Image default
ইতিহাসসভ্যতা

হাম্মুরাবির আইনকানুন: পৃথিবীর প্রথম আইনকাঠামোর গল্প

“চোখের জন্য একটি চোখ এবং দাঁতের জন্য দাঁত” এই ধরনের আইন কানুন প্রথম প্রচলন করে ব্যাবিলনীয় শাসক হাম্বুরাবি

মনে করেন খুব কষ্ট করে নিজের জন্য একটু জমি কিনেছেন আপনি। কিন্তু হঠাৎ করে কোনো প্রভাবশালী লোক এসে সে জমি নিজের বলে দাবি করলো। এখন আপনি হয়তো ভাববেন এই ব্যাপারটিকে আইনের আওতায় আনবেন কিনা? হাম্মুরাবির আইনকানুনের পূর্ববর্তী মেসোপটেমিয়া যুগে হলে এখন আপনি আতঙ্কে থাকতেন এবং আপনার কিছুই করার থাকতো না। কেননা তখন না ছিল কোন প্রতিষ্ঠিত আইন। 

আবার মনে করেন কেউ রেগে গিয়ে আপনার খুব কাছের কোন আত্মীয়ের হাত কেটে ফেলেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আপনি কি করবেন? এর প্রতিক্রিয়ায় এমনও ঘটনা শোনা গেছে যে, প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে অপর ব্যক্তির পুরো পরিবারকেই মেরে ফেলা হয়েছে। আপনার চোখে কি এটা ন্যায়বিচার? ন্যায়বিচার কখন হতো? আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যদি অপর পক্ষকেও সমানভাবে বিচার করা যেতো বা একই রকম ঘটনা ঘটানো যেত। 

এই সমতার বা “চোখের জন্য একটি চোখ এবং দাঁতের জন্য দাঁত” এই ধরনের প্রথম প্রচলন করে ব্যাবিলনীয় শাসক হাম্বুরাবি।

রাজা হাম্বুরাবি

হাম্মুরাবির আইনের ইতিহাস এবং তাৎপর্য

হাম্মুরাবি ছিলেন প্রাচীন ব্যাবিলনের ষষ্ঠ রাজা। তিনি রাজা হওয়ার আগে থেকেই সমাজে গরিবের উপর প্রভাবশালীদের দাপটকে একদমই পছন্দ করতেন না। রাজা হওয়ার পর তিনি রাজ্যে এত পরিমাণ বিশৃঙ্খলা, অন্যায়-অবিচার এবং শক্তির প্রভাব দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন। 

এর সমাধানে তিনি ১৭৫৪ খ্রিস্টপূর্বে ঘোষণা করেন হাম্মুরাবির আইন-কানুন বা The Code of Hammurabi। যে আইনকানুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যাবিলনে একটি সুশৃঙ্খল ও সংগঠিত সমাজ গঠন করা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই আইন প্রণয়ণের মাধ্যমে শক্তিশালীরা যাতে দুর্বলদের উপর অত্যাচার করতে না পারে এই বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

পৃথিবীর প্রথম আইনকাঠামো: হাম্মুরাবির কোড

বিশ্বের প্রাচীনতম আইনের সংকলনগুলোর অন্যতম হলো এই হাম্মুরাবির আইন। অনেক সময় এটিকে বিশ্বের প্রথম আইন কাঠামো বলা হয়ে থাকে যা পুরাপুরি সত্য নয়। এর আগেও কিছু লিখত আইন কাঠামোর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে যেমন- উরের উরনাম্মুর কোড, ইসিনের লিপিট, ইশতারের কোড, বিলালামা বা দাদুশা দ্বারা লিখিত ইশনুন্নার আইন, X এর আইন ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো কোনটারই পূর্ণাঙ্গ অর্থ বোঝা এখনো সম্ভব হয়নি। এইগুলোর অর্থ বুঝার চেষ্টা করাও সঠিক হবে কিনা এই নিয়েও কিছু পণ্ডিতরা প্রশ্ন তুলেছে।

সেই হিসেবে হাম্মুরাবির আইনকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইনের সংকলন বলা যায়। পূর্ণাঙ্গ বলার কারণ এতে ২৮২ টি ধারা রয়েছে, যা প্রাচীন মেসোপটেমীয় জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এগুলো ছিলো চুরি, হত্যা, বিয়ে, সম্পত্তি, দাসত্ব এবং বাণিজ্য। এখানেই প্রথম ন্যায়বিচার বা সমতার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যা আধুনিক আইন ব্যবস্থায় ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হাম্মুরাবির আইন সংকলন

আইনগুলো পাথরের বিভিন্ন স্তম্ভে খোদাই করে ব্যাবিলনের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছিল যাতে জনগণ এই আইনের সঙ্গে সহজে পরিচিত হতে পারে। এর প্রাথমিক অনুলিপি লেখা হয়েছে বেসাল্ট স্টিলের পাথরে যা সাত ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা। এই অনুলিপি বর্তমানে প্যারিসের Louvre Museum এ রাখা আছে।

অনুলিপিটি লেখা হয়েছিল আক্কাদীয় ভাষায়। বর্তমানে বিলুপ্ত আক্কাদীয় ভাষা হলো, প্রাচীন সেমেটিক ভাষা গোষ্ঠীর একটি অংশ, যা প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে ২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। হাম্মুরাবি আইনসহ এর আগের যে আইন গুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো আক্কাদীয় এবং সুমেরিয়ান ভাষা মিলে লেখা হয়েছে।

হাম্মুরাবির আইনের বিশেষত্ব 

প্রথম “আইনের শাসন”

এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত আইন সংকলনগুলোর একটি। এই আইনে রাজা নিজেকে “ন্যায়বিচারের রক্ষক” হিসেবে তুলে ধরেছেন।

“চোখের বদলে চোখ” নীতি

কোড অব হাম্মুরাবির একটি বিখ্যাত অংশ হলো “চোখের বদলে চোখ” নীতি। এটি অপরাধের শাস্তিকে অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ধারণা প্রকাশ করে। এখান থেকে সমতার ধারণাটি প্রথম তৈরি হয়। 

হাম্বুরাবির যুগে শাস্তি পাওয়ার দৃশ্য

 

মিশ্র সামাজিক নীতি

হাম্মুরাবি সবসময় চেয়েছিলেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং গরিবের উপর শোষণ রোধ করতে। এইজন্যই তিনি ধনী এবং দরিদ্রের সামাজিক শ্রেণী এবং তাদের সামর্থ্যের কথা ভেবে ধনী ও দরিদ্রের জন্য পৃথক শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দাসের জন্য শাস্তি হতো একরকম, আর অভিজাতদের জন্য অন্যরকম।

আন্তর্জাতিক প্রভাব

হাম্মুরাবির আইন পরবর্তী সভ্যতাগুলোর আইন প্রণয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যেমন মেসোপটেমীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আইনের ওপর কোড অফ হাম্মুরাবির বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

উদ্ভাবনী প্রকাশ মাধ্যম

হাম্মুরাবী তার আইন পাথরের স্তম্ভে খোদাই করে এমন ভাবে ব্যাবিলনের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করেছিলেন যাতে সাধারণ জনগণ এটি পড়তে ও বুঝতে পারে। অর্থাৎ, এই আইন ব্যাপারে জনগণ যেন পূর্ণ সচেতন হয় সেটার পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। এমন জনপ্রসাশন নীতি প্রাচীন যুগে খুবই বিরল।

প্রাসঙ্গিক আইনের পূর্ণাঙ্গ সমষ্টি

মজার ব্যপার হলো, এই আইনে এমন কোন বিষয় বাদ ছিল না যা কোন ব্যক্তি; হোক সে ধনী বা গরীব; তার সমাজে চলার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে না। হাম্মুরাবীর আইন বিখ্যাত হওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল এখানে সমাজে প্রয়োজনীয় মোটামুটি সকল বিষয়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল।

ব্যাবিলনীয় সমাজে হাম্মুরাবি আইনের প্রভাব

হাম্মুরাবি ছিলেন একজন কৌশলী, ন্যায়পরায়ণ এবং সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন শাসক। তিনি শুধু মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না বরং তিনি তাঁর শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইশিন, লারসা, এবং মারি-কে পরাজিত করে সমগ্র মেসোপটেমিয়ার একক শাসক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একজন ন্যায়বিচারক শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন যার ফসল কোড অব হাম্বুরাবি ।

তিনি জনগণের রক্ষক এবং শাসক হিসেবে নিজেকে চিত্রায়িত করেছিলেন; যিনি দুর্বলদের সুরক্ষা দিবে এবং অপরাধ দমন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। তার অন্যতম আইন “চোখের বদলে চোখ” প্রথম সমাজে ক্ষমতা বা একুয়ালিটি এর ধারণা নিয়ে এসেছিল। 

তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি তার আইন প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজে সকলে মধ্যে একটি ভয় বিরাজ করা শুরু করে এবং ধনী কিংবা গরিব হোক, তারা অন্যায় করার আগে দুইবার ভাবা শুরু করে। সবমিলে সমাজে একটি শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

হাম্মুরাবির কোড বনাম আধুনিক আইনব্যবস্থা

আধুনিক আইন ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে হাম্মুরাবি আইন ধরা হয়। কেননা এখানে প্রথম সমতা বা ইকোয়ালিটির ধারণাটা এসেছিল। শুধু তাই নয়, এখানে একসাথে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে তুলে ধরা হয়েছিল এবং বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আইনগুলো তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটাও ঠিক যে এখানে কিছু কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত ছিল যা বর্তমান আইন ব্যবস্থা সাপেক্ষে অমানবিক হতে পারে।

হাম্মুরাবির সাথে বর্তমান আইন ব্যবস্থা সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল, হাম্মুরাবির আইনের শাস্তি ছিল কঠোর এবং প্রতিশোধমূলক। আর আধুনিক আইনব্যবস্থা শাস্তিকে সংশোধনমূলক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে।

আইন যেমন সমাজে শৃঙ্খলা আনতে সাহায্য করে তেমন আবার বর্তমান পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে এটাও দেখা যায় যে আইন পুরোপুরি শৃঙ্খলা বা জাস্টিস আনতে পারে না। আইন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয় না এবং যতই বলা হোক আইনের চোখে সবাই সমান তা আদৌ বাস্তবায়ন হয়নি। আইন কেন ন্যায়বিচার বা পুরো শৃঙ্খলা আনতে পারে না? কারণ আইন মাত্রই মানব সৃষ্ট। 

রেফারেন্স

Related posts

যে খেলা মায়া সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো!

প্রতারণার ইতিহাস – যখন মিথ্যা হয়ে ওঠে সত্য!

আবু সালেহ পিয়ার

নির্বাচনের ইতিহাস- এথেন্স থেকে AI

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More