ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ হলো ওরান শহরের সেই ‘ভিআইপি গ্যালারি’, যেখান থেকে সমুদ্র আর শহরকে একসাথে দেখে আপনার মনে হবে পুরো পৃথিবীটাই যেন আপনার হাতের মুঠোয়!
আলজেরিয়ার ওরান শহরকে বলা হয় ‘দ্য রেডিয়েন্ট সিটি’। আর এই শহরের সৌন্দর্যের মুকুটে সবচাইতে উজ্জ্বল রত্নটি হলো ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট মুরজাদজোর চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গটি কেবল পাথর আর চুন-সুরকির দেয়াল নয়; এটি ওরান শহরের কয়েকশ বছরের সংঘাত, বিজয় এবং আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত মহাকাব্য।

১৬শ শতাব্দীতে ওরান শহর ছিল ভূমধ্যসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর। ১৫৭৭ থেকে ১৬০৪ সালের মধ্যে স্প্যানিশরা এই দুর্গটি নির্মাণ করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে আসা আক্রমণকারীদের থেকে শহরকে রক্ষা করা। দুর্গের অবস্থানটি এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল যেখান থেকে পুরো ওরান উপসাগর এবং শহরের ওপর কড়া নজরদারি রাখা সম্ভব ছিল।
ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ তার সময়ের সামরিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। দুর্গটির দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু এবং শক্তিশালী পাথর দিয়ে তৈরি, যা কামানের গোলা সহ্য করার ক্ষমতা রাখত। দুর্গের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য গোপন সুড়ঙ্গ, যা দিয়ে এক সময় দুর্গের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সৈন্য ও রসদ সরবরাহ করা হতো। এমনকি শোনা যায়, পাহাড়ের নিচ পর্যন্ত যাওয়ার গোপন পথও ছিল এখানে।

দুর্গের ঠিক নিচেই একটি সাদা রঙের সুন্দর গির্জা বা চ্যাপেল দেখা যায়। এর পেছনে একটি অলৌকিক ইতিহাস রয়েছে। ১৮৪৯ সালে ওরান শহরে ভয়াবহ কলেরা মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। কথিত আছে, স্থানীয় মানুষ যখন এই পাহাড়ের চূড়ায় কুমারী মেরির কাছে প্রার্থনা করেন, তখন অলৌকিকভাবে বৃষ্টি শুরু হয় এবং শহরটি মহামারি থেকে মুক্তি পায়। এই কৃতজ্ঞতা থেকেই ১৮৫০ সালে চ্যাপেলটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি ইউনেস্কোর একটি বিশেষ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্থান।
ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজে যাওয়ার সবচাইতে বড় পুরস্কার হলো এর ওপর থেকে দেখা ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য। এখান থেকে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত দেখা যায়। নিচ তাকালে পুরো ওরান শহরকে একটি খেলনা শহরের মতো মনে হয়। পাহাড়, সমুদ্র আর শহরের আধুনিক দালানগুলোর এই মেলবন্ধন আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

সূর্যাস্তের সময় দুর্গের প্রাচীন দেয়ালে যখন সোনালি আলো পড়ে, তখন ফটোগ্রাফির জন্য এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর হতে পারে না।
আলজেরিয়া স্বাধীন হওয়ার পর ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্গ এবং চ্যাপেলটির ব্যাপক সংস্কার কাজ করা হয়েছে, যাতে এর প্রাচীন সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে। আজ এটি কেবল একটি সামরিক স্থাপনা নয়, বরং ওরান শহরের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র।
ভ্রমণ টিপস
- ওরান শহর থেকে ক্যাব বা গাড়িতে করে পাহাড়ের ওপর যাওয়া যায়। রাস্তাটি বেশ আঁকাবাঁকা হলেও খুবই সুন্দর।
- সকালের দিকে বা বিকেলের শেষ ভাগে যাওয়া সবচেয়ে ভালো। দুপুরে রোদের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে।
- পাহাড়ের ওপর বাতাস অনেক বেশি থাকে, তাই সাথে হালকা জ্যাকেট রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ হলো ওরান শহরের রক্ষাকর্তা এবং তার ঐতিহ্যের অতন্দ্র প্রহরী। ইতিহাসের ধুলোমাখা দেয়াল আর নীল সাগরের শীতল বাতাসের মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে এখানে আপনাকে আসতেই হবে। এটি কেবল পাথর দিয়ে গড়া কোনো দুর্গ নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস আর অপরাজেয় শক্তির প্রতীক।
ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য
- এই দুর্গটি মূলত স্প্যানিশদের তৈরি হলেও এটি অটোমান তুর্কি এবং ফরাসিদের দ্বারাও ব্যবহৃত ও সংস্কার করা হয়েছে। দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে তিন ভিন্ন সাম্রাজ্যের সামরিক প্রকৌশলের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।
- ১৮৪৯ সালে যখন ওরান শহরে কলেরা মহামারি চরম আকার ধারণ করে, তখন স্থানীয়রা এই পাহাড়ে উঠে প্রার্থনা করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, প্রার্থনার পরপরই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয় এবং শহর থেকে রোগ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। এই অলৌকিক ঘটনার স্মৃতিতেই পাহাড়ের গায়ে চ্যাপেলটি তৈরি করা হয়।
- দুর্গের ভেতরে এমন কিছু গোপন সুড়ঙ্গ এবং করিডোর রয়েছে যা দিয়ে এক সময় সৈন্যরা পাহাড়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত। বলা হয়, মাউন্ট মুরজাদজোর একদম পাদদেশ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য এতে বিশেষ লুকানো পথ ছিল।
- পাহাড়ের উচ্চতা আর সমুদ্রের অবস্থানের কারণে এখানে বাতাসের বেগ সবসময়ই খুব বেশি থাকে। দুর্গের প্রাচীন জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস যখন বয়ে যায়, তখন এক ধরণের অদ্ভুত সুর বা গর্জনের সৃষ্টি হয়, যা পর্যটকদের কাছে বেশ রোমাঞ্চকর লাগে।
- দুর্গে ওঠার রাস্তাটি বেশ আঁকাবাঁকা হলেও, ওরান শহরে একটি ক্যাবল কার সিস্টেম রয়েছে যা আপনাকে সরাসরি পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যায়। আকাশ থেকে ওরান শহর আর সমুদ্র দেখার এটিই সেরা উপায়।
Reference:

