আঙ্কারা শহরের একেবারে হৃৎপিণ্ড হলো কিজিলাই স্কয়ার। এটি শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত, ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক মোড়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজের জন্য, কেনাকাটার জন্য বা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে এখানে জড়ো হন। আধুনিক আঙ্কারা শহরের সংস্কৃতি এবং তরুণদের আড্ডার প্রধান কেন্দ্র হলো এই চত্বর। দেশ-বিদেশ থেকে যারা আঙ্কারা ঘুরতে আসেন, অনেকেই এই জায়গাটি দিয়ে তাদের শহর ঘোরা শুরু করেন। দিন হোক কিংবা রাত, কিজিলাই স্কয়ার সবসময় নানা রঙে ও ছন্দে মুখরিত থাকে।

‘কিজিলাই’ তুর্কি শব্দটির অর্থ হলো ‘রেড ক্রিসেন্ট’ বা লাল অর্ধচন্দ্র। ১৯২৯ সালে এই চত্বরে তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান কার্যালয় তৈরি করা হয়েছিল বলেই এর নাম রাখা হয় কিজিলাই স্কয়ার।
কিজিলাই নামটি শুনলে অনেকের মনেই কৌতূহল জাগে যে এর মানে কী। আজ যেখানে আধুনিক শপিং মল আর মানুষের ভিড় দেখা যায়, একসময় সেখানে ছিল এক ভিন্ন পরিবেশ। ১৯২৯ সালে তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট বা ‘তুর্ক কিজিলাই’ সংস্থার প্রধান ভবনটি এখানে তৈরি করা হয়। এই সংস্থার নামানুসারেই পুরো এলাকার নাম হয়ে যায় কিজিলাই। সময়ের সাথে সাথে ভবনটি ভেঙে ফেলা হলেও নামটি আজও মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে। আঙ্কারার মানুষ এই নামটিকে তাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন।
তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট হলো দেশটির সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় মানবিক সাহায্যকারী সংস্থা, যা যুদ্ধ ও বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
কিজিলাই স্কয়ার হলো আঙ্কারার সবচেয়ে বড় ট্রান্সপোর্ট বা যাতায়াতের হাব। শহরের প্রায় সব মেট্রো লাইন এবং বাস রুট এই চত্বরের নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী এই জায়গাটি ব্যবহার করে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যান। এখানে আঙ্কারার পাতাল রেল বা মেট্রোর প্রধান স্টেশন রয়েছে। ব্যস্ত অফিস সময়ে বা ছুটির দিনে এই স্টেশনে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। যানজট এড়াতে সাধারণ মানুষ মেট্রো ব্যবহার করতেই বেশি ভালোবাসেন।

কেনাকাটার জন্য কিজিলাই স্কয়ারের জুড়ি মেলা ভার। এই চত্বরের চারপাশ জুড়েই রয়েছে অসংখ্য শপিং মল, কাপড়ের দোকান, বুটিক এবং বিখ্যাত ব্র্যান্ডের শোরুম। আধুনিক ফ্যাশন হাউজ থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী তুর্কি জিনিস সবকিছুই এখানে হাতের কাছে পাওয়া যায়। কেনাকাটা ছাড়াও এখানে অনেক বিখ্যাত ক্যাফে, ফাস্ট ফুডের দোকান এবং রেস্তোরাঁ আছে। কেনাকাটার ফাঁকে তরুণ-তরুণীরা এসব জায়গায় বসে আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করেন।
কিজিলাই স্কয়ারের ঠিক পাশেই অবস্থিত ‘গুভেন পার্ক’ -এর সামনের সড়কটি তুরস্কের অন্যতম ব্যস্ত শপিং স্ট্রিট হিসেবে সারা দেশে পরিচিত।
চরম ব্যস্ততা আর হট্টগোলের মাঝে একটু শান্তি পাওয়ার জন্য কিজিলাই স্কয়ারের ঠিক পাশেই রয়েছে ‘গুভেন পার্ক’। পার্কের ভেতরে অনেক বড় বড় গাছপালা থাকায় চারপাশের গরম ও কোলাহল থেকে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। মানুষ ক্লান্তিকর কাজের ফাঁকে বা হাঁটার সময় এই পার্কে এসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেন। পার্কের একপাশে একটি বিশাল ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যা দেখতে বেশ সুন্দর। বিকেলে ও সন্ধ্যায় এখানে সাধারণ মানুষের দারুণ ভিড় জমে ওঠে।

১৯৩৫ সালে তৈরি করা এই গুভেন পার্কের স্মৃতিস্তম্ভটি তুর্কি পুলিশ বাহিনীর সম্মান এবং সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, যার গায়ে অসাধারণ সব ভাস্কর্য খোদাই করা আছে।
কিজিলাই স্কয়ার আঙ্কারার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেরও কেন্দ্রবিন্দু। তুরস্কের যেকোনো জাতীয় উৎসব, বিজয় দিবস কিংবা বড় কোনো খুশির মুহূর্ত উদযাপনের জন্য মানুষ এই চত্বরে জড়ো হন। আবার কোনো দাবি বা আনন্দের উপলক্ষেও এখানে বড় জমায়েত দেখা যায়। হাজার হাজার মানুষের একসাথে উল্লাস বা অংশগ্রহণে এই চত্বরটি তখন এক উৎসবমুখর রূপ নেয়। আঙ্কারার মানুষের আবেগ এবং স্মৃতির সাথে এই জায়গাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
২০১৪ সালে এই ঐতিহাসিক চত্বরটিকে নতুন করে সাজানো হয় এবং এখানকার পুরোনো কিছু ভবন ভেঙে একে আরও বড় ও আধুনিক পথচারী বান্ধব চত্বরে রূপ দেওয়া হয়।
কিজিলাই চত্বরে ঘুরতে গেলে নানা পদের খাবারের গন্ধে মন জুড়িয়ে যায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঐতিহ্যবাহী তুর্কি সিমিত, রোস্টেড চিনা বাদাম এবং কচি ভুট্টা পোড়ানোর দোকান বসে। এছাড়া তুরস্কের বিখ্যাত ‘ডানার কাবাব’ ও আইসক্রিমের দোকানগুলোতে সবসময় লম্বা লাইন থাকে। তরুণরা এই খাবারগুলো হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেতে খুব ভালোবাসেন। এখানে বসার জন্য ছোট ছোট অনেক চমৎকার ক্যাফেও রয়েছে।
তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী তিল দিয়ে তৈরি গোল রুটি ‘সিমিত’ আঙ্কারার মানুষের সবচেয়ে প্রিয় নাস্তা, যা এই চত্বরের অলিগলিতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
দিনের বেলা কিজিলাই যতটা ব্যস্ত থাকে, রাতের বেলা এটি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামতেই চারপাশের বিশাল সব শপিং মল এবং বিলবোর্ডের রঙিন আলো জ্বলে ওঠে। হরেক রকমের নিয়ন আলোয় পুরো চত্বরটি এক নতুন রূপ নেয়। রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে মানুষ আলো ঝলমলে রাস্তায় হেঁটে বেড়ান। তরুণদের গান বাজনা এবং আড্ডায় রাতের কিজিলাই এক অন্যরকম প্রাণ ফিরে পায়।
রাতের বেলা কিজিলাই স্কয়ারের ওপর থেকে ড্রোন দিয়ে ছবি তুললে পুরো এলাকাটিকে একটি বিশাল আলোর মালার মতো দেখতে লাগে।

কিজিলাই স্কয়ারের আরেকটি সুন্দর দিক হলো এর বইয়ের বাজার। এই চত্বরের আশপাশে অনেক পুরোনো ও নতুন বইয়ের দোকান রয়েছে। তুর্কি লেখকদের উপন্যাস থেকে শুরু করে বিশ্বের বিখ্যাত সব বই এখানে পাওয়া যায়। সাহিত্যপ্রেমী এবং ছাত্রছাত্রীরা অবসরে এই দোকানগুলোতে বই উল্টেপাল্টে দেখতে আসেন। বই কেনার পাশাপাশি বই নিয়ে আলোচনা করার জন্য এটি একটি দারুণ জায়গা।
কিজিলাইয়ের অলিগলিতে এমন কিছু পুরোনো বইয়ের দোকান আছে, যেগুলো প্রায় ৪০-৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং সেখানে দুর্লভ অনেক বই খুঁজে পাওয়া যায়।
আঙ্কারার আধুনিক জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো এই কিজিলাই স্কয়ার। এখানকার মানুষের ফ্যাশন, চলাফেরা এবং আধুনিক জীবনধারা দেখলে শহরের তরুণ প্রজন্মের স্পন্দন টের পাওয়া যায়। শহরের ব্যাংক, বীমা অফিস এবং বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির কার্যালয় এই এলাকার আশেপাশেই অবস্থিত। আধুনিকতার ছোঁয়া আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে আঙ্কারাকে বুঝতে হলে কিজিলাই স্কয়ার ঘুরে দেখা সবার জন্যই জরুরি।
Reference:

