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে তোলে।

কৌশল ৫: শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন (Take Care of Your Physical Health)

আমাদের মানসিক শক্তি এবং মনোযোগ অনেকাংশেই আমাদের স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল। কারণ ক্লান্ত বা অসুস্থ শরীর নিয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন রাতে ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম আপনার মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য। ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠিত করে এবং পরবর্তী দিনের জন্য মস্তিষ্ককে তৈরি করে।

সুষম খাবার: মস্তিষ্কের সঠিক কার্যকারিতার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার, বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (মাছ, বাদাম), অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি) এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।

নিয়মিত ব্যায়াম: শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং নতুন নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে, যা আমাদের একাগ্রতা বাড়াতে সরাসরি সহায়ক।

পর্যাপ্ত ঘুমের ফলে আত্মবিশ্বাসী চেহারা

ফোকাস বা মনোযোগ কোনো জাদুকরী ক্ষমতা নয়, এটি শরীরের পেশির মতো। শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এটিই সত্যি। আপনি যত বেশি মনযোগ বা একাগ্রতা বাড়ানোর অনুশীলন করবেন, এটি তত বেশি শক্তিশালী হবে। আধুনিক বিশ্ব হয়তো সবসময় আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে, কিন্তু উপরের কৌশলগুলো ব্যবহার করে আপনি সেই মনোযোগের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখতে পারেন।

মনে রাখবেন, আপনার কাজে যতটুকু মনোযোগ থাকবে, আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যতও সেদিকেই প্রবাহিত হবে। তাই, এই মূল্যবান সম্পদটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করুন যাতে আপনি আপনার লক্ষ্য অর্জনের পথে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যেতে পারেন। 

তথ্যসূত্র –

Related posts

আপনি কি সত্যিই Introvert? নাকি শুধুই ক্লান্ত?

নারীর যে অভ্যাসগুলো রেড ফ্ল্যাগ

ফেস ইয়োগা: উপায় তরুণ দেখানোর প্রাকৃতিক জাদু

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More