প্রমিথিউসকে পাহাড়ে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়, আর প্রতিদিন এক ঈগল এসে তার লিভার খেয়ে ফেলে তবুও লিভারটা আবার নতুন করে জন্ম নেয়, যেন শাস্তিটাই এক চিরন্তন “রিপিট মোড”!
বিশ্বের প্রাচীন পুরাণগুলোর মধ্যে গ্রিক পুরাণ অন্যতম সমৃদ্ধ, রহস্যময় এবং আকর্ষণীয়। দেবতা, টাইটান, বীর ও অসংখ্য কল্পকাহিনির ভিড়ে সবচেয়ে মানবিক ও আলোচিত চরিত্রদের একজন হলেন প্রমিথিউস। প্রমিথিউস শুধু একটি পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার প্রতীক, জ্ঞানের বাহক এবং আত্মত্যাগের এক জীবন্ত উদাহরণ।

প্রমিথিউস ছিলেন ইয়াপেটাস সন্তান এবং তাই তিনি দেবতাদের পূর্ববর্তী শক্তিশালী বংশের অংশ ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য অনেক টাইটানের মতো তিনি দেবতাদের শত্রু না হয়ে বরং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। পুরাণে বর্ণিত আছে, টাইটান ও অলিম্পিয়ান দেবতাদের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যাকে বলা হয় টাইটানোমাখি বা গ্রেট কসমোলজিক্যাল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে টাইটানদের বিপক্ষে অবস্থান নেন একজন; টাইটান হলেও মানবদরদি প্রমিথিউস।

যুদ্ধ শেষে অলিম্পিয়ান দেবতারা বিজয়ী হন এবং দেবরাজ জিউসের নেতৃত্বে টাইটানদের অনেককে টারটারাস নামক অন্ধকার কারাগারে বন্দি করা হয়। তবে প্রমিথিউস এবং তার ভাই এপিমিথিউস তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্তের কারণে বেঁচে যান এবং পরে জিউস তাদেরকে পৃথিবীর প্রাণী সৃষ্টির দায়িত্ব দেন।
এই দুই ভাইয়ের নামের মধ্যেই তাদের চরিত্র ফুটে ওঠে। প্রমিথিউস মানে “আগে চিন্তা করা” তিনি সবসময় আগে ভেবে তারপর কাজ করতেন। আর এপিমিথিউস মানে “পরে চিন্তা করা” তিনি আগে কাজ করে পরে ভাবতেন।
পৃথিবীতে এসে তারা বিভিন্ন স্থানের মাটি ও পানি দিয়ে জীবজন্তু তৈরি করতে শুরু করেন। এপিমিথিউস সাধারণ প্রাণী তৈরি করলেও প্রমিথিউস আরও গভীরভাবে চিন্তা করেন। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মাটি দিয়ে এক নতুন, উন্নত প্রাণী তৈরি করেন, যাদের তিনি দেবতাদের মতো আকৃতি দেন। এই নতুন সৃষ্টির নাম দেওয়া হয় মানুষ।
মানুষ সৃষ্টির পর প্রমিথিউস যান অলিম্পাস পর্বতে। সেখানে তিনি জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনার কাছে অনুরোধ করেন মানুষকে প্রাণ দেওয়ার জন্য। এথেনা তার অনুরোধে সম্মতি দেন এবং মর্ত্যে এসে মানবদেহে প্রাণসঞ্চার করেন।

দেবতাদের আকৃতিতে তৈরি এই নতুন সৃষ্টিকে জিউস পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি, তবে তিনি প্রমিথিউসকে সরাসরি বাধাও দেননি। মানুষ সৃষ্টির পর জিউস ঘোষণা করেন যে মানুষ দেবতাদের পূজা করবে এবং দেবতাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে প্রাণী উৎসর্গ করবে। তবে শর্ত ছিল উৎসর্গের কিছু অংশ দেবতাদের জন্য থাকবে, আর বাকি অংশ মানুষ গ্রহণ করবে।
এই নিয়ম নির্ধারণের জন্য প্রমিথিউস মেকোনে নামক স্থানে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। গ্রিক পুরাণে এই ঘটনাকে বলা হয় Trick at Mecone বা মেকোনে কৌশল। এখানে প্রমিথিউস মানবজাতির স্বার্থ রক্ষার জন্য এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করেন।

তিনি একটি গাভীর অংশকে দুইভাবে সাজান একদিকে হাড় ও চর্বি সুন্দরভাবে ঢেকে আকর্ষণীয় করে তোলেন, আর অন্যদিকে মাংস লুকিয়ে রাখেন কম আকর্ষণীয়ভাবে। জিউস চকচকে অংশটি বেছে নেন, ফলে নিয়ম হয়ে যায় যে দেবতাদের হাড় ও চর্বি উৎসর্গ করা হবে, আর ভালো মাংস মানুষের জন্য থাকবে। এতে প্রমিথিউস মানুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুবিধা নিশ্চিত করেন।
কিন্তু জিউস এই প্রতারণা বুঝতে পেরে অত্যন্ত রেগে যান। তিনি প্রতিশোধ হিসেবে পৃথিবী থেকে আগুন সরিয়ে নেন, যাতে মানুষ আর কিছু তৈরি বা রান্না করতে না পারে। এতে মানবজাতি চরম সমস্যায় পড়ে যায়।
মানবজাতির এই দুর্দশা দেখে প্রমিথিউস আর চুপ থাকতে পারেননি। তিনি দেবশিল্পী হেফাস্টাস-এর কারখানা এবং দেবী এথেনার সহায়তায় অলিম্পাস থেকে আগুন চুরি করেন। তিনি একটি ফাঁপা লাঠির ভেতরে আগুন লুকিয়ে মর্ত্যে নিয়ে আসেন এবং তা মানবজাতিকে দিয়ে দেন। এই আগুন পাওয়ার পর মানুষ নতুন জীবন লাভ করে। তারা খাবার রান্না করতে শেখে, শীত থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে পায় এবং ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও যন্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়। ফলে মানবসভ্যতার দ্রুত বিকাশ ঘটে।

প্রমিথিউসের এই সাহসী পদক্ষেপ তাকে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শুভাকাঙ্ক্ষীতে পরিণত করে, যদিও এর জন্য তাকে পরবর্তীতে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হয়।
জিউস অলিম্পাস পর্বত থেকে মানুষের অগ্রগতি লক্ষ্য করে বুঝতে পারেন যে এর পেছনে রয়েছে প্রমিথিউসের হাত। মানুষকে আগুন দেওয়ার মাধ্যমে দেবতাদের বিরুদ্ধে আবারও অবাধ্যতা করেছে সে এই অভিযোগে এবার জিউস প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন।
তিনি আর সহ্য করতে না পেরে প্রমিথিউসকে ভয়ংকর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে ককেশাস পর্বতের এক খাড়া পাহাড়ে চিরকালের জন্য শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হয়। এই ঘটনাটি গ্রিক পুরাণে একটি ভয়াবহ শাস্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন সকালে একটি বিশাল ঈগল এসে শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রমিথিউসের কলিজা ঠুকরে খেত। সারাদিন ধরে চলত এই যন্ত্রণা। কিন্তু রাত হলেই তার শরীর আবার নতুন করে আগের মতো হয়ে যেত, যাতে পরদিন ঈগল আবার এসে একইভাবে তাকে কষ্ট দিতে পারে। এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টের মধ্যে কাটছিল প্রমিথিউসের জীবন। তার যন্ত্রণা চলছিল অনন্তকাল ধরে ককেশাস পর্বতের শৃঙ্খলে বাঁধা অবস্থায়।

অনেক বছর পর শক্তিশালী বীর হারকিউলিস সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি প্রমিথিউসকে দেখতে পান এবং অবাক হন যে তিনি এখনো জীবিত আছেন। প্রমিথিউসের কষ্ট দেখে হারকিউলিস সিদ্ধান্ত নেন তাকে মুক্ত করবেন। তিনি শক্তি দিয়ে প্রমিথিউসের শেকল ভেঙে ফেলেন এবং তাকে যন্ত্রণা দানকারী ঈগলটিকে হত্যা করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের সেই ভয়ংকর শাস্তির অবসান ঘটে এবং প্রমিথিউস মুক্তি পান।
প্রমিথিউস গ্রিক মিথলজির এমন একটি চরিত্র, যাকে অনেকেই দেবতুল্য মর্যাদায় দেখেন। তার মানবপ্রেম, ত্যাগ ও সাহস তাকে পুরাণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিভিন্ন গ্রিক সাহিত্য ও প্রাচীন লেখায় তাকে মহান ও সহানুভূতিশীল টাইটান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তার গল্পকে ঘিরে বহু কবি ও সাহিত্যিক অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বিশেষ করে ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলি তাঁর বিখ্যাত রচনা “Prometheus Unbound” -এ প্রমিথিউসকে একজন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি প্রমিথিউসকে এমন এক প্রতীক হিসেবে দেখান, যিনি অত্যাচার ও অন্যায়ের শৃঙ্খল ভেঙে মানবজাতির মুক্তির পথ দেখান।
শেলির দৃষ্টিতে প্রমিথিউস শুধু একটি পৌরাণিক চরিত্র নন, বরং মানব স্বাধীনতা, জ্ঞান ও প্রতিরোধের প্রতীক। দেবতাদের অন্যায় ও ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি মানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটাই তাকে গ্রিক পুরাণে এক অনন্য ও চিরকালীন চরিত্রে পরিণত করেছে।
Reference:

