টোকিও স্কাইট্রি জাপানের রাজধানী টোকিও’র সুমিদা এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম স্থাপনা। ২০১২ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি টোকিও’র আধুনিক আইকন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ৬৩৪ মিটার উচ্চতার এই টাওয়ারটি পর্যটকদের কাছে রোমাঞ্চ আর মুগ্ধতার এক নাম।
টোকিও স্কাইট্রি সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
| উচ্চতা | ৬৩৪ মিটার (২০৮০ ফুট) |
| অবস্থান | সুমিদা, টোকিও, জাপান |
| উদ্বোধন | ২২ মে, ২০১২ |
| বিশ্ব রেকর্ড | বিশ্বের সর্বোচ্চ ফ্রি-স্ট্যান্ডিং ব্রডকাস্টিং টাওয়ার |
| বিশেষ নাম | ‘মুসাশি’ (৬৩৪ সংখ্যাটির জাপানি উচ্চারণ) |
| প্রধান উদ্দেশ্য | টেলিভিশন ও রেডিও সিগন্যাল প্রচার এবং পর্যটন |

উচ্চতার রেকর্ড
টোকিও স্কাইট্রি বিশ্বের সর্বোচ্চ ‘ফ্রি-স্ট্যান্ডিং ব্রডকাস্টিং টাওয়ার’। এর মোট উচ্চতা ৬৩৪ মিটার। মজার ব্যাপার হলো, জাপানি ভাষায় ৬, ৩ এবং ৪ সংখ্যাগুলোকে একসাথে ‘মু-সা-শি’ বলা হয়, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহাসিক নামের সাথে মিলে যায়। এই উচ্চতার কারণেই এটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে।

কেন এটি তৈরি করা হয়েছিল?
টোকিও টাওয়ারের উচ্চতা একসময় সিগন্যাল পাঠানোর জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু আধুনিক টোকিওতে একের পর এক বিশাল আকাশচুম্বী ভবন গড়ে ওঠায় পুরোনো টাওয়ারটি কিছুটা ‘পিছনে’ পড়ে যাচ্ছিল। ভবনগুলোর আড়ালে পড়ে যাওয়ায় ডিজিটাল সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, যার ফলে সাধারণ মানুষের টিভি দেখতে বা রেডিও শুনতে সমস্যা হতো। এই সমস্যা মেটাতে এবং পুরো কান্তো অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সিগন্যাল পৌঁছে দিতেই টোকিও স্কাইট্রিকে দানবের মতো উচ্চতায় তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো ভবনের আড়ালে না পড়ে সে সগৌরবে পুরো শহরের ওপর রাজত্ব করতে পারে।
পর্যটকদের জন্য মূল আকর্ষণ
টোকিও স্কাইট্রির আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর দুটি অসাধারণ ভিউয়িং ডেক-এ, যা আপনাকে আক্ষরিক অর্থেই মেঘের দেশে নিয়ে যাবে:
টেম্বো ডেক
এটি টাওয়ারের প্রথম স্টপ, যেখান থেকে পুরো টোকিও শহরকে মনে হবে একটি খেলনা নগরী। ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউর কল্যাণে আপনার নজর যতদূর যাবে, কেবল আধুনিকতা আর আভিজাত্যই চোখে পড়বে। ভাগ্য ভালো থাকলে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকলে দিগন্তরেখায় তুষারশুভ্র মাউন্ট ফুজিকেও সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

টেম্বো গ্যালারি
রোমাঞ্চ যদি আরও এক ধাপ বাড়াতে চান, তবে চলে আসুন এই ‘আকাশ পথে’। এটি একটি কাঁচের তৈরি সর্পিল গ্যালারি, যা টাওয়ারের চারপাশ দিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। স্বচ্ছ কাঁচের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় আপনার মনে হবে আপনি শূন্যে ভেসে আছেন, আর মেঘেরা আপনার ঠিক পায়ের নিচ দিয়ে খেলা করছে। উচ্চতা আর সৌন্দর্যের এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতি মিলবে এখানে।

আধুনিক প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
টাওয়ারটির ডিজাইন করা হয়েছে জাপানের প্রাচীন বৌদ্ধ প্যাগোডার আদলে। এর ভেতরে একটি বিশেষ ‘ভাইব্রেশন কন্ট্রোল সিস্টেম’ আছে যা ভূমিকম্পের সময় টাওয়ারটিকে নিরাপদ রাখে। এর সাদা রঙটিও বিশেষ যাকে বলা হয় ‘স্কাইট্রি হোয়াইট’, যা জাপানের ঐতিহ্যবাহী নীল-সাদা রঙের সংমিশ্রণ।
আলোকসজ্জা ও কেনাকাটা
সূর্য ডুবলেই টোকিও স্কাইট্রি তার রাজকীয় রূপ ধারণ করে। রাতের আকাশে এর আলোকসজ্জা কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং জাপানি সংস্কৃতির এক একটি গল্প বলে। টাওয়ারটি একেক দিন একেক রঙে সেজে ওঠে। কখনো এটি ধারণ করে শান্ত নীল আভা, যাকে বলা হয় ‘ইকি’ যা দিয়ে সুমিদা নদীর স্বচ্ছ জলকে বোঝানো হয়। আবার কখনো এটি রাজকীয় বেগুনি রঙে জ্বলে ওঠে, যার নাম ‘মিয়াবি’। বিশেষ বিশেষ দিনে এটি উজ্জ্বল লাল বা উৎসবের রঙেও রাঙানো হয়, যা পুরো শহরকে এক মায়াবী রূপ দান করে।
শুধু টাওয়ার দেখেই শেষ নয়, এর ঠিক নিচেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে ‘টোকিও সোলামাচি’। এটি এমন এক বিশাল শপিং মল যেখানে ৩০০-এর বেশি আধুনিক দোকান এবং মুখরোচক সব জাপানি রেস্টুরেন্ট আছে। এখান থেকে যেমন আপনি জাপানের ঐতিহ্যবাহী স্যুভেনিয়ার বা স্মৃতিচিহ্ন কিনতে পারবেন, তেমনি পেটপুজো করে নিতে পারবেন খাঁটি সব জাপানি খাবারে।

ভ্রমণের তথ্য
টোকিও স্কাইট্রি ভ্রমণের পরিকল্পনাকে আরও নিখুঁত করতে নিচে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য ও টিপস দেওয়া হলো:
যাতায়াত ব্যবস্থা
টোকিও স্কাইট্রিতে পৌঁছানো খুবই সহজ, কারণ এর নিজস্ব স্টেশন রয়েছে:
- ট্রেন: টোকিও’র যেকোনো প্রান্ত থেকে ‘টোকিও স্কাইট্রি স্টেশন’ অথবা ‘ওশিয়াহে স্টেশন’ -এ নামলেই সামনে টাওয়ারটি দেখতে পাবেন।
- স্কাইট্রি শাটল: টোকিও স্টেশন, উয়েনো স্টেশন বা ডিজনিল্যান্ড থেকে সরাসরি স্কাইট্রি শাটল বাস পাওয়া যায়।
টিকিট ও খরচ
- কম্বো টিকিট (৩৫০মি. + ৪৫০মি.): ১৮ বছরের ঊর্ধ্বদের জন্য প্রায় ৩,১০০ ইয়েন।
- সিঙ্গেল টিকিট (শুধুমাত্র ৩৫০মি.): প্রায় ২,১০০ ইয়েন।
- ছুটির দিনে টিকিটের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। শিশুদের জন্য টিকেটের দামে বিশেষ ছাড় রয়েছে।
কখন যাবেন?
- শনি ও রবিবার প্রচণ্ড ভিড় থাকে, তাই সম্ভব হলে সোমবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- যাওয়ার আগে আবহাওয়া দেখে নিন। মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে মাউন্ট ফুজি দেখা যায় না। পরিষ্কার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনই সেরা ভিউ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত।
উপসংহার
আপনি যদি টোকিও শহরকে পাখির চোখে দেখতে চান এবং জাপানের আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পেতে চান, তবে টোকিও স্কাইট্রি আপনার তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত। এটি আপনাকে একই সাথে শিহরণ এবং প্রশান্তি দুটোই উপহার দেবে।
মজার তথ্য
- বিজলি চমকানো: যেহেতু এটি অনেক উঁচু, বছরে গড়ে অনেকবার এতে বজ্রপাত হয়, যা গবেষকদের জন্য গবেষণার দারুণ সুযোগ তৈরি করে।
- দ্রুতগামী লিফট: এর লিফটগুলো এতটাই দ্রুত যে মাত্র ৫০ সেকেন্ডে আপনাকে ৩৫০ মিটার ওপরে পৌঁছে দেবে!
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Tokyo_Skytree
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%93_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87_%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF
- https://www.britannica.com/topic/Tokyo-Sky-Tree
- https://en.tokyo-skytree.jp/
- https://www.gotokyo.org/en/spot/6/index.html

