রমজান মাসে প্রকাশ্যে গান-বাজনা শোনা এবং খাওয়া-দাওয়া করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয়। এছাড়াও মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোন নারীকে উপহার দিতে হলে তা পরিবারের মা-বোন কিংবা অন্য মহিলা সদস্যদের দিয়ে দিতে হবে।xa0
কুয়েত, আরব উপদ্বীপের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। আয়তনে ছোট হলেও, কুয়েত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। কুয়েতের ইতিহাসে রয়েছে এক উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধ্যায়। সমুদ্র উপকূলে ছড়ানো মুক্তার মতো এই দেশটি বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে তার প্রভাব ও গুরুত্ব ধরে রেখেছে। আজকে আমরা জানব কুয়েতের গল্প। আশা করি এই গল্প এই ছোট কিন্তু শক্তিশালী দেশের প্রতি পাঠককে নতুন ধারণা দিবে।
| দেশ | কুয়েতxa0 |
| রাজধানী | কুয়েত সিটি |
| আয়তন | ১৭,৮১৮ বর্গকিমিxa0 (৬,৮৮০ বর্গমাইল) |
| জনসংখ্যাxa0 | ৪,৯৩৪,৫০৭ জন |
| সরকারি ভাষা | আরবি |
| প্রধান মুদ্রা | কুয়েতি দিনার |
| সময় অঞ্চল | ইউটিসি +৩ |
| আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরxa0 |
কুয়েতের ভৌগলিক অবস্থান ও আবহাওয়াxa0
পশ্চিম এশিয়ার দেশ কুয়েত। দেশটির উত্তরে সৌদি আরব এবং উত্তর-পশ্চিমে ইরাক অবস্থিত। আরবের উত্তরাঞ্চলের পারস্য উপসাগরের প্রান্তজুড়ে এ দেশটির বিস্তৃতি।xa0
মজার ব্যাপার হচ্ছে, কুয়েত দেশটি নয়টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। কুয়েতের প্রধান দ্বীপের নাম কুয়েত আইল্যান্ড, তবে অন্যান্য ছোট দ্বীপগুলোর মধ্যে বুবিয়ান, ফাইলাকা, ওয়ারবা , মাসকান, করণ, কুব্বার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
কুয়েত বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ আবহাওয়ার দেশ। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এদেশে সর্বোচ্চ উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। কুয়েতে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কুয়েতে বৃষ্টির পরিমাণ অত্যন্ত কম হলেও এখানে বেশ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।xa0
ম্যাপxa0
কুয়েতের আয়তন ও জনসংখ্যা
কুয়েতের সরকারি নাম ‘স্টেট অফ কুয়েত’। কুয়েত নামটি আরবি ‘কুট’ শব্দ থেকে এসেছে। ‘কুট’ শব্দের অর্থ হলো পানির কাছে নির্মিত দুর্গসমূহ। কুয়েতের রাজধানী হলো কুয়েত সিটি।
কুয়েতের আয়তন প্রায় ১৭,৮১৮ বর্গকিলোমিটার। কুয়েতের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই জনসংখ্যার মধ্যে কুয়েতি নাগরিকদের সংখ্যা মাত্র ১৪ লাখ। বাকি অংশ পুরোটায় বিদেশি কর্মী। যারা মূলত বিভিন্ন দেশ থেকে কাজ করতে আসে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ইত্যাদি।
কুয়েতের জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশ কম, তবে বিদেশি কর্মী সংখ্যা বেশি হওয়ায় দেশের বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও দেখা যায়।
কুয়েতের ইতিহাস
১৯৬১ সালের জুন মাসে কুয়েত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর দেশটির আমির নির্বাচিত হন শেখ আব্দুল্লাহ আল সেলিম আল সাবা। আশির দশকে কুয়েতের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। পাশাপাশই দেশটির শেয়ার বাজারে ধ্বস নামায় শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট।xa0
এরপর আবার ১৯৯০ সালে ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত একটি তেল ক্ষেত্র থেকে তেল চুরির অভিযোগে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করে বসেন। মাত্র এক দিনেই তারা কুয়েত দখল করে নেয়। ১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট বাহিনীর হস্তক্ষেপের পর এ দখলদারিত্বের অবসান ঘটে।
কুয়েতের অর্থনীতির ইতিহাসঃ মাছ ধরার গ্রাম থেকে তেলের খনিxa0
কুয়েতের অর্থনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। এই ইতিহাস তেল আবিষ্কারের পর ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৭শ শতকে, কুয়েতে কিছু ছোট মাছ ধরার গ্রাম ছিল। সেখানে স্থানীয় জনগণ মূলত মাছ ধরা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন কুয়েত মূলত একটি মাছ ধরার গ্রাম হিসেবেই পরিচিত ছিল।xa0
তবে ১৮শ শতকের শেষের দিকে, কুয়েত পূর্ণ পরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এই সময় থেকেই কুয়েত পারস্য উপসাগর অঞ্চলের জাহাজ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ঊনবিংশ শতকে, কুয়েতের ঘোড়া বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। সেই সময় ঘোড়াগুলোকে জাহাজের মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো। তবে, বিংশ শতকের প্রথম দিকে, কুয়েতের স্থানীয় অর্থনীতি ক্রমে পতন হতে থাকে। বিশেষত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ অর্থনৈতিক অবরোধ এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে কুয়েতের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে।
১৯৩০ সালে, কিছু কুয়েতি ব্যবসায়ী পরিবার দেশ ছেড়ে চলে যায়। তবে, ১৯৩৭ সালে কুয়েতে তেলের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই কুয়েতের ভাগ্য পুরোপুরি পরিবর্তিত হতে থাকে। এর আগ পর্যন্ত কুয়েতের অর্থনীতি বেশ হতাশাজনক অবস্থায় ছিল, এবং অনেক কুয়েতি দেশ ছেড়ে অন্য অঞ্চলে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিল।
তেলের খনি আবিষ্কারের পর কুয়েতের অর্থনৈতিক পরিবর্তন
তেলের খনি আবিষ্কারের পর কুয়েতের অর্থনীতি বিপুল পরিবর্তন আসে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সময়কালটি কুয়েতের অর্থনীতির স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৬ সালে দেশটি থেকে প্রথম তেল রপ্তানি শুরু হয় এবং এর অর্থনীতি তেলের উপর একদম নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কুয়েতের বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম তেল রিজার্ভ রয়েছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি।

বর্তমানে, কুয়েত বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটির প্রায় ৯৫% রপ্তানি আয় আসে পেট্রোলিয়াম এবং তেলের সম্পর্কিত পণ্য থেকে। কুয়েতের মাথাপিছু আয় পৃথিবীর উচ্চতম। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ তেলের জন্য কুয়েতের ওপর নির্ভরশীল। কুয়েতি দিনার বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা, এবং এক কুয়েতি দিনার বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৪৬.৭৮ টাকা।
তেল খনি আবিষ্কারের প্রভাব
তেলের খনি আবিষ্কারের পর, কুয়েতের জনজীবন ও অর্থনীতি এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে। কুয়েতিরা তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। শহরটি আধুনিকতা এবং বিলাসিতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কুয়েতের তেল খনির ইতিহাস আজ বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কুয়েতের তেল বিশ্বের প্রায় ১০% রিজার্ভের অধিকারী।
এছাড়া, কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম তেল রিজার্ভ নগরী হিসেবে পরিচিত। দেশটির বিশাল তেল রিজার্ভ কুয়েতকে অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার ফলস্বরূপ কুয়েত আজ পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ।
কুয়েতের রাজনীতি
কুয়েতের শাসনব্যবস্থা একটি প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে, যা ১৭৫৬ সাল থেকে ‘আল সাবাহ’ বংশের শাসনে রয়েছে। এই বংশটি এখনও কুয়েতের শীর্ষ শাসক পরিবার হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছে।xa0
কুয়েতে ভোটের মাধ্যমে পার্লামেন্ট সদস্যরা নির্বাচিত হন, এবং নির্বাচিত সদস্যরা স্বাধীনভাবে পার্লামেন্টে আলোচনা ও মত প্রকাশ করতে পারেন। এমনকি, তারা আল সাবাহ পরিবারের সমালোচনা করতে পারে, যা কুয়েতের রাজনীতিতে অন্যন্যতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে, সময়ে সময়ে কুয়েতে রাজনৈতিক অচলাবস্থাও সৃষ্টি হয়ে থাকে।
তবে, কুয়েতের আল সাবাহ পরিবার এখনো সরকারের এবং নির্বাহী শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তাদের হাতে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার এবং নতুন নির্বাচন ঘোষণা করার ক্ষমতা। এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার ওপর শক্তিশালী প্রভাব রাখতে সক্ষম।
এই অবস্থান কুয়েতকে একটি অনন্য রাজনীতির দেশের রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে শাসক পরিবারের শাসন ও পার্লামেন্টের স্বাধীনতা একসাথে বিদ্যমান।
কুয়েতের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান
যদি ভ্রমণটা হয় মধ্যপ্রাচ্যের তাহলে আবু ধাবি এবং দুবাইয়ের পরেই চলে আসবে কুয়েতের নামটি। পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী এই ক্ষুদ্র দেশটি সমৃদ্ধ ইতিহাস, বিস্ময়কর আধুনিক স্থাপত্য এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মিলনে এক অনন্য গন্তব্যস্থল।
কুয়েত টাওয়ার
কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি-তে অবস্থিত কুয়েত টাওয়ার ১৯৭৯ সালে উদ্বোধন করা হয়। এটি তিনটি আলাদা সিলিন্ডার আকৃতির টাওয়ারের সমন্বয়ে তৈরি একটি আধুনিক স্থাপনা। কুয়েত টাওয়ারটি দেশের একটি প্রতীক এবং এর বিশেষ নকশা ও অনন্য গঠনশৈলীর কারণে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।
কুয়েত টাওয়ারের মূল টাওয়ারটির উচ্চতা ৬১৫ ফুট। এর উপরের অংশে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যেখানে বসে দর্শনার্থীরা কুয়েত সিটির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। আর নিচের অংশে একটি পানি সংরক্ষণ ট্যাংক রয়েছে।xa0

এছাড়াও, কুয়েত টাওয়ার কমপ্লেক্সে আরও দুটি টাওয়ার রয়েছে। দ্বিতীয় টাওয়ারটি ৪৮২ ফুট লম্বা এবং এটি সম্পূর্ণরূপে একটি পানির ট্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি কুয়েতের পানির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।xa0
তৃতীয় টাওয়ারটি মূলত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত অন্যান্য দুইটি টাওয়ারের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কুয়েত টাওয়ারের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায় রাতে, যখন পুরো টাওয়ারটি রঙিন আলোর সজ্জায় সজ্জিত হয়। বিশেষ করে, রাতের বেলায় টাওয়ারের আলো বিভিন্ন রঙে পরিবর্তিত হয়। যা একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং দর্শনীয় দৃশ্য তৈরি করে।
মিউজিক্যাল ফাউন্টেন
কুয়েতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য মিউজিক্যাল ফাউন্টেন একটি প্রধান আকর্ষণ। এই ফাউন্টেনে ২২০টি পানির ফোয়ারা রয়েছে। এই ফোয়ারাগুলো রংবেরঙের আলোকসজ্জা এবং সুরের তালে তালে নাচতে থাকে। পানির ফোয়ারাগুলো বিভিন্ন রকম সুরের সঙ্গে সিঙ্ক্রোনাইজডভাবে নাচে। যা দর্শকদের জন্য একটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে। এই ফাউন্টেনের আলোর খেলা এবং সঙ্গীতের মিলনে কুয়েতের রাতগুলি আরও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে।

গ্রীন আইল্যান্ড
গ্রীন আইল্যান্ড কুয়েতিদের তৈরি একটি কৃত্রিম দ্বীপ। এই দ্বীপটিxa0 ১৯৮৮ সালে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পারস্য উপসাগরের প্রথম কৃত্রিম দ্বীপও এটি। পার্ক, খেলার মাঠ, রেস্তোরাঁ, শুটিং স্পট কি নেই এখানে! এই আইল্যান্ডের একপাশে রয়েছে হাজার হাজার গাছের সারি এবং অপর পাশে রয়েছে পানির উপর দিয়ে চলার রাস্তা।

সিদ্দিকা ফাতেমা জোহরা মসজিদ
কুয়েতের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা হলো সিদ্দিকা ফাতেমা জোহরা মসজিদ। এটি স্থানীয়ভাবে তাজমহল মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এর নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত।xa0
এই মসজিদটি তার বিপুল আর্কিটেকচারাল সৌন্দর্য এবং মুগল স্থাপত্য শৈলী জন্য বেশ পরিচিত। বিশেষ করে, এর স্থাপত্যের মধ্যে তাজমহলের মতো বিশাল গম্বুজ এবং বাহারি মেঝে চোখে পড়ার মতো। মসজিদটির নির্মাণশৈলী এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা তাজমহলের সৌন্দর্য এবং ভারতের মুঘল স্থাপত্যের ছোঁয়া নিয়ে এসেছে। তাই এটি স্থানীয়দের মধ্যে তাজমহল মসজিদ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
কুয়েত লিবারেশন টাওয়ার
কুয়েত সিটির প্রাণকেন্দ্র মিরকাবে কুয়েত লিবারেশন টাওয়ার অবস্থিত। এর উচ্চতা ১২২০ ফুট। এটি বিশ্বের সবথেকে লম্বা টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার এবং এই টাওয়ারটি আইফেল টাওয়ারের চেয়েও প্রায় ৪০ মিটার বেশি উচ্চতার। এই টাওয়ারটি শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবসের দিন পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।xa0
গ্র্যান্ড মসজিদ
কুয়েতের গ্র্যান্ড মসজিদ ইসলামের ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের এক অমূল্য নিদর্শন। এটি কুয়েতের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক স্থান হিসেবে পরিচিত। মসজিদটি কুয়েত সিটির কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এটি কুয়েতের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এর আয়তন প্রায় ৭,০০০ বর্গ মিটার।xa0

মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নীল টাইলের গম্বুজ। গম্বুজটি কুয়েতের আকাশের নিচে একটি বিশাল ও প্রশস্ত দৃশ্য তৈরি করে, যা একদম অন্যরকম মুগ্ধকর। এর মিনারগুলো মসজিদের শোভা বাড়িয়ে তোলে। মিনারের উচ্চতা প্রায় ৭৭ মিটার, যা দূর থেকে দেখে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
গ্র্যান্ড মসজিদে দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছে জটিল ক্যালিগ্রাফি এবং সুক্ষ্ম কারুকার্য খচিত বিভিন্ন ঝাড়বাতি। এই ঝাড়বাতিগুলো বিশেষভাবে নির্মিত, যা মসজিদের একেবারে মূল অংশ থেকে ঝুলছে এবং এর আভা মসজিদটিকে এক মহিমান্বিত পরিবেশ প্রদান করে রেখেছে।
কুয়েত জাতীয় জাদুঘর
কুয়েতের ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে জানার জন্য কুয়েতের জাতীয় জাদুঘর পর্যটকদের জন্য আদর্শ গন্তব্যস্থল। এখানে দেশটির সমৃদ্ধ অতীত সম্পর্কে জানার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও দেখা মিলবে জাদুঘরে প্রদর্শিত নিদর্শন, আলোকচিত্র এবং কিছু পুরানো নথি, যা কয়েক শতাব্দী ধরে কুয়েতের বিবর্তন কে চিত্রায়িত করে।xa0

কুয়েতে মরুভূমি সাফারির জন্য দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে। জিপ সাফারি, ক্যাম্পিং, এবং বালির পাহাড়ে চড়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যে কারো মরুভূমি ভ্রমণের রোমাঞ্চ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিবে।xa0
কুয়েত ভ্রমণের আদর্শ সময়
কুয়েতের জলবায়ু মরুভূমি অঞ্চলীয় হওয়ায় গ্রীষ্মে অত্যন্ত গরম এবং শীতকালে শীতল থাকে। ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে মার্চ মাসকে সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়। কারণ, এ সময় আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক থাকে, যা স্থানীয় সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এক্কেবারে আদর্শ সময়।
বাংলাদেশ থেকে কুয়েত যাওয়ার মাধ্যম
বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে ভ্রমণের জন্য সরাসরি ও সংযুক্ত ফ্লাইটের সুবিধা রয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়েত সিটির উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন ফ্লাইট পরিচালনা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- কুয়েত এয়ারওয়েজ – সরাসরি ফ্লাইট
- ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস – সরাসরি ফ্লাইট
- এয়ার অ্যারাবিয়া – সংযোগযুক্ত ফ্লাইট (শারজাহ হয়ে)
কুয়েতের খাদ্য প্রণালী
মাকলুবা ও লাহাম মান্ডি
মাকলুবা আরবের একটি জনপ্রিয় বিরিয়ানি। কুয়েতিদের কাছে মাকলুবা পছন্দের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। মাকলুবা মাংস, চাল ও ভাজি করা সবজির সমন্বয়ে রান্না করা হয়।xa0
লাহাম মান্ডিও কুয়েতের একটি বহুল প্রচলিত বিরিয়ানি। ভেড়ার মাংস ও বাসমতি চালের সাথে নানা প্রকার বাহারি মসলা মিশিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়।xa0

তাশফীর
কুয়েতের মানুষের কাছে তাসফের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। রুটির সাথে মাংস অথবা সবজির তরকারি মিশিয়ে এই খাবারটি প্রস্তুত করা হয়।xa0
মুরাবিয়ান
কুয়েতের জনপ্রিয় খাবার গুলোর মধ্যে মুরাবিয়ান অন্যতম। চাল ও চিংড়ির সাথে নানা ধরনের উপকরণ সহযোগে এই খাবারটি রান্না করা হয়। এটি দেখতে অনেকটাই বিরিয়ানির মতো।

কিবদা
কুয়েতের ঐতিহ্যবাহী খাবার গুলোর মধ্যে কিবদা অন্যতম। গরু, মুরগি অথবা ভেড়ার কলিজা দিয়ে এই খাবারটি প্রস্তুত করা হয়। কুয়েতিরা সাধারণত সকালের নাস্তায় এ খাবারটি রুটি অথবা পরোটা দিয়ে খেয়ে থাকে।xa0
জার্স ওগিনী
জার্স ওগিনী কুয়েতের একটি বিখ্যাত কেক। অত্যন্ত সুগন্ধ যুক্ত হওয়ার কারণে একে পারফিউম কেক নামেও ডাকা হয়। এই কেক কুয়েতে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য কুয়েত
কুয়েতের মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগই প্রবাসী নাগরিক। অবাক করার বিষয়, মাত্র ৪৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ কুয়েতের ৩০ লক্ষাধিক মানুষই প্রবাসী। আরব অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার প্রবাসীদের সংখ্যায় বেশি এখানে। একক সম্প্রদায় হিসেবে প্রথম স্থান দখল করে আছে ভারতীয়রা, আর এর পরেই মিশরীয়দের অবস্থান। মূলত নির্মাণ খাত ও সেবা খাতে নিয়োগকৃত শ্রমিকদের বেশিরভাগই প্রবাসী।
কুয়েতের সংস্কৃতিxa0
কুয়েতের সংস্কৃতিতে ইসলামের ছাপ স্পষ্ট। ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি শিল্প কুয়েতে বেশ প্রশংসনীয় ও প্রসিদ্ধ। তবে কুয়েতের সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজনও বেশ লক্ষণীয়। এখানে পাঁচ ধরনের বিন্যাস দেখা যায়। তারমধ্যে সবার উপরে রয়েছে শাসক পরিবার, এরপর পুরনো কুয়েতি বণিক পরিবার এবং তারপর বেদুইনদের স্থান।xa0
ইসলাম প্রধান সমাজ
ইসলাম প্রধান দেশ কুয়েতের প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষই ইসলাম ধর্মানুসারী। যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ সুন্নি এবং ৪০ শতাংশ শিয়া সম্প্রদায়। বাকি ১৫% নাগরিকদের মধ্যে খ্রিস্টান, পারসি এবং হিন্দুরাও রয়েছে। কুয়েতে ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে কঠোরতা বেশ প্রকট। রমজান মাসে, বিশেষত কিয়ামুল লাইল নামক রাতে, বহু মুসলিম কুয়েতের গ্র্যান্ড মসজিদ সহ অন্যান্য মসজিদে জড়ো হয়ে রাতে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ ও প্রার্থনা করেন।xa0

কিয়ামুল লাইল হলো রমজান মাসের বিশেষ একটি রাত্রিকালীন নামাজ, যা অত্যন্ত পুণ্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলিমরা এই রাতে গভীর প্রার্থনা ও তাসবিহে রত থাকেন, এটি তাদের জন্য অতিরিক্ত সওয়াব অর্জনের এক শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
রমজান মাসে প্রকাশ্যে গান-বাজনা শোনা এবং খাওয়া-দাওয়া করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয়। এছাড়াও মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোন নারীকে উপহার দিতে হলে তা পরিবারের মা-বোন কিংবা অন্য মহিলা সদস্যদের দিয়ে দিতে হবে।xa0
কুয়েতেও পারিবারিক বন্ধন
অন্যান্য আরব দেশের মতো কুয়েতেও পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ়। প্রাচীন যুগ থেকে সামাজ এবং সংস্কৃতিতে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপনকে তারা বেশ গুরুত্ব প্রদান করে আসছে। সামাজিক সংস্কৃতি আচার ব্যবহার অনুষ্ঠান পার্বণ একসাথে উদযাপনে কুয়েতিদের জুড়ি নেই।xa0
বিয়ের ক্ষেত্রেও কুয়েতে একটু বিচিত্রতা লক্ষ্য করা যায়। বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে পাত্রীর বাড়ির বাইরে বের হওয়া কিংবা পরিবারের সদস্য ব্যতীত অন্য কারো সাথে দেখা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিয়ের প্রথম এক সপ্তাহ নতুন দম্পতি কনের বাড়িতে অবস্থান করে। পরবর্তীতে তারা স্বামীর বাড়িতে গমন করে। সামাজিক রীতি অনুসারে, সে যাত্রায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে কনের মায়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।xa0

বর্তমান আইন অনুযায়ী বিদেশী পাত্র বা পাত্রী বিয়ের পর কেউ নাগরিকত্ব পায় না। বর কুয়েতে ও কোনে ভিনদেশী হলে সন্তানরা কুয়েতি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে, তবে কনে কুয়েতি এবং বর বিদেশি হলে সন্তানরা কুয়েতে নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে না।xa0
উপসংহার
কুয়েত আয়তনে ছোট হলেও এটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দেশ। দেশটির তেলসম্পদ, ব্যবসায়িক দক্ষতা এবং শক্তিশালী অর্থনীতি কুয়েতকে আন্তর্জাতিক মানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তেলের ব্যবসার মাধ্যমে দেশটি তার বিশাল দারিদ্র্য দূর করে সমাজে সমৃদ্ধি এনেছে।
এছাড়া, কুয়েতের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো এবং উচ্চ মানের জীবনযাত্রা এটিকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশগুলোর মধ্যে একটি করে তুলেছে। কুয়েতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেশটির পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে। কুয়েতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্য, মসজিদ এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলি প্রতিদিনই পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।xa0
সার্বিকভাবে, কুয়েতকে আরবের মুক্তা বলা হয়, কারণ এটি তার ছোট আকার সত্ত্বেও একটি আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক রত্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
কুয়েত সম্পর্কে আরো কিছু মজার তথ্য
বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে একটি: কুয়েত আয়তনে খুব ছোট (১৭,৮১৮ বর্গ কিলোমিটার), কিন্তু এটি আরব উপদ্বীপের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বের প্রথম এয়ার কন্ডিশনড মসজিদ: কুয়েতের গ্র্যান্ড মসজিদ বিশ্বের প্রথম এয়ার কন্ডিশনড মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এটি মসজিদে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সময় গরমে সমস্যা না হয়, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কুয়েতে বিশ্বে সবচেয়ে বড় মানবিক সহায়তার সংস্থা: কুয়েত কুয়েতি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এর মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে মানবিক সহায়তার কাজ করে। কুয়েত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দাতা হিসেবে রক্তদান এবং ত্রাণ সহায়তার মাধ্যমে সাহায্য করে থাকে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম: কুয়েতের ভৌত সম্পদের অধিকাংশই তেল থেকে আসে, এবং দেশটির জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তাই কুয়েতের প্রতি নাগরিকের আয় বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করে।
বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানী: কুয়েত সিটির আয়তন মাত্র 200 বর্গ কিলোমিটার। তবে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানী শহরের মধ্যে অন্যতম, যদিও এখানকার অর্থনৈতিক শক্তি অসাধারণ।
বিশ্বের সর্বোচ্চ পানির মূল্য: কুয়েতে পানির মূল্য অনেক বেশি, কারণ দেশে প্রাকৃতিক পানি উৎস কম এবং অধিকাংশ পানি ডিজেল প্ল্যান্ট থেকে নিষ্কাশন করা হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ গম্বুজ: কুয়েতের গ্র্যান্ড মসজিদ এর গম্বুজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ গম্বুজগুলোর মধ্যে একটি। এর আয়তন এতটাই বিশাল যে, এটি প্রায় ১০,০০০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন।
সোর্স
১.xa0https://factsinstitute.com/countries/facts-about-kuwait/
২.xa0https://www.writerrelocations.com/web-stories/interesting-facts-about-kuwait/
৩.xa0https://globalconnect.uz/interesting-facts-about-kuwait
৪.xa0https://www.worldatlas.com/articles/10-interesting-facts-about-kuwait.html
৫.xa0https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%87%E0%A6%A4

