খলিফা আল-মনসুর বাগদাদ শহরের নিখুঁত বৃত্তাকার নকশা যাচাই করতে মাটিতে ছাই ও তুলা বিছিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। রাতের আঁধারে সেই বিশাল জ্বলন্ত বৃত্তাকার রেখা দেখে মুগ্ধ হওয়ার পরই তিনি ইতিহাসের বিখ্যাত এই ‘গোলাকার শহর’ নির্মাণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।
‘বাগদাদ’ শব্দটি শুনলেই যেন কল্পনার চোখে ভেসে ওঠে ‘হাজার এক আরব্য রজনী’র জাদুকরী সব গল্প, খলিফা হারুনুর রশীদের রাজদরবার এবং দজলা নদীর তীরের এক মায়াবী পরিবেশ। একসময় যে শহরটি ছিল সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও বাণিজ্যের অবিসংবাদিত রাজধানী, তা আজ হাজারো ভাঙাগড়ার সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
বাগদাদ শহর মানব সভ্যতার সোনালি অতীত এবং অদম্য টিকে থাকার এক জ্যান্ত জাদুঘর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধ, ধ্বংস আর পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে বাগদাদ প্রমাণ করেছে তার চিরন্তন আবেদন।

ভৌগোলিক অবস্থান
বাগদাদ শহরটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকের কেন্দ্রস্থলে, মেসোপটেমিয়া সমভূমিতে অবস্থিত। শহরটির বুক চিরে বয়ে গেছে বিখ্যাত টাইগ্রিস বা দজলা নদী, যা শহরটিকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত করেছে। এর চারপাশে বিস্তীর্ণ উর্বর সমভূমি রয়েছে।
বাগদাদ শহরটি টাইগ্রিস নদীর দুই তীরে এমনভাবে বিভক্ত যে, এর পূর্ব দিকের অংশকে স্থানীয়ভাবে ‘রিসাফা’এবং পশ্চিম অংশকে ‘কারখ’ বলা হয়।
বাগদাদের আয়তন
বাগদাদ ইরাকের বৃহত্তম শহর। এর মূল শহরের আয়তন প্রায় ৬৭৩ বর্গ কিলোমিটার। তবে বৃহত্তর বাগদাদ মেট্রোপলিটন এলাকার আয়তন আরও অনেক বেশি। অষ্টম শতাব্দীতে যখন বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর বিশাল আয়তন ও সুপরিকল্পিত বৃত্তাকার নকশার কারণে এটি তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
বাগদাদের জনসংখ্যা
জনসংখ্যার দিক থেকে বাগদাদ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ একটি শহর। বর্তমানে বৃহত্তর বাগদাদ এলাকায় প্রায় ৭৩ লাখ থেকে ৮০ লাখ মানুষ বসবাস করে। এটি কায়রোর পর আরব বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর। মধ্যযুগে বাগদাদই ছিল বিশ্বের প্রথম শহর, যার জনসংখ্যা দশ লাখের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল।

বাগদাদের ইতিহাস
৭৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর তাঁর সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবে টাইগ্রিস নদীর তীরে একটি নিখুঁত স্থান নির্বাচন করেন। তাঁর নির্দেশনায় এক অভূতপূর্ব জ্যামিতিক নকশায় শহরটি নির্মাণ করা হয়, যা ইতিহাসে ‘গোলাকার শহর’ নামে পরিচিত। শহরটিকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য এর চারপাশে ছিল তিনটি বিশাল বৃত্তাকার প্রাচীর এবং মাঝখানে ছিল খলিফার জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ।
খলিফা আল-মনসুর শহরটির সরকারি নাম রেখেছিলেন “মদিনাত আস-সালাম” বা “শান্তির শহর”। তৎকালীন মুদ্রা ও সরকারি নথিপত্রে এই নামই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখে এর প্রাক-ইসলামিক নাম ‘বাগদাদ’-ই বেশি জনপ্রিয় ছিল, ফারসি ভাষায় যার অর্থ “সৃষ্টিকর্তার দান”।

খলিফা হারুনুর রশীদ এবং তাঁর পুত্র খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে বাগদাদ তার খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছায়। এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা হাউস অব উইজডম। এটি ছিল একাধারে একটি সুবিশাল গ্রন্থাগার, অনুবাদ কেন্দ্র, মানমন্দির এবং গবেষণাগার।
বাগদাদ সেসময় এমন এক শহরে পরিণত হয়েছিল যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে খ্রিস্টান, ইহুদি এবং মুসলিম পণ্ডিতরা একসঙ্গে কাজ করতেন। গ্রিক, ভারতীয়, পারস্য এবং সিরিয় ভাষার অমূল্য সব বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থ এখানে আরবিতে অনুবাদ করা হতো।
আল-খাওয়ারিজমির মতো গণিতবিদরা এখানেই বীজগণিত ও অ্যালগরিদমের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন ও দর্শনে বাগদাদ তৎকালীন পুরো বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল।
বাগদাদের এই সোনালি অধ্যায়ে হঠাৎ করেই নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অন্ধকার। ১২৫৮ সালে চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খানের নেতৃত্বে বিশাল মঙ্গোল বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করে। তারা আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতাসিমকে বন্দী করে এবং শহরের লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মঙ্গোলরা বায়তুল হিকমাহসহ শহরের সমস্ত লাইব্রেরি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। লাখ লাখ অমূল্য হাতে লেখা বই দজলা নদীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়।
ইতিহাসবিদরা বর্ণনা করেন যে, মঙ্গোলদের ফেলে দেওয়া অসংখ্য বইয়ের কালিতে দজলা নদীর পানি নাকি বেশ কয়েক দিনের জন্য সম্পূর্ণ কালো হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে নিহত অসংখ্য মানুষের রক্তে সেই কালো পানি লাল বর্ণ ধারণ করেছিল।
মঙ্গোলদের সেই তাণ্ডবের পর বাগদাদ তার প্রাচীন জৌলুস চিরতরে হারিয়ে ফেলে। এরপর বহু শতাব্দী ধরে এটি কখনো পারস্যের সাফাভি সাম্রাজ্য, আবার কখনো উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি সাধারণ প্রদেশ হিসেবেই টিকে ছিল। তবে বাগদাদ কখনোই তার অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হতে দেয়নি। বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক ইরাকের রাজধানী হিসেবে বাগদাদ আবারও নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
বাগদাদের অর্থনীতি
ইরাকের সামগ্রিক অর্থনীতি মূলত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল হলেও, বাগদাদ শহরটি সমগ্র দেশের প্রধান প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। পুরো দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা চলে এই ঐতিহাসিক নগরীটিকে।
এখানে টেক্সটাইল, ঐতিহ্যবাহী চামড়াজাত পণ্য, দৃষ্টিনন্দন আসবাবপত্র এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অসংখ্য কারখানা রয়েছে। দেশের অধিকাংশ প্রধান ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা এবং বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানির সদর দপ্তরও এই শহরেই অবস্থিত।
প্রাচীনকালে বিশ্ববিখ্যাত ‘সিল্ক রুট’ বা রেশম পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল এই বাগদাদ। উট এবং ঘোড়ায় টানা বিশাল সব বাণিজ্য কাফেলা এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাগদাদে যাত্রাবিরতি করত। মশলা, রেশম, মণিমুক্তা আর সুগন্ধির সেই জমজমাট বাণিজ্যের কারণে বাগদাদ সেসময় এশিয়া ও ইউরোপের অর্থনীতিতে এক অবিস্মরণীয় ও বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল।
বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
বাগদাদ যুগে যুগে বহু জ্ঞানী, গুণী ও বিখ্যাত মানুষের জন্ম দিয়েছে বা তাদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত গণিতবিদ আল-খাওয়ারিজমি, দার্শনিক আল-কিন্দী এবং আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদ। আধুনিক যুগের বিখ্যাত স্থপতি জাহা হাদিদও এই শহরেরই সন্তান।

আধুনিক স্থাপত্যের রানিখ্যাত জাহা হাদিদ বাগদাদেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি স্থাপত্যের নোবেল খ্যাত ‘প্রিটজকার পুরস্কার’ জয়ী বিশ্বের প্রথম নারী স্থপতি।
বাগদাদের খাবার
বাগদাদের খাবার মূলত এরাবিক এবং মেসোপটেমীয় রান্নার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জাতীয় খাবার হলো ‘মাসগুফ’, যা এক বিশেষ পদ্ধতিতে পোড়ানো কার্প মাছ। এছাড়া দোলমা, কাবাব, ফালাফেল এবং কুবা বাগদাদের অতি পরিচিত ও সুস্বাদু খাবার।

বাগদাদের ঐতিহ্যবাহী ‘মাসগুফ’ মাছ রান্না করার পদ্ধতিটি বেশ রোমাঞ্চকর; মাছগুলোকে লম্বালম্বিভাবে কেটে খোলা আগুনের চারপাশে বৃত্তাকারে দাঁড় করিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয়, যা রাস্তায় এক চমৎকার দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
উৎসব
বাগদাদে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উভয় ধরনের উৎসবই খুব জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা হলো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এছাড়া বসন্তকালে ‘বাগদাদ আন্তর্জাতিক ফুল উৎসব’ এবং ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
বাগদাদ আন্তর্জাতিক ফুল উৎসবে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা লক্ষ লক্ষ প্রজাতির ফুল প্রদর্শন করা হয়, যা দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত এই শহরের মানুষের জন্য এক অসাধারণ শান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দর্শনীয় স্থান
বাগদাদ শহরের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। প্রাচীন আর আধুনিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায় এর প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে।
আল-জাওয়াদাইন

‘আল-জাওয়াদাইন’ বলতে শিয়া সম্প্রদায়ের ৭ম ইমাম মুসা আল-কাদিম এবং ৯ম ইমাম মুহাম্মাদ আল-জাওয়াদের পবিত্র মাজারদ্বয়কে বোঝায়। শিয়া মুসলিমদের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম পবিত্র একটি তীর্থস্থান।
‘আল-জাওয়াদাইন’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘দুইজন দয়ালু বা দানশীল ব্যক্তি’। শত শত বছর ধরে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই মাজার দুটি থেকে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে খাবার ও সাহায্য দেওয়া হয় বলে এই নামকরণ।
আল-কাদিমিয়া মসজিদ
আল-জাওয়াদাইনের মাজার দুটি যে বিশাল ও সুদৃশ্য মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত, সেটিই আল-কাদিমিয়া মসজিদ। এর চোখ ধাঁধানো সোনালী গম্বুজ এবং মিনারগুলো বাগদাদের অন্যতম আইকনিক দৃশ্য। এই মসজিদের বিশাল গম্বুজ এবং মিনারগুলো সম্পূর্ণ খাঁটি সোনা দিয়ে মোড়ানো। রোদের আলোতে এর সোনালী আভা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
আল-মুতানাব্বি মূর্তি
বাগদাদের বিখ্যাত ‘মুতানাব্বি স্ট্রিট’-এর শেষ প্রান্তে দজলা (টাইগ্রিস) নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে দশম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আরব কবি আল-মুতানাব্বির এই বিশালাকার ব্রোঞ্জের মূর্তিটি। মূর্তিটির ঠিক নিচেই কবির একটি বিখ্যাত কবিতার লাইন খোদাই করা আছে, যার অর্থ “রাত, ঘোড়া আর মরুভূমি আমাকে চেনে; চেনে তলোয়ার, বর্শা, কাগজ আর কলম।” এটি বাগদাদের মানুষের অদম্য সাহসের প্রতীক।
আল-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ

ইরান-ইরাক যুদ্ধে (১৯৮০-১৯৮৮) নিহত ইরাকি সৈন্যদের স্মরণে এই বিশাল স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়। একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত এই মনুমেন্টটি এর অনন্য আধুনিক স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। স্মৃতিস্তম্ভটির মূল নকশা হলো একটি বিশাল ফিরোজা রঙের গম্বুজ, যা ঠিক মাঝখান দিয়ে দুই ভাগে চিরে ফেলা হয়েছে। এই দুই ভাগের মাঝখানে একটি চিরশিখা জ্বলছে, যা শহীদদের আত্মার অমরত্বের প্রতীক।
বাগদাদী মিউজিয়াম
দজলা নদীর তীরে অবস্থিত এই জাদুঘরটি পুরোনো বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার এক নিখুঁত দর্পণ। আধুনিক বাগদাদের বুকে এটি যেন এক টুকরো টাইম মেশিন। এখানে কোনো সাধারণ ছবি বা মূর্তি নেই; বরং মোম দিয়ে তৈরি একদম জীবন্ত মানুষের মতো দেখতে ভাস্কর্য দিয়ে শত বছর আগের বাগদাদের বাজার, বিয়ে, স্কুল ও কারিগরদের দৈনন্দিন জীবন হুবহু ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আবু হানিফা মসজিদ

বাগদাদের আদহামিয়া এলাকায় অবস্থিত এটি সুন্নি মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় স্থান। সুন্নিদের হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফার সমাধির ওপর এই মসজিদটি নির্মিত। ১২৫৮ সালে মঙ্গোল আক্রমণ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বহু যুদ্ধ—এই মসজিদটি অসংখ্যবার ধ্বংসের মুখে পড়েছে এবং প্রতিবারই স্থানীয় মানুষের অনুদানে এটি পুনরায় আরও সুন্দর করে গড়ে তোলা হয়েছে।
উম্ম আল-কুরা মসজিদ
‘উম্ম আল-কুরা’ শব্দের অর্থ হলো ‘সকল শহরের মা’। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের স্মরণে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এই বিশাল মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদের মিনারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে আকাশের দিকে তাক করা একে-৪৭ রাইফেল এবং ‘স্কাড’ মিসাইল দাঁড়িয়ে আছে।
আব্বাসীয় প্রাসাদ
বাগদাদে আব্বাসীয় খিলাফত আমলের টিকে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শনের মধ্যে এটি অন্যতম। দজলা নদীর তীরের এই প্রাসাদটি এর সূক্ষ্ম ইটের কারুকাজ এবং অদ্ভুত সুন্দর খিলানের জন্য বিখ্যাত। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি আসলে কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন সময়ের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা, যা মঙ্গোলদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিল।
তাহরির স্কোয়ার

‘তাহরির’ মানে হলো মুক্তি বা স্বাধীনতা। এটি বাগদাদের সবচেয়ে বড় এবং কেন্দ্রীয় স্কোয়ার, যা ইরাকের আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই স্কোয়ারের একপাশে রয়েছে বিখ্যাত ‘লিবার্টি মনুমেন্ট’ বা স্বাধীনতার ভাস্কর্য। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ব্রোঞ্জের তৈরি ম্যুরাল, যেখানে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় স্টাইলে ইরাকের ১৯৫৮ সালের বিপ্লবের গল্প বলা হয়েছে।
বুরাথা মসজিদ
বাগদাদের কারখ এলাকায় অবস্থিত এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং রহস্যময় একটি ধর্মীয় স্থান। শিয়া মুসলিমদের কাছে এটি পবিত্র একটি তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য হয়। কিংবদন্তি রয়েছে যে, ইসলাম আসার আগে এই স্থানে একটি খ্রিস্টান মঠ ছিল। এমনকি হযরত আলী (রা.) নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর ফেরার পথে এখানে থামেন এবং নামাজ আদায় করেন। তাঁর সম্মানেই পরে এখানে মসজিদ নির্মিত হয়।
আল-কিশলা
উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে নির্মিত এই ভবনটি মূলত একটি সামরিক ব্যারাক ছিল। বর্তমানে এর বিশাল উঠান এবং ঘড়ির টাওয়ার (ক্লক টাওয়ার) বাগদাদের মানুষের অন্যতম প্রধান আড্ডাস্থল। আল-কিশলার ঐতিহাসিক ঘড়ির টাওয়ারটি আসলে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯২২ সালে ইরাককে উপহার দিয়েছিলেন। এটি বাগদাদের বুকে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ও অটোমান এই দুই সাম্রাজ্যের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
বাগদাদ শহরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ইতিহাসের পাতায় বাগদাদ এমন একটি নাম, যা শুনলেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐশ্বর্য আর প্রাচীন সভ্যতার কথা মনে পড়ে। ইরাকের এই রাজধানী শহরটি বহু উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী।
দজলা নদীর জাদুকরী শহর
বাগদাদ শহরটি বিখ্যাত দজলা বা টাইগ্রিস নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে। নদীটি শহরটিকে দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত করেছে পূর্ব দিকের অংশকে বলা হয় ‘রিসাফা’ এবং পশ্চিম দিকের অংশকে বলা হয় ‘কারখ’। এই নদীকে কেন্দ্র করেই বাগদাদের সভ্যতা ও বাণিজ্য হাজার বছর ধরে বিকশিত হয়েছে।
বৃত্তাকার শহর

৭৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর যখন বাগদাদ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনি একে নিখুঁত বৃত্তাকার আকৃতিতে নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন বিশ্বে এটি ছিল নগর পরিকল্পনার এক বিস্ময়। এর মূল শহরের ব্যাস ছিল প্রায় ২ কিলোমিটার এবং কেন্দ্রস্থলে ছিল খলিফার জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ ও প্রধান মসজিদ।
প্রাচীন বিশ্বের জ্ঞানের রাজধানী
অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাগদাদ ছিল পুরো পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজধানী। এখানকার বিখ্যাত ‘বায়তুল হিকমাহ’ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা ও দর্শনে বাগদাদের পণ্ডিতদের অবদান আজও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
প্রথম দশ লাখ জনসংখ্যার শহর
বাগদাদ ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম শহর, যার জনসংখ্যা দশ লাখের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল। নবম শতাব্দীর দিকে যখন ইউরোপের বড় বড় শহরগুলোতে মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার, তখন বাগদাদ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও ব্যস্ততম মহানগরী।
১২৫৮ সালের বিপর্যয়

বাগদাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায় হলো ১২৫৮ সালের মঙ্গোল আক্রমণ। হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী এই শহরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সমস্ত লাইব্রেরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল ধ্বংস করে দেয়। বলা হয়ে থাকে, মঙ্গোলদের ফেলে দেওয়া বইয়ের কালিতে দজলা নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল। এই পতনের পর বাগদাদ তার প্রাচীন জৌলুস চিরতরে হারিয়ে ফেলে।
আরব্য রজনীর শহর
বিশ্ববিখ্যাত লোককথার সংগ্রহ ‘হাজার এক আরব্য রজনী’-এর অনেক গল্পের পটভূমিই হলো এই বাগদাদ। বিশেষ করে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের সময়কার বাগদাদের ঐশ্বর্য, রোমাঞ্চ আর রহস্যের চমৎকার বর্ণনা এসব গল্পে পাওয়া যায়, যা শহরটিকে মানুষের কল্পনায় এক জাদুকরী রূপ দিয়েছে।
Reference:

