Image default
আকাশচুম্বী ভবনজাপানপর্যটন আকর্ষণ

আকাশছোঁয়া লাল-সাদা আভিজাত্য টোকিও টাওয়ার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার গল্প হলো আধুনিক জাপান। আর সেই জেগে ওঠার দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে টোকিও শহরের মিনাতো এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘টোকিও টাওয়ার’। উজ্জ্বল কমলা এবং সাদা রঙের এই সুউচ্চ কাঠামোটি কেবল একটি যোগাযোগ টাওয়ার নয়, বরং এটি জাপানিদের ধৈর্য, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং নান্দনিক চেতনার এক অভূতপূর্ব মিলনস্থল। ১৯৫৮ সালে নির্মাণের পর থেকে আজ অবধি এটি বিশ্বের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ এবং জাপানের রাজধানী টোকিওর প্রধান ল্যান্ডমার্ক হিসেবে সমাদৃত।

টোকিও টাওয়ার – Image Source:japan-guide.com

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নির্মাণ ইতিহাস

১৯৫০-এর দশকে জাপান যখন অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখন দেশে টেলিভিশন সম্প্রচারের জোয়ার আসে। জাপানের জাতীয় প্রচারমাধ্যম NHK এবং অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেলগুলো তাদের নিজস্ব ছোট ছোট অ্যান্টেনা ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু সরকার বুঝতে পারে যে, এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে টাওয়ার তৈরি করলে শহরটি অ্যান্টেনার জঙ্গলে পরিণত হবে। তখন একটি কেন্দ্রীয় এবং শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় যা পুরো কান্তো অঞ্চলে সিগন্যাল পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের আদলে এর নকশা করেন জাপানের ‘টাওয়ার বিশেষজ্ঞ’ তাচু নাইতো। তবে ভূমিকম্প ও টাইফুন সহনীয় করে এটি আইফেল টাওয়ারের চেয়েও মজবুতভাবে গড়া হয়। ১৯৫৭ সালে কাজ শুরু করে মাত্র দেড় বছরে, ১৯৫৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

প্রখ্যাত স্থপতি তাচু নাইতো – Image Source:towersintokyo.com

স্থাপত্য শৈলী ও গঠন

টোকিও টাওয়ারের উচ্চতা ৩৩২.৯ মিটার (প্রায় ১০৯২ ফুট)। মজার বিষয় হলো, এটি আইফেল টাওয়ারের চেয়ে ১৩ মিটার লম্বা হলেও ওজনে অনেক হালকা। আইফেল টাওয়ারের ওজন যেখানে প্রায় ৭,৩০০ টন, সেখানে টোকিও টাওয়ারের ওজন মাত্র ৪,০০০ টন। আধুনিক স্টিল কনস্ট্রাকশন প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।

বিমান নিরাপত্তা আইনের কারণে টাওয়ারটিতে কমলা ও সাদা রঙ করা হয়েছে। এর নির্মাণে কোরীয় যুদ্ধের আমেরিকান ট্যাংক গলানো স্টিল ব্যবহৃত হয়, যা যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষকে শান্তি ও উন্নয়নের প্রতীকে রূপান্তরের এক অনন্য উদাহরণ।

টোকিও টাওয়ারের উচ্চতা ৩৩২.৯ মিটার – Image Source:tickets-tokyo.com

টোকিও টাওয়ারের প্রধান আকর্ষণসমূহ

টোকিও টাওয়ার মূলত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত:

ফুটটাউন 

টাওয়ারের একদম নিচে অবস্থিত এই পাঁচ তলা ভবনে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং স্যুভেনিয়ার শপ। এখানে ‘ওয়ান পিস টাওয়ার’ নামক একটি ইনডোর থিম পার্ক ছিল যা অ্যানিমে প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মেইন ডেক

১৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই ডেকটি থেকে টোকিও শহরের ৩-৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। এখানকার স্বচ্ছ কাঁচের মেঝে বা ‘লুক-ডাউন উইন্ডো’ দিয়ে নিচের রাস্তা দেখা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এখানে একটি ছোট ক্যাফে এবং একটি শিন্টো মন্দিরও রয়েছে, যা টোকিওর সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত মন্দির।

টপ ডেক

২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই অংশটি ২০১৮ সালে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এখানকার জ্যামিতিক আয়নার নকশা এবং আলোকসজ্জা পর্যটকদের এক ভবিষ্যৎমুখী অনুভূতি দেয়। এখান থেকে পরিষ্কার আকাশ থাকলে মাউন্ট ফুজি স্পষ্ট দেখা যায়।

টোকিও টাওয়ারেআলোকসজ্জা 

টোকিও টাওয়ারের রাতকালীন আলোকসজ্জা বা ‘ল্যান্ডমার্ক লাইট’ শহরটিকে এক মায়াবী রূপ দেয়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে শীতল সাদা আলো এবং শীতকালে উষ্ণ কমলা আলো ব্যবহার করা হয়। নববর্ষ, ক্রিসমাস বা স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবসের মতো বিশেষ দিনে টাওয়ারটিকে ভিন্ন ভিন্ন রঙে সাজানো হয়। এই আলোকসজ্জার পরিকল্পনা করেন বিখ্যাত আলোক ডিজাইনার মোতোকো ইশি।

টোকিও টাওয়ারের রাতকালীন আলোকসজ্জা – Image Source:travel.rakuten.com

যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্ব

২০১২ সালে ৬৩৪ মিটার উঁচু ‘টোকিও স্কাইট্রি’ চালুর পর ডিজিটাল সম্প্রচারের কাজ সেখানে চলে গেলেও, টোকিও টাওয়ারের গুরুত্ব এখনও কমেনি। এটি বর্তমানে এফএম রেডিও সম্প্রচার এবং জাপানিজ মিডিয়ার ব্যাকআপ ট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া শহরের আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য এতে বিভিন্ন সেন্সর লাগানো রয়েছে।

পর্যটন ও অর্থনীতিতে প্রভাব

প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ পর্যটক টোকিও টাওয়ার ভ্রমণ করেন। এটি জাপানের পর্যটন খাতের একটি বড় আয়ের উৎস। এর আশেপাশে থাকা জোজো-জি মন্দির এবং শিবা পার্কের সবুজ প্রকৃতি পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। বিশেষ করে বসন্তকালে যখন চেরি ব্লসম ফোটে, তখন টাওয়ারটির সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

টোকিও টাওয়ারের সৌন্দর্য – Image Source:blog.japanwondertravel.com

সংস্কৃতি ও সিনেমায় টোকিও টাওয়ার

জাপানিজ পপ কালচার, অ্যানিমে এবং সিনেমায় টোকিও টাওয়ারের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। ‘গডজিলা’ থেকে শুরু করে আধুনিক ‘অ্যানিমে’ সিরিজ সবখানেই টোকিও টাওয়ারকে জাপানের শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাপানিদের কাছে এটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্রই নয়, বরং তাদের আবেগ ও জাতীয় গৌরবের প্রতীক।

টোকিও টাওয়ারে পৌঁছানোর উপায় ও টিকেট সংগ্রহ 

টোকিও টাওয়ার ভ্রমণকে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক করতে আপনি এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে ঘরে বসেই অগ্রিম টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত। শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে সাবওয়েতে চড়ে খুব সহজেই টাওয়ারের কাছাকাছি স্টেশনে পৌঁছে যাওয়া যায়। অল্প কিছুক্ষণ হাঁটলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে সেই চমৎকার লাল-সাদা আভিজাত্য! 

শেষ কথা

টোকিও টাওয়ার কেবল লোহা আর স্টিলের একটি কাঠামো নয়, এটি জাপানের আধুনিক ইতিহাসের সাক্ষী। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে ধ্বংস থেকে সৃষ্টিতে ফিরতে হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষে হয়তো আরও অনেক উঁচু টাওয়ার তৈরি হবে, কিন্তু টোকিওর আকাশে এই কমলা-সাদা কাঠামোর যে আভিজাত্য, তা চিরকাল অম্লান থাকবে। আপনি যদি কখনো জাপানে যান, তবে এই আকাশছোঁয়া আভিজাত্য দেখার অভিজ্ঞতা আপনার স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

জাপানের আধুনিক ইতিহাসের সাক্ষী – Image Source:byfood.com

Reference:

Related posts

কুয়েত টাওয়ার: মরুর মাঝে নীল-সবুজ স্বপ্ন

অটোমান সাম্রাজ্যের জীবন্ত অধ্যায় তোপকাপি প্রাসাদ !

নটর ডেম ক্যাথেড্রাল: প্যারিসের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক বিস্ময়

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More