“১৯৫৯ সালের এক শীতল রাতে, রাশিয়ার এক দুর্গম পাহাড়ের কোলে কি এমন ঘটেছিল যে, ৯ জন তরুণ অভিযাত্রী প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজেদের তাঁবু কেটে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল?”
সেই রাতে শীতল প্রকৃতির মাঝেই মৃত্যু হয় সেই ৯ জন রুশ অভিযাত্রীর। তবে তাঁদের মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না। ভাঙা হাড়, বিকৃত মুখ, আর ভয়াবহ শিহরণ জাগানো পরিবেশ। সেই ডায়াটলোভ পাসের কাহিনী যেন একটা অস্পষ্ট দুঃস্বপ্নের মতো। তাঁদের তাঁবু কেটে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টার দৃশ্যই বলে দেয়, নিশ্চয় অকল্পনীয় কোনো ঘটনার শিকার হয়েছিলেন তাঁরা। কী ঘটেছিল সেই রাতে? প্রকৃতির দুর্যোগ, নাকি অন্য কোনো অপার্থিব শক্তির খেলা? আসুন, আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করি এবং কিছু তথ্য তুলে ধরি যা হয়তো এখনো অজানা।
ডায়াটলোভ অভিযাত্রী দল
ডায়াটলোভ পাস রাশিয়ার উরাল পর্বতের একটি অঞ্চল। এখানে ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯ জন রুশ অভিযাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। এই অভিযাত্রী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ অভিযাত্রী ইগর ডায়াটলোভ। পরবর্তীতে তার অনুসারেই এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছিল ডায়াটলোভ পাস। তাদের এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল, উরাল পর্বতের এই দুর্গম অঞ্চল দিয়ে, ঘটনাস্থল থেকে 10 কিলোমিটার (6.2 মাইল) উত্তরে অবস্থিত অটোরটেন (ওটোর্টেন) পর্বতে পৌঁছানো।
এটি ছিলো একটি ১০ জনের অভিযাত্রী দল। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও দুইজন নারী সদস্য ছিলেন। গ্রুপের প্রত্যেক সদস্যরাই ছিলেন স্কি ট্যুরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রেড II-হাইকার। এই যাত্রা থেকে ফিরে আসার পরে তারা গ্রেড III হাইকারের সার্টিফিকেশন পেতেন। যাত্রা শুরুর পরপরই, দলের একজন অসুস্থ হয়ে ফিরে আসেন এবং বাকিরা উরাল পর্বতের উত্তরে অগ্রসর হন। ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে অভিযাত্রী দলটির সাথে শেষবারের মতো যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর তাদের ক্যাম্পসাইট থেকে আর কোনো খবর আসেনি। এক সপ্তাহ পরে উদ্ধারকর্মীরা তাদের খোঁজার জন্য বের হয়। কিন্তু যা পাওয়া গেল, তা ছিল সত্যিই অস্বাভাবিক।
ঘটনাস্থল ও অভিযাত্রী দলের সন্ধান
অভিযানে যাওয়ার আগে ডায়াটলোভ বলে গিয়েছিলেন যে, ভিজাইতে ফিরে আসার সাথে সাথে তিনি তাদের স্পোর্টস ক্লাবে একটি টেলিগ্রাম পাঠাবেন। সবাই প্রত্যাশা করেছিলেন, তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির পরেই তিনি যোগাযোগ করবেন। কিন্তু, এদিকে ডায়াটলোভ ইউডিনকে বলেছিলেন, তিনি আশা করেছেন যে এই অভিযান আরও দীর্ঘ হবে। কারণ, এই ধরনের অভিযানে কয়েক দিনের বিলম্ব হওয়া ছিল সাধারণ বিষয়। এরপরও তারা ফেরত না আসলে ২০ ফেব্রুয়ারির দিকে তদের আত্মীয়রা একটি উদ্ধার অভিযানের দাবি জানায়। এরপর স্বেচ্ছাসেবক ছাত্র এবং শিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রথম উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী এবং মিলিশিয়া (পুলিশ) বাহিনীর হেলিকপ্টার এবং বিমানকে ডায়াটলোভ উদ্ধার অভিযানে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানকারীরা যখন ডায়াটলোভ পাসের অভিযাত্রী দলের সন্ধানে যান, তখন তাঁরা এমন চিত্রের মুখোমুখি হন যা ছিল কল্পনারও বাইরে। তাঁবুগুলো ভেতর থেকে কাটা ছিল। মনে হচ্ছে যেন তাঁরা ভেতর থেকে তাবু কেটে বাইরে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁবুর চারপাশে পায়ের ছাপগুলো গিয়েছিল বনের দিকে। কিন্তু কিছুদূর পরে পায়ের ছাপগুলো হঠাৎ হারিয়ে যায়। এই পায়ের ছাপ ধরেই উদ্ধারকর্মীরা মৃতদেহগুলো খুঁজে পায়। প্রতিটি দেহে ছিল বিভিন্ন ধরণের আঘাতের চিহ্ন। একজনের শরীর দেখে মনে হচ্ছিল যেন তার ওপর দিয়ে কোনো বিশাল কিছু চলে গেছে। কিন্তু বাহ্যিক কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কারো শরীরে তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি ছিল। সবচেয়ে ভৌতিক দিক ছিল একজন অভিযাত্রীর জিহ্বা এবং চোখ বের হয়ে ছিল। এরকম আঘাত খুবই অস্বাভাবিক। যা সাধারণ প্রাকৃতিক কারণে ঘটতে পারে না। এই সব লক্ষণ ঠান্ডায় মারা যাওয়া মানুষদের শরীরে থাকে না।
প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাঁরা কোন বিপদে পড়েছিলেন? কেন তারা তাঁবু থেকে বেরিয়ে তুষারের ভেতর খালি পায়ে দৌড়াচ্ছিলেন? এইসব দেখে মনে হয়েছিল যেন কোনো অজানা শক্তির হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। আসলেই কী ঘটেছিল সেই রাতে।
সম্ভাব্য কারণ ও তত্ত্ব
ডায়াটলোভ পাসের রহস্য নিয়ে আজও নানা তত্ত্ব প্রচলিত আছে। তবে কোনো তত্ত্বই পুরোপুরি এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়নি। তবু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের আলোচনা করা হলো:
প্রাকৃতিক কারণ:
প্রথম এবং সরল ব্যাখ্যাটা হল তীব্র ঠান্ডা, তুষার ধসের কারণে তাঁরা মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের দেহে যে ধরনের আঘাত ছিল তা সাধারণ তুষারধস বা প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে না। তাঁরা যে পাহাড়ের ঢালে তাঁবু করেছিলেন, যেখানে তুষারধসের ঝুঁকি ছিল। এই কারণে অনেকেই মনে করে তুষার ধসে তাদের মৃত্যু হয়েছিল। তবে, ৬০ বছর পরেও কোন গবেষণা এই তত্ত্বকে সম্পূর্ণ সমর্থন করতে পারেনি।
সামরিক পরীক্ষা:
একটি তত্ত্ব বলছে, এই অঞ্চলে হয়তো কোনো সামরিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে কিছু গোপন অস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। যা দুর্ঘটনাক্রমে তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বেশ কয়েকজন অভিযাত্রীর পোশাকে রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ পাওয়া গিয়েছিল। তবে এটিও পুরো ঘটনাকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
UFO বা ভিনগ্রহের প্রাণী:
এই ঘটনার সময় আকাশে উজ্জ্বল কমলা রঙের আলো দেখা গিয়েছিল। যা অনেকে UFO বা ভিনগ্রহের প্রাণীদের উপস্থিতি হিসেবে দেখেছেন। এই আলো ঘটনার রহস্যময়তাকে বাড়িয়ে দেয়। এমন আলোকে মানুষ প্রায়ই ভিনগ্রহের প্রাণীদের আগমনের সংকেত হিসেবে দেখেন। কিছু গবেষক মনে করেন যে, অভিযাত্রীরা হয়তো এই আলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে তাঁবু ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে UFO-এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় অধিবাসীরা প্রায়ই আকাশে এমন আলো দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
অতিপ্রাকৃত শক্তি:
অনেকেই মনে করেন যে, ঘটনাস্থলে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি কাজ করেছিল। স্থানীয় মনসি জাতির কিংবদন্তী বলছে, এই এলাকাটি অভিশপ্ত। তাদের পূর্বপুরুষরা এই স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁদের মতে, এমন শক্তি অভিযাত্রিদের হত্যা করেছে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক নাই। কিছু লোক আজও বিশ্বাস করেন, এই অভিশাপের ফলেই দলটি ধ্বংস হয়েছিল।
ইনেরশালেমেন ফেনোমেনন:
এই ফেনোমেননের ফলে কখনো কখনো মানুষ নিজের ইন্দ্রিয় হারিয়ে ফেলে এবং অস্বাভাবিক আচরণ করে। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে Paradoxical Undressing নামে একটি অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ ঠান্ডার বিপরীতে শরীর থেকে পোশাক খুলে ফেলে। কিছু গবেষক মনে করেন, অভিযাত্রীরা এই ফেনোমেননের শিকার হতে পারেন। এছাড়াও বিশ্বাস করা হয় অভিযাত্রী দলটি একধরনের বিরল প্রাকৃতিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিল। যেমন কারম্যান ভর্টেক্স স্ট্রিটস, যেখানে বাতাসের অস্বাভাবিক ঘূর্ণন একটি বিশাল শব্দ সৃষ্টি করে। আর এই শব্দ অভিযাত্রীদের বিভ্রান্ত করে তুলতে পারে। যার ফলে তারা এমন আচরণ করেছিল।
অস্বাভাবিক দিক:
ডায়াটলোভ পাসের ঘটনার সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক হলো মৃতদেহের অবস্থান এবং ক্ষত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, অভিযাত্রীদের মৃত্যুকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু কিছু ঘটনার এটা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। উদাহরণস্বরূপ, একজন অভিযাত্রীকে গাছের উপরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সম্ভবত কোনও বিপদ থেকে পালিয়ে গাছে উঠেছিলেন। এছাড়াও কয়েকজনের দেহ ছিল অর্ধনগ্ন অবস্থায়।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো মৃতদেহের তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি। অভিযাত্রীদের কয়েকজনের শরীরে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পাওয়া যায়। কয়েকজনের পোশাকের নিচের অংশে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থটি ছিল। যা সাধারণ মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এইসব অস্বাভাবিকতা আজও তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করছে। অনেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামরিক পরীক্ষা, এমনকি ভিনগ্রহীর উপস্থিতি নিয়েও তত্ত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোনটাই নিশ্চিত নয়। এই ঘটনা যেন বিজ্ঞানের বুকে রেখে যাওয়া এক অমীমাংসিত ধাঁধা।
ঘটনাটির প্রভাব ও পরবর্তী কালের আলোচনা
এই রহস্যময় ঘটনা ডায়াটলোভ পাসকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রতি বছর অনেক মানুষ এই স্থানটি দেখতে যান। এখানে আজও সেই ঘটনার ছাপ রয়ে গেছে। ডায়াটলোভ পাস নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ডকুমেন্টারি, চলচ্চিত্র এবং বই। যেমন, “The Dyatlov Pass Incident” নামে একটি চলচ্চিত্র ২০১৩ সালে মুক্তি পায়। যা এই ঘটনাকে ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়াও, এই ঘটনা নিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং উৎসাহী মানুষ গবেষণা করছেন এবং নতুন তত্ত্ব তৈরি করছেন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নতুন তথ্য
২০১৯ সালে রাশিয়ান সরকার এবং বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞরা ডায়াটলোভ পাসের রহস্য উন্মোচনে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁবুর অবস্থা, অভিযাত্রীদের মৃতদেহের ক্ষত এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মৃতদেহগুলোর সঠিক অবস্থান, আঘাতের ধরন এবং শরীরের অবস্থা নিয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন।
এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে কিছু নতুন তথ্য সামনে আসে, যেমন মৃতদেহে তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি, যা প্রথমে উপেক্ষিত হয়েছিল। তবে, এই তেজস্ক্রিয়তার উৎস সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। গবেষকরা এই তত্ত্বও দিয়েছিলেন যে, সম্ভবত তুষারধস থে বাঁচতে অভিযাত্রীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মৃতদেহ গুলোর ক্ষত এবং অস্বাভাবিক আঘাতের চিহ্ন এই তত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এটি পরিস্কার যে, ডায়াটলোভ পাসের ঘটনা আজও একটি বড় রহস্য হয়ে রয়েছে। যতই বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, ততই এটি আরো বেশি অমীমাংসিত হয়ে উঠছে। এখনও পর্যন্ত, ডায়াটলোভ পাসের ঘটনার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নেই। তবে যে সব নতুন তথ্য এসেছে, তা রহস্যকে আরো গভীর করেছে।
উপসংহার
কেন তারা তাঁবুর বাইরে ছুটে গিয়েছিল? কেন মরদেহগুলো এত অদ্ভুতভাবে ছড়ানো ছিল?
কিসের থেকে তাঁরা পালাচ্ছিল?
এইসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত কখনোই সম্পূর্ণভাবে জানা যাবে না। ঘটনাটি শুধু তত্ত্ব আর প্রশ্নে ঘেরা। আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন, কি ঘটেছিল সেই রাতে? হয়তো এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়, হয়তো সামরিক পরীক্ষা, নাকি ভিনগ্রহের কোনো প্রভাব? উত্তরের চেয়ে প্রশ্নই এখানে বেশি। ডায়াটলোভ পাসের রাতটি যেন আজও মানুষকে ভাবায়।