একই রকম মিম, একই রকম কমেন্ট আর অন্তহীন অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট; ইন্টারনেট কি তার আত্মা হারিয়ে ফেলছে? যে প্রাণবন্ত ও মানবিক ডিজিটাল জগৎ আমরা চিনতাম, তা কি এখন শুধু কর্পোরেশন আর AI-এর তৈরি এক গোলকধাঁধা? ডেড ইন্টারনেট থিওরি একুশ শতকের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর একটি, যা আপনাকে আপনার ডিজিটাল অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
একবার ভাবুন, আপনি এক বিশাল, জমজমাট শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চারদিকে বড় বড় দালান, নিয়ন আলো, ব্যস্ত রাস্তা, কিন্তু একটু ভালোভাবে তাকাতেই আপনি এক অদ্ভুত একটা বিষয় লক্ষ্য করলেন। রাস্তার মানুষগুলো, দোকানের বিক্রেতা, ক্যাফেতে বসে থাকা কফি পানকারী তারা কেউই আসল মানুষ নয়। তারা সবাই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা রোবট বা ম্যানিকুইন, যারা শুধু মানুষ হওয়ার অভিনয় করে যাচ্ছে। শহরটি দেখতে জীবন্ত, কিন্তু আসলে এটি একটি প্রাণহীন, কৃত্রিম জগৎ।
এখন, এই পুরো ধারণাটিকে ইন্টারনেটের উপর প্রয়োগ করুন। এটাই হলো ডেড ইন্টারনেট থিওরি (Dead Internet Theory), একুশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় এবং ভয়ঙ্কর একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা আজ যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তা আর মানুষের তৈরি এক প্রাণবন্ত জায়গা নেই। এর বেশিরভাগ অংশই ওয়েবসাইট, আর্টিকেল, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, কমেন্ট, এমনকি ‘ভাইরাল’ ট্রেন্ডগুলোও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI বট দ্বারা তৈরি এবং নিয়ন্ত্রিত। আসল, জৈব মানবিক মিথস্ক্রিয়া (organic human interaction) এখন এতটাই কমে গেছে যে, ইন্টারনেট কার্যত ‘মৃত’।
এই তত্ত্বটি শুনতে যতই অদ্ভুত বা পরাবাস্তব মনে হোক না কেন, এটি অনলাইন ফোরাম থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু এর পেছনে কতটা সত্যতা রয়েছে? ইন্টারনেট কি সত্যিই মরে যাচ্ছে?

ডেড ইন্টারনেট থিওরি কী এবং এর জন্ম কোথায়?
ডেড ইন্টারনেট থিওরিটি মূলত ২০২১ সালের দিকে অনলাইন ফোরাম, বিশেষ করে 4chan এবং Reddit-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর মূল কথাগুলো হলো:
- ইন্টারনেটের ট্র্যাফিকের একটি বিশাল অংশ, সম্ভবত অর্ধেকেরও বেশি, এখন আর মানুষের দ্বারা তৈরি হয় না। এটি বট (automated programs) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা নকল লাইক, কমেন্ট, ভিউ তৈরি করে এবং বিভিন্ন ট্রেন্ডকে কৃত্রিমভাবে ভাইরাল করে।
- বেশিরভাগ ব্লগ পোস্ট, নিউজ আর্টিকেল, ইউটিউব ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট এখন আর মানুষের লেখা বা তৈরি করা নয়। এগুলো বিভিন্ন AI টুল ব্যবহার করে ব্যাপক হারে (mass-produced) তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে ইন্টারনেটে একই ধরনের, প্রানহীন এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
- এই তত্ত্বের প্রবক্তারা বিশ্বাস করেন যে, বড় বড় টেক কর্পোরেশন এবং বিভিন্ন দেশের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই বট এবং AI-জেনারেটেড কনটেন্ট ব্যবহার করছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করা, নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা এবং একটি কৃত্রিম ঐকমত্য (artificial consensus) তৈরি করে ভিন্নমতকে দাবিয়ে রাখা।
তাদের মতে, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের সেই ইন্টারনেট, যা ছিল মানুষের তৈরি সৃজনশীলতা, অদ্ভুত ওয়েবসাইট এবং সত্যিকারের কমিউনিটির এক প্রাণবন্ত জায়গা, তা ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে কৃত্রিম হতে শুরু করেছে।
কেন এই তত্ত্বটি এত জনপ্রিয় হচ্ছে? প্রবক্তাদের যুক্তি
যারা ডেড ইন্টারনেট থিওরিতে বিশ্বাস করেন, তারা তাদের যুক্তির স্বপক্ষে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন, যা হয়তো আপনিও আপনার দৈনন্দিন ইন্টারনেট ব্যবহারে লক্ষ্য করেছেন।
- পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্ট: আপনি কি প্রায়ই ইউটিউব বা ফেসবুকে একই ধরনের ভিডিও বা মিম বারবার দেখতে পান, শুধু সামান্য কিছু পরিবর্তন ছাড়া? অথবা, এমন অনেক নিউজ ওয়েবসাইট দেখেন, যাদের খবরের ভাষা এবং গঠন প্রায় একই রকম? তত্ত্ব অনুযায়ী, এর কারণ হলো, এগুলো সবই কয়েকটি AI মডেল থেকে তৈরি করা হচ্ছে।
- অদ্ভূত এবং অপ্রাসঙ্গিক কমেন্ট: অনেক সময় জনপ্রিয় ভিডিও বা পোস্টের নিচে এমন সব কমেন্ট দেখা যায়, যা পোস্টের সাথে সামান্যতম প্রাসঙ্গিক নয় অথবা সেগুলোর ভাষা খুবই সাধারণ এবং রোবোটিক মনে হয়। যেমন “Wow, great video!” বা “Nice post!”। এগুলোকে বট-জেনারেটেড কমেন্ট বলে মনে করা হয়, যা শুধুমাত্র এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য করা হয়।

- অ্যালগরিদমের শাসন: আমাদের নিউজফিড এখন আর আমাদের বন্ধুদের বা পছন্দের পেইজের পোস্ট দিয়ে সাজানো থাকে না। এটি অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা আমাদেরকে সেইসব কনটেন্টই দেখায়, যা আমাদেরকে প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আটকে রাখবে। এর ফলে, আমরা এক ধরনের ‘ফিল্টার বাবল’ (Filter Bubble)-এর মধ্যে আটকে পড়ি, যেখানে নতুন বা ভিন্নধর্মী কোনো কিছুর সাথে আমাদের পরিচয় হয় না।
- সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ভূতুড়ে’ অনুভূতি: অনেক সময়ই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে করতে এক ধরনের শূন্যতা বা একাকীত্ব অনুভব হয়। মনে হয়, আপনি যেন এক বিশাল ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছেন এবং কারো সাথেই সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন না। ডেড ইন্টারনেট থিওরি বলছে, এর কারণ হলো, এই ভিড়ের বেশিরভাগই আসলে ‘প্রাণহীন বট’।
সত্য-মিথ্যা বিশ্লেষণ: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
ডেড ইন্টারনেট থিওরি কি তবে সত্যি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তত্ত্বটি পুরোপুরি সত্যি না হলেও, এর পেছনে থাকা পর্যবেক্ষণগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন নয়। এটি আসলে বাস্তবতার একটি অতিরঞ্জিত এবং ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাখ্যা।
বাস্তবতা কী?
- বটের অস্তিত্ব সত্যি: এটা সত্যি যে, ইন্টারনেটের ট্র্যাফিকের একটি বিশাল অংশ বট দ্বারা তৈরি। সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম ব্যারাকুডা নেটওয়ার্কস-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের প্রায় ৪৭% ছিল বট ট্র্যাফিক। কিন্তু এর মধ্যে বেশিরভাগই হলো ‘ভালো বট’, যেমন গুগলের সার্চ ইঞ্জিন ক্রলার, যা ওয়েবসাইটগুলোকে ইন্ডেক্স করে, বা বিভিন্ন মনিটরিং বট। ক্ষতিকর বট (যেমন স্প্যাম বট, হ্যাকিং বট) অবশ্যই আছে, কিন্তু তারা পুরো ইন্টারনেট দখল করে নেয়নি।

- AI-জেনারেটেড কনটেন্টের বৃদ্ধি: এটাও সত্যি যে, ChatGPT, Midjourney বা Jasper-এর মতো AI টুলগুলোর আবির্ভাবের পর, AI-জেনারেটেড কনটেন্টের পরিমাণ রকেট গতিতে বাড়ছে। অনেক ওয়েবসাইট এখন কম খরচে এবং দ্রুত কনটেন্ট তৈরির জন্য AI ব্যবহার করছে।
- অ্যালগরিদমের প্রভাব: আমাদের অনলাইন অভিজ্ঞতা এখন অনেকাংশেই অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা আমাদের একঘেয়ে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্টের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তাহলে তত্ত্বটি ভুল কোথায়?
মূল ভুলটি হলো এর উপসংহারে। হ্যাঁ, বট আছে, AI কনটেন্ট আছে এবং অ্যালগরিদম আছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ইন্টারনেট ‘মৃত’ বা মানুষের তৈরি কনটেন্ট অদৃশ্য হয়ে গেছে।
- মানুষ এখনও সক্রিয়: প্রতিদিন কোটি কোটি আসল মানুষ তাদের নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং অভিজ্ঞতা ইন্টারনেটে শেয়ার করছে। Reddit, Discord বা বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিষয়ের ফোরামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখনও শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত মানব কমিউনিটি বিদ্যমান।
- মনস্তাত্ত্বিক কারণ: ইন্টারনেট ‘মৃত’ মনে হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো আমাদের নিজস্ব মনস্তত্ত্ব।
- নস্টালজিয়া: যারা ইন্টারনেটের শুরুর দিকের (৯০ বা ২০০০-এর দশক) সাথে পরিচিত, তাদের কাছে সেই সময়টাকে অনেক বেশি ‘খাঁটি’ এবং ‘মানবিক’ মনে হয়। সেই সময়ের তুলনায় আজকের বাণিজ্যিক এবং অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটকে প্রাণহীন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
- ইনফরমেশন ওভারলোড: প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ তথ্য এবং কনটেন্টের সম্মুখীন হতে হতে আমাদের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যা থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা এবং শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
- বাণিজ্যিকীকরণ, ষড়যন্ত্র নয়: ইন্টারনেটের এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো গোপন সরকারি ষড়যন্ত্রের চেয়েও বড় ভূমিকা রেখেছে এর বাণিজ্যিকীকরণ। কোম্পানিগুলো চায়, আমরা যেন তাদের প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি। এর জন্য তারা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আমাদের সেইসব কনটেন্টই দেখায়, যা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বা বিতর্কিত, যা প্রায়শই পুনরাবৃত্তিমূলক হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেড ইন্টারনেট থিওরি: ভবিষ্যৎ কী?
ডেড ইন্টারনেট থিওরির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। AI-এর ক্ষমতা যত বাড়বে, আসল এবং নকলের মধ্যে পার্থক্য করা ততটাই কঠিন হয়ে যাবে। এটি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের ইন্টারনেটের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা হয়তো এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা মানুষ, রোবট নই (যেমন ক্যাপচা টেস্টের মাধ্যমে আমরা এখনই যা করি)। ডিজিটাল জগতে আমাদের ‘মানবতার প্রমাণ’ (Proof of Humanity) হয়তো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে, এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। AI-জেনারেটেড কনটেন্টের এই বন্যার বিপরীতে, আসল, মানবিক এবং সৃজনশীল কনটেন্টের কদর হয়তো আরও বেড়ে যাবে। মানুষ হয়তো বড় প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ছোট, আরও বেশি ব্যক্তিগত এবং বিশ্বাসযোগ্য কমিউনিটির দিকে ঝুঁকবে।

ডেড ইন্টারনেট থিওরিটি আক্ষরিক অর্থে সত্যি নয়। ইন্টারনেট মরে যায়নি। কোটি কোটি মানুষ এখনও প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছে, যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করছে এবং নতুন কিছু তৈরি করছে।
তবে, এই তত্ত্বটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তার মতো। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইন্টারনেট তার শুরুর দিকের সেই আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। অ্যালগরিদম, বাণিজ্যিকীকরণ এবং AI-এর উত্থান আমাদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে, যা প্রায়শই এটিকে প্রাণহীন এবং কৃত্রিম মনে করাতে পারে।
তথ্যসূত্র –
- https://www.forbes.com/sites/danidiplacido/2024/01/16/the-dead-internet-theory-explained/
- https://thedeadinternettheory.com/
- https://dismislab.com/media-literacy/media-dead-internet-theory-ai/
- https://www.rupalibangladesh.com/information-technology-news/72732
- https://www.geeky-gadgets.com/dead-internet-theory-explained/

