বেবেতো গোল দিয়ে এমন ভাবে দোলনা দোলালেন যে মনে হচ্ছিল ডাচ ডিফেন্ডারদের গোল খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে এবার তিনি সত্যি সত্যিই বাচ্চার ডায়াপার পাল্টাতে দৌড় দেবেন!
ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক নাম আছে যারা তাদের জাদুকরী ড্রিবলিং বা গোল করার অসামান্য দক্ষতায় বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু যখনই ‘কমনীয়তা’, ‘শৃঙ্খলতা’ এবং ‘নিখুঁত ফিনিশিং’-এর কথা আসে, তখন একটি নাম সবার আগে উচ্চারিত হয় হোসে রবার্তো গামা ডি অলিভেরা, যাকে পুরো বিশ্ব চেনে ‘বেবেতো‘ নামে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং রোমারিওর সাথে সর্বকালের অন্যতম সেরা এক আক্রমণভাগ জুটি গড়া এই ফুটবলার ছিলেন সাম্বার দেশের এক সত্যিকারের রাজপুত্র।

বেবেতো-এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নাম | হোসে রবার্তো গামা ডি অলিভেরা |
| ডাক নাম | বেবেতো |
| জন্ম | ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ |
| জন্মস্থান | সালভাদর , বাহিয়া , ব্রাজিল |
| উচ্চতা | ১.৭৪ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) |
| পজিশন | স্ট্রাইকার |
| ক্লাব ক্যারিয়ার | ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো, ভাস্কো দা গামা, ক্রুজেইরো এবং বোটাফোগো, স্পেনের দেপোর্টিভো লা করিনা এবং সেভিলা, মেক্সিকোতে তোরোস নেজা, জাপানের কাশিমা অ্যান্টলার্স এবং সৌদি আরবের আল ইত্তিহাদের হয়ে খেলেছেন। |
| আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার | ১৯৮৫–১৯৯৮ ব্রাজিল |
| আন্তর্জাতিক সাফল্য | ব্রাজিলের হয়ে বেবেতো ৭৫টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ৩৯টি গোল করেছেন। |
প্রারম্ভিক জীবন ও ফুটবলে হাতেখড়ি
১৯৬৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের সালভাদরে জন্মগ্রহণ করেন বেবেতো। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল সহজাত আকর্ষণ। ব্রাজিলের অন্য দশটা ছেলের মতো তিনিও গলি থেকে শুরু করেছিলেন, কিন্তু তার খেলার ধরণে ছিল এক অদ্ভুত মার্জিত ভাব। মজার ব্যাপার হলো, তার পুরো নাম ‘হোসে রবার্তো গামা ডি অলিভেরা’ হলেও ছোটবেলায় তার অত্যন্ত ছোটখাটো গড়ন এবং মিষ্টি চেহারার কারণে সবাই তাকে ‘বেবেতো‘ (যার অর্থ অনেকটা ‘ছোট বাচ্চা’) বলে ডাকত।
ইসি ভিটোরিয়া: প্রতিভা চেনার প্রথম মঞ্চ
১৯৮২-৮৩ সালের দিকে ইসি ভিটোরিয়ার যুব দলে থাকাকালীনই তিনি কোচদের নজর কাড়েন। তার খেলার মধ্যে একটা সহজাত ‘ইন্টেলিজেন্স’ বা বুদ্ধিমত্তা ছিল। সে সময়কার কোচরা বলতেন, বেবেতো বল পাওয়ার আগেই জানতেন তিনি সেটা দিয়ে কী করবেন। ১৯৮৩ সালে যখন তিনি মূল দলে সুযোগ পান, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯। সেই বছরই তিনি ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ফিফা ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন, যা তাকে জাতীয়ভাবে পরিচিতি এনে দেয়।

ফ্ল্যামেঙ্গো এবং জিকো ফ্যাক্টর
১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের অন্যতম বড় ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো তাকে দলে নেয়। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। সেই দলে তখন খেলছেন ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার জিকো। জিকোকে বেবেতো তার বড় ভাই এবং শিক্ষকের মতো মনে করতেন। জিকোর ফ্রি-কিক নেওয়ার কৌশল এবং মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরির ধরন দেখে বেবেতো নিজের ফিনিশিং দক্ষতা বাড়াতে থাকেন।
ফ্ল্যামেঙ্গোর হয়ে বেবেতো ১৯৮৭ সালে ব্রাজিলের জাতীয় লিগ জেতেন। সেখানে তিনি কেবল একজন স্ট্রাইকার ছিলেন না, বরং মাঠের যেকোনো প্রান্ত থেকে গোল করার ক্ষমতা রাখতেন।

শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয়
শুরুর দিকে অনেক সমালোচক মনে করতেন, বেবেতোর শরীর খুব বেশি পাতলা এবং তিনি ডিফেন্ডারদের ধাক্কা সইতে পারবেন না। কিন্তু বেবেতো তার গতির চেয়ে বেশি ব্যবহার করতেন তার ‘ব্যালেন্স’ এবং ‘সুইফটনেস’। তিনি শারীরিক শক্তির বদলে ড্রিবলিংয়ের সময় শরীরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিতেন। ফ্ল্যামেঙ্গোতে থাকাকালীনই তার ট্রেডমার্ক ‘ভলি’ শটগুলো নিখুঁত হতে শুরু করে।
ভাস্কো দা গামা ও চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ফ্ল্যামেঙ্গোতে কয়েক বছর কাটানোর পর ১৯৮৯ সালে তিনি তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব ভাস্কো দা গামাতে যোগ দিয়ে পুরো ব্রাজিল কাঁপিয়ে দেন। সেই বছরই তিনি ভাস্কোকে লিগ শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন এবং দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন। এই সময়টাই মূলত তাকে ১৯৯০ বিশ্বকাপের জাতীয় দলে জায়গা করে দেয়।

হতাশার বিশ্বকাপ
১৯৯০ বিশ্বকাপে বেবেতোর অভিজ্ঞতা ছিল সংক্ষিপ্ত ও হতাশাজনক। বিশ্বকাপের ঠিক আগে তিনি হাঁটুর চোটের শিকার হন, যা তাকে শতভাগ ফিট থাকতে দেয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র একটি ম্যাচে (কোস্টারিকার বিপক্ষে) বদলি হিসেবে মাত্র ৬ মিনিট খেলার সুযোগ পান। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায়টি তাকে সাইডবেঞ্চে বসেই দেখতে হয়েছিল। ৯০-এর এই ব্যর্থতা ও সাইডবেঞ্চে বসে থাকার আক্ষেপই বেবেতোকে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ইউরোপ জয় এবং দেপোর্তিভো লা করুনার রূপকথা
বেবেতোর ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনা। ১৯৯২ সালে বেবেতো যখন দেপোর্তিভোতে সই করেন, তখন ক্লাবটি মাত্র এক বছর আগে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে (লা লিগা) উঠে এসেছিল। বড় কোনো শিরোপার স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, রিয়াল মাদ্রিদ বা বার্সেলোনার মতো জায়ান্টদের বিপক্ষে ড্র করাটাই ছিল তাদের জন্য বড় সাফল্য। কিন্তু বেবেতো এসেই সেই হীনম্মন্যতা দূর করে দেন। তার আত্মবিশ্বাস পুরো শহরের মানুষের ফুটবলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
স্পেনে পা রাখার প্রথম মৌসুমেই (১৯৯২-৯৩) বেবেতো বুঝিয়ে দেন কেন তাকে ব্রাজিলের সেরা ফরোয়ার্ড বলা হয়। সেই মৌসুমে তিনি লিগে একাই ২৯টি গোল করেন। ইভান জামোরানো এবং রিস্টো স্টোইচকভের মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের পেছনে ফেলে তিনি লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘পিকিচি ট্রফি‘ জিতে নেন। তিনিই ছিলেন দেপোর্তিভোর ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় যিনি এই সম্মান অর্জন করেন।

বেবেতোর সাথে সেই দলে যোগ দিয়েছিলেন আরেক ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার মাউরো সিলভা। তাদের রসায়ন দেপোর্তিভোকে ১৯৯৫ সালে কোপা দেল রে এবং স্প্যানিশ সুপার কাপ জিততে সাহায্য করে। এটি ছিল ক্লাবের ইতিহাসের প্রথম বড় কোনো শিরোপা।
দেপোর্তিভোর হোম গ্রাউন্ড ‘রিয়াজর’-এ বেবেতো ছিলেন অনেকটা ঈশ্বরের মতো। তার খেলার মার্জিত ধরন, প্রতিপক্ষকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করা এবং গোল করার পর সেই চিরচেনা হাসি ভক্তদের মুগ্ধ করত। আজও লা করুনার রাস্তায় কোনো ফুটবল আলোচনা উঠলে বেবেতোর নাম পরম শ্রদ্ধার সাথে নেওয়া হয়।
১৯৯৪ বিশ্বকাপ: ক্যারিয়ারের স্বর্ণশিখর
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের ফুটবলে পুনর্জন্মের বছর। দীর্ঘ ২৪ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর মিশনে ব্রাজিলের তুরুপের তাস ছিলেন দুই জন—রোমারিও এবং বেবেতো। তাদের সেই ঐতিহাসিক যাত্রা আর মাঠের রসায়ন আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমলিন।
রোমারিও-বেবেতো: ‘দ্য ডেডলি ডুও’
ফুটবল ইতিহাসে খুব কম জুটিই রোমারিও এবং বেবেতোর মতো নিখুঁত বোঝাপড়া দেখাতে পেরেছে। তাদের খেলার ধরন ছিল একে অপরের পরিপূরক। রোমারিও ছিলেন বক্সের ভেতর এক খুনে স্ট্রাইকার, যার ক্ষিপ্রতা আর ড্রিবলিং প্রতিপক্ষকে তটস্থ রাখত। অন্যদিকে বেবেতো ছিলেন ধীরস্থির এবং কৌশলী। তিনি কেবল গোল স্কোরার ছিলেন না, বরং চমৎকার সব পাস আর মুভমেন্ট দিয়ে রোমারিও-র জন্য জায়গা তৈরি করে দিতেন।
সেই বিশ্বকাপে এই জুটি সম্মিলিতভাবে ৮টি গোল করেছিল (রোমারিও ৫টি, বেবেতো ৩টি)। তাদের মধ্যে কোনো ইগো বা প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল কেবল গোল করার অদম্য ক্ষুধা।

ঐতিহাসিক ‘বেবি সেলিব্রেশন’
৯ জুলাই ১৯৯৪; ডালাসের কটন বোল স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল। ম্যাচের ৬৩ মিনিটে গোল করেই বেবেতো সাইডলাইনের দিকে দৌড়ে গিয়ে হাত দিয়ে এক অভূতপূর্ব অঙ্গভঙ্গি করেন। মাত্র দুদিন আগে জন্ম নেওয়া তার পুত্র সন্তান ম্যাথিউসের সম্মানে তিনি কাল্পনিক এক দোলনা দোলানোর ভঙ্গি করেন।
মুহূর্তের মধ্যে তার সাথে যোগ দেন রোমারিও এবং মাজিনহো। তিনজনের সেই ছন্দবদ্ধ দোলনা দোলানোর দৃশ্যটি মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। এটি কেবল একটি সেলিব্রেশন ছিল না, এটি ছিল ফুটবলের মানবিক ও আবেগী রূপের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

২৪ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ট্রফি জয়
১৯৭০ সালের পর ব্রাজিল যখন শিরোপা জিততে পারছিল না, তখন সমালোচকরা বলতেন ব্রাজিল তার ছন্দ হারিয়েছে। কিন্তু বেবেতো এবং রোমারিওর সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছিল যে, ‘জোগো বনিতো’ (সুন্দর খেলা) আজও বেঁচে আছে। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয় পাওয়ার পর যখন ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরা হয়, তখন বেবেতোর হাসিতেই ফুটে উঠেছিল সারা ব্রাজিলের স্বস্তি।

সাম্বার সাথে বুদ্ধির লড়াই
বেবেতো প্রথাগত কোনো পাওয়ারফুল স্ট্রাইকার ছিলেন না। তার শারীরিক গঠন খুব একটা শক্তিশালী না হলেও তার মূল শক্তি ছিল তার ফুটবলীয় মস্তিষ্ক। বল কোথায় আসতে পারে, সেটা তিনি সেকেন্ডের আগেই অনুমান করতে পারতেন। গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার। বাতাসের ওপর ভাসমান বলে তার নিয়ন্ত্রণ ছিল দেখার মতো।
ব্রাজিল জাতীয় দলে পরিসংখ্যান
ব্রাজিলের হয়ে বেবেতো ৭৫টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ৩৯টি গোল করেছেন। তিনি তিনটি বিশ্বকাপে (১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮) অংশগ্রহণ করেন। তার ট্রফি ক্যাবিনেটে রয়েছে: ১. ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৯৪) ২. কোপা আমেরিকা (১৯৮৯) ৩. ফিফা কনফেডারেশন কাপ (১৯৯৭) ৪. অলিম্পিক পদক (রুপা ও ব্রোঞ্জ)
ফুটবল পরবর্তী বর্ণিল জীবন
ফুটবলার হিসেবে বেবেতো যেমন ছিলেন মার্জিত, মানুষ হিসেবেও ছিলেন ততোটাই বিনয়ী। ক্যারিয়ার শেষ করার পর তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রিও ডি জেনেরিও-র রাজ্য আইনসভার সদস্য হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২০১৪ সালে যখন ব্রাজিলে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন তিনি আয়োজক কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন চ্যারিটি এবং সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে দুস্থ শিশুদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার কাজ করে চলেছেন।
পরিশেষ
বেবেতো ছিলেন এমন একজন ফুটবলার যিনি কেবল পায়ের কারুকার্য দিয়ে নয়, বরং নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। ব্রাজিলের ফুটবলে যখনই কোনো সংকটের মুহূর্ত এসেছে, বেবেতো তার শান্ত রূপ ধারণ করে দলকে উদ্ধার করেছেন। তাকে শুধু গোল স্কোরার হিসেবে মনে রাখা হবে না, বরং একজন শিল্পী হিসেবে মনে রাখা হবে, যিনি সাম্বার তালকে ফুটবলের মাঠে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
Reference:

