“I’ll give it to Paris. Even when you have a bad day, the city is looking great”
এমিলি ইন প্যারিসxa0 টিভি সিরিজটিতে এমিলির বলা এই লাইনটি প্যারিসের জাদুকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলে। যেকোনো পরিস্থিতি হোক না কেন এই শহরের আভা, সৌন্দর্য এবং পরিবেশ কখনই আপনাকে হতাশ করে না। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ শহরগুলির মধ্যে একটি হল প্যারিস। এটি ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য এবং ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। প্যারিসের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরানো, যেখানে যুগ যুগ ধরে নানা রাজনীতি, যুদ্ধ, সংস্কৃতি এবং শিল্পের উত্থান-পতন ঘটেছে।xa0
| দেশ | ফ্রান্সxa0 |
| অঞ্চল | ইল্u200c-দ্য-ফ্রঁস, প্যারিসxa0 |
| আয়তন | ১০৫.৪ বর্গকিমি |
| জনসংখ্যাxa0 | প্রায় ২১,০২,৬৫০ জন (২০২৩ ) |
| সরকারি ভাষা | ফরাসি |
| প্রধান মুদ্রা | ইউরো |
| সময় অঞ্চল | সিইটি (ইউসিটি +০১ঃ০০) |
| আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | শার্ল দ্য গোল বিমানবন্দর |
প্যারিস অবস্থান ও জলবায়ু
প্যারিস, পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্র ফ্রান্সের রাজধানী। এটিকে অনেকেই “লা ভিলে লুমিয়ের” বা “লাইটের শহর” বলে। সেন নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি তার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, ক্যাফে কালচার এবং আইফেল টাওয়ারের জন্য বিখ্যাত।
প্যারিসের জলবায়ু একটি সমভাবাপন্ন (Oceanic Climate)। শহরটি গ্রীষ্মকাল বেশ উষ্ণ হলেও খুব একটা তাপদাহ হয় না। শীতকালে তাপমাত্রা মাঝারি ঠান্ডা থাকে, তবে, খুব কম সময় জন্য বরফ পড়ে। বসন্ত এবং শরৎকালেxa0 শহরটির আবহাওয়া সবচেয়ে মনোরম থাকে। এই সময় ফুলের সৌন্দর্যে আর রঙিন পাতায় শহরটকে অসাধারণ দেখায়। প্যারিসের জলবায়ুর মজার বিষয়টি হলো যে, প্যারিসে সারা বছরই হালকা বৃষ্টিপাত হয়, তাই লোকজন সবসময় সাথে ছাতা রাখে।
ম্যাপ
প্যারিসের ইতিহাস
কখনো কি আপনার মনে প্রশ্নটি এসেছে যে, প্যারিস আসলো কোথা থেকে? সেই শুরু থেকেই কি প্যারিস এমন ছিল?
অনেকে ভাবে প্যারিস মানে শুধু প্রেম আর আলোর শহর। তবে, আসলে এর পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক জমজমাট কাহিনি। ইতিহাস বলে, প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন এই নগরী । ইতিহাসের অনেক বীরযোদ্ধা, রাজা, মহারাজা সহ অনেক মহিরথীদের আদি ভূমি ছিল এই প্যারিস।xa0
প্রাচীনকালে প্যারিস
প্রাচীন গ্যালিক উপজাতি, যাদের প্যারিসি বলা হয়, ওরাই প্রথম এই জায়গাটা আসে। তখন জায়গাটার নাম ছিল “লুটেটিয়া”। পরবর্তীতে রোমানরা এসে পুরো এলাকা দখল করে এবং শহরটা নিজেদের মতো করে সাজায়।
মধ্যযুগে প্যারিস: নতুন নামxa0
৫ম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর, ফ্রাঙ্কিশরা শহরটি দখল করে এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখে প্যারিস।xa0
এছাড়া বাস্তিল দুর্গের পতন ১৭৮৯ সালের একটি মাইলফলক ছিল ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে। প্যারিসে থাকা এই দুর্গ তখন মূলত রাজা-বাদশাদের বিরোধীদের আটক রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো।আর সাধারণ মানুষের কাছে এটা ছিল রাজতন্ত্রের অত্যাচারের প্রতীক। যখন ফরাসি জনগণ এটাকে আক্রমণ করে, তখন একরকম রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ প্রকাশ পায়।এই ঘটনার পর থেকে ফ্রান্সে প্রতি বছর ১৪ জুলাই “ব্যাস্টিল ডে” হিসেবে উদযাপিত হয়।

রেনেসাঁ এবং আধুনিক যুগ
১৬শ এবং ১৭শ শতকে, প্যারিস রেনেসাঁ শিল্প, সাহিত্য, এবং স্থাপত্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৭৮৯ সালে, ফরাসি বিপ্লব প্যারিস থেকে শুরু করে ১৯শ শতকের প্রথম দিকে, নেপোলিয়ন বোনাপার্টর প্যারিসকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।xa0
প্যারিস কমিউন:
এটি ১৮৭১ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্যারিসে এক সমাজতান্ত্রিক সরকার ছিল। ফ্রান্স-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পর, যখন ফরাসি সরকার ভার্সাইয়ে চলে যায়|তখন প্যারিসের শ্রমিকরা নিজেদের সরকারের সূচনা করে। এই কম্যুনের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিক শ্রেণীর শাসন, সমতা আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যে, ১৮৭১ সালের মে মাসে ভার্সাইয়ের সেনারা প্যারিসে আক্রমণ করে এবং রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর কমিউনিস্টদের পতন ঘটে।xa0
আধুনিক যুগে প্যারিস
১৯ শতকে শহরটা শিল্প, সাহিত্য আর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আইফেল টাওয়ার সেই সময়েরই ফলাফল। মজার ব্যাপার হলো, তখন অনেকেই এই স্থাপনাকে পছন্দ করে নি!! আবারxa0 অনেকে বলত, “এই লোহার জঞ্জালটাই শহরটাকে নষ্ট করে দেবে।” কিন্তু এখন? এই আইফেল টাওয়ারই প্যারিসের আইকন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরে প্যারিস ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতেও অসাধারণ সফলতা দেখিয়েছিল। যুদ্ধের সময় জার্মান দখলে থাকা সত্ত্বেও প্যারিস শহরের বড় কোন ক্ষতি হয়নি। তবে সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশাল ক্ষতি হয়েছিল।xa0
কিন্তু যেহেতু প্যারিস তার শিল্প, সাহিত্য, এবং ফ্যাশনের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শিল্পীরা শহরটিকে পুনরায় সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে কাজ শুরু করেন। বিখ্যাত শিল্পকলা প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র, এবং ফ্যাশন শোগুলো পুনরায় চালু করা হয়। যার ফলে অনেক দ্রুত প্যারিস তার চিরচেনা রূপে ফেরত আসে।xa0
প্যারিসের অর্থনীতি ও শিল্প
প্যারিসের অর্থনীতিxa0
ফ্রান্সের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হলো প্যারিস। শহরটির অর্থনীতি অনেকগুলো স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, যার মধ্যে অন্যতম হল ট্যুরিজম, ফ্যাশন, আর্ট, টেকনোলজি, এবং ফাইন্যান্স। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসে শুধু আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর মিউজিয়াম আর নটর ডেম দেখার জন্য। ট্যুরিজম খাত থেকেই শহরটি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।

সদর দপ্তরের শহর প্যারিস
প্যারিস শুধু ফ্রান্সের নয়, পুরো ইউরোপের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি। এইখানে অবস্থিত “লা ডিফেন্স” ইউরোপের বৃহত্তম আর্থিক জেলা। এখানে শত শত ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং পরামর্শক সংস্থার অফিস রয়েছে। শহরটিতে OECD (Organisation for Economic Co-operation and Development) এবং UNESCO-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সদর দপ্তর রয়েছে।xa0
ফ্যাশন ক্যাপিটাল প্যারিস
ফ্যাশনের কথা বললে, প্যারিস বিশ্বব্যাপী “ফ্যাশন ক্যাপিটাল” হিসেবে পরিচিত। LV, MN, CHANEL, DIOR মতো ব্র্যান্ডগুলো সদর দপ্তর প্যারিসে অবস্থিত। প্যারিস ফ্যাশন উইক আর ডিজাইনার শো-এর মাধ্যমে প্যারিস শুধু ফ্যাশনের ধারা ঠিক করে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিরও একটা বড় অংশে প্রভাব ফেলে।

প্যারিস প্রযুক্তি এবং স্টার্টআপ খাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। শহরটিতে ইউরোপের অন্যতম বড় স্টার্টআপ হাব রয়েছে। যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে, যা শুধু ফ্রান্স নয়, গোটা ইউরোপে প্রভাব ফেলছে।
বিনোদন
প্যারিসের ‘ক্যাবারে শো’ থেকে শুরু করে আধুনিক থিয়েটার—সবকিছুতেই মুগ্ধতার ছোঁয়া রয়েছে। প্যারিস ক্যাবারে শো হলো এক ধরনের বিশেষ বিনোদনমূলক পরিবেশনা, যা নাচ, গান, কমেডি এবং থিয়েটারের মিশ্রণে গঠিত। ক্যাবারে শো-গুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো সাধারণত রেস্তোরাঁ বা ক্লাবের মধ্যে ছোট পরিবেশে মঞ্চস্থ হয়, যেখানে দর্শকরা খাবার ও পানীয় উপভোগ করতে করতে শো দেখতে পারেন।

চলচ্চিত্র
প্যারিস চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানেই “নুভেল ভাগ” নামে পরিচিত ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্ম। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য ল্যুভ বা নটরডেমের মতো স্থাপত্যশৈলী অনেকবার বড় পর্দায় জায়গা করে নিয়েছে। “প্যারিসের প্রেক্ষাপটের অনেক বিখ্যাত সিনেমা রয়েছে, যেমনঃ Amélie (2001), Midnight in Paris (2011), Moulin Rouge! (2001), La La Land, Before sunset, Taken.
চিত্রকলা
প্যারিস মানেই ল্যুভর মিউজিয়াম। এখানে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনা লিসা বা ডেলাক্রোয়ার বিখ্যাত লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল দেখার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। এছাড়া মোনমার্ত্র, যেখানে একসময় পিকাসো ও ভ্যান গঘের মতো শিল্পীরা তাঁদের কাজ করতেন।xa0
প্যারিস এর পর্যটন আকর্ষণxa0
প্যারিস ঘুরতে গেলে এক কথায় মুগ্ধ হতেই হবে! শহরটি মূলত প্রেম, আর্ট, আর ইতিহাসের একটা প্যাকেজ।xa0xa0
আইফেল টাওয়ারxa0
আইফেল টাওয়ার, প্যারিসের অন্যতম আইকনিক একটি স্থাপনা। এটি ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯ সাল, মোট তিন বছর ধরে এই টাওয়ার তৈরি করা হয়। এই টাওয়ারটির নকশা করেছিলেন ফরাসি স্থপতি গুস্তাভ আইফেল। তাঁর নামেই এই টাওয়ারটি পরিচিতি লাভ করেছে।
শুরুতে অনেকে এর নকশা প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সঙ্গে বেমানান বলে মনে করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধুমাত্র প্যারিস নয়, পুরো ফ্রান্সের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আইফেল টাওয়ারে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে রেস্তোরাঁ ও প্রদর্শনী হল রয়েছে। তৃতীয় স্তরটিতে রয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ ডেক। লিফট দিয়ে উপরে উঠে চারদিকে তাকালে পুরো প্যারিসের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে।xa0

ল্যুভর মিউজিয়ামxa0
ল্যুভর মিউজিয়াম শিল্পপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ জায়গা! এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্ট মিউজিয়াম এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এটি ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সের বিপ্লবের পর সরকারি মিউজিয়াম এটি হিসেবে খোলা হয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রাপ্ত মিউজিয়াম হলো এই ল্যুভর মিউজিয়াম।
জাদুঘরটির বাইরের দিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ হল কাঁচের পিরামিড, যা মিউজিয়ামের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঁচের পিরামিডটি ১৯৮৯ সালে নির্মিত হয়। মিউজিয়ামের ভেতরে তিন লক্ষেরও এরও বেশি শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোনালিস, ভেনাস দ্য মাইলো, উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেসের মতো বিশ্বখ্যাত মাস্টারপিস।

নটর ডেম ক্যাথেড্রালxa0
নটর ডেম ক্যাথেড্রাল (Notre-Dame Cathedral) প্যারিসের একটি অত্যন্ত বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক গথিক ক্যাথেড্রাল। এটি প্যারিসের সেন্ট-টেনি দ্বীপে সীন নদীর তীরে অবস্থিত।xa0
এই স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উঁচু সিলিং, সুদৃশ্য ভেন্টিলেটর, উজ্জ্বল গ্লাস জানালা, এবং বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য। ক্যাথেড্রালের অভ্যন্তরীণ অংশে রয়েছে বেশ কয়েকটি রঙিন গ্লাসের জানালা, যার মাধ্যমে সূর্যের আলো প্রবেশ করলে ক্যাথেড্রেলটি বিভিন্ন রঙের আলোতে সজ্জিত হয়। এই গ্লাসের জানালাগুলি আবার ক্যাথেড্রেলের দেয়ালে আঁকা বাইবেল এবং অন্যান্য ধর্মীয় কাহিনীকে গুলোকে আলোকিত করে। এই দৃশ্য মনে অসধারণ এক ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে।

স্যাক্রে-ক্যুর
স্যাক্রে-ক্যুর (Sacre-Cœur) প্যারিসের একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং শান্তিপূর্ণ গির্জা। এটি শহরের মনমার্ট্র হিলের চূড়ায় অবস্থিত। এই গির্জাটি গথিক ও রোমান স্থাপত্য শৈলিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এই গির্জার অন্যতম আকর্ষণ হলো, সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি বেলকনি। এই বেলকনি থেকে পর্যটকেরা পুরো শহরের অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। যদি আপনি প্যারিসে এসে থাকেন,তাহলে স্যাক্রে-ক্যুরের উপর থেকে সূর্যাস্তের সময় শহরের দৃশ্য দেখা হতে পারে খুবই মনোমুগ্ধকর একটি অভিজ্ঞতা।xa0
প্যালাইস দে লা ডেকোভার্তে
এটি প্যারিসের একটি অন্যতম বৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিউজিয়াম।যা আপনাকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের জগতে যাত্রা করাবে। মিউজিয়ামটি প্যারিসের বিলিওকোর্ট পার্কে অবস্থিত।
মিউজিয়ামটিতে-তে নানা ধরনের ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী রয়েছে,। আপনি যদি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মহাকাশ, জীববিজ্ঞান, পরিবেশ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত দিকে আগ্রহী হন, এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। এখানে ভিজুয়াল ডিসপ্লে, মোশন সিমুলেটর, টাচ স্ক্রিন প্যানেল এবং রোবটিক্স শো-এর মতো অনেক ইন্টারঅ্যাকটিভ কার্যক্রম হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকে।
প্যারিসের সংস্কৃতি ও জীবনধারা
প্যারিস শহরের সাংস্কৃতিক এবং জীবনধারা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। শহরটির সংস্কৃতির মূল হচ্ছে এর ফ্যাশন, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত।
প্যারিসের ফ্যাশন সংস্কৃতি
প্যারিসের ফ্যাশন সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোচিত। এখানকার মানুষরা ফ্যাশনের প্রতি খুবই সচেতন, আর এ কারণেই তাদের পোশাকের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিত্ব আর শ্রেণীর প্রতিফলন দেখা যায়। এখানে ফ্যাশন শুধুমাত্র একটি স্টাইল বা ট্রেন্ড নয়, বরং এটি একটি জীবনধারা আর শিল্পের অংশ। প্যারিসের রাস্তায় হাঁটলেই বুঝবেন, এখানে পোশাকের ধরন যেন একটা চলন্ত ফ্যাশন শো।
প্রতি বছর শহরটিতে প্যারিস ফ্যাশন উইক (Paris Fashion Week) আয়োজন করা হয়। এই শো ফ্যাশন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ইভেন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই ইভেন্টে বিশ্বের নামকরা ডিজাইনাররা তাদের নতুন কালেকশন প্রদর্শন করেন।xa0
প্যারিসের সাহিত্য
প্যারিসের সাহিত্য জগতে ভিক্টর হুগো, মার্সেল প্রুস্ত, জাঁ-পল সার্ত্র, আলবেয়ার কাম্যু ও এরিস্টিড ব্রায়ান-এর মতো লেখকদের বিশাল অবদান রয়েছে। “লা মিজারেবল”, “ইন সার্চ অব লস্ট টাইম”, “দ্য স্ট্রেঞ্জার”– এসব সাহিত্যকর্ম প্যারিসের প্রেক্ষাপটে রচিত। এছাড়া শহরটিতে Paris Book Fair, Festival Quartier du Livre-এর মতো সাহিত্য উৎসব নিয়মিত আয়োজন করা হয় ।

প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী খাবার
ফরাসি রান্নার শৈলী বৈচিত্র্যময় ও সুস্বাদু। স্যুপ, মাংসের পদ, সমুদ্রজাতীয় খাবার, ডেজার্ট ও পেস্ট্রির মিশ্রণে প্রতিটি রেস্তোরাঁ আপনি পাবেন এক অনন্য স্বাদের অভিজ্ঞতা। ক্রোয়াসান থেকে শুরু করে, ব্যাগুয়েট,-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত খাবার প্যারিসের অংশ।
ফরাসিরা শামুক, গুগলি, ঝিনুক ইত্যাদি খেতে খুব পছন্দ করে। এদের মাছের বাজারগুলোর অনেকটাই দখল করে থাকে নানা প্রজাতির শামুক ও ঝিনুক। ফরাসিদের আরেকটি পছন্দের খাবার হল ফোয়া গ্রার। যার অর্থ হচ্ছে চর্বিযুক্ত মোটা কলিজা। বিভিন্ন পালা-পার্বণ এবং উৎসবে এদের খাবার টেবিলের অন্যতম আকর্ষণ এই সুস্বাদু খাবার। তা ছাড়া বিভিন্ন বনেদি রেস্তোরাঁ তাদের নিজেদের ফোয়া গ্রার উৎকর্ষ নিয়ে বেশ বড়াই করে।

প্যারিসের ক্যাফেগুলো কেবল খাবারের জন্য নয়, বরং, গল্প করা, সময় কাটানো ও এক কাপ কফির সঙ্গে দিন শুরু করার জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
প্যারিসের জীবনযাত্রা
প্যারিসের জীবনধারা একদমই আলাদা এবং বেশ সৃষ্টিশীল। এখানকার মানুষরা খুব চাপের মধ্যে জীবন কাটান না। বরং, তারা জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসেন। প্যারিসের রাস্তায় হাঁটলে দেখতে পাবেন, মানুষজন তাড়া করেন না। তারা ধীর গতিতে হাঁটেন, আর, শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। প্যারিসের রাসাতায় হাটলেই দেখা যাবে, কেউ কেউ কফির কাপ হাতে হাঁটছেন, তো কেউ আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে রাস্তার পাশের ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিচ্ছে।xa0
প্যারিসের রোমান্সxa0
প্যারিস কে বলা হয় রোমান্সের শহর। এখানে যেন প্রেম বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকে। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ক্যাফে, আর প্রতিটি পুরনো ভবন একেকটা প্রেমের গল্প বলে। আইফেল টাওয়ার থেকে শুরু করে সেইন নদীর ধারে হাত ধরে হাঁটা, বা নদীর ওপর ছোট্ট সেতুগুলোর একপাশে দাঁড়িয়ে সুর্যাস্ত দেখা—এগুলো মনে করিয়ে দেয় কেন প্যারিসকে ভালোবাসার শহর বলা হয়।
প্যারিসের ক্যাফেগুলোও যেন একেকটা প্রেমের কেন্দ্র। সেখানে বসে কফি চুমুক দিতে দিতে মানুষজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। কেউ নিজের সঙ্গীর সঙ্গে মেতে থাকে, কেউ বা কল্পনায় নতুন কোনো প্রেমের গল্প তৈরি করে।xa0
আর প্যারিসের ছোট ছোট রাস্তা? সেখানে হাঁটলে মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। পুরনো বাড়িগুলো, বেগুনি রঙের ঝুলন্ত ফুল, আর রাস্তার কোণায় বসা শিল্পীর গান যেন এক মনোরোম রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি করে। এখানে আসা মানে নিজের জীবনের গল্পে নতুন একটা রোমান্সের অধ্যায় যোগ করা।xa0

প্যারিস যোগাযোগ ব্যবস্থা
প্যারিস বিশ্বের অন্যতম পর্যটন শহর হওয়ায় এর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও সহজ। মেট্রো, বাস, ট্রাম, আরইআর (RER) ট্রেনসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থার কারনে, এখানে চলাচল করা বেশ আরামদায়ক ।
মেট্রো – সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন
প্যারিসের মেট্রো শহরের প্রধান গণপরিবহন। যা যেমন দ্রুতগামী, তেমন সাশ্রয়ী। শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণস্থানে মেট্রো সংযোগ রয়েছে। যা পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য ভ্রমণকে আরও সহজ করে তোলে।
আরইআর (RER) ট্রেন – দূরবর্তী ভ্রমণের জন্য
যারা শহরের বাইরের অঞ্চলে যেতে চান, তাদের জন্য RER ট্রেন পারফেক্ট। RER (Réseau Express Régional) হল প্যারিস ও আশপাশের শহরের মধ্যে দ্রুত চলাচলের জন্য একটি আঞ্চলিক এক্সপ্রেস ট্রেন ব্যবস্থা। এটি মেট্রোর চেয়ে অনেকটাই দ্রুতগতির।
বাস ও ট্রাম – আরামদায়ক বিকল্প
শহরের বিভিন্ন এলাকায় সহজে চলাচলের জন্য অনেকে বাস ও ট্রামxa0 ব্যবহার করে । ট্রামগুলো মূলত শহরের আশপাশের অঞ্চলে আর বাসগুলো শহরের প্রতিটি কোণায় দেখা যায়।
ট্যাক্সি ও রাইড-শেয়ারিং সার্ভেস
প্যারিসে প্রচুর ট্যাক্সি পাওয়া যায়।প্যারিসে উবার (Uber), বল্ট (Bolt), গাই৭ (G7) এর মতো রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসও রয়েছে । যা সহজেই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডাকা যায়।
সাইকেল সুবিধা
আপনি যদি সাইকেলপ্রেমীদের হয়ে থাকেন, আপনার জন্য রয়েছে Vélib’ নামক বাইক শেয়ারিং অ্যাপ । যা বেশ সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প।

প্যারিস তার ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, ফ্যাশন ও সৌরভ দিয়ে প্রতি বছর অগণিত আগন্তুককে মুগ্ধ করছে। মনে হবে, শহরটির প্রতিটি অলিগলি যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। তাই আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন (Thomas Jefferson) একবার প্যারিস সম্পর্কে বলেছিলেন,xa0
“এই শহরের রাস্তা দিয়ে একবার হেঁটে গেলেও মানুষ ইতিহাস, সৌন্দর্যবোধ ও জীবন্ত দর্শনের নতুন আঙ্গিক খুঁজে পায়।”
প্যারিস সম্পর্কে মজার কিছু তথ্যঃ
১. প্যারিসে মাত্র একটি “স্টপ” সাইন!
পুরো শহরটিতে মাত্র একটি “স্টপ” সাইন রয়েছে। যা ১৬তম আর্মিসমেন্টে (arrondissement) একটি বিল্ডিং এর কাছে অবস্থিত।
২. কুকুরদের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা
প্যারিসিয়ানরা তাদের কুকুরদের প্রতি বেশ যত্নশীল। এমন বলা হয় যে, শহরটিতে কুকুরের সংখ্যা শিশুদের থেকেও বেশি! সেখানে কিছু রেস্টুরেন্টে কুকুর নিয়ে ঢোকার অনুমতি আছে।
৩. সিনেমার শহর
প্যারিসের রাস্তায় এখন পর্যন্ত ১১০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও ১৬১টি এক রিলের ছবি শুটিং হয়েছে। এইসব শুটিং শেষ করতে মোট ৩৩৩৯ দিন সময় লেগেছে!
৪. সেরা বেকারের প্রতিযোগিতা
প্রতিবছর প্যারিসে সেরা বেকার নির্বাচনের একটি প্রতিযোগিতা হয়। যেখানে বিজয়ীকে ফরাসি প্রেসিডেন্টের জন্য নিজ হাতে রুটি তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হয়।
৫. প্যারিসের মেট্রো: নিজ দায়িত্বে দরজা খোলা!
প্যারিসের মেট্রোতে যাত্রীদের নিজেদেরই দরজা খুলতে ও বন্ধ করতে হয়। আরও মজার ব্যাপার,মেট্রোতে স্টেশনের নাম ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা নেই।তাই গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে,আপনার গন্তব্য পার হয়ে গেল কিনা টা নিয়ে!
৬. ফরাসি ভাষার প্রতি অনুরাগ
প্যারিসে যদি আপনি ইংরেজিতে কিছু জানতে চান, বেশিরভাগ সময় ফরাসিতে উত্তর পাবেন! কারণ, প্যারিসিয়ানরা নিজেদের ভাষার প্রতি বেশ অনুরাগী । তারা ইংরেজিতে কথা বলাকে খুব একটা পছন্দ করে না ।xa0

