২০১৩ সালে হেন্ডারসনের বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও ছেলের ফুটবলের ক্ষতি হবে বলে তাঁকে দেখা করতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে লিভারপুলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর গ্যালারিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হেন্ডারসনের কান্নার সেই দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে।
জর্ডান হেন্ডারসন গ্যালারির দুয়োধ্বনি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ট্রোল যাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করলেও, তিনি সেই ট্রোলিংয়ের জবাব মুখে দেননি; দিয়েছেন একের পর এক ট্রফি উঁচিয়ে ধরে। ক্লপের লিভারপুলের আসল ‘ইঞ্জিন’ খ্যাত এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে যেমন ছিল অ্যানফিল্ডের সোনালী সাফল্য, তেমনই ছিল সৌদি আরবের দলবদল নিয়ে তুমুল বিতর্ক। সব ঝড়-ঝাপটা সামলে প্রিমিয়ার লিগে রাজার মতো ফিরে আসা এই ফুটবল মায়েস্ত্রোর বর্ণিল জীবনের আদ্যোপান্ত নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন।
জর্ডান হেন্ডারসন’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
জর্ডান ব্রায়ান হেন্ডারসন |
|
জন্ম |
১৭ জুন ১৯৯০ (বয়স ৩৬) |
|
জন্মস্থান |
সান্ডারল্যান্ড , টাইন অ্যান্ড ওয়্যার, ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
৬ ফুট ০ ইঞ্চি (১.৮২ মিটার) |
|
পজিশন |
মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
সান্ডারল্যান্ড,কভেন্ট্রি সিটি,লিভারপুল,আল-ইত্তিফাক,আয়াক্স এবং বর্তমানে ব্রেন্টফোর্ড ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১০– ইংল্যান্ড |

১৯৯০ সালের ১৭ই জুন ইংল্যান্ডের সান্ডারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন জর্ডান ব্রায়ান হেন্ডারসন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর রক্তে ছিল ফুটবলের নেশা। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি তাঁর স্থানীয় ক্লাব সান্ডারল্যান্ডের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। একাডেমির প্রতিটি স্তরে তিনি নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং শারীরিক সক্ষমতার পরিচয় দেন। ২০০৮ সালের নভেম্বরে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সান্ডারল্যান্ডের মূল দলে তাঁর অভিষেক ঘটে।
মাঝমাঠে কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং চমৎকার পাসিং রেঞ্জের কারণে তিনি দ্রুতই নজর কাড়েন। ২০০৯ সালে কিছুদিনের জন্য কোভেন্ট্রি সিটিতে ধারে খেললেও সান্ডারল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন। ২০১০-১১ মৌসুমে সান্ডারল্যান্ডের ‘তরুণ সেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হওয়ার পর বড় বড় ক্লাবগুলোর নজর পড়ে এই ব্রিটিশ মিডফিল্ডারের ওপর।

২০১১ সালের জুন মাসে প্রায় ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে যোগ দেন জর্ডান হেন্ডারসন। তৎকালীন কিংবদন্তি ম্যানেজার কেনি ডালগ্লিশ তাঁকে দলে নিলেও, মাঠে হেন্ডারসনের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচকরা প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলছিলেন। তাঁর খেলার ধরনকে অনেকেই অলরেডদের ঐতিহ্যের সাথে বেমানান বলে রায় দিয়েছিলেন।
২০১২ সালে ক্লাবের নতুন ম্যানেজার হিসেবে আসেন ব্রেন্ডন রজার্স। তিনি এসেই জর্ডান হেন্ডারসনকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তিনি তাঁর পরিকল্পনায় নেই এবং লিভারপুল তাঁকে ফুলহামের কাছে বিক্রি করতে চায়। যেকোনো সাধারণ খেলোয়াড় হলে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়তেন, কিন্তু হেন্ডারসন ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি রজার্সকে সরাসরি বলেন: “আমি লিভারপুল ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি এখানেই থাকব এবং লড়াই করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করব।“

পরবর্তী সময়ে জর্ডান হেন্ডারসন কেবল দলেই ফেরেননি, বরং ব্রেন্ডন রজার্সের অধীনে ২০১৩-১৪ মৌসুমের সেই বিখ্যাত শিরোপা লড়াইয়ের অন্যতম মূল কারিগর হয়ে ওঠেন।
২০১৫ সালে লিভারপুলের সর্বকালের অন্যতম সেরা অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ড যখন অ্যানফিল্ড ছাড়েন, তখন ক্লাবের নতুন অধিনায়ক হিসেবে জর্ডান হেন্ডারসনের নাম ঘোষণা করা হয়। জেরার্ডের মতো এক মহীরুহের জায়গা নেওয়াটা ছিল পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ। সমর্থক থেকে শুরু করে মিডিয়া সবাই হেন্ডারসনের নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু রজার্সের পর যখন ইয়ুর্গেন ক্লপ লিভারপুলের দায়িত্ব নেন, তখন জর্ডান হেন্ডারসনের ক্যারিয়ারে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। ক্লপ হেন্ডারসনের ভেতরের নেতৃত্বগুণকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি হেন্ডারসনকে মাঠের আসল ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

২০১৯ সালের জুনে টটেনহ্যাম হটস্পারকে হারিয়ে লিভারপুল যখন তাদের ষষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতে, তখন মাদ্রিদের আকাশে হেন্ডারসনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্যটি অলরেড সমর্থকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল। এর ঠিক পরের বছর, ২০২০ সালে দীর্ঘ ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লিভারপুল যখন প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন হেন্ডারসনকে ‘এফডব্লিউএ ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়। তিনি প্রমাণ করেন, নেতৃত্ব দিতে কেবল জাদুকরী পায়ের প্রয়োজন হয় না, দরকার হয় একটি বিশাল হৃদয়ের।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে জর্ডান হেন্ডারসন তাঁর ১২ বছরের লিভারপুল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। তিনি তাঁর প্রাক্তন সতীর্থ স্টিভেন জেরার্ডের কোচিংয়ে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-ইত্তিফাকে যোগ দেন। তবে এই দলবদলটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
সৌদি আরবের পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে মাত্র ৬ মাসের মাথায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি আল-ইত্তিফাক ছেড়ে ডাচ জায়ান্ট আয়াক্সে যোগ দেন। সেখানে নিজের ফর্ম ফিরে পাওয়ার পর, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে তিনি পুনরায় প্রিমিয়ার লিগে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ব্রেন্টফোর্ডের সাথে দুই বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ব্রেন্টফোর্ডের মাঝমাঠে তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দলটিকে প্রিমিয়ার লিগে বেশ শক্ত অবস্থানে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
২০১০ সালে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে থ্রি-লায়ন্সদের মাঝমাঠের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক জর্ডান হেন্ডারসন। তিনি ২০১২, ২০১৬ এবং ২০২০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পাশাপাশি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
বর্তমান ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল মাইনুর মতো তরুণদের মেন্টরিং এবং মাঠের ভেতরে ট্যাকটিক্যাল ভরসা হিসেবে হেন্ডারসনকে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার মাধ্যমে হেন্ডারসন এক অনন্য ও ঐতিহাসিক রেকর্ডের মালিক হতে যাচ্ছেন। তিনিই প্রথম ইংলিশ খেলোয়াড় যিনি দেশের হয়ে টানা ৭টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
মাঠের ভেতরে জর্ডান হেন্ডারসন যেমন একজন লড়াকু অধিনায়ক, মাঠের বাইরে তিনি তেমনই একজন শান্ত ও আদর্শ পারিবারিক মানুষ। জর্ডান হেন্ডারসনের স্ত্রীর নাম রেবেকা বার্নেট। হেন্ডারসন যখন তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুতে সান্ডারল্যান্ডের যুব দলে খেলতেন, তখন রেবেকার সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তখন থেকেই তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়েন।

দীর্ঘ কয়েক বছর সফলভাবে প্রেম করার পর, ২০১৪ সালে তাঁরা পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জর্ডান হেন্ডারসন এবং রেবেকা দম্পতি বর্তমানে তিন সন্তানের জনক-জননী। তাঁদের দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যাদের নাম অ্যালেক্সা এবং অ্যালবা। ২০২০ সালে লিভারপুলের ঐতিহাসিক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের ঠিক কিছুকাল আগে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় একমাত্র পুত্রসন্তান মাইলস।
জর্ডান হেন্ডারসনের সফলতার পেছনে তাঁর বাবা ব্রায়ান হেন্ডারসন এবং মা লিজ হেন্ডারসন-এর অবদান অনস্বীকার্য। হেন্ডারসনের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়টি জড়িয়ে আছে তাঁর বাবার সাথে। ২০১৩ সালে তাঁর বাবা ওরাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তিনি চাননি বাবার কষ্ট দেখে হেন্ডারসনের ফুটবলে মনোযোগ নষ্ট হোক, তাই তিনি হেন্ডারসনকে হাসপাতালে আসতেও নিষেধ করেছিলেন। ২০১৯ সালে লিভারপুল যখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে, তখন গ্যালারিতে থাকা ক্যান্সারমুক্ত বাবাকে জড়িয়ে ধরে হেন্ডারসনের অঝোরে কাঁদার দৃশ্যটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা পারিবারিক ও আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে।

জর্ডান হেন্ডারসনের ব্যক্তিগত জীবন কোনো ধরনের স্ক্যান্ডাল বা বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও ভালোবাসায় ঘেরা, যা তাঁকে তরুণ ফুটবলারদের জন্য একজন পারফেক্ট ফ্যামিলি ম্যান হিসেবে উপস্থাপন করে।
Reference :

