Image default
ফুটবল

পেলের শূন্যস্থান পূরণ করা অদম্য নায়ক আমারিল্ডো

 আমারিল্ডো যখন পেলের বদলে মাঠে নামেন, তখন গারিঞ্চা তাকে বলেছিলেন, “ভয় পেয়ো না ছোট ভাই, তুমি শুধু বলটা আমাকে দিও, বাকিটা আমি দেখে নেব!”

ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ এক অনন্য অধ্যায়। একদিকে এটি ছিল ব্রাজিলের টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের গল্প, আর অন্যদিকে এটি ছিল ফুটবল সম্রাট পেলের ইনজুরিতে পড়ার ট্র্যাজেডি। কিন্তু সেই ট্র্যাজেডিকে উৎসবে রূপান্তর করেছিলেন একজন মানুষ  আমারিল্ডো তাভারেস দা সিলভেইরা। যাকে ফুটবল বিশ্ব চেনে ‘ও পসেসাসো’ বা ‘আবিষ্ট মানব’ নামে। পেলের মতো অতিমানবের অভাব ঢেকে দিয়ে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতানো কি সম্ভব? ১৯৬২ সালে আমারিল্ডো প্রমাণ করেছিলেন যে, সাহস আর জেদ থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

আমারিল্ডো তাভারেস দা সিলভেইরা- Image Source: it.pinterest.com

আমারিল্ডো এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম 

আমারিল্ডো তাভারেস দা সিলভেইরা 

জন্ম  

২৯ জুলাই ১৯৩৯

জন্মস্থান 

ক্যাম্পোস ডস গয়তাকাজেস , ব্রাজিল

উচ্চতা 

১.৬৯ মিটার (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি)

পজিশন 

স্ট্রাইকার

ক্লাব ক্যারিয়ার

ফ্লামেঙ্গো,বোটাফোগো,মিলান,ফিওরেন্টিনা,রোমা ,ভাস্কো দা গামার মতো ক্লাবে খেলেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

১৯৬১–১৯৬৬ ব্রাজিল

১৯৩৯ সালের ২৯ জুলাই ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে জন্মগ্রহণ করেন আমারিল্ডো। ছোটবেলা থেকেই তার খেলায় ছিল এক অদ্ভুত ক্ষিপ্রতা এবং আগ্রাসন। তিনি যখন মাঠে থাকতেন, তখন তার মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা কাজ করত। বল পাওয়ার জন্য তার যে ব্যাকুলতা, তা দেখেই সাংবাদিকরা তার নাম দিয়েছিলেন ও পসেসাসো’ বা ‘আবিষ্ট মানব’।

তিনি ক্যারিয়ার শুরু করেন স্থানীয় ক্লাবে, কিন্তু তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটে বোটাফোগোতে। আমারিল্ডো ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব বোটাফোগোতে যোগ দেন। সেখানে তিনি গারিঞ্চা এবং দিদির মতো কিংবদন্তিদের সাথে খেলার সুযোগ পান, যা তাকে আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রাইকার হিসেবে গড়ে তোলে।

ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব বোটাফোগোর জার্সিতে আমারিল্ডো- Image Source: alchetron.com

১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ব্রাজিল গিয়েছিল হট ফেবারিট হিসেবে। প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করেন পেলে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে চেকাস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে পেলে মারাত্মক ইনজুরিতে পড়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। পুরো ব্রাজিল তখন স্তব্ধ। পেলের জায়গায় কে খেলবে? কার এত সাহস যে পেলের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে মাঠে নামবে?

কোচ আইমোর মোরেইরা বেছে নিলেন ২২ বছর বয়সী তরুণ আমারিল্ডোকে। পুরো বিশ্ব তখন সংশয়ে ছিল, কিন্তু আমারিল্ডোর চোখে ছিল আগুনের ঝিলিক।

১৯৬২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলে আমারিল্ডো- Image Source: rioandlearn.com

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয় ছিল অনিবার্য। স্পেন ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল এবং ব্রাজিল টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায়। ঠিক সেই মুহূর্তে জ্বলে উঠলেন আমারিল্ডো। ম্যাচের ৭২ মিনিটে প্রথম গোল করে সমতা ফেরান। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে দুর্দান্ত এক হেডে জয়সূচক গোলটি করেন। সেই রাতে রিও-র রাস্তায় মানুষ পেলের শোক ভুলে আমারিল্ডোর নামে স্লোগান দিতে শুরু করে। এক রাতেই তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের নতুন ত্রাতা।

১৯৬২ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও স্পেনের মধ্যকার ম্যাচ- Image Source: medium.com

ফাইনালে ব্রাজিলের সামনে সেই চেকাস্লোভাকিয়া, যাদের বিপক্ষে ম্যাচে পেলে ইনজুরিতে পড়েছিলেন। ম্যাচের শুরুতেই মাসোপুস্টের গোলে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল। ঠিক দুই মিনিট পর, আমারিল্ডো মাঠের বাম প্রান্ত থেকে এক অবিশ্বাস্য এঙ্গেল থেকে গোল করে সমতা ফেরান।

পুরো ম্যাচে আমারিল্ডো চেক ডিফেন্ডারদের তটস্থ করে রেখেছিলেন। তার দেওয়া পাস থেকেই শেষ পর্যন্ত জিলমার এবং ভাভার গোলে ব্রাজিল ৩-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে শিরোপা ধরে রাখে। পেলে বিহীন সেই বিশ্বকাপে আমারিল্ডো ৩টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন।

আমারিল্ডো প্রথাগত সেন্টার ফরোয়ার্ড ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গতিশীল এবং টেকনিক্যালি তুখোড়। শরীরের বাঁক ব্যবহার করে ডিফেন্ডারদের বোকা বানানো ছিল তার সহজাত কৌশল। পেলের শূন্যস্থান পূরণের মানসিক চাপ তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছিল। বাম পায়ে তার শটগুলো ছিল বুলেট গতির।

১৯৬২ বিশ্বকাপ জয়ের পর পেলে ও আমারিল্ডো- Image Source: medium.com

বিশ্বকাপের সাফল্যের পর আমারিল্ডো ইতালিতে পাড়ি জমান। তিনি এসি মিলান এবং ফিওরেন্তিনার হয়ে খেলেন। ইতালিয়ান লিগেও তিনি সফল ছিলেন এবং ফিওরেন্তিনার হয়ে সিরি-এ শিরোপাও জেতেন। ব্রাজিলের হয়ে তিনি ২২টি ম্যাচে ৭টি গোল করেন। সংখ্যাটা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ৭টি গোলের গুরুত্ব ছিল হীরের চেয়েও দামী।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক সময় বড় গাছের ছায়ায় ছোট চারাগাছ ঢাকা পড়ে যায়। পেলের বিশালত্বের ছায়ায় আমারিল্ডোর নাম হয়তো অনেক সময় আড়ালে থাকে, কিন্তু ১৯৬২ সালের সেই স্বর্ণালী অধ্যায়ে আমারিল্ডো না থাকলে ব্রাজিলের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।

আমারিল্ডো ছিলেন সেই নায়ক, যিনি বিপদের সময় বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে জানতেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, দলে একজন মহাতারকা না থাকলেও দলীয় সংহতি আর একজন যোগ্য উত্তরসূরি থাকলে বিশ্বজয় করা সম্ভব। ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে আমারিল্ডো চিরকাল সেই ‘ত্রাতা’ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, যিনি পেলের অনুপস্থিতিকে এক সুন্দর জয়ে রূপান্তর করেছিলেন।

Reference:

Related posts

সাম্বার ছন্দে ব্রাজিলীয় ফুটবলের এক কালজয়ী নায়ক বেবেতো

আশা রহমান

ব্রাজিলিয়ান গোলমেশিন আদেমির দে মেনেজেস

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More