Image default
জাপানপর্যটন আকর্ষণ

শিনসেকাই: ওসাকার যে গলিতে সময় আজও থমকে আছে!

জাপানের ওসাকা শহরের অন্যতম রঙিন, প্রাণবন্ত এবং পুরনো ধাঁচের একটি এলাকার নাম শিনসেকাই । জাপানি ভাষায় ‘শিনসেকাই’ শব্দের অর্থ হলো “নতুন বিশ্ব” । ১৯১২ সালের দিকে এটি একটি আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও, বর্তমানে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী জাপানের এক নস্টালজিক বা স্মৃতিবিজড়িত পরিবেশ ধরে রেখেছে। বিশাল সব থ্রিডি সাইনবোর্ড, নিয়ন আলো আর সস্তা কিন্তু সুস্বাদু স্ট্রিট ফুডের কারণে এটি পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

শিনসেকাই– Image Source:kingtolentino.com

১৯১২ সালে যখন শিনসেকাই প্রথম তৈরি হয়, তখন এর নকশা করা হয়েছিল বিশ্বের দুটি বিখ্যাত শহরের আদলে! এর উত্তর দিকটি তৈরি হয়েছিল ফ্রান্সের প্যারিস শহরের মতো করে এবং দক্ষিণ দিকটির অনুপ্রেরণা ছিল নিউইয়র্কের কনি আইল্যান্ড।

শিনসেকাইয়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এর আইকনিক প্রতীক সুতেনকাকু টাওয়ার। এর অর্থ হলো “স্বর্গে পৌঁছানোর টাওয়ার।” ১০৩ মিটার উঁচু এই টাওয়ারের অবজারভেশন ডেক থেকে পুরো ওসাকা শহরের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। রাতের বেলায় যখন টাওয়ারটি বিভিন্ন রঙের আলোয় সেজে ওঠে, তখন শিনসেকাইয়ের রাস্তাগুলো আরও মায়াবী রূপ ধারণ করে।

সুতেনকাকু টাওয়ার – Image Source:www.triptojapan.com

বর্তমানে আপনি যে সুতেনকাকু টাওয়ারটি দেখছেন, তা কিন্তু আসল বা প্রথম টাওয়ার নয়! ১৯৪৩ সালে প্রথম টাওয়ারটিতে আগুন লেগে যায়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে ওই পোড়া টাওয়ারের লোহাগুলো খুলে গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। বর্তমান টাওয়ারটি ১৯৫৬ সালে নতুন করে বানানো হয়।

শিনসেকাইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবারের নাম হলো “কুশিকাৎসু”। এটি মূলত মাংস, সামুদ্রিক খাবার এবং সবজি কাঠিতে গেঁথে, ব্যাটারে ডুবিয়ে কড়া তেলে ভাজা এক ধরনের মচমচে স্ন্যাকস। এখানকার রাস্তায় হাঁটলেই কুশিকাৎসুর অসংখ্য ছোট-বড় রেস্তোরাঁ চোখে পড়বে। বাইরের ক্রিস্পি আবরণ আর ভেতরের নরম স্বাদ একে ওসাকার সেরা স্ট্রিট ফুডগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

কুশিকাৎসু খাওয়ার একটি খুব কড়া নিয়ম আছে, আর তা হলো দু’বার চুবানো নিষেধ! প্রতিটি টেবিলে সসের একটি পাত্র থাকে যা সবাই ব্যবহার করে। তাই একবার কামড় দেওয়ার পর সেই এঠো কাঠি আর সসের পাত্রে ডোবানো যায় না।

শিনসেকাইয়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনে হাসিমুখ আর চোখা মাথার একটি অদ্ভুত পুতুলের মূর্তি দেখতে পাবেন। এর নাম বিলিকেন। ওসাকার লোকেরা একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করেন। পর্যটকরা এখানে এসে বিলিকেনের মূর্তির সাথে ছবি তোলেন এবং সৌভাগ্য কামনায় তার পা ঘষে দেন।

শিনসেকাই – Image Source:www.michaeljensen.com

যদিও বিলিকেনকে এখন ওসাকার স্থানীয় দেবতা বলে মনে হয়, এর জন্ম কিন্তু জাপানে নয়! ১৯০৮ সালে ফ্লোরেন্স প্রিৎজ নামের এক আমেরিকান শিল্প শিক্ষক স্বপ্নে এই চরিত্রটি দেখেন এবং তার নকশা করেন। পরে সেটি জাপানে এসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

শিনসেকাই আধুনিক জাপানের মতো চকচকে নয়, বরং এটি কিছুটা পুরনো, সস্তা এবং সাধারণ। এখানকার সরু গলিগুলোতে আজও পুরনো ধাঁচের আর্কেড গেমের দোকান, পিনবল মেশিন এবং ছোট ছোট পানশালা দেখা যায়। ওসাকার মতো একটি হাই-টেক শহরের ঠিক মাঝখানে এমন একটি জায়গা যেন টাইম মেশিনে করে কয়েক দশক আগের জাপানে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

শিনসেকাইয়ে ফুগু বা পাফার ফিশ (পটকা মাছ) এর রেস্তোরাঁ বেশ জনপ্রিয়। এই মাছের শরীরে মারাত্মক বিষ থাকে! তাই এটি রান্না করার জন্য শেফদের বছরের পর বছর কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়ে তবেই সরকারি লাইসেন্স পেতে হয়।

শিনসেকাই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো আধুনিক জাপানের চকচকে আবরণের বাইরে গিয়ে কয়েক দশক পুরোনো এক নস্টালজিক বা রেট্রো জাপানের স্বাদ পাওয়া। এখানকার সরু গলি, পুরোনো ধাঁচের আর্কেড গেম এবং বিশাল সব রঙিন থ্রিডি সাইনবোর্ড আপনাকে টাইম মেশিনে করে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। 

শিনসেকাই– Image Source:japantravel.navitime.com

এই এলাকার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত স্ট্রিট ফুড “কুশিকাৎসু” (কাঠিতে গাঁথা মচমচে ভাজা খাবার) না খেলে আপনার ওসাকা ভ্রমণই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এছাড়া ঐতিহাসিক সুতেনকাকু টাওয়ারের ওপর থেকে শহরের চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করা এবং সৌভাগ্যের প্রতীক ‘বিলিকেন’ দেবতার পা ঘষে আশীর্বাদ নেওয়ার মতো মজার অভিজ্ঞতাগুলোর জন্য শিনসেকাই ভ্রমণ আপনার জন্য একটি দারুণ এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে। 

 

Reference: 

Related posts

পানতাই বাতু হিতাম কুয়ান্তানের অনন্য কালো পাথরের সৈকত

সাগর, স্বাদ আর শৈল্পিকতা সবকিছুর নাম ইয়োকোহামা

কুয়ান্তানের মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকত তেলুক চেম্পেদাক

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More