ভাবতে পারেন, এমন একজন মহাপুরুষ ছিলেন, যিনি জন্মের পর থেকেই রোজার মাসে দিনের বেলা মায়ের দুধও পান করতেন না! ছোট্ট বয়সেই যার ভেতরে ধরা দিয়েছিল আধ্যাত্মিকতার আলোকরশ্মি। সেই শিশুই বড় হয়ে, হয়ে ওঠেন ‘গাউসুল আযম’—মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক আশ্রয়দাতা হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)।
ইসলামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে, যে কয়েকজন মহাপুরুষ তাঁদের জীবন, জ্ঞান ও অলৌকিক আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে আল্লাহপ্রেমিকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)। তাঁর দরগাহ আজও ইরাকের বাগদাদ শহরে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই দরগাহকে ঘিরে আছে ইতিহাস, তাসাউফ, ভক্তি, অলৌকিক কাহিনি আর রহমতের অসংখ্য বর্ণনা, যা ভক্তদের হৃদয়ে এক অনন্য আবেগ সৃষ্টি করে।
আবদুল কাদির জিলানীর জন্ম
১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জিলান প্রদেশে জন্ম নেন, মহান আধ্যাত্মিক সাধক আবদুল কাদির জিলানী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মাঝে বিশেষত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। এমনকি লোকমুখে শোনা যায়, তিনি জন্মের পর থেকেই রোজার মাসে দিনের বেলা দুধ পান করতেন না। আর এই ঘটনাই হয়তো ছিল ভবিষ্যতের এক আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত।
কৈশোরকাল পেরিয়েই জিলানি বাগদাদের পথে পা বাড়ান। সে সময় বাগদাদ ছিল ইসলামী জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে তিনি ফিকহ, হাদিস, তাফসির, দর্শন ও তাসাউফের শিক্ষা লাভ করেন। কালের প্রবাহে তিনি হয়ে ওঠেন এমন এক মহাপুরুষ, যাঁকে বলা হয় “গাউসুল আযম”; অর্থাৎ সমগ্র উম্মাহর আধ্যাত্মিক সাহায্যকারী।

হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর দরগাহ। ধীরে ধীরে এটি পরিণত হয় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে, যার স্থাপত্যশৈলীও বেশ মুগ্ধকর।
আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর দরগাহ
অটোমান সাম্রাজ্যের সময় এই দরগাহটি পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করাও হয়েছিল। যাতে এর স্থাপত্যে ইসলামী শিল্পকলা ও সুফি ঐতিহ্যের সমন্বয় ফুটে ওঠে। পরবর্তীকালে এটি শুধু ইরাক নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের ভক্তদের জন্য আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সোনালি গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার, দৃষ্টিনন্দন আরবী ক্যালিগ্রাফি, আর ভেতরে আলো-ছায়ার খেলা যেন দর্শনার্থীর হৃদয়কে আলোড়িত করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। দরগাহর ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে কোরআনের আয়াত খোদাই করা দেয়াল ও ঝলমলে ঝাড়বাতি। আর এই মাজারের চারপাশে ভক্তদের দোয়ার শব্দে মনে হয়, এ যেন দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশান্তির জগৎ।

এই দরগাহ প্রতিদিন ভরে থাকে হাজারো মানুষের আগমনে। কেউ নামাজ আদায় করেন, কেউ কোরআন তিলাওয়াত করেন, আবার কেউ নীরবে বসে নিজের অন্তরের কষ্ট আল্লাহর কাছে তুলে ধরেন। বিশেষত বৃহস্পতিবার রাতে এবং শুক্রবারে এখানে ভক্তদের ঢল নামে।
এছাড়াও, রজব, শাবান ও মহরমের মতো বিশেষ ইসলামী মাসে এই দরগাহে মাহফিল, মিলাদ ও কোরআন খতম এর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এ সময়ে ইরাকের বাইরে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, তুরস্ক ও আফ্রিকা থেকেও ভক্তরা এসে জড়ো হন।
দরগাহকে ঘিরে অলৌকিক কাহিনি
শুধু তাই নয়, হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর দরগাহকে ঘিরে বহু অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত আছে। যা ভক্তদের হৃদয়ে ভক্তি ও বিশ্বাস আরও গভীর করে।
বৃষ্টির দোয়া
এমনই একটি বিখ্যাত ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর জীবদ্দশার সময়। সেই ঘটনায় বলা হয়, একবার বাগদাদে প্রবল খরা দেখা দেয়। মানুষ পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছিল। তখন আবদুল কাদির জিলানীকে অনুরোধ করা হলে তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করেন, আর অল্প সময়ের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি নামা শুরু হয়। এই অলৌকিক ঘটনার কারণে, মানুষ তাঁকে “গাউসুল আযম” উপাধিতে ভূষিত করে।
আবদুল কাদির জিলানী ও ডাকাত
তার বাল্যকালের একটি ঘটনা অনেক বিখ্যাত, বাল্যকাল থেকে তার পড়ার অনেক ইচ্ছা তাই তার মাকে বলল আমি পড়াশোনা করার জন্য বাগদাদ শহর যাবো। তার মা তাকে তৈরি করে দিল এবং চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বলল: আমি তোমাকে আল্লাহর রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছি । জানিনা আর কখনো কোন দিন দেখা হবে কিনা এবং আমি তোমাকে একটা উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি যতই কঠিন পরিস্থিতিতে পরনা কেন তবুও কাওকে মিথ্যা কথা বলবে না। আব্দুল কাদ্বির জিলানী তার মা এর কাছে ওয়াদা করলেন যে, সে কোন দিন মিথ্যে কথা বলবে না। তারপর একটি কাফেলার সঙ্গে রওনা হয়ে গেলন বাগদাদের পথে। যাওয়ার পথে তার মা সেই চল্লিশটা স্বর্ণমুদ্রা তার জামার ভিতরে সেলাই করে দিয়েছিলেন, যাতে পড়ে না যায়।
এই কাফেলার দল একটি বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ এগিয়ে এলো একদল ডাকাত, তারা পুরো কাফেলাকে ঘিরে ধরল এবং সকল যাত্রীর কাছ থেকে সমস্ত টাকা-পয়সা আর দামি দামি জিনিস গুলো কেড়ে নিতে শুরু করল।

একটা ডাকাত এগিয়ে এলো জিলানী কাছে আর চোখ কটমট করে বলল: ওহে খোকা! তোমার কাছে কিছু আছে নাকি? তিনি বললেন : হ্যাঁ ,আমার কাছে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা আছে। ওই ডাকাত তাকে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল এবং এবং তাকে ডাকাতের সর্দারের কাছে নিয়ে গেলো। সরদার জানতে চাইলো : তোমার কাছে কিছু আছে নাকি ? – হ্যাঁ ,আমার কাছে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা আছে। -‘কোথায় ?’ –এই দেখুন , আমার জামার ভিতরে লুকানো রয়েছে।‘ আব্দুল কাদ্বির জিলানীর এ কথা শুনে ডাকাতের দল হতভম্ব হয়ে উঠল।
তাকে বলল যে তুমি কি জানো আমরা কাফেলার সমস্ত যাত্রীর কাছ থেকে টাকা পয়সা আর মালপত্র লুটপাট করে নিচ্ছি। তোমার পয়সা তো লুকানো ছিল, আমরা তো দেখতে পেতাম না । তবুও তুমি মিথ্যা কথা না বলে কথাটা ফাঁস করলে কেন? তখন আব্দুল কাদ্বির জিলানী বলল: আমি আমার মাকে কথা দিয়ে এসেছি যে, যতই বিপদে পড়ি না কেন জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলবনা। এ কথা শুনে ডাকাতরা কেঁপে উঠলো কাঁদতে লাগলো এবং বলল ‘এক বাচ্চা তার মায়ের ওয়াদার প্রতি এত মনোযোগ রেখেছে যে, টাকা পয়সা লুটপাটের ব্যাপারেও তাঁর পরোয়া নেই। কিন্তু, আফসোস ! আমরা আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছিলাম -হে আল্লাহ তুমি তো আমাদের প্রভু । আমরা তোমারই কথা মত চলব । হায় আমাদের সর্বনাস বছরের পর বছর ধরে এ ওয়াদা আমরা ভুলে বসে রয়েছি । আর প্রভুর অবাধ্যতা করে চলেছি।‘ এরপর ডাকাতরা আল্লাহর দরবারে তৈওবা করল এবং কাফেলার সমস্ত জিনিসপত্র ফিরিয়ে দিল।
হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর শিক্ষা
হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর শিক্ষা মূলত আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা, নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ, আর মানুষের সেবার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর শিক্ষা থেকেই পরবর্তীতে “কাদেরিয়া তরিকা” নামে, সুফিবাদের অন্যতম বড় ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তরিকা আজও মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফ্রিকার বহু দেশে কার্যকরভাবে প্রচলিত।
দরগাহে আসা দর্শনার্থীরা এখানকার পরিবেশে শুধু আধ্যাত্মিক শান্তিই পান না, বরং ইসলামের প্রকৃত মর্মকথা- ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানবসেবা পুনরায় উপলব্ধি করার সুযোগ পান। এই জায়গার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, দরগাহে প্রবেশ করলে ভক্তদের চোখে অশ্রু দেখতে পাবেন। কেউ নীরবে দোয়া করেন, কেউ দুঃখ-দুর্দশার ভার লাঘব করে মনে শান্তি পান। দরগাহে বসলে মনে হবে যেন, সময় থেমে গেছে। চারপাশে শুধু প্রশান্তি আর রহমতের আলো।
বিদেশি ভ্রমণকারীরাও দরগাহ দেখে বিস্মিত হন। তাদের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মেলবন্ধন। এই দরগাহ শুধু আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। এক সময় বহু মুসলিম শাসক এ দরগাহকে কেন্দ্র করে সমাজে ঐক্য ও শান্তির বার্তা প্রচার করেছেন। এমনকি যুদ্ধ ও অস্থিরতার সময়ও দরগাহ মানুষকে আশ্রয় ও সাহস জুগিয়েছে।
হুমকির মুখে দরগাহ
আজকের যুগেও হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর দরগাহ ভক্তদের জন্য পবিত্রতম স্থানগুলোর একটি। যদিও ইরাকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সন্ত্রাসী হামলার কারণে বহুবার দরগাহ হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের জুন মাসে, ইরাকের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সময় দরগাহে একটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দরগাহর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু নিরপরাধ মানুষ হতাহত হয়।
এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল শিয়া-সুন্নি বিভাজন উসকে দেওয়া, কারণ হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) সুন্নি হলেও, তাঁর দরগাহে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে জিয়ারত করতে আসে। পরবর্তীতে ইরাকি সরকার ও স্থানীয় সম্প্রদায় দরগাহ পুনর্নির্মাণ করে এবং এটিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভক্তদের হৃদয়ে দরগাহর প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা এতটাই গভীর যে, কোনো ধরনের সন্ত্রাসই এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের মাহাত্ম্য মুছে ফেলতে পারে না

প্রতি বছর লাখো ভক্ত এই দরগাহে এসে জিয়ারত করেন। এখানে এসে মানুষ শান্তি খুঁজে পায়, ভ্রাতৃত্বের বার্তা পায় এবং আল্লাহর প্রেমে নিজেদের নতুনভাবে যুক্ত করে। আর তাই আজও যখন কোনো মানুষ দরগাহে এসে দোয়া করে, তখন সে কেবল একটি স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ায় না; বরং দাঁড়ায় সেই মহাপুরুষের দরবারে, যিনি তাঁর সমগ্র জীবন আল্লাহর ইবাদত ও মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর দরগাহ চিরকালীন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও রহমতের প্রতীক হয়ে থাকুক।

