আইফেল টাওয়ারকে উচ্চতায় হারিয়ে দিয়ে আল হামরা টাওয়ার এমনভাবে কোমর বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে মরুভূমির এক মায়াবী নৃত্যশিল্পী!
আধুনিক স্থাপত্যের ইতিহাসে কিছু ভবন কেবল উচ্চতার জন্য নয়, বরং তাদের অনন্য গঠনশৈলীর জন্য অমর হয়ে থাকে। কুয়েত সিটির কেন্দ্রস্থলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘আল হামরা টাওয়ার‘ ঠিক তেমনই একটি নাম। ৪১২.৬ মিটার (১,৩৫৪ ফুট) উচ্চতার এই আকাশচুম্বী ভবনটি কুয়েতের সবচেয়ে উঁচু এবং বিশ্বের অন্যতম অনন্য ‘কার্ভড’ বা বাঁকানো কংক্রিট টাওয়ার।

আল হামরা টাওয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নজরকাড়া গঠন। প্রচলিত চারকোনা ভবনের ধারণা ভেঙে এটি একটি পেঁচানো বা মোড়ানো কাগজের মতো দেখায়। এর স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর ওইংস অ্যান্ড মেরিল (SOM) ভবনটিকে এমনভাবে নকশা করেছে যা একই সাথে নান্দনিক এবং কার্যকরী।
টাওয়ারটির এক পাশ খোলা এবং অন্য তিন পাশ ধীরে ধীরে বাঁকানো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো বিশাল চাদর বা পর্দা হাওয়ায় উড়ছে। এই নকশাটি মূলত কুয়েতের প্রখর রোদের হাত থেকে ভবনটিকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর বিশেষ আকৃতির কারণে টাওয়ারের ভেতর থেকে কুয়েত সিটির এবং পারস্য উপসাগরের এক অপূর্ব প্যানোরামিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়, অথচ সরাসরি সূর্যের তাপ ভেতরের পরিবেশকে উত্তপ্ত করতে পারে না।
আল হামরা টাওয়ারকে বলা হয় বিশ্বের দীর্ঘতম ‘কাস্টিলেড’ বা খোদাই করা কংক্রিট কাঠামো। এর নির্মাণশৈলীতে এমন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
টাওয়ারের দক্ষিণ পাশের দেয়ালটি সম্পূর্ণ কংক্রিটের তৈরি এবং এতে কোনো বড় জানালা নেই। এটি করা হয়েছে মরুভূমির তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে ভবনকে রক্ষা করার জন্য। এই দেয়ালে ব্যবহৃত পাথরের আস্তরণ ভবনটিকে শীতল রাখতে সাহায্য করে।
ভবনটি যেহেতু একদিকে বাঁকানো, তাই এর মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র বা সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি বজায় রাখা ছিল প্রকৌশলীদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। অত্যাধুনিক গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে এর ভিত্তি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা বছরের পর বছর ধরে বাতাসের চাপ ও ভূকম্পন সহ্য করতে সক্ষম।
বাইরে থেকে আল হামরা টাওয়ার যতটা বিস্ময়কর, ভেতর থেকে এটি ততটাই রাজকীয়। ৮০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনে আধুনিক জীবনের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।
টাওয়ারের নিচের তলাগুলোতে রয়েছে পাঁচ তলা বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক শপিং মল। এখানে বিশ্বের নামি-দামি ব্র্যান্ডের শপ, বিলাসবহুল সিনেমা হল এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্যাফে রয়েছে। টাওয়ারের অধিকাংশ ফ্লোরই কর্পোরেট অফিসের জন্য বরাদ্দ। বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানি, ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট ফার্মের অফিস এখানে অবস্থিত। ভবনের উপরের দিকে রয়েছে চমৎকার ‘স্কাই লবি’ এবং উচ্চমানের রেস্টুরেন্ট। যেখান থেকে রাতে কুয়েত সিটির আলোকসজ্জা দেখলে মনে হয় এক মায়াবী নগরী।
আল হামরা টাওয়ার কুয়েতের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। কুয়েত যখন তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাণিজ্যিক এবং পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন এই টাওয়ারটি সেই স্বপ্নের সারথি হিসেবে কাজ করছে। এটি কুয়েতের স্কাইলাইনকে বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে চিনিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে আরবরা কেবল ইতিহাস নয়, আধুনিক প্রযুক্তিতেও সেরা।
আপনি যদি কুয়েত সিটিতে থাকেন, তবে আল হামরা টাওয়ার এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। এটি কুয়েত সিটির আল-শুহাদা স্ট্রিটে অবস্থিত। সিটি বাস বা কারিম অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজেই এখানে আসা যায়।

পর্যটকদের জন্য শপিং মল এবং ফুড কোর্ট উন্মুক্ত। তবে উপরের তলাগুলোতে যাওয়ার জন্য অনেক সময় বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। সূর্যাস্তের সময় এখানে থাকাটা হবে আপনার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।
আল হামরা টাওয়ার কেবল ইট, বালি আর কংক্রিটের কোনো কাঠামো নয়; এটি কুয়েতের মানুষের সাহস এবং সৃজনশীলতার ফসল। এটি দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমির বালুর ওপর, কিন্তু এর লক্ষ্য আকাশের নীল দিগন্ত। আপনি যদি স্থাপত্যপ্রেমী হন বা আধুনিক জীবনের আভিজাত্য পছন্দ করেন, তবে আল হামরা টাওয়ার আপনার কাছে এক চিরস্থায়ী বিস্ময় হয়ে থাকবে।
আল হামরা টাওয়ার সম্পর্কে কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য
- আল হামরা হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন যেটির গঠনশৈলীতে এমন শৈল্পিক মোড় দেওয়া হয়েছে। এটি দেখতে অনেকটা পাথরের তৈরি বিশাল এক ওড়নার মতো।
- এর দক্ষিণ দিকের কংক্রিট দেয়ালটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে সেটি সারাদিন ভবনের কাঁচের অংশকে ছায়া দেয়। এতে মরুভূমির প্রচণ্ড গরমেও ভবনের ভেতরটা প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা থাকে এবং প্রচুর বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
- এই টাওয়ারের বাইরের দেয়ালে প্রায় ২,৫৮,০০০ বর্গমিটার চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এই পাথরগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যাতে রোদ পড়লে ভবনটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
- এই ভবনের লিফটগুলো এতোটাই দ্রুত যে আপনি নিচতলা থেকে একদম ওপরে যেতে এক মিনিটেরও কম সময় নেবেন!
- পরিষ্কার দিনে এই টাওয়ারের ওপর থেকে পুরো কুয়েত শহর তো বটেই, এমনকি মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Al_Hamra_Tower
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%86%E0%A6%B2_%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%BE_%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%B0
- https://www.vietnam.vn/bn/toa-thap-al-hamra-tai-kuwait-kiet-tac-kien-truc-xoan-oc-80-tang-giua-long-sa-mac
- http://world-architects.com/fr/skidmore-owings-and-merrill-new-york/project/al-hamra-tower

