Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

প্রকৃতির অপার বিষ্ময় গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক

বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পাহাড়ি রাস্তা ‘গোয়িং-টু-দ্য-সান রোড’ ধরে মেঘের রাজ্যে ভেসে যেতে চান? যেখানে আকাশছোঁয়া বরফচূড়া আয়নার মতো ভেসে উঠে স্বচ্ছ হ্রদের জলে, যেখানে বন্য ভাল্লুকেরা বনের রাজা সেজে ঘুরে বেড়ায় আপন মনে। গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক আপনাকে দিচ্ছে সেই সুযোগ। প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখতে চাইলে জীবদ্দশায় একবার হলেও যেতে চাইবেন মনোমুগ্ধকর এই স্থানটিতে।xa0

পৃথিবীর বুকে এমন কিছু জায়গা আছে, যার বিশালতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যxa0 ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমেরিকার মন্টানা রাজ্যে, কানাডার সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক (Glacier National Park) তেমনই এক স্থান। মিলিয়ন একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা এক মহাকাব্য। জায়গাটির পরতে পরতে রয়েছে আকাশছোঁয়া পর্বতচূড়া, হাজার বছরের পুরনো হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার, আয়নার মতো স্বচ্ছ ফিরোজা রঙের হ্রদ আর উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় কিছু বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ।

এই পার্কটিকে প্রায়শই “ক্রাউন অফ দ্য কন্টিনেন্ট” বা “মহাদেশের মুকুট” বলা হয়।xa0 যারা হাইকিং ভালোবাসেন, যারা বন্যপ্রাণীর সাথে হাসিমুখে সেলফি তুলতে চান অথবা যারা শুধু গাড়ির কাচঢাকা জানালার ভেতর দিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে চান; তাদের সবার জন্য গ্লেসিয়ার পার্ক এক অফুরন্ত বিস্ময়ের ভান্ডার।

আজকের লেখায় আমরা গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক ভ্রমণের একটি সম্পূর্ণ গাইড তুলে ধরব; জানব এর সেরা দর্শনীয় স্থান, হাইকিং ট্রেইল, এবং একটি সফল ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি সম্পর্কে।

গ্লেসিয়ার পার্কের গোয়িং-টু-দ্য-সান রোড

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্কের কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে আসে, তা হলো গোয়িং-টু-দ্য-সান রোড (Going-to-the-Sun Road)। এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক অবিশ্বাস্য কীর্তি এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা পাহাড়ি ড্রাইভ। প্রায় ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই রাস্তাটি পার্কের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে এবং এটিই একমাত্র রাস্তা, যা পার্কের একেবারে ভেতর দিয়ে গিয়েছে।

এই রাস্তা ধরে গাড়ি চালানো এক কথায় রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা দেবে আপনাকে। আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়িটি যখন ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকবে, আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে বিশাল উপত্যকা, আকাশছোঁয়া বরফের চূড়া। আর নিচে তাকালেই দেখবেন গভীর এক খাদ। যেতে যেতে দেখা মিলবে পাহাড়ি ছাগল (Mountain Goat) বা বিগহর্ন ভেড়ার (Bighorn Sheep)।

বিগহর্ন ভেড়া

এই রাস্তার সর্বোচ্চ বিন্দু হলো লোগান পাস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬,৬৪৬ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এটি কন্টিনেন্টাল ডিভাইডের উপর অবস্থিত এবং এখান থেকে পার্কের সবচেয়ে সুন্দর কিছু দৃশ্য দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে এখানকার তৃণভূমি নাম না জানা বুনো ফুলে ছেয়ে থাকে, যা পার্কের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।xa0

তবে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এই রাস্তাটি শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালেই (সাধারণত জুন মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি) পুরোপুরি খোলা থাকে, কারণ বছরের বাকি সময় এটি প্রচণ্ড তুষারপাতে ঢাকা থাকে। এই রাস্তাটি এতটাই জনপ্রিয় যে এখানে প্রবেশের জন্য আগে থেকেই অনলাইনে গাড়ি বুকিং দিয়ে রাখতে হয়। ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় বিষয়টি মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

হাইকারদের জন্য সেরা কয়েকটি হাইকিং ট্রেইল

গ্লেসিয়ার পার্কের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে হাইকিং বা ট্রেকিং করতেই হবে। এখানে সহজ থেকে শুরু করে অত্যন্ত কঠিন সব ধরনের হাইকারদের জন্য ৭০০ মাইলেরও বেশি ট্রেইল রয়েছে। এদের মধ্যে আছে-

অ্যাভালাঞ্চ লেক ট্রেইল (Avalanche Lake Trail)

xa0এটি পার্কের অন্যতম জনপ্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে সহজ একটি ট্রেইল। প্রায় ৪.৫ মাইল (৭.২ কিমি) দীর্ঘ এই ট্রেইলটি আপনাকে নিয়ে যাবে প্রাচীন সিডার গাছের জঙ্গলের দিকে, যার শেষে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর অ্যাভালাঞ্চ লেক। লেকের চারপাশে থাকা উঁচু পাহাড় থেকে বেশ কয়েকটি জলপ্রপাত সরাসরি লেকের জলে এসে মেশে, যা এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করে। পরিবারসহ ভ্রমণের জন্য এটি একটি আদর্শ ট্রেইল।

অ্যাভালাঞ্চ লেক ট্রেইল

গ্রিনেল গ্লেসিয়ার ট্রেইল (Grinnell Glacier Trail)

যারা ভ্রমণের মাঝে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা চাইছেন, তাদের জন্য এই ট্রেইলটি হতে পারে আকর্ষণীয় একটি স্থান।xa0

প্রায় ১১ মাইল (১৭.৭ কিমি) দীর্ঘ এই ট্রেইল আপনাকে নিয়ে যাবে পার্কের অন্যতম বিখ্যাত গ্রিনেল গ্লেসিয়ারের একেবারে কাছে। পথের দু’পাশে পড়বে সুন্দর গ্রিনেল লেক এবং আপার গ্রিনেল লেক, যার ফিরোজা রঙের জল আপনাকে নিমিষেই মুগ্ধ করবে। এই ট্রেইলে প্রায়ই গ্রিজলি ভাল্লুক এবং পাহাড়ি ছাগল দেখা যায়।

হাইলইন ট্রেইল (Highline Trail)

এটি গ্লেসিয়ার পার্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর ট্রেইলগুলোর একটি। লোগান পাস থেকে শুরু হওয়া এই ট্রেইলটি প্রায় ১১.৬ মাইল (১৮.৬ কিমি) দীর্ঘ। এটি পাহাড়ের খাড়া ঢালের পাশ দিয়ে চলে গেছে, যা থেকে চারপাশের এক অবিশ্বাস্য প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। যাদের হাইটফোবিয়া আছে, তাদের জন্য এই ট্রেইল কিছুটা ভীতিকর হতে পারে, কিন্তু এর চারপাশের সৌন্দর্য সেই ভয়কে জয় করার জন্য যথেষ্ট।

গ্লেসিয়ার পার্কের বন্যপ্রাণী: এক জীবন্ত সাফারি

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক উত্তর আমেরিকার বন্যপ্রাণী দেখার জন্য অন্যতম সেরা একটি জায়গা। এটি বিশ্বের এমন কয়েকটি স্থানের মধ্যে একটি যেখানে আমেরিকা মহাদেশের প্রায় সব শিকারী ধরনের প্রাণী এখনও বাধাহীনভাবে বসবাস করে আসছে।xa0

যেমন- পার্কের সবচেয়ে আকর্ষণ এবং একই সাথে ভয়ংকর প্রাণী হলো গ্রিজলি ভাল্লুক। তাদের দর্শন পাওয়ার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো গ্রিনেল এবং হাইলইন ট্রেইলের মতো উঁচু এলাকার ট্রেইলগুলো। তবে, মনে রাখা প্রয়োজন, তাদের থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্ব (অন্তত ১০০ গজ) বজায় রাখা খুবই জরুরি এবং তাদের দেখতে চাইলে সাথে করে অবশ্যই বেয়ার স্প্রে নিয়ে যাবেন।xa0

এছাড়া, এই পার্কের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানকার পাহাড়ি ছাগল। এই প্রাণীগুলোকে প্রায়শই লোগান পাসের আশেপাশে পাহাড়ের খাড়া ঢালে অনায়াসে চড়ে বেড়াতে দেখা যায়।

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্কে মুজ

xa0এখানে আপনি বেশ বড়, বাঁকানো শিংওয়ালা ভেড়া দেখতে পাবেন যাদের বিগহর্ন ভেড়া নামে ডাকা হয়। এরা উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বাস করে।

এছাড়া, পার্কে মুজ (Moose), এল্ক (Elk), কালো ভাল্লুক (Black Bear), নেকড়ে এবং বিরল উলভারিনও (Wolverine) রয়েছে। বন্যপ্রাণী দেখার সেরা সময় হলো খুব সকালে অথবা সন্ধ্যার ঠিক আগে।

বরফের ইতিহাস এবং বর্তমান সংকট

এই পার্কটির নামকরণ হয়েছে এর হিমবাহ বা গ্লেসিয়ারের নামে।xa0

ইতিহাসবিদদের মতে, বরফ যুগের শেষে, প্রায় ১০,০০০ বছর আগে, এই পুরো এলাকাটি বিশাল বরফের চাদরে ঢাকা ছিল। সেই বরফের চাদর সরে যাওয়ার সময়ই এটি আজকের এই U-আকৃতির উপত্যকা, ধারালো পর্বতচূড়া এবং সুন্দর হ্রদগুলো তৈরি করে গেছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও পার্কে প্রায় ১৫০টি সক্রিয় হিমবাহ ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, আজ সেই সংখ্যা কমতে কমতে ২৫-এর নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পার্কের প্রায় সব হিমবাহই পুরোপুরি গলে যেতে পারে। এই পরিবর্তন পার্কের বাস্তুতন্ত্র এবং জলবায়ুর উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।xa0

তাই, গ্লেসিয়ার পার্ক ভ্রমণ শুধু প্রিয়জনদের সাথে ছুটি কাটানো নয় বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবকে কাছ থেকে দেখার এবং একই সাথেxa0 সচেতন হওয়ার সুযোগও বটে।

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক এ ক্যাম্পিং

গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতির বিশালতা, বৈচিত্র্য আর সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। গোয়িং-টু-দ্য-সান রোডের রোমাঞ্চকর ড্রাইভ থেকে শুরু করে গ্রিনেল গ্লেসিয়ারের বরফ ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা, অথবা একটি গ্রিজলি ভাল্লুককে দূর থেকে দেখার উত্তেজনা; এই পার্কের প্রতিটি মুহূর্তই আপনার স্মৃতিতে অমলিন থাকবে আজীবন।xa0

এই জায়গাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে এখনও কতটা বিস্ময় লুকিয়ে আছে এবং সেই বিস্ময়কে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র –

Related posts

চীনের স্বর্গরাজ্য জিউঝাইগো- ১১৪টি রঙিন হ্রদ ও লোককথা

হাচিকো: বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কুকুরের বাস্তব গল্প

যুদ্ধই গড়েছে আধুনিক জীবনের অনুষঙ্গ আধুনিক প্রযুক্তি

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More