Image default
ঘটমান বর্তমান

মহাকাশ থেকে ভোট: কল্পনা নাকি বাস্তবতা?

“কল্পনা করুন, পৃথিবী থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ভেসে বেড়াচ্ছেন। চারপাশে শুধু একাকিত্ব, নিস্তব্ধতা, শূন্যতা। কিন্তু এমন এক জায়গা থেকেও আপনাকে ভোট দিতে হবে? কী আশ্চর্য!”

একটু থামুন, মনে হচ্ছে যেন সাই-ফাই সিনেমার কোনো দৃশ্য, তাই না? অথচ, এটি একদম বাস্তব। আজকের নভোচারীরা মহাকাশ স্টেশনে বসে গণতন্ত্রের চর্চা করে চলেছেন। মহাকাশে থেকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি আধুনিক সমাজের এক অনন্য উদাহরণ।

কিন্তু, মহাকাশে বসে ভোট দেওয়া কি সম্ভব? হ্যাঁ, আইন, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয় এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তবে এখানেই শেষ নয়। মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়া, ভবিষ্যতের সেই পৃথিবীর দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে সীমানা কেবলমাত্র একটি ধারণা।

মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার ইতিহাস

ভোটিং ফ্রম স্পেস এক্ট বিল পাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ১৯৮৬ সালে The Uniformed and Overseas Citizens Absentee Voting Act পাশ করে। এই এক্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে বসবাসরত আমেরিকানরা যেন আমেরিকান নির্বাচনে ভোট দিতে পারে। এই আইনের পর ১৯৯৭ সালে টেক্সাস রাজ্যে পাস হয় “Voting from Space Act”। এর মূল লক্ষ্য ছিল, মহাকাশ মিশনে থাকা নাগরিকদের নির্বাচনী অধিকার নিশ্চিত করা। কারণ, মহাকাশচারীরা প্রায় ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) অবস্থান করেন। তাদের মহাকাশে থাকার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। গণতন্ত্রের প্রতি এই শ্রদ্ধা থেকেই ১৯৯৭ সালে টেক্সাসে এই আইন পাস হয়। 

একই বছরে টেক্সাস রাজ্যের আইনসভা Rule 81.35 পাস করে। এই আইন অনুযায়ী, 

“যে কেউ টেক্সাস নির্বাচন কোড, অধ্যায় ১০১-এর অধীনে ভোটার হয়ে থাকলে এবং প্রাক-নির্বাচনী সময় ও নির্বাচনের দিনে মহাকাশে থাকলে, সে ভোট দিতে পারবে।”

তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে যে টেক্সাসেই কেন এই আইন পাশ হল? কারণ হলো নাসার জনসন স্পেস সেন্টার (JSC) হিউস্টনে অবস্থিত, আর হিউস্টন টেক্সাস রাজ্যের অংশ। এই হিউস্টনে বেশিরভাগ মহাকাশচারী বসবাস করেন এবং তারা সেখানকার ভোটার।

মহাকাশচারীরা কি সবাই ভোট দেওয়ার যোগ্য?

সব নাসা মহাকাশচারী মহাকাশ থেকে ভোট দিতে পারেন। তবে তাদের কিছু নির্দিষ্ট নির্বাচন বিধি মেনে চলতে হয়। প্রথমত, একজন মহাকাশচারীকে পৃথিবীর কক্ষপথ ত্যাগ করার আগে সে কোথাকার নিবন্ধিত ভোটার তা জানাতে হবে। “তাহলে যদি একজন মহাকাশচারী টেক্সাসে নিবন্ধিত ভোটার হন, তাহলে তারা বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারেন ভোট দেয়ার জন্য।”

ন্যাশনাল কনফারেন্স অফ স্টেট লেজিসলেচার্স (এনসিএসএল)- এর নির্বাচন এবং পুনঃবিন্যাস বিভাগের পরিচালক ওয়েন্ডি আন্ডারহিল বলেন, 

“একমাত্র রাজ্য যা স্পষ্টভাবে মহাকাশচারীদের ব্যালট ইলেকট্রনিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়, তা হল টেক্সাস।”  

ন্যাশনাল কনফারেন্স অফ স্টেট লেজিসলেচার্স (এনসিএসএল) আমেরিকার রাজ্য, অঞ্চল এবং কমনওয়েলথগুলোর আইনসভাগুলিকে প্রতিনিধিত্ব করে। 

অনুপস্থিত ভোটিং সিস্টেম

যদি মহাকাশচারী টেক্সাসের বাইরে অন্য কোনও রাজ্যের নিবন্ধিত ভোটার হন, তবে কিছু অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। আন্ডারহিল ব্যাখ্যা করেন যে, যেসব মহাকাশচারী টেক্সাস ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে নিবন্ধিত ভোটার তারা Uniformed and Overseas Citizens Absentee Voting Act (UOCAVA) এর আওতায় সেনা/বিদেশী ভোটার হিসেবে গণ্য হবেন। এই আইনে তাদেরকে নিজ রাজ্যের অনুপস্থিত ভোটিং সিস্টেম ব্যবহার করে অথবা FPCA (Federal Postcard Application) পূরণ করে ভোট দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, 

“যদিও ২৮টি রাজ্য ভোটিংয়ের জন্য কোনো কারণ ছাড়াই অনুপস্থিত হিসেবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেয়। এমনকি যেসব রাজ্য অনুপস্থিতির কারণ চায়, সেখানে ‘কক্ষপথে থাকা’ অবশ্যই একটি বৈধ কারণ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিত ব্যালট চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। অনুপস্থিত ব্যালট গ্রহণ করার পর সেটা পূরণ করে, পৃথিবী ছাড়ার আগে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি তারা এটা করতে না পারেন, এবং তারা টেক্সাসের বাইরে থাকেন, তাহলে তারা তাদের রাজ্যের ইলেকট্রনিক ব্যালট-ফেরত ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারবেন। ৩১টি রাজ্য ব্যালট ফেরত দেওয়ার জন্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতি অনুমোদন করে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যাক্স, ইমেইল বা ঐ রাজ্যের নির্দিষ্ট পোর্টাল।”

এই বিধিগুলি নিশ্চিত করে, মহাকাশচারীরা পৃথিবীর বাইরে থাকলেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাবেন না। মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া আসলে সাধারণ অনুপস্থিতি ভোট দেওয়ার মতোই। এইক্ষেত্রে মজার ব্যাপার হল, মহাকাশচারীরা ঠিকানা হিসেবে লিখেন “লো-আর্থ অরবিট”

মহাকাশ থেকে ভোট দেয়ার প্রক্রিয়া

মহাকাশ থেকে ভোটদান

মহাকাশে ভোট দেওয়ার জন্য মহাকাশচারীদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। অনুপস্থিতি ভোট এর মতোই, মহাকাশে থাকা মহাকাশচারীদের ভোট নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জমা দিতে হয়। টেক্সাস নির্বাচন কোড অনুযায়ী মহাকাশচারীদের ভোট দেওয়ার জন্য আবেদন করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে।

ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া

মহাকাশ থেকে ভোট দেয়ার প্রক্রিয়া

মহাকাশচারীদের মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় Federal Post Card Application (FPCA) ফর্ম পূরণের মাধ্যমে। অনুপস্থিতি ভোট দেয়ার জন্য মিলিটারি সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা যখন বিদেশে অবস্থান করেন, তখন তাদেরও এই ফর্মটি পূরণ করতে হয়।

মহাকাশচারীদের ভোট জমা নেয়ার জন্য কাউন্টি ক্লার্ক অফিসের প্রতিনিধিরা নাসার সাথে কাজ করেন। তারা মহাকাশচারীদের আবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং ফর্মটি সময়মতো জমা দেয়া হচ্ছে কিনা, সেদিকে নজর রাখেন।

কাউন্টি ক্লার্কের প্রতিনিধিরা মহাকাশচারীদের সাথে নাসার প্রতিনিধিদের সমন্বয় করে ভোটের প্রক্রিয়া চালিয়ে যান। তারা মহাকাশ এবং নির্বাচনী অফিসের মধ্যে লিয়াজোঁ হিসেবে কাজ করেন এবং মহাকাশচারীরা যেন তাদের ভোট সময়মতো জমা দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করেন।

এনক্রিপ্টেড ইমেলের ব্যবহার- ব্যালট পূরণ
এনক্রিপ্টেড ইমেলের ব্যবহার
ক) ব্যালট ডাউনলোড

মহাকাশচারীরা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের (ISS) সুরক্ষিত কম্পিউটার ব্যবহার করে তাদের ইমেল থেকে এনক্রিপ্টেড ব্যালট ডাউনলোড করেন। এই কম্পিউটারগুলোতে হ্যাকিং বা যেকোনো সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি নেই। স্পেস স্টেশনের প্রতিটি কম্পিউটার NASA-র বিশেষ সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম দ্বারা সুরক্ষিত।

খ) ব্যালট পূরণ করা

মহাকাশচারীরা ব্যালট ফর্মটি পূরণ করেন। এই ফর্মে তারা তাদের নির্বাচনী পছন্দ (প্রার্থীর নাম বা পছন্দের অপশন) উল্লেখ করেন। ব্যালটটি পূরণ করার পর, এটিকে আবারও এনক্রিপ্ট করা হয়। এই দ্বিতীয় এনক্রিপশন ব্যালটের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং কোনোভাবেই ডেটা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ- ব্যালট জমা দেওয়া
গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ
ক) ব্যালট প্রেরণ

এনক্রিপ্ট করা ব্যালটটি মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবীতে NASA-র মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে পাঠানো হয়। এই ক্ষেত্রে সাধারণত সুরক্ষিত ডেটা ট্রান্সমিশন প্রোটোকল ব্যবহার হয়।

খ) মিশন কন্ট্রোল সেন্টার

NASA-র মিশন কন্ট্রোল সেন্টার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তারা ব্যালটটিকে সঠিক নির্বাচনী অফিসে পাঠানোর বাবস্থা করে।

গ) নির্বাচনী অফিসে ব্যালট জমা

অবশেষে, নির্বাচনী অফিস ব্যালটটি গ্রহণ করে। এরপর এটি নির্বাচনের সাধারণ ব্যালট প্রক্রিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর জমা হওয়ার পরে একে অন্যান্য সাধারণ ব্যালট হিসেবে নির্বাচনী কর্মকর্তারা গণনা করেন।

মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার উদাহরণ

মহাকাশচারী ডেভিড উলফ

মহাকাশ থেকে প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় NASA-এর মহাকাশচারী ডেভিড উলফ (David Wolf)। তিনি ১৯৯৭ সালে এমআইআর স্পেস স্টেশনে (MIR Space Station) অবস্থান করার সময় টেক্সাসের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ভোট প্রদান করেন।

মহাকাশচারী শেন কিমব্রো

ডেভিড উলফের পর আরও অনেক মহাকাশচারী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শেন কিমব্রো। শেন ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। কিমব্রো বলেছিলেন, 

“মহাকাশে থেকেও ভোট দিতে পারা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।”

মহাকাশচারী কেট রুবিনস

২০২০ সালের নির্বাচনে কেট রুবিনস মহাকাশ থেকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি ISS-এ অবস্থান করে বলেন, 

“যেখানে আমাদের কাজ পৃথিবী থেকে বহু দূরে, সেখান থেকেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারা সত্যিই গর্বের বিষয়।”

মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়া যেন গণতন্ত্রের এক অনন্য উদাহরণ। পৃথিবী থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও মহাকাশচারীরা যে তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কোথায় আছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার ভোটের মূল্য।

আপনিও কি আপনার নাগরিক অধিকার, বিশেষ করে ভোট দেওয়ার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন? গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করুন। মনে রাখুন, আপনার একটি ভোটই আপনার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।

সূত্র 

Related posts

‘কিংস পার্টি’ বাহাস: শুরুতে আলোচনায়, শেষে ধরাশায়ী

লস এঞ্জেলেস – আগুনে জ্বলন্ত স্বপ্নপুরী

আবু সালেহ পিয়ার

লন্ডনের ট্রাফিক ব্যাবস্থা থেকে বাংলাদেশ কি শিখতে পারবে?

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More