Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

রহস্যময় মায়ান সিম্বলিজম এর বিস্ময়কর অর্থ!

মায়াদের প্রতীক কি আত্মার গুপ্তভাষা? নাকি হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানের সূত্র?xa0

মায়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে ছড়িয়ে থাকা প্রতীকগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, এগুলো নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন। কিন্তু যদি বলি, এই চিহ্নগুলোর কিছু গাণিতিক হিসাব মিলে যায় আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে, বিশ্বাস করবেন? ক্যালেন্ডার, গণিত, এমনকি তাদের মন্দিরের স্তম্ভে লুকিয়ে থাকা সব সংকেত, আজও বিজ্ঞান আর দর্শনকে বিস্মিত করে।xa0

মায়াদের প্রতিটি চিহ্ন যেন মানুষের বোঝার বাইরে। তাদের পবিত্র ‘চাক মোল’ কি শুধুই কৃষির দেবতার প্রতীক, নাকি সেটি আসলে এলিয়েন সাথে যোগাযোগের কোড? পিরামিডের সিঁড়িতে খোদাই করা ‘সাপের আকার’ কি কেবলই ধর্মীয় বিশ্বাসের ছায়া, নাকি প্রাচীন শক্তির প্রবাহ চিত্র? মায়ান ভাষার প্রতিটি চিত্রলিপি, সংখ্যার পেছনে যেন লুকিয়ে আছে সাইন্স, ধর্ম আর দর্শনের এমন এক জটিল মিশ্রণ।xa0xa0

এখন প্রশ্ন মায়ারা কি এমন জানত, যা আমরা এখনও জানি না? চলুন আজকের ব্লগে তাদের কিছু প্রতীকের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি।xa0xa0xa0

মায়া ক্যালেন্ডারের অর্থ

মায়া সভ্যতার ক্যালেন্ডার

মায়ানদের মোট চারটি ক্যালেন্ডার ছিল। প্রতিটি ক্যালেন্ডারই মায়াদের ধর্মীয় ও কৃষি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।xa0

টলকিন (Tzolk’in) ক্যালেন্ডারxa0

টলকিন প্রাচীন মায়া সভ্যতার গভীর জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে তৈরি একটি ক্যালেন্ডার। ২৬০ দিনের এই ক্যালেন্ডারটি মায়াদের দৈনন্দিন জীবন, আচার-অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অন্যতম ভিত্তি ছিল।xa0

টলকিন ক্যালেন্ডার

সংখ্যা ও প্রতীকের যুগলবন্দি

টলকিনের মূল কাঠামো দুটি অংশের সমন্বয় গঠিত: ১৩টি সংখ্যা (১ থেকে ১৩) ও ২০ টি দিনের নাম (ইমিক্স, ইক, আকবাল, কান, চিকচান, কিমি, মানিক, লামাত, মুলুক, অক, চুয়েন, ইব, বেন, ইক্স, মেন, কিব, কাবান, এত্জনাব, কাওক, আহাউ)।xa0

এই সংখ্যা ও নামের সংমিশ্রণে তৈরি হয় ২৬০ দিনের চক্র। উদাহরণস্বরূপ, বছরের প্রথম দিনটি “১ ইমিক্স”, দ্বিতীয় দিন “২ ইক”, তৃতীয় দিন “৩ আকবাল” এবং শেষ দিন “১৩ আহাউ”। এখানে দুইটি চক্র আলাদা আলাদা চলতে থাকে। এই ক্যালেন্ডারের কোন মাস নেই। প্রতিটি দিনের নামের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্থ রয়েছে। যেমনঃxa0

  • ইমিক্স (Imix) – পানি ও জন্মের প্রতীক।
  • ইক (Ik’) – বাতাস ও নতুন শুরুর প্রতীক।
  • চিকচান (Chikchan) – সর্প, রূপান্তর ও শক্তির প্রতীক।
  • আহাও (Ajaw) – সূর্য ও নেতৃত্বের প্রতীক।xa0xa0

উৎপত্তি ও ব্যবহারxa0

টলকিনের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের নানা মত রয়েছে। কেউ মনে করেন এটি শুক্র গ্রহের আবর্তন, আবার কেউ বলেন মানব গর্ভধারণের গড় সময়কাল (প্রায় ৯ মাস) থেকে অনুপ্রাণিত। এছাড়া, প্রাকৃতিক চক্র ও কৃষির সময়সূচির সাথেও এর সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

মায়ারা বিশ্বাস করতো যে, প্রতিটি দিন একটি বিশেষ শক্তি বহন করে। ফলে, শিশুর জন্ম, বিবাহ, রাজ্য শাসনের সময় নির্ধারণ, সবকিছুই এই ক্যালেন্ডার অনুসারে করা হতো। এছাড়াও, মায়া পুরোহিত ও জ্যোতিষীরা, শুভ ও অশুভ দিন নির্ধারণের জন্য, কৃষিকাজ, ফসল রোপণ ও সংগ্রহের সঠিক সময় জানতে, যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে, ব্যক্তির জন্মতারিখ অনুযায়ী ভাগ্য নির্ধারণে এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত।

আধুনিক যুগে টলকিন

যদিও মায়া সভ্যতা বিলুপ্ত হয়েছে। তবুও টজলকিন আজও জীবিত। গুয়াতেমালার মাম সম্প্রদায় এবং মেক্সিকোর কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী এখনও এই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি পালন করে।xa0

হাব’ (Haab’) ক্যালেন্ডার

মায়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যালেন্ডার ছিল হাব’ (Haab’)। এটি আমাদের বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতোই ৩৬৫ দিনের সৌর ক্যালেন্ডার। মায়ারা এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতো ঋতু পরিবর্তন, কৃষিকাজ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক কাজের সময় ঠিক করার জন্য। এটি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

হাব ক্যালেন্ডার

হাব’ ক্যালেন্ডারের কাঠামো

হাব ক্যালেন্ডারে মোট ৩৬৫ দিন থাকে। এই ক্যালেন্ডারে ১৮টি মাস এবং প্রতিটি মাসে ২০টি করে দিন থাকে। ১৮টি মাসে মোট ৩৬০ দিন থাকে। বাকি ৫ দিনকে “উয়েব’ (Wayeb’)” বলা হয়।xa0

প্রতিটি মাসের একটি নির্দিষ্ট নাম ও অর্থ ছিল। যেমন- পোপ (Pop) মাসকে নতুন শুরুর সময় ধরা হতো, ইয়াক্সকিন (Yaxk’in) ছিল সূর্যের শক্তির মাস, মোল (Mol) বৃষ্টি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত, আর পাক্স (Pax) যুদ্ধ ও সুরক্ষার সময় হিসেবে বিবেচিত হতো।

বছরের শেষ ৫ দিনকে অশুভ বলে মনে করা হতো। মায়ারা বিশ্বাস করত, এই সময়ে দেবতারা অসন্তুষ্ট থাকেন।এই সময় অশুভ শক্তির প্রভাব বাড়ে। তাই, তারা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করত এবং অযথা বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলত।

গুয়াতেমালার কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় এখনো এই ক্যালেন্ডারের অনুসরণে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে। পাশাপাশি, জ্যোতির্বিদ ও ঐতিহাসিকরা আজও হাব’ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।xa0xa0

ক্যালেন্ডার রাউন্ড: সময়ের চক্র এবং মায়াদের বিস্ময়কর গণনা

প্রাচীন মায়ারা সময়কে আমাদের মতো সরলরেখায় দেখত না। তাদের কাছে সময় ছিল একটি চক্র, একটি ঘূর্ণমান চাকা, যা ঘুরে ঘুরে একই বিন্দুতে ফিরে আসে। এই চিন্তাভাবনার ভিত্তিতেই তারা তৈরি করেছিল ক্যালেন্ডার রাউন্ড। এই ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা জটিল। ৫২ বছরে এই ক্যালেন্ডারের একটি চক্র পূর্ণ হয়।

সময়ের চক্র এবং মায়াদের বিস্ময়কর গণনা

ক্যালেন্ডার রাউন্ড কী?

ক্যালেন্ডার রাউন্ড মূলত দুটি ভিন্ন ক্যালেন্ডার মিলিয়ে তৈরি। প্রথমটি ছিল টলকিন (Tzolk’in) এবং দ্বিতীয়টি ছিল হাব’ (Haab’)। এই দুইটি ক্যালেন্ডার একসঙ্গে চলতে থাকে। এই হিসেবে ১৮,৯৮০ দিন পর (৫২ বছর) একই তারিখ আবার ফিরে আসে। এটি ছিল ক্যালেন্ডার রাউন্ড।xa0

আমাদের আধুনিক ক্যালেন্ডারে যেমন ২০২৪ সালের ১১ মার্চের পর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ আসে, কিন্তু মায়াদের ক্যালেন্ডারে একটি নির্দিষ্ট তারিখ আবার ফিরে আসতে ৫২ বছর লেগে যেত!xa0

কেন ৫২ বছর এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

মায়াদের কাছে ৫২ বছর ছিল একটি পূর্ণ চক্র। তারা মনে করত এই সময়ের শেষে পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে। চক্র পুরন হলে মায়ানরা আগুনের উৎসব পালন করত, যেখানে সমস্ত আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো এবং তারপর নতুন ভাবে আগুন জ্বালিয়ে নতুন চক্র শুরু করা হতো।

যদিও মায়া সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু আজও কিছু জনগোষ্ঠী এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে ধর্মীয় উৎসব, কৃষিকাজ ও ব্যক্তিগত ভাগ্য গণনায়।

দ্য লং কাউন্ট ক্যালেন্ডারxa0

দ্য লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার

মায়ারা সময় পরিমাপ করার জন্য লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। এটি ছিল তাদের সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় ক্যালেন্ডার পদ্ধতি। এটি মূলত দীর্ঘ সময়ের হিসাব রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার ছিল ৫,১২৫ বছরের একটি চক্র। এর মাধ্যমে মায়ারা পৃথিবীর ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট দিন থেকে সময় গণনা শুরু করত। তাদের মতে এই দিন তাদের মহাকাব্যিক যুগের শুরু হয়েছিল।

মায়ারা তাদের ইতিহাস ও সময় পরিমাপ করার জন্য লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। এই ক্যালেন্ডারে সময় মাপা হতো কিপ, টুন, উয়েব এবং বিকম নামে কয়েকটি বড় ইউনিট দিয়ে। এখানে,

  • কিপ (K’in): ১ দিন।
  • উয়েব (Winal): ২০ কিপ, মানে ২০ দিন।
  • টুন (Tun): ১৮০ কিপ, মানে ৩,৬০০ দিন।
  • বিকম (Baktun): ২০ টুন, মানে ৭২,০০০ দিন।

এটি তাদের জন্য একটি মহাকাব্যিক সময় সারণী ছিল। এখানে আদি থেকে ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনা একই কাঠামোয় স্থান পেত। এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ঘটনা সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারত।

২০১২ সালের “পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী” এই ক্যালেন্ডারের কারণেই এত জনপ্রিয় হয়েছিল! যদিও কিছু ভুল ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু মায়াদের মতে এই সময় পুরনো চক্রটি শেষ হবে আর নতুন চক্র শুরু হবে।

কার্ডিনাল পয়েন্টস

কার্ডিনাল পয়েন্টস

মায়া সভ্যতা মানেই রহস্য আর প্রতীকবাদের এক অবিশ্বাস্য জগৎ! তারা প্রকৃতি, দেবতা আর মহাবিশ্বের শক্তিকে বোঝার একটি পদ্ধতিও তৈরি করেছিল। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী চারদিকে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এক বিশাল শক্তির প্রবাহমান ক্ষেত্র। আর এই শক্তিকে ব্যাখ্যা করতে তারা ব্যবহার করত The Cardinal Points, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম। তবে, মায়াদের কাছে এই দিকনির্দেশনা ছিল একেবারেই আলাদা! প্রতিটি দিক ছিল এক-একটা শক্তিশালী দেবতার আধার, ছিল রহস্যময় রঙের প্রতীক, এমনকি ভবিষ্যদ্বাণীর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও!xa0

চার দিক এবং তাদের গোপন রহস্য

মায়ারা বিশ্বাস করত, এই পৃথিবী এক বিশাল শক্তির খেলাঘর। আর প্রতিটি দিকের রয়েছে নিজস্ব শক্তি, রং এবং প্রতীকী গুরুত্ব।

পূর্ব (Likin): মায়াদের কাছে পূর্ব দিক ছিল আলো এবং নতুন শুরুর প্রতীক। এই দিকের রং ছিল লাল, যা নতুন সূচনা ও শক্তির ইঙ্গিত বহন করত। মায়ারা মনে করত, সূর্য উঠে আসে দেবতা রূপে। তার নাম ছিল কিঞ্চ আহাউ (Kinich Ahau)। মায়াদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর প্রথম সূর্য পূর্বদিক থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

পশ্চিম (Chik’in): পশ্চিম ছিল মৃত্যু এবং অন্ধকারের প্রতীক। মায়াদের ধারণা ছিল, পশ্চিমে সূর্যের অস্ত যাওয়ার পর আত্মা পৃথিবী থেকে আধ্যাত্মিক রাজ্যে প্রবেশ করে। মায়ারা বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুর পর পশ্চিমে আত্মা পুনর্জন্মের জন্য প্রস্তুত হয়। এই দিকের রঙ ছিল কালো।xa0

উত্তর (Xaman): উত্তর ছিল ঠাণ্ডা, ধ্বংস এবং শক্তির পুনর্সংগঠনের প্রতীক। মায়াদের মতে, উত্তর দিক ছিল আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও বিশুদ্ধতার উৎস। এর রং ছিল সাদা, যা পবিত্রতা ও আত্মার জাগরণকে বোঝাত। মজার ব্যাপার হলো, তারা বিশ্বাস করত, এই দিক থেকে দেবতারা পৃথিবীতেxa0 আসে এবং আবার এই দিক দিয়েই স্বর্গে ফিরে যায়। তাই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান উত্তর দিকে মুখ করে সম্পন্ন হত।

দক্ষিণ (Nojol): দক্ষিণ ছিল গরম এবং অগ্রগতির প্রতীক।xa0 দক্ষিণ মানেই উর্বরতা, ফসল, বৃষ্টি আর জীবনের সমৃদ্ধি! এ দিকের রং ছিল হলুদ। যা ভূপৃষ্ঠের উর্বরতা এবং সম্পদের প্রতীক। মায়ারা মনে করত, এই দিক থেকে জীবনের প্রাচুর্য আসে। তাই কৃষিকাজের সময় দক্ষিণ দিকের দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের বলিদান দিত।

পঞ্চম কেন্দ্র: বিশ্বের হৃদয়

মায়ারা বিশ্বাস করত, এই চার দিকের শক্তি যেখানে মিলিত হয়, সেটি হল পঞ্চম কেন্দ্র।xa0 এই কেন্দ্রকে তারা ‘বিশ্বের হৃদয়’ নাম দিয়েছিল। এর রং ছিল নীল-সবুজ। এই রঙ আকাশ ও পৃথিবীর মিলনের প্রতীক। মায়ারা মনে করত, এখানেই তাদের প্রধান দেবতারা বাস করেন।

মায়াদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে যুদ্ধের সময়, Cardinal Points-এর ভিত্তিতে ঠিক করা হত। বিভিন্ন ধর্মীয় পূজা, উৎসব, এবং কৃষিকাজের সময় নির্বাচনেও Cardinal Points ভূমিকা পালন করত। মায়াদের আধ্যাত্মিক এবং দৈনন্দিন জীবন Cardinal Points-এর সিম্বলিজমের মধ্যে পুরোপুরি গাঁথা ছিল।

জাগুয়ার: মায়াদের শক্তি ও রহস্যের প্রতীক

মায়াদের শক্তি ও রহস্যের প্রতীক জাগুয়ার

মায়াদের কাছে জাগুয়ার ছিল রাতের রাজা, পাতালের রক্ষক এবং শক্তির প্রতীক। তারা বিশ্বাস করত, জাগুয়ার পাতালের জগতে চলাফেরা করতে পারে এবং মৃতদের পথ দেখায়।

রাজারা নিজেদের “বালাম” (জাগুয়ার) বলে পরিচয় দিত। যুদ্ধের সময় রাজারা জাগুয়ারের চামড়া পরত, যেন শত্রুরা ভয় পায়। ধর্মীয় বিশ্বাসে জাগুয়ার ছিল দেবতাদের সঙ্গী। মায়ারা বিশ্বাস করত জাগুয়ার দেবতা রাতে সূর্যকে পাতাল পার করায়।

মায়াদের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে জাগুয়ারের প্রতীক দেখা যায়। একে চিত্রায়িত করা হয়েছে বড় দাঁত, শক্তিশালী চোখ এবং কালো ছোপযুক্ত চামড়ার একটি ভয়ঙ্কর চেহারার প্রাণী হিসেবে। অনেক জায়গায় এটিকে দেবতার সাথে মিশ্রিত হয়ে দেখা যেত। এই রুপ অনেকটা অর্ধমানব ও অর্ধজাগুয়ারের মত।xa0

বালামরা মনে করত, তারা জাদুবলে জাগুয়ারে রূপান্তরিত হতে পারে। এছাড়াও মায়াবী শক্তি অর্জন করতে পারে। আজও মায়া সংস্কৃতিতে জাগুয়ার শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও রহস্যের প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।

হিরো টুইনস: মায়াদের পৌরাণিক যোদ্ধা ও পাতালের বিজয়ী

হিরো টুইনস

মায়াদের ধর্মীয় চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে হিরো টুইনসের প্রতীক বারবার দেখা যায়। এদের শরীরে দেবতাদের চিহ্ন খোদাই করা থাকে। তাদের চিত্রিত করা হতো তরুণ যোদ্ধা হিসেবে। অনেক জায়গায় তাদের বলগেম খেলা অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয়েছে।

হিরো টুইনস প্রতীকের মানে ন্যায়বিচারে প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। মায়ানরা বিশ্বাস করত, তারা তাদের বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে অন্যায়ের অবসান ঘটিয়েছিল। মায়াদের বিশ্বাস ছিল, ন্যায়বিচার সবসময় জয়ী হয়। আর হিরো টুইনস সেটারই প্রতীক।

এছাড়াও হিরো টুইনস ছিল পুনর্জন্ম ও অমরত্বের প্রতীক। এটার কারণ হল তারা নিজেরাই মৃত্যুকে পরাজিত করে জীবিত হয়ে ফিরে এসেছিল। সূর্য ও চাঁদের প্রতীক হিসেবে এদের ধরা হয়। মায়াদের মতে, তারা মৃত্যুর পর সূর্য ও চাঁদে পরিণত হয়। যা দিন-রাতের চক্র তৈরি করে। হিরো টুইনসকে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের চিরন্তন শক্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।xa0

কুকুলকান (Kukulkan): মায়াদের প্রাচীন দেবতা এবং তার প্রতীক

কুকুলকান

কুকুলকান ছিল মায়ান ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। তাকে সাধারণত পাখির ডানা বিশিষ্ট সাপ বা ফিউড সাপ হিসাবে চিত্রিত করা হয়। এই দেবতা মায়া সভ্যতায় একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাচীন মায়া পিরামিড, চিচেন ইটজা (Chichen Itza)-তে কুকুলকানের প্রতীক বহুবার দেখা গেছে। যেখানে সাপের মুখের শিলালিপি ও শরীর, পিরামিডের সিঁড়ির দিকে নির্দেশ করে।xa0

কুকুলকানের প্রতীকের অর্থ

কুকুলকানকে জীবন, মৃত্যু, এবং পুনর্জন্মের দেবতা হিসেবে দেখা হতো। তার পাখির ডানা এবং সাপের শরীরের মাধ্যমে মায়ারা আকাশ, পৃথিবী এবং পাতালের সংযোগের প্রতীক দেখাতো।

কুকুলকানকে প্রকৃতির শক্তির উৎস মনে করা হত। যেমন বৃষ্টি, বায়ু, এবং পৃথিবীর উর্বরতা। তাকে ভাল ও মন্দ শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার দেবতা হিসেবে দেখা হতো। তার কাজ ছিল সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করা। এছাড়াও, কুকুলকান অনেক সময় জলের দেবতা হিসেবেও প্রদর্শিত হয়।

বৃষ্টি দেবতা “চাক” এবং তার প্রতীক

মায়াদের কাছে চাক (Chaak) ছিল বৃষ্টি দেবতা। একে সাধারণত রাগান্বিত মুখ এবং তীব্র চোখের দৃষ্টি সহ এক শক্তিশালী রূপে চিত্রিত করা হত। তাকে প্রায়ই বজ্রপাত বা তুফানের চিহ্ন হাতে ধারণ করতে দেখা যেত। এই চিহ্ন তার আকাশের শক্তি ও বৃষ্টির নিয়ন্ত্রণের প্রতীক ছিল। চাকের মুখে জলছত্র বা বৃষ্টির বিন্দু চিত্রিত থাকতো।

মায়ারা বিশ্বাস করত, চাকই তাদের জমির ফসলের বৃদ্ধি এবং প্রকৃতির সুষম ভারসাম্য রক্ষা করত। তার বজ্র বা তুফানের প্রতীককে বজ্রপাতের বাহক হিসেবে দেখানো হত। তার প্রতীক দ্বারা মায়ারা প্রাকৃতিক শক্তি এবং বৃষ্টির বরকত কামনা করত।xa0

পালেঙ্কে (Palenque) শহরের মন্দিরের দেয়ালে চাকের প্রতীক স্পষ্টভাবে খোদাই করা রয়েছে। টিকাল (Tikal) ও কোপান (Copan) সহ মায়াদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরাতাত্ত্বিক স্থানেও চাকের প্রতীক দেখা যায়।xa0

বৃষ্টি দেবতা চাক

 

ধর্ম, বিজ্ঞান আর দর্শনের অসাধারণ মিশ্রণে মায়ানরা সৃষ্টি করেছিল এক প্রতীকী জগৎ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, এগুলো ঈশ্বরের প্রতীক। ধর্মতাত্ত্বিকরা বলেন, এগুলো একধরনের আত্মিক ভাষা। আর বিজ্ঞানীরা দেখতে পায় তাদের গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার নিখুঁত জ্ঞান। এই প্রতীকগুলো কি কেবলই ধর্মীয় রীতি? নাকি তারাxa0 আমাদেরxa0 চেনা বাস্তবতার বাইরের কিছু জানাতে চেয়েছিল? যদি মায়ারা সত্যিই কিছু জানত, তবে সেই জ্ঞানের কী হল?

এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। অনুসন্ধানেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের রহস্য। হয়তো সঠিক সময়ে আমরা তাদের চিহ্নের আসল রহস্য বুঝতে পারব।

তথ্যসূত্রxa0

Related posts

কামুক, শিশু ভক্ষণকারী ডাইনি ‘লিলিথ’

সোকোত্রা: পৃথিবীর বুকেই লুকানো এক ‘এলিয়েন দ্বীপ’

খাবারের ষড়যন্ত্র? ম্যাকঅ্যালেন শহরের স্থূলতার রহস্য

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More