Image default
জাপানধর্মীয় স্থাপনাপর্যটন আকর্ষণ

প্রাচীন জাপানের প্রবেশদ্বার সেনসো-জি মন্দির

সেনসো-জি মন্দির মূলত আধুনিক টোকিও’র বুকেই লুকিয়ে থাকা এক টুকরো প্রাচীন জাপান। আসাকুসা এলাকার এই ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মন্দিরটি প্রতি বছর বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে কাছে টানে তার বিশালাকার লাল গেট, ধূপের মিষ্টি সুবাস আর এক শান্ত ধর্মীয় মায়ায়। দয়ার দেবী কাননকে উৎসর্গ করে তৈরি করা এই পবিত্র স্থানটি যেন ব্যস্ত শহরের মাঝে এক টুকরো শান্তির নীড়!

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

সেনসো-জি মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ১৪০০ বছরের পুরনো। লোকগাথা অনুযায়ী, ৬২৮ সালে হিয়োমা এবং হামানারি নামে দুই ভাই সুমিদা নদীতে মাছ ধরার সময় তাদের জালে দেবী কাননের একটি সোনার মূর্তি খুঁজে পান। তারা বারবার মূর্তিটি নদীতে ফেলে দিলেও সেটি বারবার তাদের জালে ফিরে আসছিল। পরবর্তীতে গ্রামের প্রধান এই মূর্তির মহিমা বুঝতে পারেন এবং নিজের ঘরকে একটি মন্দিরে রূপান্তর করেন যাতে সবাই দেবীর পূজা করতে পারে। এভাবেই ৬৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনসো-জি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

সেনসো-জি মন্দির
সেনসো-জি মন্দির – Image Source:tokyocheapo.com

মন্দিরের প্রধান আকর্ষণসমূহ

কামিনারিমোন বা বজ্রদ্বার

মন্দিরের প্রবেশপথে অবস্থিত এই বিশাল লাল গেটটি আসাকুসার প্রতীক। গেটটির মাঝখানে ঝুলে থাকা বিশালাকার লাল লণ্ঠনটি পর্যটকদের ছবি তোলার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। গেটের দুই পাশে বায়ু দেবতা এবং বজ্র দেবতার মূর্তি পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নাকামিসে শপিং স্ট্রিট 

কামিনারিমোন গেট দিয়ে ঢোকার পরই চোখে পড়বে ২০০ মিটারের একটি দীর্ঘ রাস্তা। এই রাস্তার দুই পাশে রয়েছে সারিবদ্ধ ছোট ছোট দোকান। এখানে জাপানিজ ঐতিহ্যবাহী স্ন্যাকস (যেমন: সেনবেই বা রাইস ক্র্যাকার), স্যুভেনিয়ার এবং কিমোনো পাওয়া যায়। এটি জাপানের অন্যতম প্রাচীন শপিং স্ট্রিট।

সেনসো-জি মন্দির
সোনার মূর্তি – Image Source:pixnio.com

হোজোমন গেট 

নাকামিসে রাস্তা পার হওয়ার পর দ্বিতীয় প্রধান তোরণ হলো হোজোমন। এই গেটটি মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। এর উপরে বুদ্ধের অমূল্য সূত্র বা স্ক্রোল সংরক্ষিত থাকে।

মেইন হল  

মন্দিরের মূল ভবন বা হন্দো-তে দেবী কাননের মূল মূর্তিটি রাখা আছে। যদিও মূল মূর্তিটি সাধারণ মানুষের দেখার জন্য উন্মুক্ত নয়, তবুও ভক্তরা এখানে এসে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তবে পরবর্তীতে জাপানিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটি হুবহু আগের মতো করে পুনর্নির্মাণ করা হয়। 

পাঁচ তলা প্যাগোডা 

মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই প্যাগোডাটি জাপানের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এটি বুদ্ধের অস্থির অবশেষ ধারণ করার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং রাতে আলোকসজ্জার সময় এটি এক অপার্থিব সৌন্দর্য ধারণ করে।

পাঁচ তলা প্যাগোডা – Image Source:panasonic.net

প্রচলিত বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা

সেনসো-জি মন্দিরে পর্যটকরা শুধু সৌন্দর্য দেখতেই আসেন না, বরং এখানকার ঐতিহ্যবাহী কিছু আচারে অংশ নিতেও পছন্দ করেন:

ওমিকুজি (ভাগ্য পরীক্ষা) 

এটি একটি মজার ভাগ্য গণনা পদ্ধতি। মাত্র ১০০ ইয়েনের বিনিময়ে একটি পাত্র থেকে কাঠের কাঠি তুলে নিতে হয়। সেই কাঠির নম্বর অনুযায়ী ড্রয়ার থেকে আপনার ভাগ্যের কাগজটি বের করতে হবে। যদি কাগজে খারাপ কিছু লেখা থাকে, তবে চিন্তার কিছু নেই! নিয়ম অনুযায়ী সেই কাগজটি মন্দিরের নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে বেঁধে রেখে আসতে হয়, যাতে অমঙ্গল সেখানেই থেমে যায়।

ধূপের ধোঁয়া 

মন্দিরের সামনে একটি বড় ধূপদানি থাকে যেখান থেকে প্রচুর সুগন্ধি ধোঁয়া বের হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র ধোঁয়া শরীরের যে অংশে লাগানো হয়, সেই অংশের রোগ বা ব্যথা সেরে যায়। তাই অনেককেই দেখা যায় দুহাত দিয়ে ধোঁয়া টেনে নিজের শরীরের দিকে নিতে।

উৎসব ও সংস্কৃতি

সেনসো-জি মন্দিরকে কেন্দ্র করে জাপানের অন্যতম বড় উৎসব ‘সানজা মাতসুরি’ পালিত হয়। মে মাসে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে এখানে মেলা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান লেগেই থাকে।

সানজা মাতসুরি – Image Source:wikimedia.org

ভ্রমণ তথ্য ও টিপস 

মন্দিরটি আসাকুসা স্টেশনের একেবারেই কাছে অবস্থিত। স্টেশন থেকে বের হয়ে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটলেই আপনি মন্দিরের প্রধান ফটকে পৌঁছে যাবেন। মন্দির প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখার জন্য কোনো প্রবেশ ফি বা টিকেটের প্রয়োজন হয় না বরং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। মন্দিরের মূল হলটি সাধারণত সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। চমৎকার আলোকসজ্জা উপভোগ করতে এবং ভিড় এড়াতে খুব সকালে অথবা সন্ধ্যার পর যেতে পারেন, যখন পুরো মন্দিরটি এক মায়াবী রূপ ধারণ করে।

সেনসো-জি মন্দির
মন্দিরের চমৎকার আলোকসজ্জা – Image Source:bokksu.com

ইতি কথা

সেনসো-জি মন্দির কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি জাপানিদের টিকে থাকার এবং বিশ্বাস ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ। যারা টোকিও ভ্রমণে আসেন, তাদের জন্য আসাকুসার এই মন্দিরটি দেখা বাধ্যতামূলক। এখানে আসলে আপনি জাপানের ইতিহাসের গভীরতা এবং মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখতে পাবেন।

সেনসো-জি মন্দির নিয়ে কিছু অবাক করা এবং মজার তথ্য 

১.  এই বিশাল মন্দিরের জন্ম হয়েছিল মাত্র ২০ সেন্টিমিটারের একটি ছোট সোনার মূর্তিকে কেন্দ্র করে। ৬২৮ সালে দুই ভাই মাছ ধরার সময় জালে দেবী কাননের মূর্তিটি পান। তারা যতবারই মূর্তিটি নদীতে ফেলে দিচ্ছিলেন, সেটি ততবারই অলৌকিকভাবে তাদের জালে ফিরে আসছিল।

২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা হামলায় মন্দিরের বেশিরভাগ অংশই ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও, সাধারণ মানুষের ভালোবাসার অনুদানে এটি হুবহু আগের রূপে দ্রুত পুনর্নিমাণ করা হয়। এটি জাপানিদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক।

৩. কামিনারিমোন গেটে ঝুলে থাকা সেই বিখ্যাত লাল লণ্ঠনটি উচ্চতায় ৩.৯ মিটার এবং প্রস্থে ৩.৩ মিটার। এর ওজন প্রায় ৭০০ কেজি! এটি নিয়মিত বিরতিতে পরিবর্তন করা হয় এবং বর্তমানে যে লণ্ঠনটি আছে সেটি প্যানাসনিক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা কোণোসুকে মাৎসুশিতা দান করেছিলেন।

৪. মন্দিরের ঠিক মাঝখানে একটি বড় ধূপদানি থাকে। বিশ্বাস করা হয়, এর ধোঁয়া শরীরের যে অঙ্গে লাগানো হবে, সেই অঙ্গের অসুস্থতা সেরে যাবে। তাই অনেক পর্যটককে দেখবেন দুহাতে ধোঁয়া টেনে মাথায় বা শরীরে মাখছেন।

৫. এখানকার ‘ওমিকুজি’ বা ভাগ্য গণনায় যদি আপনার খারাপ ভাগ্য আসে, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মন্দিরের লোহার স্ট্যান্ডে কাগজটি বেঁধে দিলে বিশ্বাস করা হয়, আপনার দুর্ভাগ্য সেখানেই আটকে থাকবে এবং আপনার সাথে ঘরে ফিরবে না।

৬. মন্দিরের ছাদে এবং বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগনের কারুকাজ দেখা যায়। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, ড্রাগন হলো পানির দেবতা। মন্দিরে অগ্নিকাণ্ড রোধ করতে এবং পবিত্রতা বজায় রাখতে প্রতীকী হিসেবে ড্রাগন ব্যবহার করা হয়।

৭. দিনের বেলা এখানে প্রচণ্ড ভিড় থাকে, তবে সূর্যাস্তের পর পুরো মন্দির এলাকা যখন সোনালী আলোয় সেজে ওঠে, তখন এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা কাজ করে। অনেকেই জানেন না যে, রাতের সেনসো-জি দিনের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর এবং শান্ত।

Reference:

Related posts

অ্যানিমের শহর- টোকিও

অটোমান সাম্রাজ্যের জীবন্ত অধ্যায় তোপকাপি প্রাসাদ !

কুয়ান্তানের মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকত তেলুক চেম্পেদাক

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More