২০০৮ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য টাইমস’ পৃথিবীর সেরা ২০টি ভবনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। তাজমহল এবং পার্থেননের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি পুরো জাপান থেকে একমাত্র ভবন হিসেবে উমেদা স্কাই বিল্ডিং সেই সম্মানজনক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল!
জাপানের ওসাকা শহরের অন্যতম আইকনিক এবং দর্শনীয় আধুনিক স্থাপনা হলো ‘উমেদা স্কাই বিল্ডিং’। ওসাকা স্টেশনের কাছাকাছি কিতা জেলায় অবস্থিত এই আকাশচুম্বী ভবনটি শহরের আধুনিকতার এক অনন্য প্রতীক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো সাই-ফাই সিনেমার ভবিষ্যৎ শহরের একটি অত্যাধুনিক স্পেস স্টেশন পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে। ১৭৩ মিটার উঁচু এই ভবনের ডিজাইন এতটাই ব্যতিক্রমী যে, এটি কেবল জাপানেই নয়, পুরো বিশ্বের স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে এক বিশাল বিস্ময়। ওসাকা ভ্রমণে গিয়ে যারা আধুনিক স্থাপত্যের পাশাপাশি শহরের একটি ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য উমেদা স্কাই বিল্ডিং একটি অবশ্য দর্শনীয় স্থান।

উমেদা স্কাই বিল্ডিংয়ের নকশা করেছিলেন বিখ্যাত জাপানি স্থপতি হিরোশি হারা এবং এটি ১৯৯৩ সালে নির্মাণ শেষ হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই স্থপতিই কিয়োটো শহরের আইকনিক ‘কিয়োটো স্টেশন’-এরও নকশা করেছিলেন, যা জাপানের আরেকটি স্থাপত্য বিস্ময়।

এই ভবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অদ্ভুত এবং নজরকাড়া গঠন। উমেদা স্কাই বিল্ডিং মূলত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ৪০ তলা বিশিষ্ট টাওয়ার নিয়ে গঠিত টাওয়ার ইস্ট এবং টাওয়ার ওয়েস্ট। এই দুটি বিশাল টাওয়ারকে একে অপরের সাথে যুক্ত করেছে ওপরের দিকে থাকা একটি অসাধারণ ব্রিজ বা অবজারভেটরি, যা “ফ্লোটিং গার্ডেন অবজারভেটরি” নামে পরিচিত। নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকালে মনে হয় দুটি বিশাল স্তম্ভ আকাশের বুকে একটি চাকতিকে মাথায় করে দাঁড়িয়ে আছে। এই অদ্ভুত এবং সাহসী ডিজাইনের কারণে ভবনটিকে অনেকেই “ভবিষ্যতের আর্ক ডি ট্রায়াম্ফ” বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।
মূল নকশায় এটি “সিটি অফ এয়ার” নামক একটি মেগা প্রজেক্টের অংশ ছিল, যেখানে ৪টি বিশাল টাওয়ার একে অপরের সাথে যুক্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেসময় জাপানের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাজেট মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় মূল নকশা পরিবর্তন করে এটিকে মাত্র ২টি টাওয়ারে নামিয়ে আনা হয়।
উমেদা স্কাই বিল্ডিংয়ের চূড়ায় পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটি ভবনের মতোই রোমাঞ্চকর। এর অবজারভেটরিতে যাওয়ার জন্য দর্শনার্থীদের প্রথমে একটি স্বচ্ছ কাঁচের লিফটে করে ৩৫ তলায় উঠতে হয়। লিফট থেকে বাইরের শহরের দৃশ্য ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকাটা এক দারুণ অনুভূতি দেয়। তবে আসল চমক অপেক্ষা করে এরপরেই। ৩৫ তলা থেকে ৩৯ তলায় যাওয়ার জন্য আপনাকে শূন্যে ভাসমান একটি ভি-আকৃতির এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে। দুটি টাওয়ারের ঠিক মাঝখানের শূন্যস্থানে, মাটি থেকে প্রায় ১৫০ মিটার ওপরে ঝুলন্ত এই কাঁচের এসকেলেটরে ওঠার সময় মনে হবে আপনি যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশে ভাসছেন!

এই ভাসমান এসকেলেটরটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ঝুলন্ত এসকেলেটরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর চারপাশ পুরোটাই স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি হওয়ায়, উচ্চতাভীতি আছে এমন মানুষদের জন্য এটি একইসাথে চরম ভয়ের এবং দারুণ উত্তেজনার একটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা!
৩৯ তলার টিকিট কাউন্টার পার হয়ে আপনি যখন ৩৯ ও ৪০ তলায় পৌঁছাবেন, তখন আপনি প্রবেশ করবেন বিখ্যাত “ফ্লোটিং গার্ডেন অবজারভেটরি”-তে। নাম ‘গার্ডেন’ হলেও এখানে কোনো গাছপালা নেই, বরং এটি আকাশের বুকে ভাসমান একটি বিশাল ডেক। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ছাদ, যা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। জাপানের বেশিরভাগ উঁচু ভবনের অবজারভেটরিগুলো কাঁচ দিয়ে ঘেরা থাকে, কিন্তু উমেদা স্কাই বিল্ডিংয়ের ছাদে আপনি সরাসরি খোলা বাতাসে দাঁড়িয়ে ওসাকা শহরের চমৎকার ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় আকাশ যখন কমলা আর লাল রঙে সেজে ওঠে এবং সন্ধ্যার পর ওসাকা শহর যখন লাখো নিয়ন আলোয় জ্বলে ওঠে, তখনকার দৃশ্য একেবারেই জাদুকরী।

রাতের বেলায় এই উন্মুক্ত ছাদের হাঁটার পথটি অতিবেগুনি রশ্মির আলোয় তারার মতো জ্বলে ওঠে। হাঁটার পথে ব্যবহৃত বিশেষ ফসফরাস মিশ্রিত পাথরের কারণে অন্ধকারের মধ্যে মনে হয় আপনি যেন মহাকাশের কোনো গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের ওপর দিয়ে হাঁটছেন।
ভবনের ওপরের অংশটি যেখানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়, ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যায় এর বেজমেন্ট বা আন্ডারগ্রাউন্ডে। উমেদা স্কাই বিল্ডিংয়ের মাটির নিচের তলায় রয়েছে “তাকিমি কোজি” নামের একটি রেস্তোরাঁর গলি। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা আপনাকে ১৯২০ বা ১৯৩০-এর দশকের পুরোনো জাপানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। সরু গলি, পুরোনো দিনের পোস্টার, ঐতিহ্যবাহী পাথরের রাস্তা, একটি ছোট ইনারি মন্দির এবং পুরনো ধাঁচের লাল ডাকবাক্স সব মিলিয়ে এটি এক অদ্ভুত নস্টালজিক পরিবেশ তৈরি করে।

তাকিমি কোজির ভেতরে রাখা পুরোনো দিনের একটি ভিনটেজ গাড়ি এবং একটি আসল ডাইহাৎসু মিজেট থ্রি-হুইলার ট্রাক রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের কাছে ছবি তোলার জন্য ভীষণ জনপ্রিয় এবং এটি সত্যি সত্যিই শোয়া যুগের একটি আসল গাড়ি!
উমেদা স্কাই বিল্ডিং কেবল লোহা আর কাঁচের একটি নিষ্প্রাণ জঙ্গল নয়; এর চারপাশে প্রকৃতিকেও খুব সুন্দরভাবে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ভবনের নিচতলায় রয়েছে “চুজেনজি নো মোরি” বা একটি ছোট আরবান ফরেস্ট (শহুরে বন) এবং চমৎকার সব জলাশয়। এই কৃত্রিম জঙ্গলটি প্রায় ৫০ প্রজাতিরও বেশি গাছপালায় সাজানো। ব্যস্ত শহরের মাঝে এটি একটি ছোট মরুদ্যানের মতো কাজ করে। এখানকার জলাশয় ও ছোট জলপ্রপাতের শব্দ ভবনের চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহলকে ভুলিয়ে দেয়। এছাড়া এর দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি যা একটি “ওয়াল অফ হোপ” বা আশার দেয়াল হিসেবে পরিচিত, যেখানে বিভিন্ন মৌসুমি ফুল ফুটে থাকে।
দুটি ভবনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে শহরের বাতাস খুব সহজেই এর ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে। এটি এক ধরনের “থার্মাল টানেল” হিসেবে কাজ করে, যা ভবনের চারপাশের তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং পরিবেশবান্ধব।
আধুনিক স্থাপত্য, পুরোনো দিনের স্মৃতি, এবং উন্মুক্ত আকাশের এক অপূর্ব মিলনস্থল হলো এই উমেদা স্কাই বিল্ডিং। এটি শুধু পর্যটকদের জন্যই নয়, বরং স্থানীয় প্রেমিক যুগলদের কাছেও একটি ভীষণ জনপ্রিয় ডেটিং স্পট। অবজারভেটরির ৪০ তলায় একটি নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে যেখানে কাপলরা তাদের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে “হার্ট লক” বা হৃদয় আকৃতির তালা ঝুলিয়ে রাখে। এছাড়া এখানকার ক্যাফেতে বসে কফি পান করতে করতে শহরের ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখাটা আপনার ওসাকা ভ্রমণকে একটি চিরস্মরণীয় রূপ দেবে। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আর শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা এই দুইয়ের এক দারুণ মেলবন্ধন হলো এই ভবনটি।
ওসাকা ভ্রমণের সময় আপনার অবশ্যই উমেদা স্কাই বিল্ডিংয়ে যাওয়া উচিত, কারণ এটি আপনাকে আধুনিক স্থাপত্য এবং রেট্রো জাপানের এক দারুণ বৈপরীত্য উপহার দেবে। ১৭৩ মিটার উঁচুতে থাকা এর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত “ফ্লোটিং গার্ডেন অবজারভেটরি” থেকে খোলা বাতাসে দাঁড়িয়ে পুরো ওসাকা শহরের মনোমুগ্ধকর ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ উপভোগ করা যায়। এছাড়া দুটি ভবনের মাঝে শূন্যে ভাসমান স্বচ্ছ কাঁচের এসকেলেটরে ওঠার শিহরণ এবং রাতের বেলায় তারার মতো জ্বলে ওঠা “লুমি স্কাই ওয়াক”-এর জাদুকরী পরিবেশ আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলবে। ওপরে যখন ভবিষ্যতের আধুনিকতা, তখন ভবনের নিচতলাতেই রয়েছে “তাকিমি কোজি” নামের পুরনো ধাঁচের এক রেস্তোরাঁর গলি, যেখানে আপনি ১৯২০-এর দশকের নস্টালজিক পরিবেশে ওসাকার বিখ্যাত সব খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।
Reference:

