Image default
ঘটমান বর্তমান

স্টেম সেল থেরাপিঃ মৃত্যুকে জয় করার দ্বার প্রান্তে

কোন সাইন্স ফিকশনের কম নয় স্টেম সেল থেরাপি। চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা এবং পেশাদার খেলোয়াড়রাদের, স্টেম সেল পদ্ধতি ব্যবহার করে মুছে ফেলছেন বার্ধক্যের চিহ্ন। 

প্রশ্ন করা হলো, “আপনার কাছে সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় কোনটা?” একজন  উত্তর দিলেন মহাকাশ। অন্যজন বললেন মহাকাশের চেয়েও রহস্যময় হলো মানুষের শরীর। কারণ, আমাদের দেহ এমন রোগ বাধাতে সক্ষম যার কোন চিকিৎসা নেই। আবার এটাও সত্য যে অনেক রোগেরই চিকিৎসার উপকরণ এই শরীর থেকেই পাওয়া সম্ভব। 

আমাদের দেহের প্রত্যেকটা কোষ যেন এক একটা রহস্য। আমাদের দেহ কী কী করতে সক্ষম তা নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। আর এভাবেই আবিষ্কার হয়েছে স্টেম সেল বা স্টেম কোষ থেরাপি। যে চিকিৎসার মাধ্যমে তারুণ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি সেরে উঠছে দুরারোগ্য সব ব্যাধি।  

বিল গেটসের উক্তি

স্টেম সেল কী

আমাদের শরীরের এমন অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর একটা দিক হলো স্টেম সেল বা স্টেম সেল। স্টেম সেল হলো এক বিশেষ ধরনের কোষ যা নিজে থেকেই বিভাজিত হতে পারে এবং শরীরের প্রায় যেকোনো ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে সক্ষম। অর্থাৎ এই কোষ প্রয়োজনে স্নায়ু কোষ, রক্ত কোষ, মাংসপেশীর কোষ, অস্থি কোষ ইত্যাদি কোষে পরিণত হতে পারে। তবে সব ধরনের স্টেম সেল সব ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে না। এর মধ্যে কিছু ভাগ রয়েছে। 

১৯০৮ সালে রক্তকণার বিশেষায়িত কোষে রুপান্তরীকরণ থেকে প্রথম স্টেম সেলের প্রথম ধারণা নিয়ে আসেন রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ম্যাক্সিমোভ। এরপর ১৯৬০ এর দশকে কানাডার বিজ্ঞানী জেমস টিল এবং আর্নেস্ট ম্যাককুলচ ইঁদুরের উপর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো স্টেম সেলের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন।

তারা দেখান যে, স্টেম সেল নিজের মতো করে বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করতে পারে এবং বিশেষায়িত কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। এখান থেকেই শুরু হয় স্টেম সেলের অভাবনীয় সম্ভাবনার যাত্রা।

স্টেম সেল থেরাপি- এক  যুগান্তকারী আবিষ্কার

স্টেম সেলের এই বহুমুখিতা (pluripotency) এবং রূপান্তর ক্ষমতা (differentiation) অর্থাৎ স্টেম সেলের অন্য কোষে রুপান্তর হওয়ার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আবিষ্কার হয়েছে স্টেম সেল থেরাপি। এই আবিষ্কার ছিল বায়োটেকনোলজির এক  যুগান্তকারী আবিষ্কার যা বর্তমানে রক্তের ক্যান্সার লিউকেমিয়া ( leukemia)  এবং লিম্ফোমা (lymphoma) টিউমারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এর সম্ভাবনা এখানেই শেষ না।

বর্তমানে স্টেম সেল থেরাপি দিয়ে শুধু ক্যান্সারই নয়, বরং, হৃদরোগ, ডায়বেটিস, neurodegenerative  স্নায়ুরোগ যেমন— পারকিনসনেরও চিকিৎসা করা সম্ভব। যা নিয়ে গবেষণা চলছে এবং বিজ্ঞানীরা আশার আলো দেখতে পারছেন। 

তারকাদের যৌবন ধরে রাখছে স্টেম সেল চিকিৎসা 

এরই মধ্যে তারকাদের মাঝে স্টেম সেল চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ সাড়া জাগিয়েছে। চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা এবং পেশাদার খেলোয়াড়রাদের, স্টেম সেল পদ্ধতি ব্যবহার করে আঘাত সারানো বা বার্ধক্যের চিহ্ন মুছে ফেলার খবর প্রায়ই শিরোনামে দেখা যাচ্ছে। 

“ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল” – সৌন্দর্যের একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি

“ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল” বিষয়টি কিম কার্দাশিয়ানের মাধ্যমে বিশ্বে পরিচয় লাভ করে। এখানে রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে সেখান থেকে প্লেটলেট বের করা হয় এবং তা মাইক্রোনিডলিং-এর মাধ্যমে আবার ত্বকে প্রয়োগ করা হয়। প্লেটলেট ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিন উৎপাদন বাড়ায়, ফলে ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল হয়।

কিম কার্দাশিয়ান এর ‘ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল’

পেশাদার খেলোয়াড়দের জন্য PRP থেরাপি

স্টিফ কারি, টাইগার উডস এবং রাফায়েল নাদালের মতো পেশাদার খেলোয়াড়রা আঘাত সারাতে PRP থেরাপি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে প্লেটলেট একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত স্থানে প্রয়োগ করা হয়, যা দ্রুত টিস্যু মেরামত করতে সহায়ক। PRP পদ্ধতি কম আক্রমণাত্মক হওয়ায় খেলোয়াড়রা আবার দ্রুত খেলায় ফিরতে পারেন।

ভিন্ন উৎস থেকে স্টেম সেলের ব্যবহার

হ্যারি স্টাইলস, মারগট রবি এবং ডেভিড বেকহ্যাম ভেড়ার প্লাসেন্টা থেকে সংগৃহীত স্টেম সেলের অ্যান্টি-এজিং সুবিধা গ্রহণ করেছেন। এই পদ্ধতিও “ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল”-এর মতো, যেখানে মাইক্রোনিডলিং-এর পর স্টেম সেল ফ্লুইড প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে কোলাজেন ও ইলাস্টিন উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

তারুণ্য ধরে রাখতে SAVA পদ্ধতি 

ক্যারোলিন স্ট্যানবেরি সম্প্রতি SAVA পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে রোগীর নিজস্ব স্টেম সেল ব্যবহার করে বার্ধক্যের লক্ষণ দূর করা হয়। এই পদ্ধতে রোগীর ফ্যাট টিস্যু থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ করে তা ত্বকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। রোগীর নিজস্ব কোষ ব্যবহারের ফলে ঝুঁকি অনেক কম।

কোষের পুনর্জন্ম চিকিৎসা- ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি

এই থেরাপি সাধারণ মানুষের জন্যও এখনও সহজলভ্য নয়। তবে ভবিষ্যতের এই চিকিৎসার জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে চাইলে এখনই আপনার কোষ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে এমন অনেক স্টেম সেল ব্যাংক আছে যেখানে আপনি চাইলেই নিজের কোষ সংগ্রহকে পরবর্তী সময় ব্যবহার করে নিজের তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন। 

স্টেম সেল থেরাপি কিভাবে কাজ করে 

স্টেম সেল থেরাপি কোন সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি লম্বা ও জটিল প্রক্রিয়া। প্রথমে স্টেম সেল কি কাজে ব্যবহার হবে সে অনুযায়ী ব্যক্তির শরীরের উপযুক্ত স্থান থেকে টিস্যু সংগ্রহ করা হয়। এরপর এই স্টেম সেল ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনর্গঠন বা মেরামত করা হয়। 

সাধারণত প্রয়োজনীয় স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয়, ভ্রূণ, হাড়ের মজ্জা, বা চর্বি টিস্যু থেকে। বর্তমানে ইন্ডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (iPSC) থেকেও স্টেম সেল তৈরি করা হয়। একেক উৎসের স্টেম সেলের বহুমুখিতা একের রকম হয়। এজন্য তা গবেষণায় ব্যবহৃত হবে নাকি চিকিৎসা উদ্দেশ্যে তার উপর নির্ভর করে যে কোষ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে।

ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেল প্রস্তুতি

স্টেম সেল সংগ্রহের পর সেটাকে ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এই কোষের এমনভাবে বিভাজনের ঘটানো হয় যাতে তারা নির্দিষ্ট ধরনের কোষে (যেমন— স্নায়ুকোষ, রক্তকোষ) রূপান্তরিত হতে পারে। এখানে বিশেষ প্রক্রিয়ায় স্টেম সেলকে রোগীর প্রয়োজনীয় টিস্যু বা অঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হয়।

স্টেম সেল থেরাপি প্রসেস এর ধাপ

স্টেম সেল শরীরে প্রয়োগ

চিকিৎসার জন্য সাধারণত প্রস্তুতকৃত স্টেম সেলকে শরীরে ইনজেকশন বা সার্জারি মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। লিউকেমিয়াতে হাড়ের মজ্জায় রক্ত তৈরির জন্য স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে বোন ম্যারো ট্রান্সফার করে চিকিৎসা করা হয়। তেমনি  মস্তিষ্কে স্নায়ুতন্ত্র পুনর্গঠনের জন্য এমনকি হৃদপিণ্ডে হার্ট টিস্যু মেরামতের জন্যও স্টেম সেল থেরাপি ব্যবহার করা সম্ভব।

হার্টফেইলারে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোষও মেরামত করা সম্ভব স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে। তাই এখন হার্ট ফেইলারেরও চিকিৎসা হচ্ছে যা কয়েক দশক আগেও ভাবা সম্ভব ছিল না। এইজন্যই স্টেম সেল থেরাপিকে বলা হয় সাইন্স ফিকশনের রিয়েল লাইফ উদাহরণ। 

কোষের পুনর্গঠন ও মেরামত

শরীরে প্রবেশ করার পর স্টেম সেল ক্ষতিগ্রস্ত বা মরে যাওয়া কোষের জায়গায় গিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপন করা শুরু করে। স্টেম সেল মস্তিষ্ক থেকে সিগন্যাল পেয়ে নির্দিষ্ট কোষে রূপান্তরিত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করে।

স্টেম  সেলের উৎস 

স্টেম সেল শরীরের বিভিন্ন টিস্যু থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে, মূলত এমব্রায়ো, প্রাপ্তবয়স্ক টিস্যু, এবং কৃত্রিম উপায়ে তৈরি কোষ থেকে সংগৃহীত হয়।

এমব্রিয়োনিক স্টেম সেল(Embryonic Stem Cells)- ভ্রুণ থেকে কোষ সংগ্রহ

এটি নেওয়া হয়ে একদম তিন থেকে পাঁচ দিন বয়সী প্রথম পর্যায়ের ভ্রূণ থেকে। এ পর্যায়ের ভ্রূণকে ব্লাস্টোসিস্ট বলা হয় যা ১০০ থেকে ১৫০ টি কোষ নিয়ে গঠিত।

ভ্রূণ থেকে কোষ সংগ্রহ করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভ্রুণের কোষ সবচেয়ে বেশি বহুমুখী (pluripotent) হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ভ্রুণ থেকে সংগ্রহ করা কোষ শরীরের যেকোনো ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। এই জন্য জটিল রোগের চিকিৎসা এবং গবেষণায় এখান থেকে কোষ সংগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে। 

কিন্তু, এখানেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে যে, ভ্রূণ থেকে কোষ নেওয়া কতটা নৈতিক? কেননা  ভ্রুণ থেকে কোষ নেওয়া মানে সেই ভ্রুণ অর্থাৎ একটি জীবন নষ্ট করা। 

প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল (Adult Stem Cells)

সাধারণত শরীরের প্রাপ্তবয়স্ক  টিস্যু থেকেও এই কোষ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু খুব অল্প পরিমাণে। প্রাপ্ত বয়স্কদের শরীরের স্টেম সেল ব্যবহৃত হয় :

  • হাড়ের মজ্জা (Bone Marrow): রক্তকোষ উৎপাদনের জন্য।
  • রক্ত (Peripheral Blood): রক্ত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে।
  • চামড়া (Skin): ক্ষত মেরামতের জন্য।
  • ফ্যাট টিস্যু (Adipose Tissue): পুনর্গঠনের জন্য।
  • মস্তিষ্ক (Brain): স্নায়ুর পুনর্গঠন।

প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল ভ্রূণীয় স্টেম সেল থেকে সীমিত ধরনের নির্দিষ্ট কিছু কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। এটি সব ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে না। সাধারণত অঙ্গ পুনর্গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতে ব্যবহৃত হয় ।

রক্তজ স্টেম সেল (Hematopoietic Stem Cells)

এর উৎস হাড়ের মজ্জা, নাভিরজ্জুর রক্ত (Umbilical Cord Blood) এবং প্লাসেন্টা। রক্তজ স্টেম সেল রক্ত এবং রোগ প্রতিরোধ কোষ তৈরি করতে সক্ষম। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট এবং রক্তের রোগের চিকিৎসায় এই স্টেম সেল ব্যবহার হচ্ছে।

নাভিরজ্জুর রক্ত (Umbilical Cord Blood) হলো একজন শিশুর জন্মের সময় যে নাড়ি নাভির সাথে থাকে তার রক্ত। এই নাড়ির মাধ্যমেই মায়ের গর্ভে থাকার সময় শিশু মায়ের শরীর সরাসরি পুষ্টি পেয়ে থাকে। রক্তজ স্টেম সেলের উৎস হিসেবে নাভিরজ্জুর রক্ত তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং কম বিতর্কিত হওয়ায় বর্তমানে আম্বেলিক্যাল কর্ড ব্যবহার করার রীতি শুরু হচ্ছে।

ইন্ডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (iPSCs)

ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলস (iPSCs) হলো জিনগত পুনঃপ্রোগ্রামিং (genetic reprogramming) এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তৈরি স্টেম সেল, যা মানুষের শরীরের বিশেষায়িত কোষ (যেমন- ত্বকের কোষ বা রক্তকোষ) থেকে তৈরি করা হয়। 

জাপানের বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ২০০৬ সালে একটি বড় পদক্ষেপ নেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে পুনঃপ্রোগ্রাম করে ভ্রূণীয় স্টেম সেলের মতো প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলে রূপান্তরিত করা সম্ভব।

এর ফলে ভ্রূণ ধ্বংস ছাড়াই স্টেম সেল গবেষণার পথ খুলে যায়। আবার, এটি এমব্রায়োনিক স্টেম সেলের মতোই ক্ষমতা রাখে। এখানে নৈতিকতার বিতর্ক কম থাকায় গবেষণা ও চিকিৎসায় বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন স্টেম সেল থেরাপি বিতর্কিত ?

স্টেম সেল থেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি বৈপ্লবিক পদ্ধতি হলেও, এটি বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত। এর বিতর্কের মূল কারণগুলো হলো এর নৈতিকতা, নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, এবং গবেষণার সীমাবদ্ধতা।

নৈতিকতার প্রশ্ন 

এমব্রায়োনিক স্টেম সেল পদ্ধতিতে ভ্রুণ ধ্বংস করে স্টেম সেল সংগ্রহ করতে হয়, যা অনেকের কাছে ভ্রূণের হত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এখানে জীবনের শুরু থেকে ভ্রুণকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা উচিত কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এখানে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করে।

স্টেম সেল গবেষনার বিরুদ্ধে আন্দোলন

নিরাপত্তার সমস্যা 

স্টেম সেল থেরাপি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। তাই এর প্রক্রিয়ায় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি হতে পারে, যা টিউমার বা ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিস্থাপিত কোষ শরীরের সাথে সঠিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ইমিউন রিজেকশন ঘটতে পারে।

আবার, কয়েক প্রজাতির প্রাণিদের মধ্যে স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে সফল ক্লোনিং সম্ভব হয়েছে। কিন্তু, এখানে ব্যবসায়িক চিন্তা চলে আসছে যা এই প্রাণীদের জীবনের মূল্যকে তুচ্ছ করে দিচ্ছে। 

এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসছে যে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় যে প্রাণীগুলো বাহক হিসেবে বা পরীক্ষার অসফল ফলাফল হিসেবে জন্ম হচ্ছে, তাদের জন্য কি এটি একপ্রকার অত্যাচারে পরিণত হচ্ছে না? 

এছাড়াও, গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং এর খরচ ও ব্যবহারের সুবিধা নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। কারণ, স্টেম সেল গবেষণা এখনো সম্পূর্ণরূপে উন্নত নয়। নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য বা প্রমাণ নেই। কিছু ক্ষেত্রে, থেরাপি কার্যকর না হয়ে রোগীর অবস্থা আরও খারাপও করতে পারে।

বাংলাদেশে স্টেম সেল থেরাপি 

বাংলাদেশে স্টেম সেল থেরাপি এখনো পুরোপুরি উন্নত হয়নি। তবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কিছু বড় হাসপাতাল এবং বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হাড়ের মজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow Transplant) এবং রক্তজনিত রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল ব্যবহার করছে। 

বাংলাদেশে নাভিরজ্জুর রক্ত সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নাভিরজ্জু থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ সেবা প্রদানও করছে। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশে স্টেম সেল চিকিৎসা ও গবেষণা হচ্ছে

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল স্টেম সেল থেরাপির সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে তা কতটুকু নৈতিকভাবে ব্যবহৃত হবে? নাকি ছোটবেলায় মুভিতে প্রানী এবং মানুষের উপর ক্লোনিং এর অপব্যবহার দেখার মত দৃশ্য দেখতে হতে পারে? এই ভাবনার সাথে এটাও একটা বিস্ময়কর বিষয় যে, আমাদের মানবদেহ নিজেই কত কিছু করতে সক্ষম! এই যেন শুধু এক মানব শরীর নয়, মহাকাশের মতো এক রহস্যময় জগত, যা সম্পর্কে যতই জানি ততই অবাক হওয়া যায়।  

রেফারেন্সঃ

Related posts

২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের যত পাঁয়তারা ও প্রভাব

পারমানবিক বোমা – মারণাস্ত্রের অতীত ও বর্তমান

হিজবুত তাহরীর কী এবং কেন তারা বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ

Leave a Comment

Table of Contents

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More