Image default
ইতিহাস

সুন্দরবনের বনবিবি – এক আরব কন্যার বনবাস

আরব্য কন্যা বনবিবি ছিলেন ইব্রাহিম বা বেরাহিম নামে এক ফকির এর কন্যা। মক্কা হতে আগত ইব্রাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি, সতীনের প্ররোচনায় পড়ে, ভাগ্যে জোটে সুন্দরবনের বনবাস।

পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ যখনই ভয়কে জয় করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই জন্ম হয়েছে দেব-দেবীর। তারই ধারাবাহিকতায়, সুন্দরবন এর গহীনে থাকা মানুষদের লৌকিক দেবী মা বনবিবির গল্পের উত্থান। বনবিবি হল সুন্দরবনের বিখ্যাত কিংবদন্তি; সুন্দরবনের গ্রামে গ্রামে এই উপকথাটি বহু রকম ভাবে শুনতে পাওয়া যায়।

বনবিবির ইতিহাসঃ আরব কন্যার বনবাস

বনবিবির উত্থান

আরব কন্যা বনবিবি ছিলেন ইব্রাহিম বা বেরাহিম নামে এক ফকির এর কন্যা। মক্কা হতে আগত ইব্রাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি, সতীনের প্ররোচনায় পড়ে, ভাগ্যে জোটে সুন্দরবনের বনবাস। এই সময় আল্লাহ বিশেষ উদ্দেশ্যে স্বর্গ থেকে বনবিবি ও শাহ জঙ্গলীকে গুলালবিবির সন্তান রূপে জন্মগ্রহণের নির্দেশ দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। মূলত আঠারো ভাটির দেশ রক্ষার্থে তাদের জন্ম হয়।

দক্ষিণ রায় ছিলেন যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীনস্থ সামন্ত। নানা রকমের কালো জাদু, ভূত-প্রেত এবং সুন্দরবনের বসবাসকারী বিভিন্ন পশুপাখি ও বাঘের রাজা ছিলেন দক্ষিণ রায়। দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। শেষে দক্ষিণ রায় পরাজিত হয়ে বনবিবির কাছে মাথা নত করেন। দক্ষিণ রায়ের পরাজয়কে বাঘ বা অপশক্তির পরাজয় হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে উভয় দেশের সুন্দরবন অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন বনবিবি অথবা বনদেবী।

দক্ষিণ রায় ও বনবিবির যুদ্ধ

বনবিবির ও দুখের গল্প

সুন্দরবনের প্রচলিত আর একটি মিথ হলো দুখের গল্প। সুন্দরবনের একটি প্রত্যন্ত গ্ৰামে একজন বিধবা মহিলা ও তাঁর ছেলে বাস করত। বাপ হারা ছোট্ট ছেলেটির নাম ছিল দুখে। পাশের গ্ৰামে বসবাস করতো দুখের দুই কাকা; ধনা ও মনা‌। 

একদিন দুখেকে নিয়ে তারা মধু আহরণ করতে যায়। যাওয়ার সময় দুখের মা ছোট্ট ছেলেকে বলে, বনে তার আরেক মা রয়েছে। বিপদে পড়লে যেন তাকেই স্মরণ করে দুখে। তিনিই সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। এই বলে নৌকা ছেড়ে দেয়।

বন বিবি ও দুখে

তখন গভীর বনে বাস করতেন গাজী আউলিয়া। আর বনের পাহারায় থাকতেন বাঘরূপী দেবতা দক্ষিণ রায়। যেমন দাপুটে তার চেহারা, তেমনই ছিল অহঙ্কার। দুজনের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব ছিল।

এদিকে দুখের কাজে মন নেই। সারাক্ষণ ভাবে কখন তার মায়ের কাছে যাবে। এমনি চলতে চলতে এক রাতে দক্ষিণ রায়, ধনা-মনার স্বপ্নে আসে। স্বপ্নে তাদের মধু ও প্রচুর ধনসম্পত্তির আশীর্বাদ দিয়ে যায় সে। তবে শর্ত রাখলেন একটা, দুখেকে উৎসর্গ করতে হবে তার কাছে; নইলে নৌকা ডুবিয়ে দেবেন।

লোভে আর ভয়ে ধনা আর মনা, দুখেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছল করে দুখেকে একটি দ্বীপে নামিয়ে দেয়। এরপর ধনা আর মনা নৌকা ছেড়ে দেয়। দুখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে। তখন হঠাৎই মনে পড়ল তার মায়ের বলা কথা। বনে দুখের আরেক মা রয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে সেই মাকেই স্মরণ করল দুখে। স্মরণ করতেই তার সামনে এসে দাঁড়ান এক অপরূপ সুন্দরী দেবী।‌ সুন্দরবনের ত্রাণকর্ত্রী “বনবিবি”। দুখেকে কোলে তুলে নিতেই সে কাঁদতে কাঁদতে সমস্ত ঘটনা জানাল বনবিবিকে।

বন বিবি ও দুখের ছবি

সব শুনে রাগে ফেটে পড়লেন বনবিবি। নৌকায় করে অনেক ধন সম্পদ ভরিয়ে দুখের মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন দুখেকে। আর তার ভাই শাহ জঙ্গলিকে আদেশ দিলেন দক্ষিণ রায়কে পরাস্ত করার। শাহ জঙ্গলি কিছুক্ষণের মধ্যেই দক্ষিণ রায় ও গাজি আউলিয়াকে এনে হাজির করেন বনবিবির পায়ের সামনে। দক্ষিণ রায় উপায় না দেখে বনবিবির বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এদিকে দুখে তার রক্ষা পাবার গল্প সবাইকে বলে এবং তখন বনবিবির পূজার জন্য যজ্ঞ শুরু হয়।

তারপর থেকেই এই আরব্য কন্যা বনবিবি, সুন্দরবনের মানুষের কাছে পূজিত হয়ে আসছেন শত শত বছর ধরে। বনবিবির মূর্তির পাশে আজও থাকে শিশু দুখে আর শাহ জঙ্গলী। অনেকে মনে করেন, বনবিবি কখনো বাঘের রূপে আসেন, আবার কখনো আসেন মুরগির রূপে। 

কোথায় আছে বন বিবির মন্দির 

এপার বাংলা – ওপার বাংলা মিলিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসীরা বনবিবির মন্দির স্থাপনা করেছেন। সজনেখালি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, দো-বাকি অভয়ারণ্য ও দয়াপুর গ্রামে বনবিবির মন্দির দেখা যায়। খুলনার দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা ইউনিয়নের ঢাংমারী গ্রামেও এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বনের ভেতরে এবং বন সংলগ্ন লোকালয়ে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার এর বেশি স্থানে বনদেবীর পূজা হয়।

বনদেবীর পূজা 

অরণ্যের দেবী হিসেবে প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় বনবিবি বা বনদেবীর পূজা।

বনদেবীর পূজা

প্রতিবছরের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আর এই পূজাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় মেলার আয়োজন। ১৪২ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় যোগ দিতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। সারা বছর এই দিনটির জন্য গ্রামবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। পুরুষেরা আগে থেকে পূজার জন্য প্রস্তুতি স্বরূপ স্ত্রীর সাথে সহবাস করা বন্ধ করে দেন, গোসল করার পর পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করেন। মহিলারা কপালে সিঁদুর দেন না। দিনভর বনবিবির প্রার্থনা করেন।

বনবিবির পূজার মেলা

কোন রকমের বলি ছাড়াই এ পূজা পালন করা হয়। তবে গ্রামবাসীরা কেউ কেউ দু চারটে মুরগি নিয়ে গিয়ে মায়ের নামে উৎসর্গ করে ছেড়ে দেন। দিনভর পুঁথিপাঠের মধ্য দিয়ে বনবিবিকে স্মরণ, প্রসাদ বিতরণসহ চলে নানান কর্মকাণ্ড। সারাদিন উপোস থেকে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে মায়ের মন্দির পর্যন্ত শুয়ে প্রনাম করতে করতে চলে যান। আর রাতে শুরু হয় মেলা। নানা পণ্য নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে মেলায় আসেন দোকানিরা।

বনবিবির মূর্তি

গ্রামবাসীরা মণ্ডপ তৈরি করে সেখানে পূজার জন্য বনবিবি, শাহ জঙ্গলি, ধনা, মনা, গাজী কালু, দুখে ও দক্ষিণ রায়ের (সুন্দরবনের বাঘের) মূর্তি তৈরি করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মূর্তিতে বনবিবি বা বনদেবীর গায়ের রঙ হয় হলুদ, মাথায় থাকে মুকুট, গলায় থাকে হার, বনফুলের মালা ও লাঠি বা ত্রিশুল ধারিণী। 

মুসলিম সমাজে বনবিবি পীরানি হিসেবে পরিচিত। ইসলাম প্রভাবিত মূর্তি গুলোতে টিকলির সাথে টুপি, চুলে বেনুনী, পরনে ঘাগড়া-পাজামা বা শাড়ি ও জুতা পরিধান করে।

বনবিবির মূর্তি

বনবিবির প্রভাব

কিংবদন্তি বনবিবির গল্পটার আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, এটা অতি অনায়াসে হিন্দু এবং ইসলাম  ধর্মের অনেক উপাদানকে কোন রকম দ্বন্দ্ব ছাড়া সহ-অবস্থানে এনেছে। বনবিবিকে অনেকেই ভাবেন একজন দেবী, কিন্তু লিখিত উপাখ্যানগুলোতে এই দেবী আসলে একজন নারী পীর, এক মুসলিম ফকিরের কন্যা। 

গল্পটা মূলত কোন ধর্ম বিশ্বাস থেকে তৈরি তা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। সেটা নির্ণয় করা বোধহয় খুব একটা দরকারও নেই। পুরো সুন্দরবন জুড়ে সে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান নির্বিশেষে বনবাসী মানুষের অধিকাংশই বনবিবির ভক্ত। 

সেদিক থেকে দেখলে, এই কিংবদন্তিটা বাংলা লোকসংস্কৃতির সমন্বয় সাধনার একটা অতুলনীয় নিদর্শন। বনবিবি নামের এই মিথটির প্রধান উদ্দেশ্য হল – মানুষ আর অন্য প্রাণীদের প্রয়োজনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে, মানুষের লোভের নাটাই শক্ত করা। বনবিবি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের গল্পে বার বার এই কথা গুলই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাওয়া যাবে। 

সাহিত্যে বনবিবি

বাংলার মিথলজিক্যাল ইতিহাস বহু যুগের। শেকড় সন্ধানী ইতিহাস আমাদের সংস্কৃতিকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। কিংবদন্তি বনবিবিকে নিয়েও রয়েছে নানা রকমের উপাখ্যান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

  • বনবিবির কেরামতি
  • বনবিবির জহুরানা
  • বনবিবির উপাখ্যান

এছাড়াও সম্প্রতি ‘কোক স্টুডিও বাংলা’ বনবিবির কিংবদন্তি ও খনার বচন নিয়ে ব্যান্ড ‘মেঘদলের’ সাথে ‘বনবিবি’ নামের গান গেয়েছে।

সুন্দরবনের মানুষদের কাছে বনবিবি কিংবদন্তি  কেবলমাত্র একটা গল্প নয়, এটা একটা জীবন চর্চার পথ। নানা কারণে সুন্দরবনে জীবনযাপন খুব কঠিন। তবু যে-মানুষেরা এখানে থাকে, তাঁদের মধ্যে দেখা যায় এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, আর আশ্চর্য রকমভাবে জীবন উপভোগের রসবোধ। সুন্দরবনে ঠিক যেমন জল ও স্থলের সীমারেখা প্রায়ই গুলিয়ে যায়, তেমনই বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বিভেদ রেখাও মিলিয়ে যায়। এখানকার মানুষের আলাদা জাত, আর আলাদা ধর্মই হোক না কেন, সবাই বনবিবি কে শ্রদ্ধা করেন। কিছু ন্যায্য ভাবনা, কিছু নীতির ফরমান বনবিবি। মানবধর্মই বলে দেয়, মানুষ ও অরণ্যের সম্পর্ক কেমন হবে। তাই সুন্দরবনের মানুষের জীবনে এর প্রভাব বিশাল।

Related posts

জামদানি – রঙে নকশায় তাঁতে লেখা কবিতা

ইতিহাসের পাতায় মাদক: এক অপ্রত্যাশিত যাত্রা

আবু সালেহ পিয়ার

বিড়ালের হারানো অতীত: যুদ্ধক্ষেত্রে বিড়াল

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More