Image default
তুরষ্কপর্যটন আকর্ষণ

আঙ্কারা দুর্গ: মেঘের দেশে রাজাদের বাড়ি!

আঙ্কারা দুর্গ বা ‘আঙ্কারা কালেসি’ তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও সুন্দর স্থান। এটি শহরের ঠিক মাঝখানে একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। এই দুর্গটি আঙ্কারা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। অনেক দূর থেকেই এই বিশাল দুর্গটি মানুষের চোখে পড়ে। হাজার বছর ধরে এটি তুরস্কের দীর্ঘ ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক এখানে এসে পুরোনো দিনের গল্প জানতে পারেন। আধুনিক শহরের মাঝে এটি যেন একটি প্রাচীন রত্ন।

আঙ্কারা দুর্গ – Image Source: en.wikipedia.org

আঙ্কারা দুর্গ ঠিক কত সালে বা কোন রাজা প্রথম তৈরি করেছিলেন, তা আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এটি প্রায় ৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি স্থাপনা।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অনেক রাজা ও সাম্রাজ্য এই দুর্গটি শাসন করেছে। রোমান, বাইজেন্টাইন, সেলজুক এবং অটোমান বা উসমানীয় রাজারা বিভিন্ন সময়ে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। শত্রুদের হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে প্রতিটি সাম্রাজ্যই দুর্গটিকে নতুন করে সাজিয়েছিল। বারবার যুদ্ধ এবং আক্রমণের কারণে দুর্গের অনেক অংশ ভেঙে গিয়েছিল। পরে রাজারা আবার সেগুলো মেরামত করেন। তাই এই দুর্গের পরতে পরতে বিভিন্ন সময়ের মানুষের কাজের ছাপ রয়ে গেছে। এটি যেন সময়ের এক জীবন্ত ইতিহাস বই।

আঙ্কারা দুর্গ – Image Source: en.wikipedia.org

আঙ্কারা দুর্গের দেয়ালগুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করলে প্রাচীন রোমান আমলের ভাঙা মূর্তি ও মার্বেল পাথরের টুকরো দেখা যায়। নতুন দেয়াল বানানোর সময় পুরোনো ভবনের পাথরগুলো আবার ব্যবহার করা হয়েছিল।

আঙ্কারা দুর্গটি মূলত দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা। একটি হলো ভেতরের দুর্গ এবং অন্যটি বাইরের দুর্গ। বাইরের দেয়ালগুলো একসময় পুরো পুরোনো শহরকে ঘিরে রাখত। আর ভেতরের দুর্গটি মূলত সেনাপতি ও রাজপরিবারের নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ভেতরের দেয়ালগুলো অনেক বেশি উঁচু, মোটা এবং মজবুত। শত্রুরা যাতে সহজে ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য বিশাল দরজা বা গেট বানানো হয়েছিল। এই মজবুত দেয়ালগুলো আজও বেশ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

দুর্গের ভেতরের অংশের চারপাশের দেয়ালে মোট ৪২টি বিশাল টাওয়ার বা মিনার রয়েছে। এই মিনারগুলোর প্রতিটি দেখতে প্রায় পাঁচ কোণা বা পঞ্চভুজ আকৃতির।

আঙ্কারা দুর্গ – Image Source: en.wikipedia.org

আঙ্কারা এই দুর্গের ভেতরে ঢুকলে মনে হবে আপনি যেন শত শত বছর আগের পুরোনো দিনে ফিরে গেছেন। দুর্গের ভেতরের সরু ও পাথর বাঁধানো রাস্তাগুলো দেখতে খুব সুন্দর। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো পুরোনো উসমানীয় আমলের ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘর। এই বাড়িগুলোর বেশিরভাগই দুই বা তিন তলা বিশিষ্ট। বাড়িগুলোর দেয়াল সাদা রঙের এবং জানালা ও ছাদ কাঠ দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে তুরস্কের পুরোনো এই স্থাপত্যগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে।

দুর্গের ভেতরের এই শত বছরের পুরোনো বাড়িগুলো শুধু দেখার জন্য ফেলে রাখা হয়নি। আজও অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের পরিবার নিয়ে এই বাড়িগুলোতে বসবাস করেন।

আঙ্কারা দুর্গের ভেতরে এখন অনেক ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। পর্যটকরা এখানে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী নানা সুন্দর জিনিস কিনতে পারেন। হাতে বানানো কার্পেট, গহনা, সুগন্ধি মশলা, সিরামিকের থালা এবং ঘর সাজানোর নানা জিনিস এখানে খুব সহজে পাওয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠলে রাস্তার ধারের সুন্দর ক্যাফেগুলোতে বসা যায়। সেখানে বসে দারুণ স্বাদের টার্কিশ কফি বা আপেল চা খাওয়া যায়। কেনাকাটা এবং অবসরে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি বেশ জমজমাট থাকে।

আঙ্কারা দুর্গের ভেতরে অবস্থিত ছোট ছোট দোকান – Image Source: www.yeniankara.com.tr

দুর্গের ভেতরের অনেক পুরোনো ও ভাঙা বাড়িগুলোকে খুব যত্ন করে মেরামত করা হয়েছে। এখন সেগুলোকে সুন্দর রেস্তোরাঁ, ছোট জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারিতে রূপ দেওয়া হয়েছে।

দুর্গের একদম ওপরের অংশে উঠলে পুরো আঙ্কারা শহরের এক দারুণ দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে আধুনিক আঙ্কারা শহরের উঁচু উঁচু কাঁচের ভবন দেখা যায়। আর অন্যদিকে দেখা যায় প্রাচীন এই শহরের ছোট ছোট লাল ছাদের পুরোনো বাড়িগুলো। পুরোনো এবং নতুন শহরের এই সুন্দর মিলন সত্যিই খুব চমৎকার লাগে। ছবি তোলার জন্য এটি আঙ্কারা শহরের সবচেয়ে দারুণ জায়গা। পাহাড়ের ওপর থেকে চারপাশের এই মনোরম দৃশ্য মনকে খুব শান্ত করে দেয়।

আঙ্কারা দুর্গ – Image Source: turkeytravelplanner.com

আঙ্কারা দুর্গ থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্যটি অসাধারণ। বিকেল বেলায় সূর্যাস্তের সময় পুরো শহর যখন সোনালি আলোয় ভরে যায়, তখন অনেকেই এই দৃশ্য দেখতে দুর্গের চূড়ায় ভিড় করেন।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গেলে এই প্রাচীন দুর্গটি অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত। শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে দূরে এটি এক দারুণ শান্ত ও সুন্দর জায়গা। এখানে এলে তুরস্কের অতীত ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়। আঙ্কারা দুর্গের ঠিক বাইরেই বিখ্যাত ‘রাহমি এম. কোচ জাদুঘর’ রয়েছে, সেটিও ঘুরে দেখা যায়। সুন্দর সময় কাটানো এবং প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। এই চমৎকার ঐতিহাসিক দুর্গটি ঘুরে দেখার জন্য পর্যটকদের কোনো টিকিট কাটতে হয় না বা টাকা দিতে হয় না। সবার জন্য এটি একদম বিনামূল্যে সারাদিন খুলে দেওয়া থাকে।

Reference:

 

Related posts

আয়া সোফিয়া: ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থল

আশা রহমান

সুমিয়োশি তাইশা: ওসাকার বুকে প্রাচীন জাপানি আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া

ইসরাত জাহান ইরা

অটোমান সাম্রাজ্যের জীবন্ত অধ্যায় তোপকাপি প্রাসাদ !

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More