বাগদাদে অবস্থিত আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও অর্থপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর একটি। আরবি ভাষায় ‘আল-শহীদ’ শব্দের অর্থ হলো ‘শহীদ’। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ হারানো বীর সৈন্যদের স্মরণে এটি নির্মাণ করা হয়। এই বিশালাকার স্মৃতিস্তম্ভটি বাগদাদের টাইগ্রিস নদীর পূর্ব তীরে একটি কৃত্রিম হ্রদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে এটিকে একটি বিশাল ও উজ্জ্বল নীল রঙের গম্বুজ মনে হয়, যা মাঝখান থেকে দুই ভাগে বিভক্ত।

স্মৃতিস্তম্ভটির পুরো এলাকাটি এতই বড় যে এর চারপাশের সবুজ পার্ক ও কৃত্রিম হ্রদ মিলিয়ে এটি প্রায় ৪০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ব্যতিক্রমী নকশা। এটি মূলত ৪০ মিটার উঁচু একটি বিশাল নীল গম্বুজ। তবে গম্বুজটি আস্ত নয়, বরং মাঝখান থেকে নিখুঁতভাবে দুটি আলাদা টুকরোয় বিভক্ত। দুই টুকরোর ঠিক মাঝখানে একটি ধাতব পতাকা ও এক অমর শিখা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গম্বুজটির ভেতর থেকে এক আলোর শিখা আকাশ ছুঁয়ে যেতে চাইছে।
গম্বুজের দুটি বিভক্ত অংশের মাঝের দূরত্ব এমনভাবে রাখা হয়েছে যে তা কোনো মানুষের দুই হাত খুলে ওপরের দিকে তুলে প্রার্থনার ভঙ্গিকে রূপক হিসেবে প্রকাশ করে।
এই ঐতিহাসিক চমৎকার শিল্পকর্মটি ইরাকের অত্যন্ত নামকরা স্থপতি সামান কামাল এবং বিখ্যাত ভাস্কর ইসমাঈল ফাত্তাহ আল-তুর্কের যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। ১৯৮৩ সালে এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ইরাকের ইতিহাস, প্রাচীন সংস্কৃতি এবং আধুনিক স্থাপত্যকলার এক অসাধারণ মিশ্রণ ঘটিয়েছেন তারা। এটি নির্মাণের পর থেকে সারা বিশ্বের স্থপতি ও প্রকৌশলীরা এর প্রশংসা করেছেন।
ভাস্কর ইসমাঈল ফাত্তাহ আল-তুর্ক এই স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা এমনভাবে করেছিলেন যাতে এটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ঐতিহ্য এবং আধুনিক ইরাকের ঐক্যকে একসাথে তুলে ধরে।

স্মৃতিস্তম্ভটির বাইরের পুরো শরীর ফিরোজা বা হালকা নীল রঙের এক বিশেষ ধরণের সিরামিক টাইলস দিয়ে ঢাকা। ঐতিহ্যবাহী মেসোপটেমিয়ার নকশায় এই টাইলসগুলো তৈরি করা হয়েছে। রোদের আলো যখন এই নীল টাইলসগুলোর ওপর পড়ে, তখন পুরো গম্বুজটি দারুণভাবে চকচক করে ওঠে। নীল আকাশের সাথে এই ফিরোজা রঙের গম্বুজের দৃশ্য দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যান।
গম্বুজটির বাইরের অংশে ব্যবহৃত কয়েক লাখ নীল টাইলস বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে বছরের পর বছর রোদে ও বৃষ্টিতে এর আসল উজ্জ্বলতা কখনও নষ্ট না হয়।
বাহির থেকে শুধু বিশাল নীল গম্বুজটি দেখা গেলেও এর ঠিক নিচে মাটির গভীরে দুটি বিশাল তলা রয়েছে। এই মাটির নিচের অংশটি মূলত একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর, লাইব্রেরি এবং প্রদর্শনী কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে যুদ্ধে শহীদ হওয়া হাজার হাজার মানুষের নামের তালিকা সুন্দরভাবে খোদাই করে রাখা আছে। এছাড়া সেখানে তাদের স্মৃতিচিহ্ন, পুরোনো ছবি এবং ব্যবহৃত পোশাক সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও গম্বুজের মাটির নিচের এই অংশে বিশেষ আধুনিক নকশার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই বেশ ঠান্ডা ও শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে।
বিশাল স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশে একটি কৃত্রিম হ্রদ বা লেক তৈরি করা হয়েছে। হ্রদের টলটলে শান্ত পানিতে নীল গম্বুজের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে, যা দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। হ্রদের ভেতর নানা রঙের পানির ফোয়ারা রয়েছে। বিকেল বেলা বা সন্ধ্যায় যখন ফোয়ারাগুলো চালানো হয়, তখন চারপাশের পরিবেশ খুব মনোরম ও প্রশান্তিময় হয়ে ওঠে। বাগদাদের মানুষ এখানে এসে হেঁটে বেড়াতে খুব পছন্দ করেন।

স্মৃতিস্তম্ভটি পানির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় মনে হয় বিশাল নীল গম্বুজটি যেন হ্রদের পানি ফুঁড়ে বা ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
গম্বুজের যে দুই টুকরো রয়েছে, তার ঠিক মাঝখানে ইরাকের একটি বড় ধাতব জাতীয় পতাকা এবং একটি অনির্বাণ শিখা বা ‘অমর শিখা’ রয়েছে। এই শিখাটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সব সময় জ্বলতে থাকে। এটি শহীদদের স্মৃতি অমর রাখার প্রতীক। এই জায়গায় দাঁড়ালে এক অদ্ভুত আবেগ ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। দেশ-বিদেশের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান বাগদাদ সফরে এলে এখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
গম্বুজের দুটি অংশের ভেতরের দেয়ালে ব্রোঞ্জে মোড়ানো সুন্দর আরবি ক্যালিগ্রাফিতে পবিত্র কোরআনের নানা বাণী খোদাই করা রয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে এক বিশাল এবং সুন্দর পার্ক রয়েছে। পার্কে অনেক সবুজ ঘাস, ফুল গাছ এবং বসার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। বাগদাদের ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ শহরের মাঝে এটি একটি সবুজ মরূদ্যানের মতো কাজ করে। ছুটির দিনগুলোতে পরিবার ও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। এখানকার শান্ত পরিবেশ মানুষের মনের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।
পার্কটি স্থানীয় মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি বাগদাদের তরুণদের জন্য ছবি তোলার সবচেয়ে প্রিয় একটি স্পটে পরিণত হয়েছে।
যদিও আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি একটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি কেবল যুদ্ধের স্মৃতিতে আটকে থাকেনি। এটি এখন ইরাকি জনগণের ত্যাগ, সাহস এবং পরম শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি মানুষ যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, এটি তাদের সকলের প্রতি সম্মানের স্মারক। এটি ইরাকের কঠিন সময় থেকে উঠে দাঁড়ানোর গল্প বলে।
ইরাকে যেকোনো জাতীয় শোক বা স্মরণদিবসে এই আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে বিশেষ মোমবাতি প্রজ্বলন ও সাংস্কৃতিক সভার আয়োজন করা হয়।
বাগদাদ শহর ঘুরতে আসা দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ এক অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। স্থাপত্যকলার ছাত্র ও গবেষকরা এর ভিন্নধর্মী নকশা ও কারিগরি কৌশল দেখার জন্য এখানে আসেন। বিশালাকার নীল গম্বুজের সামনে দাঁড়িয়ে স্মরণীয় ছবি তোলা পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা। পর্যটন গাইডরা এটিকে আধুনিক বাগদাদের পরিচয় হিসেবে তুলে ধরেন। বিশ্বের বহু বিখ্যাত স্থাপত্যবিষয়ক ম্যাগাজিনে আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা আধুনিক স্থাপত্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
Reference:

