লেবানন আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। পৃথিবীর প্রাচীনতম সংস্কৃতির বসবাস দেশটিতে। এদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠিও পৃথিবীর প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। মজার বিষয় হলো, এই জনগোষ্ঠীর ধারা এতটাই প্রাচীন যে, তাদের বিস্তার এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে। ছোট দেশ হলেও, সুন্দর এই ভূখণ্ডটি বর্তমান আরব বিশ্বের ভূ-রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই হয়তো ইসরায়েলি আগ্রাসনের কবলে পড়ে দেশটির স্বার্বভৌমত্ব এখন বিপদের মুখে পতিত হয়েছে। আজকের গল্প এই প্রাচীন সংস্কৃতির দেশকে নিয়ে এগিয়ে যাক।
রাজধানী | বৈরুত |
সরকারি ভাষা | আরবি |
জনসংখ্যা | ৫২ লক্ষ ৯৬ হাজার ৮১৪ |
মোট আয়তন | ১০, ৪৫২ বর্গ কি.মি |
মুদ্রা | লেবানিজ পাউন্ড |
সময় অঞ্চল | UTC +২
UTC +৩ (গ্রীষ্মকালীন) |
ভূমধ্যসাগরের কোলে ছোট্ট একটি অঞ্চল
লেবানন ভূমধ্যসাগরের আরব পেনিনসুলা অঞ্চলে অবস্থিত একটি ছোট্ট দেশ। পেনিন্স্যুলা অর্থ উপদ্বীপ বা চারিদিকে জল দ্বারা বেষ্টিত এক টুকরো জমি। অর্থাৎ, লেবানন একটি ভূমধ্যসাগরীয় দেশ, যার উত্তর পূর্বে রয়েছে সিরিয়া, দক্ষিণে ফিলিস্তিন, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর এবং সাইপ্রাস।
মধ্যপ্রাচ্যের লেভেন্ট অঞ্চলের অংশ লেবানন। লেভেন্ট শব্দটি ব্যবহৃত হয় আধুনিক ঘটনা, জনগণ, রাজ্য বা একই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোকে বোঝাতে। যেমন সাইপ্রাস, মিশর, ইরাক, ইসরাইল, জর্ডান, লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং তুরস্ককে লেভান্ট হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ এই অঞ্চলগুলোর আবহাওয়া কিংবা সংস্কৃতিতে বেশ মিল রয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থান হওয়ায় লেবাবনের আবহাওয়ায় রয়েছে মৃদু উপকূলীয় জলবায়ুর আভাস। এছাড়াও, লেবাননের অভ্যন্তরীণ এলাকায় দেশটির অন্যতম দুটি পর্বতমালা মাউন্ট লেবানন এবং এ্যন্টি লেবানন পর্বতমালার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। এই পাহাড়গুলির কারণে দেশটিতে বৈচিত্রময় জলবায়ু তৈরী হয়।
ম্যাপ
লেবাননের আয়তন ও জনসংখ্যা
লেবাননের রাষ্ট্রীয় নাম লেবানিজ প্রজাতন্ত্র। দেশটির রাজধানী হলো বৈরুত। এটি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ২য় ক্ষুদ্রতম দেশ। এর আয়তন ১০, ৪৫২ বর্গকিলোমিটার। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫২ লক্ষ ৯৬ হাজার ৮১৪। এই জনসংখ্যার বেশিরভাগই হাজার হাজার বছর ধরে লেবাননে বসবাস করছে। আর তাই এদেশে অন্যান্য জনগোষ্ঠি সংখ্যা কম। তবে, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজারা আর্মেনিয়ায় গণহত্যা চালালে কিছু সংখ্যক আর্মেনিয়ান লেবাননে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে অনেক ফিলিস্তিনিও লেবাননে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
দেশের নাম হিসেবে লেবানন শব্দটি এসেছে সম্ভবত মাউন্ট লেবানন থেকে। ফিনিসিয়ান মূল ‘lbn’ এর অর্থ “সাদা”। মাউন্ট লেবাননের বরফাবৃত শিখরের কারণে হয়তো এই নামকরণটি করা হয়েছে। এছাড়াও, পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার এবলা লাইব্রেরীতে ব্রোঞ্জ যুগের বিভিন্ন গ্রন্থে এবং গিলগামেশের মহাকাব্যের তিনটি পত্রে লেবানন নামটির উল্লেখ পাওয়া গেছে। হিব্রু বাইবেলেও লেবানন নামটি প্রায় ৭০ বার।
লেবাননের ইতিহাস
লেবাননে মানব সভ্যতার ইতিহাস যিশু খ্রীষ্টের জন্মেরও প্রায় ৫০০০ বছরের পুরানো। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ৫৩৯ এই অঞ্চলটি ফিনিসিয়ার অংশ ছিলো। ৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেবানন রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ৭ম শতকের পর লেবাননে খিলাফাত প্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় দেশটিতে রশিদুন, উমাইয়াদ এবং আব্বাসীয় বংশের খলিফারা তাঁদের শাসনকার্য চালায়।
মধ্যযুগীয় লেবানন
১১ শতকে এই অঞ্চলে ক্রুসেডার রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১শ ও ১২শ শতকে ক্রুসেডাররা পবিত্র ভূমি জেরুজালেম পুনর্দখল করার জন্য যাত্রা শুরু করে। এই সময়ে ক্রুসেডাররা লেবাননের বিভিন্ন উপকূলীয় শহর ও দুর্গ দখল করে নেয়। এর মধ্যে ত্রিপোলি এবং টায়ার অন্যতম। ক্রুসেডারদের সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন কিংবদন্তি নেতা সালাউদ্দিন আইয়ুবী। তিনি ১১৮৭ সালে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন। পরবর্তীতে আয়ুবিদ, মামলুক সবশেষ আটোমান শাসকরা লেবননের শাসন ক্ষমতা দখল করেন।
অটোমান শাসন ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লেবানন
লেবানন দীর্ঘদিন অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। তবে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ম্যান্ডেট সিস্টেমের মাধ্যমে লেবানন ফ্রান্সের অধীনে আসে। ১৯২০ সালে ফ্রান্স “গ্রেটার লেবানন” নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা আধুনিক লেবাননের ভিত্তি।
স্বাধীনতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৪৩ সালে লেবানন ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর লেবানন একটি বহুজাতিক, বহু-ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। “ন্যাশনাল প্যাক্ট” নামের একটি চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে শাসনব্যবস্থায় খ্রিস্টান, শিয়া এবং সুন্নি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সমতা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
লেবাননের গৃহযুদ্ধ (১৯৭৫-১৯৯০)
১৯৭৫ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা ১৫ বছর ধরে চলতে থাকে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক মতবিরোধের ফলে এই গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। বিভিন্ন স্থানীয় দল এবং বিদেশি শক্তি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে “তাইফ চুক্তি” স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়।
সিরিয়ান ও ইসরায়েলি প্রভাবে লেবানন
গৃহযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে সিরিয়া এবং ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করে। ২০০৫ সালে লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডের পর সিরিয়ার সেনাবাহিনী লেবানন থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
লেবাননে হিজবুল্লাহ ও আধুনিক রাজনৈতিক সংকট
২০০৬ সালে ইসরায়েলের সাথে হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ ব্যাপক ধ্বংস সাধন করে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক মন্দা, এবং ২০১৯-২০ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভ দেশের অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি করে। ২০২০ সালের বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণ দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ করে দেয়।
লেবাননের রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থাঃ সকল ধর্মের সমান সুযোগ
লেবাননে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। মজার বিষয় হলো, লেবাননের সংবিধানে প্রতিতি ধর্মের মানুষের জন্যই সংরক্ষিত পদ রয়েছে। ১৯৪৩ সালে একটি জাতীয় চুক্তির মাধ্যমে এ আইন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো।
এই আইন আনুসারে রাষ্ট্রপতি হবেন একজন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান ,প্রধানমন্ত্রী হবে একজন সুন্নী মুসলিম, সংসদের স্পিকার হবে একজন শিয়া মুসলিম এবং ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার হবেন একজন ইস্টার্ন অর্থোডক্স।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মীয় সংঘাত প্রতিরোধ এবং ১৮টি স্বীকৃত ধর্মীয় গোষ্ঠীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। লেবাননের সংবিধানের ৯৫ নম্বর ধারায় ধর্মীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে রাজনৈতিক কাঠামোকে বিলোপ করার বিধান রয়েছে, তবে এটি এখনও সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা হয়নি।
লেবাননের পর্যটনঃ কোথায় কোথায় ঘুরবে
বাইব্লোস শহর
বাইব্লোস হলো লেবাননের প্রাচীন শহর। শুধু লেবাননের নয়, এটি পুরো পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন শহর। এই শহরেই প্রাচীন ফিনিশিয় সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বাইব্লোস শহরে ৭,০০০ বছর আগের ভূমধ্যসাগরের তীরে বসবাসকারী নিওলিথিক এবং চ্যালকোলিথিক মৎস্য শিকারী সম্প্রদায়ের মানুষের সন্ধান পেয়ছে। এমনকি তাদের তৈরি চুনাপাথরের মেঝে, আদিম অস্ত্র এবং পাত্রসহ কিছু প্রাগৈতিহাসিক কুঁড়েঘরের অবশিষ্টাংশও আবিষ্কার করেছেন।
ফিনিশিয়ানরা ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল এবং তারা এই বাইব্লেসেই প্রথম বর্ণমালার উদ্ভাবন ঘটায়। পরবর্তীকালে এই বর্ণমালাই গ্রীক ও লাতিন বর্ণমালা তথা মর্ডান আ্যলফাবেট এর সূদূর প্রসারী যাত্রার সূচনা করে।
জেইটা গ্রোটো
লেবাননে কিছু লোভনীয় পর্যটনের মধ্যে প্রথমেই আসবে জেইটা গ্রোটোর নাম। জেইটা গ্রোটো একটি প্রাচীন গুহা, যা লেবাননের রাজধানী বৈরুত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরবর্তী আল-কালবের উপত্যকায় অবস্থিত। পরস্পর আলাদা কিন্তু আন্তঃসংযুক্ত এ গুহা প্রায় ৯ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে আছে। এই গুহাটি সম্পূর্ণ চূনাপাথর দিয়ে তৈরি। এই গুহার বড় বড় চুনাপাথরের স্তম্ভের দৃষ্টিনন্দন রূপ যে কারো চোখকে ধাধিয়ে দিবে। অবাক করা বিষয় হলো, এই গুহার ভেতরে রয়েছে আস্ত একটি নদী। পর্যটকরা এই গুহা দেখতে এসে নদী ভ্রমণ করারও সুযোগ পাবেন। নতুন নির্বাচিত প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি হলো এই জেইটা গ্রোটো।
ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব বৈরুত
লেবাননের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই ঘুরে দেখার মতো একটি স্থান হলো ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব বৈরুত জাদুঘর। এই জাদুঘরে লেবাননের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে ফিনিশীয়, গ্রিক, বাইজেন্টাইন এবং আরব শাসনামলের বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও এখানে রয়েছে ফিনিশীয় গহনা, হস্তশিল্প এবং শিলালিপি। জাদুঘরের ভূগর্ভস্থ কক্ষে একটি সমাধিসৌধ এবং কিছু দৃষ্টিনন্দন দেয়ালচিত্র রয়েছে। জাদুঘরে প্রবেশের পর লেবাননের ইতিহাস নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়, যা লেবাননের ইতিহাস সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা প্রদান করে।
কাদিশা উপত্যকা
লেবাননের উত্তর মুহাফাজা রাজ্যের বিচার ও জিগার্টার শহরের মাঝমাঝি রয়েছে অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত কাদিশা উপত্যকা। এই উপত্যকার পাশ দিয়ে আবার প্রবাহিত হয় কাদিশা নদী। কাদিশা উপত্যকায় যাওয়ার পথে চোখে পড়ে বিচারের চমৎকার পাহাড়ি গ্রাম, যা লেবাননের সেরা দৃশ্যগুলোর একটি হতে পারে। পাহাড়ি টিলাগুলোতে ওঠার সাথে সাথে কাদিশা উপত্যকার সৌন্দর্য আরও বেশি করে উজ্জ্বল হতে থাকে। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীন ফিনিশীয় নগরী টায়ার
দক্ষিণ লেবাননের সমুদ্রের তীরবর্তী শহর টায়ার একটি প্রাচীন ফিনিশীয় নগরী। এটি লেবাননের চতুর্থ বৃহত্তম শহর। টায়ার শহরটি বিভিন্ন কিংবদন্তিতে ভরপুর। বলা হয়ে থাকে, বেগুনি রঙের উৎপত্তি এই শহরেই হয়েছিল। আর এই কারণেই হয়তো টায়ার বন্দরের কাছে সরু রাস্তার পাশে অবস্থিত বাড়িগুলোর রঙ উজ্জ্বল বেগুনি।
টায়ারের পুরনো এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যার মধ্যে মিনা অন্যতম। ফিনিশীয়, রোমান এবং ক্রুসেডের সময়কার ধ্বংসাবশেষ এবং সুশোভিত বালুকাবেলা টায়ার নগরীকে করেছে লেবাননের অন্যতম সেরা পর্যটন আকর্ষণ। ২০১৬ সালে টায়ারকে লেবাননের ‘পর্যটন রাজধানী’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
সিডর শহর
দক্ষিণ লেবাননের ভূমধ্যসাগরের পাড়ে অবস্থিত সিডর শহরটি লেবাননের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। সিডরের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। সাইট্রাস ও কলাগাছে ঘেরা সিডর লেবাননের একটি ব্যস্ততম বন্দরনগরী। সিডরের প্রধান পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে দ্য সী ক্যাসল, সিডরের পুরনো বাজার এবং মধ্যযুগীয় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
বালবেক শহর
লেবানন-সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত বালবেক শহরটি পৃথিবীর বৃহত্তম রোমান ধ্বংসাবশেষের জন্য বিখ্যাত। এটি বৈরুতের উত্তরে বেকা উপত্যকায় অবস্থিত। দ্বিতীয় শতাব্দীর পূর্বে নির্মিত এই এই শহরে রয়েছে অসংখ্য রোমান মন্দির। এই মন্দিরগুলো ছিল রোমানদের পবিত্র তীর্থস্থান। এখানকার রোমানরা তিন দেবতা—জুপিটার, ভেনাস, এবং মার্কারি—এর পূজা করতেন।
এছাড়া জিবরান জাদুঘর, সিডারস অব গড, সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অব বৈরুত, আল সউফ সিডার ন্যাচার রিজার্ভ, বেতএদ-দিন প্রাসাদ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থল। লেবাননে ছয়টি স্কি রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে সকালে স্কিইং এবং দুপুরে ভূমধ্যসাগরে সাঁতার কাটা সম্ভব। ৩,০০৮ মিটার উচ্চতার ‘কুরনাত আস সাওদা’ লেবাননের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, যা লেবাননকে শীতকালীন ক্রীড়াবিদদের জন্য এক জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল করে তুলেছে।
লেবাননের অর্থনৈতিক যাত্রা
লেবাননের প্রধান অর্থনৈতিক খাত গুলোর মধ্যে ধাতব পণ্য, ব্যাংকিং খাত, কৃষিজ খাত, রাসায়নিক ও পরিবহন সরঞ্জাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, লেবাননের সেবা ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলমান আছে। লেবাননের অর্থনীতিতে লেজ ফায়ার নামে একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। লেজ ফায়ার মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা পরিবেশ যেখানে ব্যক্তি মানুষ বা ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনরূপ সরকারি হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিনিময় চলে। রাষ্ট্রের এহেন দৃষ্টিভঙ্গীকে অবাধনীতি বলা হয়।
তবে, উন্নয়নশীল নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ লেবানন আর্থসামাজিক ভাবে বর্তমানে চরম দুর্দশার সময় পার করছে । গত কয়েক বছরের দফায় দফায় সরকারের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অচল অবস্থা অর্থনৈতিক সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রমাগত বেড়েছে ঋণের বোঝা। দেশটি ২০২২ সালে নিজেদের দেউলিয়াও ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক অচল অবস্থার পাশাপাশি ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ঋণের বোঝা নিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে।
লেবাননের শিল্প ও সংস্কৃতি
লেবাননের সংস্কৃতির একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো, এদেশে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে। প্রথমে প্রাচীন কানানাইট-ফিনিশীয়দের ভূমি, পরবর্তীতে আসিরিয়ান, পার্সিয়ান, গ্রীক, রোমান, আরব, ক্রুসেডার, অটোমান তুর্কি এবং ফরাসি; লেবাননের সংস্কৃতি যুগে যুগে এই সমস্ত গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিকশিত হয়েছে। বিভিন্ন জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত লেবাননের জনসংখ্যা, উৎসব, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং খাদ্য সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। যদিও লেবানিজদের মধ্যে জাতিগত, ভাষাগত, ধর্মীয় এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক বৈচিত্র্য থাকার পরও তারা “প্রায় একটি সাধারণ সংস্কৃতি” উদযাপন করে।
উৎসব এবং অনুষ্ঠান
লেবাননের সংস্কৃতির প্রধান আকর্ষণ তার উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো। এই উৎসবগুলো সারা বছর জুড়ে উদযাপিত হয় এবং স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।
বাইব্লোস ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল
লেবাননে প্রতিবছর জুলাই-আগস্ট মাসে প্রাচীন বাইব্লোসে শহরে এই উৎসবটির আয়োজন করা হয়। মূলত, বাইব্লোবস শহরের আদিমতাকে উদযাপন করতেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন। এসময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, এবং নাট্যকাররা এখানে অংশগ্রহণ করেন। এখানে স্থানীয় সংগীত এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের পরিবেশনা দেখা যায়।
বালবেক ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল
প্রতিবছর জুলাই এই উৎসবটি পালিত হয়। এটি লেবাননের সবচেয়ে পুরনো এবং বৃহত্তম সাংস্কৃতিক উৎসব। বালবেকের প্রাচীন রোমান মন্দিরগুলোতে এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সঙ্গীত, থিয়েটার, এবং নৃত্যশিল্পীরা পারফর্ম করেন।
বৈরুত ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল :
বৈরুত চলচ্চিত্র উৎসব সারা বিশ্ব থেকে আসা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি বড় মঞ্চ। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে এখানে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়, যা সিনেমাপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় এক আয়োজন।
এছাড়াও মুসলিম ধর্মাবল্মবীদের কল্যাণে দেশটিতে ইদ-উল-ফিতর, ইদ-উল-আজহা, ইদ এ মিলাদুন্নাবি বেশ আয়োজনের সাথে পালিত হয়। খ্রিষ্টান ধর্মাবল্মবীদের জন্য রয়েছে ক্রিসমাস এবং ইস্টার।
লেবাননের বিখ্যাত খাবার
লেবাননের খাবারও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। লেবাননের খাবারের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর খাবারের কিছুটা মিল থাকলেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আলাদা। কিছু বিখ্যাত লেবানিজ খাবার হলো-
- হোমাস: এটি ছোলার পেস্ট, তিল, জলপাই তেল, এবং লেবুর রস দিয়ে তৈরি এক ধরনের ডিপ, যা সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়।
- ফালাফেল: মসুর ডাল বা ছোলার বল, যা ভেজে তৈরি হয় এবং সাধারণত পিটা রুটির সাথে পরিবেশন করা হয়।
- তাববুলে: পেট্রোসেলি, পুদিনা, টমেটো, এবং বুলগার গম দিয়ে তৈরি একটি সালাদ, যা স্বাস্থ্যকর এবং খুবই সুস্বাদু।
- কিব্বেহ: ভাজা বা বেকড মাংস, বুলগার গম এবং মসলার মিশ্রণে তৈরি একটি পুষ্টিকর খাবার।
- মানাকিশ: এটি একটি জনপ্রিয় লেবানিজ পিৎজা, যার ওপর বিভিন্ন ধরনের উপকরণ যেমন জাতার (এক ধরনের মশলা), চিজ বা মাংস ব্যবহার করা হয়।
সংগীত ও নৃত্য
লেবাননের ঐতিহ্যবাহী সংগীত এবং নৃত্য দেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দাব্কে (Dabke) লেবাননের অন্যতম জনপ্রিয় নাচের ধারা, যা বিবাহ এবং অন্যান্য পারিবারিক উৎসবে দেখা যায়। এছাড়া লেবাননের আধুনিক সংগীত শিল্পীরা, যেমন ফেইরুজ (Fairuz) এবং নাসরি শামসেদ্দিন (Nasri Shamseddine), আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত।
লেবাননের চিত্রশিল্পে ২০শ শতকের প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তফা ফাররুখ অন্যতম। রোম ও প্যারিসে প্রশিক্ষিত এই শিল্পী তার কর্মজীবনে প্যারিস থেকে নিউইয়র্ক এবং বৈরুতের বিভিন্ন স্থানগুলোতে প্রদর্শনী করেছেন। সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে ওয়ালিদ রা’আদ উল্লেখযোগ্য; বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাস করেন। ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে, আরব ইমেজ ফাউন্ডেশনের ৪০০,০০০-এরও বেশি ছবি রয়েছে। যেসব ছবিতে লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনা চিত্রায়িত হয়েছে। [আরব ইমেজ ফাউন্ডেশন এর তোলা ছবি]
সাহিত্যে, খালিল জিবরান তার বই “দ্য প্রফেট” এর জন্য পরিচিত, যা ২০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। এছাড়াও, আমিন রিহানি, মিখাইল নাঈমি, এবং আধুনিক লেবানিজ লেখক ইলিয়াস খুরি, আমিন মাআলুফ, হানান আল-শায়েখ প্রমুখ আন্তর্জাতিক সফলতা অর্জন করেছেন।
লেবাননের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ১৯২০ সাল থেকে শুরু। আরবী ভাষা বলয়ের মধ্যে লেবানন সবচেয়ে উদীয়মান চলচ্চিত্র কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। লেবাননের সংবাদ মাধ্যমগুলি আরব বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে মুক্ত ও উদার।
লেবাননের শিক্ষাখাত
লেবাননের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রই তাদের গুণমানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ২০১৩ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈশ্বিক তথ্য প্রযুক্তি প্রতিবেদনে, লেবানন গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় বিশ্বের চতুর্থ এবং সামগ্রিকভাবে দশম স্থান অধিকার করে। দেশে ৪১টি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুত এবং সেন্ট জোসেফ ইউনিভার্সিটি উল্লেখযোগ্য।
লেবাননের স্বাস্থ্য খাত
লেবাননের স্বাস্থ্য খাত বেশ উন্নত। তবে এদেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য। লেবানন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আর এ কারণেই, দেশটির ‘আসফুরিয়ে হাসপাতাল’ মানসিক চিকিৎসায় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলো। ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, লেবানিজ গৃহযুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাবের কারণে ১৯৮২ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
উপসংহার
ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত লেবাননে মহান সাম্রাজ্য গুলোর উত্থান পতনের ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে সুপরিচিত। প্রাচীন ফিনিশীয়দের সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বিন্দু লেবাননে রোমান, বাইজেনটাইন, অটোমান পরবর্তী ফরাসি সাম্রাজ্যের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। লেবাননের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেশটির ইতিহাসের মতোই বৈচিত্র্যময়। লেবানন মুসলিম (সুন্নি, শিয়া, এবং দ্রুজ) এবং খ্রিস্টান (মারোনাইট, অর্থোডক্স এবং অন্যান্য) সম্প্রদায় সহ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি মিশ্রণের আবাসস্থল। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সহাবস্থানে জাতীয় পরিচয় সমৃদ্ধ ।কিন্তু এই ধর্মীয় সহ অবস্থান প্রায়ই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যথেষ্ট জটিলতা তৈরি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যার প্রমাণ পাওয়া যায়। গৃহযুদ্ধের গভীর ক্ষত কাটিয়ে তায়েফের চুক্তি সংঘাতকে শিথিল করলেও শক্তিশালী করেছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে।
আরও কিছু মজার তথ্যঃ
সিডারবৃক্ষের দেশ লেবাননঃ লেবাননের জাতীয় প্রতীক হিসাবে খ্যাত সিডার গাছ। দেশটির পতাকার মধ্যেও সিডার বৃক্ষ রয়েছে।
প্রাচীন নামের দেশঃ আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, লেবানন দেশের নামকরণ পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন এবং সে নামকরণ আজও টিকে আছে।
মরুভূমিহীন আরব দেশঃ আরো একটি মজার বিষয় হলো, আরবের দেশগুলোর মধ্যে লেবাননে একমাত্র দেশ যেখানে কোনো মরুভূমি নেই।
মদ্যপান বৈধঃ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও লেবাননের মদ্যপান বৈধ। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৩০০০ বছর আগে থেকেই লেবানন পৃথিবীব্যাপী ওয়াইন উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত।
শরনার্থীর দেশঃ পৃথিবীর মধ্যে লেবাননে সবথেকে বেশি শরনার্থী আশ্রয় নিয়েছে।
ধূমপায়ীদের দেশঃ লেবাননের জনগণ ধূমপান করতে পছন্দ করে। ধূমপায়ীর সংখ্যা হিসেবে লেবাননের অবস্থান পুরো বিশ্বে তৃতীয়।