আঙ্কারা শহরের একদম প্রাচীন নাম ছিল ‘আনকিরা’, যার অর্থ হলো জাহাজের ‘নোঙর’। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই শহরের আশেপাশে কোনো সাগর বা মহাসাগর নেই, তবুও এর এমন অদ্ভুত নাম রাখা হয়েছিল!
আঙ্কারা হলো তুরস্কের রাজধানী। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটি দেখতে অনেক সুন্দর। এখানে পুরোনো ইতিহাস আর আধুনিকতার দারুণ মিল রয়েছে। অনেকেই ভাবেন ইস্তাম্বুল তুরস্কের রাজধানী। কিন্তু তা ঠিক নয়! আরও মজার ব্যাপার হলো, ১৯২৩ সালের আগে আঙ্কারা খুব ছোট একটি পাহাড়ি শহর ছিল। তখন এখানে মাত্র ৩৫ হাজার মানুষ বাস করত। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক আঙ্কারাকে রাজধানী বানানোর পর এটি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। আর এখন এটি লাখ লাখ মানুষের এক বিশাল আধুনিক শহর।

ভৌগোলিক অবস্থান
আঙ্কারা শহরটি তুরস্কের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে ‘সেন্ট্রাল আনাতোলিয়া’ বলা হয়। শহরটি সমুদ্র থেকে বেশ দূরে। তাই এখানকার আবহাওয়া একটু শুকনো প্রকৃতির। শহরটির চারপাশে ছড়িয়ে আছে সুন্দর উঁচু পাহাড়। সেই সাথে আছে বিস্তীর্ণ সবুজ সমভূমি। পাহাড় আর সমভূমির এই মেলবন্ধন শহরটির সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তুরস্কের ঠিক কেন্দ্রে থাকায় এর গুরুত্ব অনেক। এখান থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তে সহজে যাতায়াত করা যায়। এটি পুরো দেশের প্রধান রেল ও সড়ক যোগাযোগের মূল কেন্দ্র।
আঙ্কারার আয়তন
আঙ্কারা অনেক বড় একটি শহর। এটি তুরস্কের বিশাল একটি জায়গা জুড়ে রয়েছে। পুরো আঙ্কারা প্রদেশের মোট আয়তন প্রায় ২৪,৫২১ বর্গ কিলোমিটার। মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই ভাবেন ইস্তাম্বুল তুরস্কের সবচেয়ে বড় জায়গা। কারণ ইস্তাম্বুল খুব বিখ্যাত। কিন্তু আয়তনের দিক থেকে ইস্তাম্বুলের চেয়ে আঙ্কারা প্রদেশ অনেক বড়। আঙ্কারার মোট জমির পরিমাণ ইস্তাম্বুলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তাই এটি তুরস্কের অন্যতম বিশাল একটি এলাকা।
আঙ্কারার জনসংখ্যা
আঙ্কারা শহরে প্রচুর মানুষ বাস করে। বর্তমানে এই শহরে প্রায় ৫৭ লাখ মানুষের বসবাস। এটি তুরস্কের দ্বিতীয় সবচেয়ে জনবহুল শহর। শহরটিতে অনেকগুলো বড় এবং নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তাই তুরস্কের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী এখানে পড়াশোনা করতে আসে। এ কারণে আঙ্কারায় তরুণদের সংখ্যা অনেক বেশি। শহরটি সবসময় তরুণদের পদচারণায় বেশ প্রাণবন্ত থাকে।

১৯২৩ সালে আঙ্কারাকে তুরস্কের রাজধানী বানানো হয়। তখন এটি খুবই ছোট একটি শহর ছিল। সেসময় এখানে মাত্র ৩৫ হাজার মানুষ বাস করত। এরপর খুব দ্রুত শহরটি বড় হতে থাকে। মাত্র ১০০ বছরের ব্যবধানে সেই ছোট্ট শহরটি আজ ৫৭ লাখ মানুষের এক বিশাল নগরে পরিণত হয়েছে!
আঙ্কারার ইতিহাস
আঙ্কারার ইতিহাস অনেক পুরোনো। এটি হাজার হাজার বছর আগের একটি প্রাচীন শহর। আগে এই শহরের নাম আঙ্কারা ছিল না। প্রাচীনকালে মানুষ এই শহরকে ‘অ্যানসাইরা’ নামে ডাকত।
আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে আঙ্কারার অনেক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯২৩ সালের ১৩ অক্টোবর এই শহরের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যায়। ওই দিন তুরস্কের মহান নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক আঙ্কারাকে নতুন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আগে তুরস্কের রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল। রাজধানী হওয়ার পর থেকেই শহরটি দ্রুত উন্নত হতে থাকে।

এই শহরটির অতীত ইতিহাস খুবই বৈচিত্র্যময়। এই প্রাচীন শহরটি রোমান, বাইজেন্টাইন এবং উসমানীয় এই তিনটি বড় সাম্রাজ্যের শাসন খুব কাছ থেকে দেখেছে। একটি শহরের বুকে এতগুলো বিখ্যাত সাম্রাজ্যের স্মৃতি একসাথে থাকা সত্যিই খুব চমৎকার ব্যাপার!
আঙ্কারার অর্থনীতি
আঙ্কারা তুরস্কের অর্থনীতির একটি অনেক বড় খুঁটি। দেশের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখান থেকেই পরিচালিত হয়। তুরস্কের প্রধান সরকারি অফিস এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান কার্যালয়গুলো এই শহরেই অবস্থিত। তাই এখানকার অনেক মানুষ সরকারি চাকরিতে যুক্ত আছেন।
সরকারি কাজের পাশাপাশি ব্যবসা এবং শিল্পেও আঙ্কারা অনেক এগিয়ে। এখানে প্রচুর বড় বড় কলকারখানা রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বা সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করার অনেক কারখানা এখানে আছে। এছাড়াও মহাকাশ গবেষণার বড় বড় কাজ এই শহরেই হয়ে থাকে। আঙ্কারাতে অনেক বড় বড় গাড়ি তৈরির কারখানাও রয়েছে।
সারা বিশ্বে ‘অ্যাঙ্গোরা’ উল খুব বিখ্যাত। এই উল অনেক নরম এবং দামি হয়। অনেকেই হয়তো জানেন না, এই উলের নাম কিন্তু এই আঙ্কারা শহর থেকেই এসেছে! আঙ্কারার একটি পুরোনো নাম ছিল ‘অ্যাঙ্গোরা’। এই শহরের এক বিশেষ জাতের ছাগল ও খরগোশের নরম লোম থেকেই তৈরি হয় এই চমৎকার উল।
বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব

অনেক বিখ্যাত মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শহরের সাথে। তবে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নাম এখানে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। তিনি এই শহরকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘দ্য ক্ল্যাশ’-এর গায়ক এবং গিটারিস্ট জো স্ট্রামার এই আঙ্কারা শহরেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন!
আঙ্কারার খাবার
আঙ্কারার খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু। এখানকার মানুষ মজাদার খাবার খেতে খুব পছন্দ করে। এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থানীয় খাবারের নাম হলো ‘আঙ্কারা তাভা’। এটি মূলত ভেড়ার নরম মাংস দিয়ে তৈরি হয়। মাংসের সাথে থাকে দারুণ মজার পোলাও বা পাস্তা। এই খাবারটি খেতে খুবই চমৎকার।

এছাড়াও শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় নানা রকমের সুস্বাদু কাবাব পাওয়া যায়। আর ভারী খাবারের পর মিষ্টি হিসেবে সবার পছন্দ বিখ্যাত তুর্কি মিষ্টি ‘বাকলাভা’।
আঙ্কারার রাস্তায় এক ধরনের গোলাকার রুটি প্রচুর বিক্রি হয়। এর নাম ‘সিমিট’। এই রুটির গায়ে অনেক তিল ছড়ানো থাকে। এটি আঙ্কারার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। সকালের নাশতায় গরম চায়ের সাথে মচমচে সিমিট খেতে সেখানকার মানুষ খুব ভালোবাসে।
আঙ্কারার উৎসব
আঙ্কারা শহরে সারা বছরই নানা রকম উৎসব লেগে থাকে। এখানকার সংস্কৃতি ও শিল্পের উৎসবগুলো খুব চমৎকার। এর মধ্যে ‘আঙ্কারা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ অনেক বিখ্যাত। প্রচুর মানুষ নতুন সব সিনেমা দেখতে এই উৎসবে যোগ দেয়।
এছাড়াও এই শহরে ‘আঙ্কারা আন্তর্জাতিক কার্টুন উৎসব’ হয়। সেখানে দেশ-বিদেশের সুন্দর সব কার্টুন ও ছবি দেখানো হয়। আর কেনাকাটা করার জন্য আছে ‘আঙ্কারা শপিং ফেস্টিভ্যাল’। এই উৎসবের সময় পুরো শহরের দোকানগুলোতে জিনিসপত্রের দাম অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। তখন সবাই মিলে খুব আনন্দ করে কেনাকাটা করে।

প্রতি বছর এপ্রিল মাসে আঙ্কারায় আন্তর্জাতিক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল বা বিশাল গানের উৎসব হয়। তখন পৃথিবীর নানা দেশ থেকে বিখ্যাত সব শিল্পীরা এখানে আসেন। তারা এই শহরে এসে সবাইকে গান ও বাজনা শোনান। এই উৎসবের সময় পুরো আঙ্কারা শহর যেন গানের সুরে মেতে ওঠে!
দর্শনীয় স্থান
আঙ্কারা শহরে ঘুরে দেখার মতো অনেক সুন্দর সুন্দর দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এখানে পুরোনো দুর্গ, বিশাল মসজিদ এবং আধুনিক জাদুঘর দেখা যায়। এই জায়গাগুলোতে প্রাচীন ইতিহাস আর নতুন শহরের এক চমৎকার মিল পাওয়া যায়। তাই দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আঙ্কারায় এসে ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করেন।
আনিতকাবির
আনিতকাবির তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের বিশাল সমাধি। এটি অনেক বড় এবং সুন্দর মার্বেল পাথরের তৈরি। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ তাকে সম্মান জানাতে এখানে আসেন। এই সমাধিতে ঢোকার মূল রাস্তার দুই পাশে ২৪টি বড় বড় সিংহের মূর্তি বসানো আছে। এই রাস্তাকে ‘লায়ন রোড’ বলা হয়।
আঙ্কারা দুর্গ

আঙ্কারা দুর্গ শহরের সবচেয়ে পুরোনো একটি দুর্গ। এটি অনেক উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। দুর্গের ওপর থেকে পুরো আঙ্কারা শহর খুব সুন্দর দেখা যায়। এই দুর্গের দেয়ালগুলো বানানোর সময় প্রাচীন রোমান যুগের ভাঙা পাথর ও মূর্তির নানা অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। দেয়ালে খুঁজলে আজও সেগুলো দেখা যায়!
হাজি বায়রাম মসজিদ
হাজি বায়রাম মসজিদ শহরের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র একটি মসজিদ। এটি কাঠ এবং ইট দিয়ে তৈরি। প্রতিদিন অনেক মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসেন। এই মসজিদটি ঠিক একটি প্রাচীন রোমান মন্দিরের (অগাস্টাসের মন্দির) গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এটি দুটি ভিন্ন ধর্ম ও যুগের চমৎকার একটি মিলন!
কোকাটেপে মসজিদ
কোকাটেপে মসজিদ আঙ্কারার সবচেয়ে বড় মসজিদ। এর গম্বুজ ও মিনারগুলো অনেক উঁচু। এর ভেতরের কারুকাজ ও বিশাল ঝাড়বাতিগুলো দেখতে খুব সুন্দর। মসজিদটি দেখতে অনেক পুরোনো মনে হলেও, এটি আসলে খুব বেশি আগের নয়। এই বিশাল মসজিদটি পুরোপুরি তৈরি শেষ হতে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছিল।

কিজিলাই স্কয়ার
কিজিলাই স্কয়ার আঙ্কারা শহরের একদম মূল কেন্দ্র। এখানে সবসময় মানুষের প্রচুর ভিড় থাকে। চারদিকে অনেক বড় বড় শপিং মল ও ক্যাফে আছে। ‘কিজিলাই’ শব্দের অর্থ হলো ‘লাল চাঁদ’। অনেক আগে এখানে রেড ক্রিসেন্ট বা লাল চাঁদের একটি বড় হাসপাতাল ছিল, তাই এই চত্বরের এমন নাম হয়েছে।
আসলানহানে মসজিদ
আসলানহানে মসজিদ ১৩শ শতকে তৈরি হওয়া একটি সুন্দর মসজিদ। এর ভেতরে দারুণ সব কাঠের কাজ আছে। এটি দেখতে খুব ছিমছাম ও শান্ত। ‘আসলানহানে’ মানে হলো ‘সিংহের ঘর’। এই মসজিদের বাইরের দেয়ালে একটি প্রাচীন সিংহের মূর্তি গাঁথা আছে বলেই এর নাম দেওয়া হয়েছে আসলানহানে!
অগাস্টাসের মন্দির
অগাস্টাসের মন্দির প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো একটি রোমান মন্দির। অনেক বছর পার হওয়ায় এটি এখন কিছুটা ভেঙে গেছে। তবে এর ইতিহাস অনেক বড়। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের নিজের জীবনের সব গল্প ও সফলতার কথা এই মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করে লেখা আছে, যা আজও পড়া যায়।
আঙ্কারা পালাস

আঙ্কারা পালাস একটি খুব সুন্দর ঐতিহাসিক ভবন। এটি দেখতে একদম রাজপ্রাসাদের মতো। আগে এখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথিরা থাকতেন। আধুনিক তুরস্কের শুরুর দিকে এই ভবনেই শহরের সবচেয়ে বড় এবং জমকালো নাচের অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হতো।
দুয়াত্তেপে স্মৃতিস্তম্ভ
দুয়াত্তেপে স্মৃতিস্তম্ভ তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এটি একটি উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত। এটি তুরস্কের বীরদের ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘দুয়াত্তেপে’ কথাটির মানে হলো ‘প্রার্থনার পাহাড়’। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সৈন্যরা এখানে বসে দেশের বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করতেন বলে এর এমন নাম হয়েছে।

আঙ্কারা হলো প্রাচীন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলা। এই শহরে যেমন পুরোনো দিনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তেমনি রয়েছে নতুন যুগের ছোঁয়া। তুরস্কের আসল রূপ এবং সংস্কৃতি খুব কাছ থেকে দেখতে চাইলে আঙ্কারায় একবার হলেও ঘুরে আসা উচিত। এখানকার সুন্দর পরিবেশ, মজাদার খাবার আর মানুষের ভালোবাসা আপনার ভ্রমণকে একদম চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
Reference:

