আল জাহরার ঐতিহ্যবাহী উট দৌড় প্রতিযোগিতায় মানুষের বদলে উটের পিঠে বসানো হয় রিমোট-চালিত ছোট ছোট ‘রোবট জকি’!
কুয়েতের শুষ্ক ও তপ্ত মরুভূমির কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বালিয়াড়ি। কিন্তু এই রুক্ষতার মাঝেই আল জাহরা প্রদেশে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য সবুজ জগত ‘আল জাহরা নেচার রিজার্ভ’ । এটি মূলত একটি সুরক্ষিত জলাভূমি বা ওয়েটল্যান্ড, যা কুয়েতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনবদ্য নিদর্শন। মরুভূমির বুকে এই জলাভূমি যেন এক জাদুকরী মরূদ্যান, যা কেবল মানুষের চোখকেই প্রশান্তি দেয় না, বরং হাজারো বন্যপ্রাণী ও পাখির জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আধুনিক কুয়েতের নগর উন্নয়ন ও যান্ত্রিকতার ভিড়ে এই রিজার্ভটি প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার হিসেবে টিকে আছে।

কুয়েতের মতো একটি দেশে যেখানে কোনো প্রাকৃতিক নদী বা বড় মিষ্টি পানির হ্রদ নেই, সেখানে আল জাহরা নেচার রিজার্ভের এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও সবুজ বনানী আক্ষরিক অর্থেই একটি ভৌগোলিক বিস্ময়!
এই চমৎকার প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যটির ইতিহাস বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একসময় এই এলাকাটি ছিল একটি উন্মুক্ত উপকূলীয় প্রান্তর, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত শিকার এবং পরিবেশ দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে কুয়েত সরকার এই এলাকাটির পরিবেশগত গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং একে একটি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। ধীরে ধীরে এটিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় যাতে বাইরের কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
এই রিজার্ভের ভেতরে মিষ্টি পানির যে বিশাল হ্রদগুলো রয়েছে, সেগুলো মূলত কুয়েতের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে আসা পরিশোধিত পানি দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ, ফেলে দেওয়া পানিকে কাজে লাগিয়েই এই বিশাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে!

আল জাহরা নেচার রিজার্ভের ভেতরে পা রাখলেই মনে হবে আপনি যেন অন্য কোনো দেশে চলে এসেছেন। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা নলখাগড়া এবং সবুজ গাছপালার ঘন জঙ্গল। জলাভূমির চারপাশে প্রচুর পরিমাণে তামারিস্ক গাছ এবং বিভিন্ন প্রকারের মরুভূমির গুল্ম দেখতে পাওয়া যায়। এই গাছপালাগুলো একদিকে যেমন জলাভূমির মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, অন্যদিকে তেমনি বন্যপ্রাণীদের খাবার ও লুকিয়ে থাকার চমৎকার জায়গা তৈরি করে। বিশেষ করে বসন্তকালে যখন গাছে গাছে নতুন পাতা ও ফুল আসে, তখন পুরো রিজার্ভের দৃশ্যপট যেন এক নিপুণ শিল্পীর আঁকা ছবির মতো মনে হয়।
এখানকার নলখাগড়ার বনগুলো এতটাই ঘন এবং উঁচু যে, অনেক সময় এগুলো ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়! এই ঘন বন ছোট ছোট পাখিদের শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রাকৃতিক দুর্গের মতো কাজ করে।
এই নেচার রিজার্ভটিকে যদি ‘পাখিদের স্বর্গরাজ্য’ বলা হয়, তবে তা মোটেও অতিরঞ্জিত হবে না। আল জাহরা নেচার রিজার্ভ আন্তর্জাতিকভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বার্ড ওয়াচিং স্পট’ বা পাখি দেখার জায়গা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুয়েত পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম প্রধান একটি রুট। শীতের শুরুতে যখন পাখিরা ইউরোপ ও এশিয়া থেকে উষ্ণ আফ্রিকার দিকে উড়ে যায়, তখন হাজার হাজার পাখি এই রিজার্ভে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নেমে আসে। এখানে ঈগল, পেলিকান, এবং ফ্ল্যামিংগোর মতো চমৎকার সব পাখির দেখা মেলে, যা পাখিপ্রেমীদের জন্য এক অন্যরকম আকর্ষণ।

আল জাহরা নেচার রিজার্ভে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৩০টিরও বেশি ভিন্ন প্রজাতির পাখি রেকর্ড করা হয়েছে! এর মধ্যে গ্রেট হোয়াইট পেলিকান এবং গ্রেটার ফ্ল্যামিংগোর বিশাল ঝাঁক যখন এক হয়ে আকাশে ওড়ে, তখন তা এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের জন্ম দেয়।
পাখিদের পাশাপাশি এই সংরক্ষিত জলাভূমিটি বিভিন্ন ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এবং উভচর প্রাণীদেরও একটি নিরাপদ আবাসস্থল। মরুভূমির লাল শিয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর এবং টিকটিকি এখানে অবাধে ঘুরে বেড়ায়। তাছাড়া জলাভূমির পানিতে প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ এবং ব্যাঙ রয়েছে, যা মূলত পরিযায়ী পাখিদের প্রধান খাদ্য। এখানকার জীববৈচিত্র্য এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, প্রতিটি প্রাণী একে অপরের ওপর নির্ভর করে চমৎকার একটি ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছে, যা মরুভূমির চরম রুক্ষ আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে সক্ষম।
এই জলাভূমিতে এমন কিছু বিরল প্রজাতির মরু-টিকটিকি দেখা যায়, যারা তীব্র গরমের সময় নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এক অদ্ভুত কায়দায় বালুর নিচে ডুব দিতে পারে!

এই অনবদ্য প্রাকৃতিক সম্পদটিকে রক্ষা করার জন্য কুয়েতের ‘এনভায়রনমেন্ট পাবলিক অথরিটি’ (EPA) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সাধারণ জনগণের জন্য আল জাহরা নেচার রিজার্ভটি সবসময় উন্মুক্ত থাকে না। এখানকার সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম যাতে মানুষের কোলাহল বা দূষণের কারণে নষ্ট না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হয়। কেবল শীতের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে সীমিত সংখ্যক দর্শনার্থী, গবেষক বা ফটোগ্রাফারদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের এই কঠোর পদক্ষেপের কারণেই আল জাহরা রিজার্ভ আজও তার প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে পেরেছে।
আল জাহরা নেচার রিজার্ভের ভেতরে পলিথিন, প্লাস্টিক বা যেকোনো ধরনের আবর্জনা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশের সময় কোনো উচ্চ শব্দ করতে বা হর্ন বাজাতেও বারণ করা হয়, যাতে বন্যপ্রাণী ও পাখিদের শান্তিতে ব্যাঘাত না ঘটে।
পরিবেশ রক্ষা এবং গবেষণার পাশাপাশি আল জাহরা নেচার রিজার্ভ ইকোট্যুরিজম এবং পরিবেশগত শিক্ষার একটি দারুণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ করতে পারে। কীভাবে একটি রুক্ষ মরুভূমিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবুজ অরণ্যে পরিণত করা যায়, তার একটি জীবন্ত উদাহরণ হলো এই জায়গাটি।
ফটোগ্রাফারদের জন্য এখানকার প্রতিটি কোণ যেন একেকটি ফ্রেম। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের সময় শান্ত জলাভূমির পানিতে যখন চারপাশের সবুজ গাছের প্রতিবিম্ব পড়ে, তখন সেই দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয়।

আল জাহরা নেচার রিজার্ভের ভেতরে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য কাঠ দিয়ে বিশেষ ‘ওয়াকওয়ে’ বা হাঁটার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। মাটি বা গাছপালার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, তার জন্য মানুষ শুধুমাত্র এই কাঠের রাস্তার ওপর দিয়েই চলাচল করতে পারেন!
আল জাহরা নেচার রিজার্ভ কুয়েতের বুকে প্রকৃতির অসীম শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিকে যদি একটু নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া যায়, তবে সে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও জীবন ফিরিয়ে আনতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার যে প্রতিশ্রুতি, আল জাহরা নেচার রিজার্ভ ঠিক সেই লক্ষ্যেরই এক নীরব ও সফল কারিগর। প্রকৃতির এই অনন্য উপহারকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলেরই একান্ত দায়িত্ব।
Reference:

