পার্কের ভেতরে দর্শনার্থীদের ঘোরার জন্য চাকার ওপর চলা একটি ছোট রেলগাড়ি রয়েছে, স্থানীয়রা যার নাম দিয়েছে “লেজার্ড”, যার অর্থ হলো ‘টিকটিকি’। দর্শনার্থীরা এই মজাদার টিকটিকি-ট্রেনে চড়ে পুরো পার্কটি খুব সহজেই ঘুরে দেখতে পারেন!

ফ্রান্সের লিয়ন শহরের কোলাহলের মাঝে এক বিশাল এবং মনোরম সবুজ আশ্রয়স্থল হলো পার্ক দে লা তেত দ’অর। প্রায় ১১৭ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি ফ্রান্সের অন্যতম বৃহত্তম এবং ইউরোপের সেরা আরবান পার্ক বা শহুরে উদ্যানগুলোর একটি। এটি লিয়নের “সবুজ ফুসফুস” হিসেবে পরিচিত। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু স্বস্তি পেতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের কাছে এর চেয়ে চমৎকার জায়গা আর নেই। বিশাল হ্রদ, সবুজের সমারোহ আর পাখপাখালির ডাকে এটি লিয়নের বুকে এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
“পার্ক দে লা তেত দ’অর” নামের অর্থ হলো “সোনার মাথার পার্ক”। প্রচলিত আছে যে, ক্রুসেডাররা যিশু খ্রিস্টের একটি বিশাল সোনার মাথা এই পার্কের মাটির নিচে কোথাও পুঁতে রেখেছিল, যা বহু খোঁজাখুঁজি করেও আজও কেউ খুঁজে পায়নি!
এই দৃষ্টিনন্দন পার্কটির নকশা করেছিলেন দুই ফরাসি ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট ভাই ইউজিন এবং ডেনিস বুহলার। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, লিয়ন শহর যখন দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিশাল উন্মুক্ত সবুজ জায়গার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়। এই চিন্তা থেকেই ১৮৫৭ সালে পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনের আদলে সাজানো হয়েছে, যেখানে রয়েছে আঁকাবাঁকা পথ, দিগন্তজোড়া খোলা প্রান্তর এবং বিশাল সব প্রাচীন গাছ।

১৮৫৭ সালটি আরবান পার্কের ইতিহাসের জন্য একটি বিশেষ বছর, কারণ ঠিক একই বছরে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের বিশ্ববিখ্যাত ‘সেন্ট্রাল পার্ক’ সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল!
পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর মাঝখানে থাকা বিশাল একটি কৃত্রিম হ্রদ, যা প্রায় ১৬ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। গ্রীষ্মকালে এই হ্রদটি এক প্রাণবন্ত রূপ ধারণ করে, যখন দর্শনার্থীরা প্যাডেল বোট বা ছোট নৌকা ভাড়া করে হ্রদের শান্ত জলে ঘুরে বেড়ান। হ্রদের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি ছোট্ট দ্বীপ, যার নাম ‘ইল দ্যু সোভেনির’ বা স্মৃতির দ্বীপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত লিয়নের সৈন্যদের স্মরণে এই দ্বীপে একটি সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে পৌঁছানোর জন্য পানির নিচ দিয়ে একটি সুড়ঙ্গপথ রয়েছে।
এই বিশাল হ্রদটি কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়নি। পার্কটি নির্মাণের সময় লিয়নের সাধারণ শ্রমিকরা নিজেদের হাতে মাটি খুঁড়ে এই হ্রদ তৈরি করেছিলেন এবং পাশের রোন নদীর পানি এনে এটি পূর্ণ করা হয়েছিল।
পার্ক দে লা তেত দ’অর শুধু একটি সাধারণ পার্ক নয়, এর ভেতরে রয়েছে একটি আস্ত চিড়িয়াখানা! ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘জুলজিক্যাল পার্ক’ লিয়ন শহরের এক বিশাল গর্ব। এখানে রয়েছে ‘আফ্রিকান প্লেইনস’, যেখানে জেব্রা, জিরাফ, সিংহ এবং ফ্লেমিঙ্গোর মতো প্রাণীরা খোলা পরিবেশে বিচরণ করে। এটি বর্তমানে বিরল ও বিপন্ন প্রাণীদের প্রজনন এবং সংরক্ষণের ওপর ব্যাপকভাবে কাজ করছে। শিশুদের জন্য এই চিড়িয়াখানাটি এক বিশাল আনন্দের জায়গা।

ইউরোপের খুব কম সংখ্যক শহরেই এত বিশাল এবং সমৃদ্ধ চিড়িয়াখানা রয়েছে, যা দর্শকদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং যার জন্য কোনো প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না!
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের জন্য এই পার্কটি একটি পরম তীর্থস্থান। এর ভেতরে রয়েছে ফ্রান্সের অন্যতম সেরা এবং বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন। প্রায় ৮ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বাগানে ১৫,০০০-এরও বেশি প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি করা বিশাল কাচের গ্রিনহাউসগুলো। এই গ্রিনহাউসগুলোতে আমাজনের গহিন অরণ্য থেকে শুরু করে মাদাগাস্কারের শুষ্ক অঞ্চলের নানা বিরল এবং মাংসাশী উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা দর্শকদের এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে যায়।
এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের কাচের তৈরি মূল ঐতিহাসিক গ্রিনহাউসটি এতটাই উঁচু যে, এর ভেতরে বিশাল আকারের পাম গাছগুলো অনায়াসে তাদের ডালপালা মেলে বেড়ে উঠতে পারে।
লিয়ন শহর ঐতিহাসিকভাবেই গোলাপ চাষ এবং নতুন প্রজাতির গোলাপ উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। আর এই ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়েই পার্ক দে লা তেত দ’অর-এ তৈরি করা হয়েছে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিনন্দন রোজ গার্ডেন বা গোলাপ বাগান। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল রোজ গার্ডেন’, যেখানে প্রায় ৩০,০০০-এরও বেশি গোলাপ গাছ রয়েছে। বসন্ত এবং গ্রীষ্মকালে যখন লক্ষ লক্ষ গোলাপ একসাথে ফুটে ওঠে, তখন পুরো পার্কটি এক স্বর্গীয় সুবাসে ভরে যায় এবং দর্শনার্থীরা এক জাদুকরী দৃশ্যের সাক্ষী হন।

পার্কের এই সুবিশাল ইন্টারন্যাশনাল রোজ গার্ডেনটি ১৯৬৪ সালে মোনাকোর বিশ্ববিখ্যাত রাজকুমারী এবং হলিউড অভিনেত্রী ‘গ্রেস কেলি’ স্বয়ং লিয়নে এসে উদ্বোধন করেছিলেন।
পার্ক দে লা তেত দ’অর-এ কেউ আসেন বিশাল লনে বসে পিকনিক করতে, কেউ জগিং বা সাইক্লিং করতে, আবার কেউবা কেবলই প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। এর ছিমছাম পথ ধরে হাঁটার সময় চোখে পড়বে শতবর্ষী পুরোনো সব বিশাল গাছ, যা লিয়নের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। কংক্রিটের ব্যস্ত শহরের মাঝে এমন একটি সবুজে ঘেরা পার্ক সত্যিই লিয়নবাসীর জন্য প্রকৃতির এক পরম আশীর্বাদ।
Reference:
- https://fr.wikipedia.org/wiki/Parc_de_la_T%C3%AAte-d%27Or
- https://www.lyon.fr/lieu/parcs/parc-de-la-tete-dor
- https://www.visiterlyon.com/sortir/parcs-jardins-et-lieux-de-balade/parc-de-la-tete-d-or
- https://www.loisirs-parcdelatetedor.com/le-parc
- https://www.lyon.fr/sortir-et-decouvrir/profiter-de-la-nature-en-ville/le-parc-de-la-tete-dor

