গোলপোস্টের নিচে বাঘের মতো বল ঠেকানো এই লাতিন রকস্টার অবসরে গিটার হাতে পুরোদস্তুর জেমস! লিভারপুলের ড্রেসিংরুমে তার গান শুনে সতীর্থরা তো হাঁ ভেবেছিল গোলকিপার কিনেছে, অথচ ড্রেসিংরুমে এসে হাজির আস্ত এক ব্যান্ডের লিড ভোকাল!
আলিসন বেকার নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত, দৃঢ় এবং অপ্রতিরোধ্য প্রাচীরের ছবি। আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকদের ভূমিকা যে কতটা পরিবর্তন হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। তিনি শুধু গোল লাইনে দাঁড়িয়ে বল ঠেকান না, বরং পুরো ডি-বক্সের ভেতর নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন এবং নিখুঁত পাসের মাধ্যমে দলের আক্রমণের সূচনা করেন।
আলিসন বেকার- এর ব্যক্তিগত তথ্য
|
নাম |
আলিসন রামসেস বেকার |
| জন্ম |
২ অক্টোবর ১৯৯২ (বয়স ৩৩) |
| জন্মস্থান |
নোভো হামবুর্গো , ব্রাজিল |
|
উচ্চতা |
১.৯৩ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি) |
| পজিশন |
গোলরক্ষক |
| ক্লাব ক্যারিয়ার |
রোমা এবং বর্তমানে লিভারপুল এর হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৫– ব্রাজিল |
আলিসন রামসেস বেকার ১৯৯২ সালের ২রা অক্টোবর ব্রাজিলের রিউ গ্রান্দে দু সুল-এর নভো হামবুর্গো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারে ফুটবল খেলার একটি ঐতিহ্য ছিল। তার বাবা এবং ঠাকুরদাও অপেশাদার ফুটবল খেলতেন, আর তার মা ছিলেন হ্যান্ডবল গোলরক্ষক। তবে আলিসনের জীবনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বড় ভাই মুরিয়েল বেকার, যিনি নিজেও একজন পেশাদার গোলরক্ষক।

মাত্র দশ বছর বয়সে আলিসন ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব ইন্টারনাসিওনাল-এর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। শুরুতে তিনি শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল এবং স্থূলকায় ছিলেন, যার কারণে তাকে অনেক সময় বেঞ্চে বসে থাকতে হতো। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, মানসিক দৃঢ়তা এবং দ্রুত বেড়ে ওঠা উচ্চতার কারণে তিনি নিজেকে ক্লাবের অন্যতম সেরা প্রতিভা হিসেবে প্রমাণ করেন। ২০১৩ সালে ইন্টারনাসিওনালের মূল দলে তার অভিষেক হয় এবং খুব দ্রুতই তিনি তার বড় ভাই মুরিয়েলকে পেছনে ফেলে ক্লাবের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন।

ব্রাজিলে দারুণ পারফর্ম করার পর ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান জায়ান্টদের নজর কাড়েন আলিসন। ইতালিয়ান সিরি-আ-এর ক্লাব এএস রোমা তাকে প্রায় ৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে ভেড়ায়। ইতালিতে প্রথম মৌসুমটি আলিসনের জন্য সহজ ছিল না, কারণ তখন রোমার প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন অভিজ্ঞ পোলিশ তারকা ভয়চেক স্টেজনি।
তবে ২০১৭-১৮ মৌসুমে ভয়চেক স্টেজনি জুভেন্টাসে চলে যাওয়ার পর আলিসন রোমার এক নম্বর জার্সি পান। আর সেই মৌসুমেই তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দেন তার আসল ক্ষমতা।
২০১৭-১৮ চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রোমার সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে আলিসন ছিলেন প্রাচীরের মতো। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে প্রথম লেগে ৪-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর, দ্বিতীয় লেগে রোমা ৩-০ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে। সেই ম্যাচে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজদের একাধিক নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে আলিসন ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর রাডারে চলে আসেন।
২০১৮ সালের জুলাই মাসে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লিভারপুল আলিসনকে রেকর্ড ৭২.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে নেয়। সেই সময়ে তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি গোলরক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।
লিভারপুলের ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ একটি নিখুঁত দল তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তাদের কেবল একজন বিশ্বমানের গোলরক্ষকের অভাব ছিল। আলিসন দলে আসার সাথে সাথেই লিভারপুলের রক্ষণভাগের চেহারা বদলে যায়। ডিফেন্ডার ভার্জিল ভ্যান ডাইকের সাথে আলিসনের জুটি লিভারপুলকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ডিফেন্সে পরিণত করে।
লিভারপুলে নিজের প্রথম মৌসুমেই (২০১৮-১৯) আলিসন প্রিমিয়ার লিগে ২১টি ‘ক্লিন শিট’ রেখে গোল্ডেন গ্লাভস জয় করেন। সেই বছরই লিভারপুল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে টটেনহ্যাম হটস্পারকে ২-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে আলিসন একাই ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছিলেন। তার পরের মৌসুমে (২০১৯-২০) লিভারপুল দীর্ঘ ৩০ বছরের খরা কাটিয়ে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয় করে, যেখানে আলিসনের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

ফুটবল ইতিহাসে গোলরক্ষকদের গোল করার ঘটনা খুবই বিরল। আলিসন বেকার ২০২১ সালের মে মাসে ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়নের বিপক্ষে ম্যাচের ৯৫ মিনিটে কর্নার থেকে এক অবিশ্বাস্য হেডে গোল করেন। লিভারপুলের ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোলরক্ষক যিনি কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করেছেন। এই গোলটি লিভারপুলকে সেই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ালিফাই করতে সাহায্য করেছিল, যা আলিসনের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
২০১৫ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দলে আলিসনের অভিষেক হয়। ডিয়েগো আলভেস বা এদেরসনের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষক থাকা সত্ত্বেও কোচ তিতের অধীনে আলিসন ব্রাজিলের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন।
২০১৯ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় আলিসন ছিলেন অতিমানবীয় ফর্মে। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ১টি গোল হজম করেছিলেন। ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি তিনি টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি ২০১৮ ও ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মূল গোলরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাঠের বাইরে আলিসন একজন অত্যন্ত ধার্মিক এবং পারিবারিক মানুষ। ২০১৫ সালে তিনি নাতালিয়া লোইভের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বর্তমানে তারা তিন সন্তানের জনক। আলিসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একজন শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেন, যেখানে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পক্ষে প্রচার চালান।

২০২১ সালে আলিসন তার বাবাকে এক দুঃখজনক দুর্ঘটনায় হারান। সেই কঠিন সময়েও তিনি যেভাবে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে মাঠে নিজের সেরাটা দিয়েছেন, তা তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।

ফুটবল মাঠের এই শান্ত রকস্টার বর্তমানেও তার চেনা ছন্দেই আছেন। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আলিসন বেকার লিভারপুল এবং ব্রাজিল জাতীয় দল উভয় জায়গাতেই গোলপোস্টের নিচে এক বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে নিজের রাজত্ব ধরে রেখেছেন।
বয়সের সাথে সাথে শট ঠেকানোর ক্ষিপ্রতা তো কমেইনি, বরং তার পজিশনিং সেন্স এবং রিফ্লেক্স এখন আরও পরিপক্ব। সহজ কথায়, আলিসন বেকার এখনো বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা এবং দামী গোলরক্ষকদের একজন, যার গ্লাভসের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।
আলিসন বেকারকে নিয়ে চমকপ্রদ কিছু তথ্য
- আজকের এই অ্যাথলেটিক বডি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, মাত্র ১০-১২ বছর বয়সে আলিসন বেশ গোলগাল বা স্থূলকায় ছিলেন। উচ্চতাও খুব একটা বাড়ছিল না। এই কারণে তার ক্লাব ইন্টারনাসিওনালের যুব একাডেমিতে তিনি নিয়মিত বেঞ্চে বসে থাকতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তার উচ্চতা বাড়তে শুরু করে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বদলে ফেলেন।
- আলিসন যখন একাডেমিতে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তখন হতাশ হয়ে ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তার বড় ভাই মুরিয়েল বেকার (যিনি নিজেও পেশাদার গোলরক্ষক) তাকে ধরে রাখেন, সাহস দেন এবং নিয়মিত অনুশীলন করান। মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে ইন্টারনাসিওনালের মূল দলে এই বড় ভাই মুরিয়েলকেই বেঞ্চে বসিয়ে আলিসন এক নম্বর গোলরক্ষক হয়েছিলেন।
- ২০২১ সালের মে মাসে ওয়েস্ট ব্রমউইচের বিপক্ষে ম্যাচের ৯৫ মিনিটে কর্নার থেকে হেডে এক অবিশ্বাস্য গোল করেন আলিসন। এই একটি গোল লিভারপুলের ইতিহাসে অনেকগুলো রেকর্ড গড়ে!
- মাঠের বাইরে আলিসন একজন দারুণ গিটারিস্ট। তিনি লাতিন রক মিউজিক পছন্দ করেন এবং অবসরে প্রায়ই গিটার বাজিয়ে গান গান!
- ব্রাজিলে আলিসনকে তার দারুণ লুকের কারণে বেশ জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়। রোমায় খেলার সময় তার সুদর্শন চেহারার কারণে ইতালিয়ান মিডিয়া তাকে নিয়ে মেতে উঠেছিল এবং বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ড তাকে মডেলিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাকে ভালোবেসে অনেকে “The German” বলে ডাকেন, কারণ তার পূর্বপুরুষদের একাংশ জার্মান বংশোদ্ভূত ছিল !
Reference:
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A6%A8_%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0
- https://en.wikipedia.org/wiki/Alisson_Becker
- https://www.espn.com/soccer/player/_/id/196876/alisson-becker
- https://wageindicator.org/bn-bd/work-in-bangladesh/salary/vip/alisson-becker

