Image default
পর্যটন আকর্ষণফ্রান্স

লিয়নের গোপন গোলকধাঁধা: রহস্যময় ত্রাবুলস

ফ্রান্সের লিয়ন শহরের এক অনন্য এবং রহস্যময় আকর্ষণ হলো এর ‘ত্রাবুল’। বাইরের রাস্তা থেকে দেখলে মনে হবে এগুলো সাধারণ কোনো ভবনের দরজা, কিন্তু সেই ভারী কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই আপনি ঢুকে পড়বেন এক গোপন সুড়ঙ্গপথ বা আচ্ছাদিত গলিতে। এই পথগুলো একটি ভবনের ভেতর দিয়ে, ব্যক্তিগত উঠোন পার হয়ে পেছনের আরেকটি রাস্তায় গিয়ে মিশেছে। লিয়নের ঐতিহাসিক ‘ভিও লিয়ন’ এবং পাহাড়ি ‘ক্রোয়া-রুস’ এলাকায় এই গুপ্তপথগুলোর দেখা মেলে, যা শহরটির প্রাচীন রহস্য আর রোমাঞ্চকে আজও সযত্নে ধারণ করে আছে।

লিয়নের গোপন ত্রাবুলগুলি– Image Source:rachelsruminations.com

‘Traboule’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ “transambulare” থেকে, যার অর্থ “আড়াআড়িভাবে হাঁটা” বা “ভেতর দিয়ে পার হওয়া”।

এই ত্রাবুলগুলোর নির্মাণের পেছনে রয়েছে লিয়নের এক সমৃদ্ধ শিল্প ইতিহাস। উনিশ শতকে লিয়ন ছিল ইউরোপের সিল্ক বা রেশম শিল্পের অঘোষিত রাজধানী। ক্রোয়া-রুস পাহাড়ে থাকা রেশম শ্রমিকরা, যাদের স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘ক্যানুট’, তারা নিজেদের তাঁতে বোনা দামি সিল্কের থানগুলো পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নিচে নদীর ঘাটে বা ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে যেতেন। বৃষ্টির পানি বা খারাপ আবহাওয়া থেকে মহামূল্যবান সিল্ককে রক্ষা করার জন্যই এই আচ্ছাদিত শর্টকাট পথগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এই পথগুলো ব্যবহার করে শ্রমিকরা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিরাপদে এবং দ্রুত রেশম পৌঁছে দিতেন।

সিল্কের থানগুলো এতই ভারী হতো যে, সেগুলো পিঠে বহন করে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তাই এই পথগুলোতে ঢালু রাস্তা বা বিশেষ প্রশস্থ সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

ত্রাবুলগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল সিল্ক ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয় এবং বীরত্বপূর্ণ। নাৎসি জার্মানি যখন ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধারা এই ত্রাবুলগুলোকে তাদের গোপন আস্তানা, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা এবং দ্রুত পালানোর পথ হিসেবে ব্যবহার করত। লিয়নের সাধারণ মানুষের কাছে এই গুপ্তপথগুলো পরিচিত হলেও জার্মান বাহিনীর কাছে এগুলো ছিল এক অজানা বিশাল গোলকধাঁধা। এই গোপন পথগুলোর কারণেই লিয়ন ফরাসি প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পেরেছিল।

কুখ্যাত জার্মান গেস্টাপো প্রধান ক্লাউস বার্বি– Image Source:wikipedia.org

কুখ্যাত জার্মান গেস্টাপো প্রধান ক্লাউস বার্বি তার বাহিনী নিয়ে এই ত্রাবুলগুলোতে ঢুকতে ভয় পেতেন। কারণ চোরাগোপ্তা হামলা থেকে বাঁচতে নাৎসিদের কাছে এই জালের মতো ছড়িয়ে থাকা পথগুলোর কোনো মানচিত্র ছিল না!

ত্রাবুলগুলোর স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর এবং বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে ভিও লিয়ন এলাকার ত্রাবুল গুলোতে ইতালীয় রেনেসাঁস স্থাপত্যের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। একটি সাধারণ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই আপনার চোখে পড়বে অপূর্ব সুন্দর সব পাথরের খিলান, প্রাচীন গোলাকার বা সর্পিল সিঁড়ি, এবং রোদ এসে পড়া ছিমছাম উঠোন। অনেক ত্রাবুলে গোলাপি বা গাঢ় হলুদ রঙের ইতালীয় স্টাইলের প্লাস্টার দেখা যায়, যা পনেরো বা ষোলো শতকের ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের পুরোনো বাড়িগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

ক্রোয়া-রুস এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত ত্রাবুলের নাম ‘কুর দে ভোরাস’। এর ভেতরে থাকা বিশাল ছয় তলা বিশিষ্ট পাথরের উন্মুক্ত সিঁড়িটি স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে ফটোগ্রাফারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

ক্রোয়া-রুস এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত কুর দে ভোরাস– Image Source:en.wikipedia.org

লিয়নের পুরনো শহর বা ‘ভিও লিয়ন‘ জুড়েই ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ত্রাবুল। এখানকার পথগুলো তুলনামূলক প্রাচীন এবং কিছুটা সরু। এখানকার ত্রাবুলগুলো মূলত প্রাচীন রোমানদের তৈরি করা জল সরবরাহের পথ বা পুরনো রাস্তাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। প্রতিটি ত্রাবুলেরই নিজস্ব একটি গল্প আছে। পর্যটকরা যখন এই প্রাচীন স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালগুলোর মাঝে হাঁটেন, তখন মনে হয় যেন তারা কোনো টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক শতাব্দী আগের প্রাচীন লিয়নে ফিরে গেছেন।

লিয়নের সবচেয়ে দীর্ঘ ত্রাবুলটি এই ভিও লিয়ন এলাকায় অবস্থিত, যা ৫৪ রুয়ে সেন্ট-জিন নম্বর বাড়ি থেকে শুরু হয়ে ২৭ রুয়ে দ্যু বোফ-এ গিয়ে শেষ হয়েছে। এটি একসঙ্গে চারটি আলাদা ভবনের উঠোন পার হয়ে গেছে!

বর্তমানে এই ত্রাবুল গুলো লিয়নের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। তবে এগুলো কোনো সাধারণ জাদুঘর বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, বরং এই ঐতিহাসিক ভবনগুলোতে এখনো লিয়নের সাধারণ মানুষ বসবাস করেন। তাই পর্যটকদের জন্য এই পথগুলো পরিদর্শন করার কিছু কড়া নিয়ম রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান হলো সম্পূর্ণ নিঃশব্দে চলাফেরা করা এবং বাসিন্দাদের গোপনীয়তাকে সম্মান করা। শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই গুপ্তপথগুলোকে ম্যাপ ধরে ধরে খুঁজে বের করা এক ধরণের ট্রেজার হান্ট বা গুপ্তধন খোঁজার মতোই রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা।

লিয়ন শহরের ত্রাবুল গুলোর ম্যাপ– Image Source:offbeatfrance.com

পর্যটকদের সুবিধার্থে লিয়নের পর্যটন বিভাগ নির্দিষ্ট কিছু ত্রাবুলের দরজার পাশে ব্রোঞ্জের তৈরি একটি বিশেষ ফলক বা সিংহের মাথার চিহ্ন লাগিয়ে দিয়েছে, যাতে লোকেরা বুঝতে পারে যে এই দরজাটির ভেতর দিয়ে অন্য রাস্তায় যাওয়া যাবে এবং এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

লিয়ন শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০০টির মতো ত্রাবুল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়! কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৪০টির মতো ত্রাবুল পর্যটকদের দেখার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বাকিগুলো পুরোপুরি ব্যক্তিগত এবং বাইরের মানুষদের সেখানে প্রবেশ নিষেধ।

Reference:

Related posts

হেরাত গ্রেট মসজিদ: শতাব্দী পুরোনো সৌন্দর্যের প্রতীক

ওসাকা ক্যাসেল: জাপানের এক অজেয় দুর্গ

কাবুলের ধর্মীয় ঐতিহ্য পুল-ই-খিশতি মসজিদ

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More