“ভিনগ্রহীরা তৈরি করেছে এই নাজকা লাইন? ভীনগ্রহীরা না করলেও এমন কিছু মানুষ তৈরি করেছে যারা ছিলো অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী। আবার এমন কোন জনগোষ্ঠির মানুষেরও হাত থাকতে পারে যারা মহাশক্তিশালী কোন সত্ত্বার পূজা করে”
দক্ষিণ পেরুর উঁচু মরুভূমির উপর দিয়ে বিমানের উড়ে যাওয়ার সাথে সাথে পাথর ও বালির রূপ পরিবর্তন করতে শুরু করে। বাদামি ও লালচে বালুর মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে সাদা কিছু রেখা আবির্ভূত হয়। বছরে এক ইঞ্চি বৃষ্টিও না হওয়া এই শুষ্ক মরুভূমিতে এই সাদা রেখাগুলো জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে। এই রেখাগুলোর কোনটা সরল জ্যামিতিক নকশা কোনটা আবার হামিংবার্ড, মাকড়সা, বানর। এগুলো পেরুর নাজকা লাইন, পৃথিবীর অন্যতম এক রহস্য যার ভেদ সম্ভব হচ্ছে না এই অসম্ভব উন্নত প্রযুক্তির যুগে এসেও! চলুন দেখা যাক নাজকা লাইন কোন ধরনের রহস্য।
নাজকা লাইন কি
নাজকা লাইন বলতে এককথায় বলা যায়, একটি বৃহৎ রেখা চিত্র, যা কেবলমাত্র আকাশ থেকে দেখলেই ভালো মতো বোঝা যায়। পেরুর রাজধানী লিমা থেকে প্রায় ৪০০ কি.মি দক্ষিণে, পেরুর মরুভূমি ‘নাজকা’ এবং মরুভূমিতে অবস্থিত ‘নাজকা নদী’র আশেপাশে এই রেখাসমূহের দেখা মেলে। স্থানের নামানুসারে এই রেখার নামকরণ করা হয়েছে নাজকা লাইন।
নাজকা লাইন ৫০০ বর্গ কি.মি. জুড়ে বিস্তৃত। এই রেখাগুলোকে বিমানের সাহায্যে, উপর থেকে দেখলে এর আকৃতি এবং ভাব পুরোপুরি বোঝা সম্ভব। কয়েক ধরণের নকশার নাজকা লাইন রয়েছে। এর কয়েকটার নাম হলো- বানর (৩৬০ ফুট), হামিংবার্ড (১৬৫ ফুট), হত্যাকারী তিমি (২১০ ফুট), মাকড়সা (১৫০ ফুট)। এছাড়াও বিভিন্ন ফুল, উদ্ভিদ, ত্রিভুজ, জ্যামিতিক রেখা, সর্পিল রেখা রয়েছে নাজকা লাইনে।
ধারণা করা যায় যে, ২০০০ বছরেরও আগে নাজকা সংস্কৃতির মানুষেরা এখানে এসব রেখাঙ্কন করেছিলেন। আবার কিছু কিছু গবেষক মনে করেন যে, নাজকা লাইন এর চেয়েও বেশি আগের। বিংশ শতাব্দীতে নাজকা লাইন আবিস্কৃত হয়েছে। কতক গবেষক এ সম্পর্কে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু আজ অবধি নাজকা লাইন একটি রহস্যের নাম। কেননা, নিখুঁতভাবে করা এসব রেখাসমূহের নিশ্চয়ই একটা বড় উদ্দেশ্য ছিলো। আজ অবধি এই উদ্দেশ্য কি হতে পারে এ সম্পর্কে অনেক ধারণাই পাওয়া গেছে। তবুও, একদম সত্যটা আজও অধরা।
নাজকা লাইনের আবিষ্কার
১৯২৭ সালের কথা। পেরুর একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ ‘তোরিবিও মেহিয়া কেসপ’ নামের একটা শুষ্ক মালভূমি অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি নিচে (নাজকা মরুভূমি) কতগুলো অদ্ভুত রেখা দেখতে পেলেন। কি সুনিপুণভাবে করা প্রত্যেকটি রেখাচিত্র! আর এই রেখাগুলো প্রায় পুরো নাজকা মরুভূমি জুড়েই। এরপর এখানে একটু দ্বিমত আছে। অনেকে বলেন যে, বিমানের যাত্রীরা পরবর্তীতে এই অদ্ভুত রেখাচিত্র গুলো বিমান থেকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং পেরুর অথরিটিকে জানান। আরেক পক্ষ বলেন, একজন পাইলট এই এলাকার উপর দিয়ে যাবার সময় অদ্ভুত রেখাচিত্র গুলো দেখতে পান।
যাইহোক, এরপর কেটে যায় অনেক বছর। সাল ১৯৩৯ এ রহস্য আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। লিমা (পেরুর রাজধানী) শহরে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক কনফারেন্সে তোরিবি আবার এই রেখাচিত্রগুলোর সম্বন্ধে বলেন। এবার তোরিবির এই বক্তব্যে সকলে বিস্মিত হয়ে উঠে। তৎকালীন সময়ে একজন আমেরিকান, পল কসক (ঐতিহাসিক) পেরুতে গবেষণার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি গবেষণা করতেন প্রাচীন সভ্যতার সেচ ব্যবস্থা নিয়ে। তিনি এ রেখাচিত্রসমূহের কথা জানতে পেরে এর সম্মন্ধে বিস্তারিত জানার উৎসাহ বোধ করেন। তিনি নিজেও একটা বিমান ভাড়া করলেন এবং নিজ চোখে রেখাসমূহ দেখলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি এর সত্য উদঘাটন করবেনই। এই সত্য উদঘাটনে তাঁর সঙ্গী হলেন জার্মান গণিতজ্ঞ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ মারিয়া রাইখ। দুজন মিলে রহস্য উন্মোচনে লেগে পড়লেন। তাঁরা আবিস্কার করলেন ৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত ১০ হাজারেরও বেশি রেখাচিত্র পুরো মরুভূমি জুড়েই রয়েছে।
নাজকা রেখাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়—
১. জিওগ্লিফস: জিওগ্লিফস মানে জ্যামিতিক রেখাচিত্র। প্রায় শতাধিক জিওগ্লিফস পাওয়া যায় নাজকা লাইন থেকে।
কতগুলো জিওগ্লিফস ২০০ মিটার অঞ্চল ধরে বিস্তৃত। National Academy of Science এর মতে, এর সংখ্যা ৩০৩ টি। এই জিওগ্লিফসের ব্যাখ্যা নিয়ে আবার দুটো মতের সৃষ্টি হয়েছে। একদল গবেষক ২৫টি জিওগ্লিফস কে চিহ্নিত করেন এবং তাদের মতে এই জিওগ্লিফসগুলো প্যারাকাস সংস্কৃতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
আবার আরেক দল গবেষক মনে করেন যে, বাকি জিওগ্লিফসদের সাথে ‘চিনচা সভ্যতা’র যোগসূত্র রয়েছে। যাইহোক, এসব জিওগ্লিফস যে শতভাগ নিখুঁত এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। কত অদ্ভুত তাই না!
২. বায়োমরফস: বায়োমরফস মানে জীবজগৎ। অর্থাৎ, পশু-পাখি বা গাছ-পালার ছবি।
এই উল্লেখযোগ্য বায়োমরফস কতকটা মানুষের আকৃতির,আবার মাছ, বিড়াল, পাখি, বানর, গিরগিটি, কুকুরের। আবার, মানুষের সাথে প্রাণীর সখ্যতাও এসবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া, ছুরি দিয়ে মানুষের মাথা কাটা হচ্ছে এমন অদ্ভুত রেখাচিত্রও পাওয়া যায় নাজকা লাইনসে। এটার বিষয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা যে, নাজকার আদি অধিবাসীরা নরবলি দিতো। বায়োমরফসের রেখাচিত্রসমূহকে নাজকা অধিবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিরুপ বলে অনেকে মনে করতেন।
নাজকা লাইন স্রষ্টা রহস্য
নাজকা লাইনের তৈরি নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে।
নাজকা অথবা প্যারাকাস জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি নাজকা লাইন
কতক গবেষক মনে করেন, নিশ্চিতভাবেই নাজকা লাইন প্রাচীন নাজকা সংস্কৃতির সৃষ্টি। আবার, কতক গবেষক মনে করেন যে, অধিকাংশ নাজকা লাইন দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরাতন। তাই এটা যে শুধু নাজকা সংস্কৃতির ফসল তা নয়, এটি নাজকা জনগোষ্ঠির মানষ আসার আগেও সৃষ্টি হতে পারে।
কতক গবেষকের মতে, নাজকা লাইন ইনকা সভ্যতার মানুষদের শ্রম এবং মেধা দিয়ে তৈরি। অনেকে মনে করেন নাজকা লাইন প্যারাকাস সংস্কৃতির ফসল। কারণ, নাজকা লাইনে কতক রেখাঙ্কন মানুষের অবয়বের মতো। আর প্যারাকাস সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে তারা মানব সদৃশ্য ছবি আঁকতেন।
এলিয়েনদের তৈরি নাজকা লাইন
আরেকদল গবেষকের মতে, নাজকা লাইন খোদ এলিয়েনদের সৃষ্টি। বিজ্ঞানী এরিখ ভন দানিকেন’সহ আরও কিছু গবেষক বলেন যে, নাজকার অধিবাসীরা এই রেখাচিত্রগুলো অঙ্কন করেছিল কিন্তু তারা এককভাবে তা করেনি। এই কাজটি করতে তারা ভিনগ্রহীদের সাহায্য নিয়েছিলো।
নাজকা লাইনের সৃষ্টি রহস্য
ধারণা করা হয়, নাজকা লাইন সৃষ্টি করা হয়েছে তিন হাজার বছরেরও পূর্বে। নকশাগুলো হাজার বছর ধরে টিকে আছে কেননা নাজকা মরুভূমিতে বৃষ্টি হয়না বললেই চলে। আর এ মরুভূমিতে তেমন বালিও নেই। বালির বদলে রয়েছে বাদামি রঙের ছোট ছোট পাথর। উপরিভাগের পাথরগুলো হলো আয়রণ অক্সাইড পাথর। আর নিচে রয়েছে চীনাপাথরের মাটি। এই সব পাথরের উপর ৪-৬ ইঞ্চি পুরু করে এবং কতক জায়গায় পরিখা খনন করে চিত্রগুলোকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
টাওয়ারের উপর থেকে আঁকা
কিন্তু এই রেখাগুলো এত বৃহৎ যে সামনাসামনি বোঝাই সম্ভব নয় যে এটা কি আকৃতির। তাহলে কিভাবে তৈরি হয়েছে রেখাচিত্র? কেউ কেউ বলেন যে, রেখাচিত্র পর্যবেক্ষণের জন্য হয়তো উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করা হতো এবং সেখানে উঠে দিকনির্দেশনা দিতো। তবে এ যুক্তি ক্ষীণ কেননা কমপক্ষে শতভাগ উচুতে উঠলে তবেই এই রেখাচিত্রগুলোর আকৃতি বোঝা যায়। সে সময় এমন কোন প্রযুক্তিও ছিলো না যার সাহায্যে চিত্রগুলো আঁকা হয়েছে ধারণা করা যায়।
বেলুনে করে আঁকা
প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাচীনকালে গরম বাতাসের তৈরি বেলুন থেকে এসব রেখা অঙ্কন করা হতো। কিন্তু যদি তাইই হতো, তাহলে ১৭৮০ সালে মানুষ আবার কখন বেলুন আবিষ্কার করলো!
আবার, অনেক গবেষক ব্যক্ত করেন যে, এসব রেখাচিত্র বানানোর পূর্বে ছোট নকশা করা হতো এবং পরবর্তীতে তার অনুকরণে বৃহৎ রেখাচিত্রগুলো অঙ্কন করা হতো। কিন্তু এই বয়ানেরও গভীরতা নেই। কারণ, এখানে রেখাচিত্রগুলো তৈরির উপায়ের প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে গেল!
তবে একটি বিষয়ে সকলে একমত যে, যেভাবেই রেখাঙ্কন করা হোক তা অবশ্যই সময়সাপেক্ষ ছিলো। প্রচুর সময় আর শ্রম লেগেছে রেখাচিত্রগুলো অঙ্কণ করতে।
নাজকা লাইন এবং এলিয়েন তত্ত্ব
অনেকেই নাজকা লাইনের রেখা চিত্রের সাথে এলিয়েন বা ভিন্নগ্রহী প্রাণীদের সম্পর্ক খুঁজে পান। উপরিউক্ত ছবিতে নাজকা লাইনের যে রেখাচিত্রটি দেয়া আছে তার সাথে বর্তমান বিজ্ঞানীদের দেয়া এলিয়েনের আকৃতি বা চেহারার বর্ণনার ৯০% মিলে যায়। কতক গবেষকদের মতে, এই এলিয়েনরা জ্ঞান, বুদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলো। এরাই এসব রেখাচিত্র অঙ্কন করে গিয়েছে বলে তারা ধারণা করেন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য করতে হয়, লেখক এরিক ফন দানিকেন এর বিখ্যাত তত্ত্বটি। তার লেখা বই ‘চ্যারিয়টস অফ গড’ এ তিনি এই তত্ত্ব দেন যে, প্রাচীনকালে ভিন্নগ্রহীরা পৃথিবীতে আসতো। আর এই রেখাগুলো ছিলো তাদের মহাকাশযানের রানওয়ে।
এই রেখাগুলো এমনভাবে আঁকানো যাতে, এই ভিন্নগ্রহীরা রেখাগুলো দেখে স্থানটা চিহ্নিত করতে পারে এবং পরবর্তীতে মনেও যেন থাকে। এছাড়াও নাজকা লাইনের রেখাচিত্রের সাথে বর্তমান এয়ারলাইনস হাইওয়ের মিলও পাওয়া যায় অদ্ভুতভাবে।
নাজকা লাইনের গোপন বার্তা
নাজকা লাইনের চিত্রগুলোর প্রতীকী অর্থ বের করা সহজ কাজ নয়। তবে এটুকু ধারণা করা যায় যে— নাজকা লাইন এমন এক নিদর্শন যা মানবসভ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এখানে একেক চিত্র একেক জিনিস ফুটিয়ে তোলে।
উপরিউক্ত ছবিটা দেখে গবেষকরা ধারণা করেন, এটি একটি দৈত্য মাকড়সা। এটার অন্তর্নিহিত অর্থ এখনও উদঘাটন না করা গেলেও আশ্চর্যজনকভাবে এই চিত্রের সাথে ‘অরিয়ন’ নক্ষত্রমন্ডলের নকশার বেশ সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
উপরিউক্ত নাজকা লাইন দ্বারা গবেষকরা ধারণা করেন এটি একটি হামিংবার্ডের রেখাচিত্র। কিন্তু এটার ব্যাখ্যা জানা যায় না।
উপরিউক্ত নাজকা লাইন জ্যামিতিক বা পরিসংখ্যানগত তথ্য উপস্থাপন করে এটা ধারণা করা হয়।
বিষয় হলো, এই নাজকা লাইনের রেখাচিত্রগুলো গবেষকদের ভাবায় আর সাধারণ মানুষদের করে উৎসাহী। নাজকা লাইনের জ্যামিতিক রেখাচিত্র (ত্রিভূজ, চতুর্ভূজ, আয়তক্ষেত্র, সামন্তরিক ইত্যাদি) আরও বেশি বিস্ময়ের সঞ্চার করে। যেখান থেকে জ্যামিতিক রেখা অঙ্কন শুরু হয়েছে ঠিক সেখান থেকে একেবারে শেষঅবধি রেখাটি নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে। জার্মান গবেষক মারিয়া রাইখা ৫০ টি চিত্র এবং প্রায় এক হাজারের বেশি জ্যামিতিক রেখা আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে কোন কোনটা আবার ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ।
কতক গবেষকদের মতে, এই জ্যামিতিক রেখাচিত্রসমূহ অঙ্কন করা হয়েছে বৃষ্টিকামনা এবং পূর্বপুরুষের আত্মার সাথে যোগাযোগের জন্য। কতক গবেষকদের মতে, এই রেখাচিত্রগুলো ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে অঙ্কন করা হয়েছে। কিন্তু আদতেই এসব রেখা গুলো আসলে কি কি তথ্য দেয় তা আজও অধরা।
নাজকা লাইনের উদ্দেশ্য
নাজকা লাইনকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে এই অত্যাশ্চর্য রেখাচিত্র গুলোই সব নয়।নাজকা লাইনের উপর প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, কতক রেখাচিত্রগুলোর সাথে পাওয়া যায় কতক গর্ত এবং সুড়ঙ্গের মতো অনেক লাইন।
সুড়ঙ্গের মতো এসব লাইনের নাম ‘পুকুইয়ো’। পুকুইয়ো ব্যবহৃত হতো জলসংবহনের কাজে। আজ অবধি ৩৬টি পুকুইয়ো আবিস্কার করা হয়েছে। এসব এতোই নৈপুণের সাথে তৈরি হয়েছিলো যে কিছু পুকুইয়ো আজও কার্যকরী। গর্তগুলো দেখে ধারণা করা হয়, এখানে হয়তো নাজকার প্রাচীন অধিবাসীরা পানি সংরক্ষণ করতো। এছাড়াও কতক রেখাচিত্রের সাথে পিরামিড বা মাটির ঢিবি দেখা যায়।
এসব পিরামিড (cahuachi) যে এককালে সজ্জিত ছিলো তা বোঝা যায়। ধারণা করা হয়, এগুলো ধর্মীয় কারণেই ব্যবহার করা হতো। নাজকা লাইনের কতক চিত্র, চিহ্ন দ্বারা ধারণা করা যায় তারা কৃষিকাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এছাড়াও, উঠে এসেছে মাছ শিকারেরও প্রমাণ।
নাজকা লাইনের রহস্য নিয়ে আধুনিক গবেষণা
১৯২০ সালে নাজকা লাইনের আবিস্কারের পর থেকেই লাইনগুলো একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এসব সবই অনুমানলব্ধ জ্ঞান হবার কারণে এসব ব্যাখ্যা রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়নি।
কিন্তু একজন জার্মান অনুবাদক,মারিয়া রেইচে, তিনি বহু বছর ধরে নাজকা লাইনের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় ছিলেন। তিনি নাজকা লাইন সংরক্ষণের বিষয়েও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। অবশেষে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে, এই লাইনগুলো একটি বিশাল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্যালেন্ডার এবং নাজকা লাইনে যে প্রাণীর রেখাচিত্র হয়েছে এসবও আকাশে তারার দলবদ্ধতার ভিত্তিতে অঙ্কন করা হয়েছে।
তবে, এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায় কেননা শুধু আকাশে নক্ষত্রমন্ডল দেখে এত বৃহৎ পরিসরে এত নিখুঁত রেখাচিত্র কিভাবে অঙ্কন করা সম্ভব? যাইহোক, এটা নিয়ে আরেকটু উল্লেখ করা যাক, ১৯৬৭ সালে আমেরিকান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী, জেরাল্ড হকিন্স আবার এ বিষয়টা নিয়ে বসেন। তিনি নাজকা লাইনের রেখাচিত্রের সাথে মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থার কোন মিল পাননি।
১৯৯৭ সালে আবার এই সত্য উদঘাটনের প্রয়াস দেখানো হয়। এবার প্রত্নতাত্ত্ববিদ, ভূগোলবিদ ছাড়াও অন্যান্য গবেষক একত্র হয়ে গবেষণায় নামলেন। এই দল নাজকা লাইন এবং পালপা শহরের মাঝামাঝি অবস্থিত কাছাকাছি বেশ কয়েকটা পরিসংখ্যানের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করার জন্য ‘নাজকা-পালপা প্রকল্প’ তৈরি করেন।
এই গোষ্ঠীর মতে, নাজকা লাইনের অনেকগুলো চিত্রের পাশে কতক প্লার্টফর্ম রয়েছে। এই প্লার্টফর্মগুলো নাজকা অধিবাসীদের আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রার ইতিহাস বহন করে। তাঁরা দেখান একটি কাঁটাযুক্ত ঝিনুকের সাথে একটি খনন করা প্লার্টফর্ম। গবেষকদের মতে এসব চিত্র ধর্মের সাথে যুক্ত ছিলো ।
উপসংহার
আজ অবধি যা আবিস্কৃত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে নাজকা লাইন রহস্য সম্বন্ধে খুব অল্প কিছুই জানা যায়। কিন্তু মূল যে রহস্য থেকে গেছে তার উত্তর আজও নাগালের বাইরে। গবেষকদের মতে, কতক রহস্য এতোটাই রহস্যময় যে হয়তো পৃথিবী একদিন অসংখ্য এসব রহস্যগুলো সাথে নিয়েই ধ্বংস হবে। এভাবেই কিছু রহস্য রহস্যই থেকে যাবে পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া অবধি। তবে নাজকা লাইন নিয়ে আমরা আশাবাদী হতেই পারি যে একদিন এ রহস্যজট খুলবে। তবে, এটা ভালো যে নাজকা লাইন বর্তমানে স্বীকৃত রহস্য। ইউনেস্কো নাজকা লাইনকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ র তালিকাতে যুক্ত করেছে ১৯৯৪ সালে।