স্ত্রীর লাঞ্চের দেরি সইতে না পেরে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের শুরু করা সেই ‘দুপুর ১২টার অ্যালার্ম’ কামানের তোপধ্বনি হয়ে আজও নিস শহরকে মাতিয়ে রাখছে!
নিস শহর পশ্চিম ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত এক মনোমুগ্ধকর ও ঐতিহাসিক শহর। ফরাসি রিভিয়েরা বা “কোত দাজ্যুর” অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরটি তার নীল সমুদ্র, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া, মনোরম সৈকত এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত। সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা নিস দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটক ও অবকাশযাপনপ্রেমীদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। এখানে ইতিহাস, শিল্পকলা, আধুনিক জীবনধারা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসাথে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য পরিবেশ।

ভৌগোলিক অবস্থান
নিস শহরের ভৌগোলিক অবস্থান একে ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত করেছে। এটি বিখ্যাত ফরাসি রিভিয়েরা বা কোত দাজ্যুর -এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। নিসের পশ্চিমে রয়েছে বিখ্যাত কান শহর এবং পূর্বে রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র মোনাকো ও ইতালির সীমান্ত।
ইতালি সীমান্ত থেকে এই শহরের দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার। এই কারণেই নিস শহরে ফরাসি এবং ইতালীয় উভয় সংস্কৃতির এক চমৎকার মিশ্রণ দেখা যায়। এছাড়া এটি মার্সেই এবং জেনোয়া শহরের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পয়েন্টে অবস্থিত।

জনসংখ্যা ও আঞ্চলিক প্রভাব
জনসংখ্যার ভিত্তিতে নিস ফ্রান্সের একটি অন্যতম প্রধান মহানগরী। এটি প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ এবং তুলুজের পরেই ফ্রান্সের পঞ্চম জনবহুল শহর হিসেবে স্বীকৃত।
ভূমধ্যসাগর এবং আল্পস পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় শহরটির আয়তন সীমিত, যার ফলে এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশ বেশি। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের আগমনে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নিস মূল শহরে বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পুরো মেট্রোপলিটন বা মহানগর এলাকা ধরলে এর জনসংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ উপরে।

নিস শহরের ইতিহাস
নিস শহরটি কেবল একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এর প্রতিটি গলি আর পাথুরে সৈকতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বিবর্তনের গল্প।
প্রাচীন যুগ
নিস শহরের গোড়াপত্তন হয় প্রাচীন গ্রীকদের মাধ্যমে। তারা যখন ভূমধ্যসাগরের তীরে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে, তখন তারা মার্সেই থেকে এসে এখানে একটি দুর্গবেষ্টিত শহর গড়ে তোলে। গ্রীকরা পার্শ্ববর্তী লিগুরিয়ান উপজাতিদের পরাজিত করে এই শহরের নাম দেয় ‘নিকাইয়া’। গ্রীক পুরাণে ‘নিক’ হলেন বিজয়ের দেবী। অর্থাৎ, শুরু থেকেই এই শহরের নাম ছিল ‘বিজয় নগরী’।
পরবর্তীকালে এই শহরটি রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। রোমান আমলে বর্তমান নিসের পাহাড়ের ওপর ‘সেমেনেলিয়াম’ নামে একটি আলাদা শহর গড়ে উঠেছিল, যার ধ্বংসাবশেষ আজও সিমিয়েজ এলাকায় দেখা যায়।
মধ্যযুগ ও ইতালীয় প্রভাব
নিস শহরের চরিত্রে যে আভিজাত্য আমরা দেখি, তার সিংহভাগ এসেছে ইতালীয় প্রভাব থেকে। ১৩৮৮ সালে নিস নিজেকে সাভয় রাজবংশের সুরক্ষায় সঁপে দেয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী এটি মূলত ইতালীয় সার্ডিনিয়া রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল।
এই দীর্ঘ সময়ে নিসে ইতালীয় স্থাপত্য, খাদ্যাভ্যাস এবং ভাষার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। আজও ওল্ড টাউনে হাঁটলে মনে হবে আপনি ফ্রান্সের চেয়ে ইতালির কোনো শহরে বেশি আছেন।
নিস শহরটি ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। ১৮৬০ সালে ইতালির একীভূতকরণের সময় ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন এবং সার্ডিনিয়া রাজ্যের মধ্যে ‘তুরিন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ইতালিতে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে নিস এবং সাভয় অঞ্চলটি ফ্রান্সকে দিয়ে দেওয়া হয়।
১৮৬০ সালের এপ্রিলে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নিসের মানুষ বিপুল ভোটে ফ্রান্সের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়। এরপর থেকেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
আধুনিক নিস শহর
ফ্রান্সের অংশ হওয়ার পর, বিশেষ করে ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে নিস বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেতে শুরু করে। ইউরোপের বিশেষ করে ব্রিটিশ এবং রাশিয়ান রাজপরিবার ও অভিজাতরা শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে নিসে আসতে শুরু করেন। তাদের জন্যই বিখ্যাত ‘প্রমেনাড ডেস অ্যাঙ্গলেস’ নির্মিত হয়। ২০২১ সালে ইউনেস্কোনিস শহরকে এর স্থাপত্য এবং ‘শীতকালীন অবকাশযাপন শহর’ হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দান করে।

নিস শহরের দর্শনীয় স্থান
নিস শহরটি যেন একটি উন্মুক্ত জাদুঘর। এর প্রতিটি মোড়েই রয়েছে নতুন কোনো বিস্ময়।
প্রমেনাড ডেস অ্যাঙ্গলেস
নিস বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সমুদ্রের কোল ঘেঁষা এই ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রশস্ত রাস্তা। ১৮শ শতাব্দীতে শীতকালে অনেক ইংরেজ পর্যটক এখানে সময় কাটাতে আসতেন। তাদের অর্থায়নেই এই হাঁটার পথটি নির্মিত হয়েছিল বলে এর নাম ‘ইংরেজদের হাঁটার পথ’।
নীল জলরাশি আর পাম গাছের সারিতে ঘেরা এই রাস্তাটি সাইক্লিং, স্কেটিং বা বিকেলের অলস হাঁটার জন্য বিশ্বের অন্যতম সেরা জায়গা। সমুদ্রের নীল রঙের সাথে মিলিয়ে এখানে রাখা আইকনিক নীল চেয়ার নিসের ঐতিহ্যের অংশ।

ওল্ড টাউন
নিস শহরের আসল আত্মা এবং প্রাচীন রূপ বাস করে এই ওল্ড টাউনে। এখানকার গোলকধাঁধার মতো সরু গলি, উজ্জ্বল হলুদ ও লাল রঙের দালান এবং বারোক স্থাপত্য আপনাকে ইতালীয় আমেজ দেবে। ওল্ড টাউনের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার বিখ্যাত বাজার। প্রতিদিন সকালে এখানে রঙের মেলা বসে কখনো সুগন্ধি ফুলের বাজার, কখনো বা সতেজ ফল ও সবজির মেলা। সোমবার এখানে এন্টিক বা পুরোনো শৌখিন জিনিসের বাজার বসে যা পর্যটকদের ভীষণ প্রিয়।

ক্যাসেল হিল
পুরো নিস শহরকে এক পলকে দেখার জন্য ক্যাসেল হিল এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই। নাম ‘ক্যাসেল হিল’ হলেও এখানে এখন কোনো দুর্গ নেই, তবে রয়েছে চমৎকার বাগান এবং একটি বিশালাকার কৃত্রিম ঝরনা। এখান থেকে একদিকে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি আর অন্যদিকে শহরের লাল ছাদের বাড়িগুলোর যে দৃশ্য দেখা যায়, তাকে পর্যটকরা ‘পোস্টকার্ড ভিউ’ বলে থাকেন। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি শহরের সেরা স্পট।

প্লেস মাসেনা
নিস শহরের প্রধান এবং সবচেয়ে রাজকীয় চত্বর প্লেস মাসেনা। লাল রঙের সুদৃশ্য দালান, মেঝেতে সাদা-কালো মার্বেলের দাবার ছকের মতো নকশা আর বিশাল ‘ফাউন্টেন অফ দ্য সান’ এই চত্বরটিকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। এখানে আধুনিক ভাস্কর্য হিসেবে খুঁটির ওপর বসা সাতটি আলোকিত মূর্তি দেখা যায়, যা বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সংহতির প্রতীক।

ফিনিক্স পার্ক
নিস শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, পরিবারের সাথে বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য ফিনিক্স পার্ক এক অনন্য গন্তব্য। ৭ হেক্টরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি একাধারে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ছোটখাটো একটি চিড়িয়াখানা। পার্কের মাঝখানে রয়েছে সাত হাজার বর্গমিটারের একটি বিশাল কাঁচের ঘর বা গ্রিনহাউস। এটি বিশ্বের অন্যতম উঁচু গ্রিনহাউস হিসেবে পরিচিত।

পোর্ট লিম্পিয়া
নিস শহরের পূর্ব দিকে অবস্থিত পোর্ট লিম্পিয়া হলো এই অঞ্চলের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। ১৮শ শতাব্দীতে নির্মিত এই বন্দরটি বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম সুন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে বিবেচিত। এখানে আপনি একদিকে যেমন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক বিশ্বের দামী এবং বিলাসবহুল ইয়ট দেখতে পাবেন, তেমনি অন্য পাশে দেখা মিলবে নিসের ঐতিহ্যবাহী রঙিন কাঠের মাছ ধরার নৌকা, যেগুলোকে স্থানীয়রা ‘পয়ন্টু’বলে ডাকে।

মাতিস মিউজিয়াম
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীদের একজন হেনরি মাতিস। তিনি নিস শহরের জাদুকরী আলো এবং রঙের প্রেমে পড়ে জীবনের অনেকটা সময় এখানেই কাটিয়েছিলেন। তাঁর অমর কীর্তিগুলোকে সংরক্ষণ করতেই এই মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লাল রঙের দেয়াল এবং চারপাশে থাকা জলপাই বাগান এলাকাটিকে অত্যন্ত শান্ত ও সুন্দর করে তুলেছে।

এলটন জনের বাড়ি
নিসের ওপরের দিকে ‘মাউন্ট বোরন’ পাহাড়ে বিশ্বখ্যাত গায়ক এলটন জনের একটি বিশাল রাজকীয় ভিলা রয়েছে। স্থানীয়রা একে ‘হলুদ প্রাসাদ’ বলে চেনে। শুধু এলটন জন নন, হলিউডের অনেক তারকা আর বিলিয়নেয়ারদের পছন্দের জায়গা এই নিস।

কুর সলেয়া মার্কেট
নিস শহরের ওল্ড টাউনের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বাজারটি কেবল একটি কেনাকাটার জায়গা নয়, এটি নিসের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে মূলত নিসের ‘সজীবতার প্রতীক’ বলা হয়।
প্রতিদিন সকালে এখানে কয়েকশ প্রজাতির সতেজ ফুলের সমারোহ ঘটে। মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টের প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটক সবাই এখানকার ফুলের সুবাসে মুগ্ধ হন। ফরাসি সরকার এই বাজারটিকে দেশের অন্যতম ‘বিশেষ বাজার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

নিস শহরের খাদ্যাভ্যাস
নিস শহরের রন্ধনশৈলী এতটাই স্বতন্ত্র যে এটি সারা বিশ্বে সমাদৃত। এখানকার খাবারগুলো মূলত স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সতেজ সবজি, জলপাই তেল এবং সামুদ্রিক মাছের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
স্যলাদ নিসোয়া এটি নিস শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক খাবার। সাধারণত টুনা মাছ, সেদ্ধ ডিম, কালো জলপাই , সতেজ টমেটো, শসা এবং গ্রিন বিনস দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এর ওপরে স্থানীয় জলপাই তেলের ড্রেসিং খাবারটিকে এক অনন্য সতেজ স্বাদ দেয়। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে এটি দুপুরের খাবারের জন্য সেরা পছন্দ।
নিসের স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারের রাজা হলো সোক্কা। এটি মূলত ছোলার ময়দা, পানি এবং জলপাই তেল দিয়ে তৈরি এক ধরণের পাতলা প্যানকেক। ওল্ড টাউনের গলিগুলোতে এর সুবাস পর্যটকদের সহজেই টেনে আনে।
অনেকেই জানেন না যে, বিশ্ববিখ্যাত সবজি ডিশ ‘রাতাটুই’ আসলে নিস শহর থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। বেগুন, ক্যাপসিকাম, কুমড়া এবং টমেটোকে জলপাই তেলে অল্প আঁচে রান্না করে এই সুস্বাদু পদটি তৈরি করা হয়।
নিস শহরের উৎসব
নিস শহরটি কেবল তার সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং বছরজুড়ে আয়োজিত বর্ণিল উৎসবগুলোর জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
নিস কার্নিভাল এখানকার সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান কার্নিভাল। সাধারণত প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবে বিশালাকার সব ফ্লোট (সাজানো গাড়ি), অদ্ভুত সব মুখোশ এবং পুতুল নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।
কার্নিভালের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘বাতালে দ্য ফ্লেয়ার’ বা ফুলের লড়াই। সুসজ্জিত গাড়ি থেকে পর্যটকদের দিকে হাজার হাজার সতেজ ফুল ছুড়ে দেওয়া হয়। পুরো শহর তখন এক সুগন্ধি আর রঙের নগরীতে পরিণত হয়।
সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য নিস জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। প্রতি বছর জুলাই মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এটি বিশ্বের প্রথম জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল হিসেবে পরিচিত (শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে)।
যদিও ফোর অফ জুলাই পুরো ফ্রান্সের জাতীয় উৎসব, তবে নিসে এটি বিশেষভাবে পালিত হয়। সমুদ্রের পাড়ে অর্থাৎ প্রমেনাড ডেস অ্যাঙ্গলেসে বিশাল আতশবাজির প্রদর্শনী হয়। পুরো উপকূল আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উদযাপন করে।

নিস শহরের অর্থনীতি
নিসের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো পর্যটন। শহরের মোট জিডিপি-র একটি বিশাল অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। বছরে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাসিনো এবং খুচরা কেনাকাটার দোকানগুলোতে স্থানীয় জনসংখ্যার একটি বড় অংশ নিয়োজিত।
নিস ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক পর্যটন কেন্দ্র । এখানে আয়োজিত বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং প্রদর্শনীগুলো সারা বছর প্রচুর রাজস্ব জোগান দেয়।
পোর্ট লিম্পিয়া বা নিস বন্দরটি ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখান থেকে কর্সিকা দ্বীপের সাথে পণ্য ও যাত্রী আদান-প্রদান হয়। এছাড়া বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ এবং ইয়ট রক্ষণাবেক্ষণ খাত থেকে শহরটি প্রচুর আয় করে।
নিসের মনোরম আবহাওয়ার কারণে এখানে আবাসন খাতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের অনেক ধনী ব্যক্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত মানুষ এখানে সম্পত্তি কেনেন। ফলে নির্মাণ শিল্প এবং রিয়েল এস্টেট ম্যানেজমেন্ট এখানকার অর্থনীতির একটি শক্তিশালী অংশ।
নিস শহর ভ্রমণের সেরা সময়
নিস শহরের আবহাওয়া সারা বছরই পর্যটকদের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আল্পস পর্বতমালা উত্তর দিক থেকে আসা শীতল বাতাসকে বাধা দেয় বলে এখানকার আবহাওয়া ফ্রান্সের অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ ও আরামদায়ক।
গ্রীষ্মকাল নিস ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয়’। এই সময়ে গড় তাপমাত্রা ২৭°C থেকে ৩০°C এর মধ্যে থাকে। আকাশ একদম পরিষ্কার থাকে এবং সমুদ্রের জল থাকে চমৎকার উষ্ণ। পর্যটকরা এই সময়ে সমুদ্র সৈকতে রোদ পোহানো এবং জলক্রীড়ায় মেতে ওঠেন। তবে এই সময়ে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে এবং হোটেল খরচও কিছুটা বেড়ে যায়।
অনেকের মতে, নিস ভ্রমণের সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো বসন্ত বা শরৎ। তাপমাত্রা ১৮°C থেকে ২৪°C এর মধ্যে থাকে, যা দীর্ঘ সময় হাঁটা বা সাইক্লিং করার জন্য একদম নিখুঁত। এই সময়ে প্রকৃতি নতুন সাজে সাজে । পর্যটকদের ভিড় কম থাকে বলে হোটেল ভাড়া তুলনামূলক কম পাওয়া যায় এবং বেশ শান্তিতে শহরটি ঘুরে দেখা যায়।
নিসের শীতকাল উত্তর ইউরোপের মতো হাড়কাঁপানো নয়, বরং বেশ সহনীয়। তাপমাত্রা সাধারণত ৮°C থেকে ১৫°C এর মধ্যে থাকে। তুষারপাত এখানে খুব একটা দেখা যায় না। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বখ্যাত ‘নিস কার্নিভাল’। এই কার্নিভালের রঙ আর উৎসবের আমেজ শীতের জড়তা কাটিয়ে শহরটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এছাড়া ডিসেম্বরে বড়দিন বা ক্রিসমাসের আলোকসজ্জা দেখার মতো হয়।
কেন আপনি নিস ভ্রমণ করবেন?
নিস কেবল একটি শহর নয়, এটি একটি অনুভূতি। আপনি যদি ইতিহাসের অনুরাগী হন, তবে ওল্ড টাউন আপনাকে মুগ্ধ করবে। আপনি যদি ভোজনরসিক হন, এখানকার স্ট্রিট ফুড আপনার মুখে লেগে থাকবে। আর আপনি যদি শান্তিতে সমুদ্র উপভোগ করতে চান, তবে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি তো আছেই।
সমাপ্তি
নিস শহরটি তার প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে। ফরাসি আভিজাত্য আর ইতালীয় উষ্ণতা এই দুইয়ে মিলে নিস এমন এক পর্যটন কেন্দ্র, যা প্রত্যেকের ভ্রমণ তালিকায় থাকা উচিত। আপনি পর্যটক হিসেবে যান বা নিছক কৌতূহল থেকে, নিসের সৌন্দর্য আপনাকে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করবে।
নিস শহরের মজার এবং অদ্ভুত তথ্য
নামের রহস্য
নিস শহরের আসল নাম ছিল ‘নিকাইয়া’। আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীকরা পার্শ্ববর্তী এক যুদ্ধে জয়লাভ করার পর এই শহরটি প্রতিষ্ঠা করে। গ্রীক বিজয়ের দেবী ‘নিক’ এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, নিস মানেই হলো ‘বিজয়’।
প্রতিদিন দুপুরে তোপধ্বনি!
নিসে আপনি যদি ঠিক দুপুর ১২টায় থাকেন, তবে বিকট এক কামানের গোলা বা তোপধ্বনির শব্দ শুনতে পাবেন। এটি কোনো বিপদ নয়, বরং একটি অদ্ভুত ঐতিহ্য। ১৮৬০-এর দশকে স্যার টমাস কভেন্ট্রি নামক এক ইংরেজ ভদ্রলোক নিসে থাকতেন। তাঁর স্ত্রী দুপুরে লাঞ্চ করতে দেরি করতেন। স্ত্রীকে সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে তিনি মেয়রের অনুমতি নিয়ে প্রতিদিন ঠিক দুপুর ১২টায় এই তোপধ্বনি দিতেন। সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে (তবে এখন কামানের বদলে আতশবাজি বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়)।
এখানকার সমুদ্রতটে বালু নেই!
আপনি যদি নিসের সমুদ্রতটে খালি পায়ে হাঁটার কথা ভাবেন, তবে একটু সাবধান! এখানকার সমুদ্র সৈকত আমাদের কক্সবাজারের মতো বালুকাময় নয়, বরং এটি বড় বড় গোল পাথরে পূর্ণ। স্থানীয়রা এই পাথরগুলো নিয়েই রোদ পোহাতে পছন্দ করেন।
নীল রঙের চেয়ারের শহর
নিসের সমুদ্রের পাড়জুড়ে আপনি অনেক নীল রঙের চেয়ার দেখতে পাবেন। এগুলো নিসের একটি আইকনিক প্রতীক। ১৯৫০-এর দশকে এগুলো প্রথম বসানো হয়েছিল যেন মানুষ আরাম করে সমুদ্রের নীল জলরাশি উপভোগ করতে পারে। এমনকি নিসের অনেক স্যুভেনিয়ার শপেও এই নীল চেয়ারের মিনিয়েচার পাওয়া যায়।
শিল্পীদের স্বর্গরাজ্য
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হেনরি মাতিস এবং মার্ক শাগাল তাঁদের জীবনের দীর্ঘ সময় নিসে কাটিয়েছেন। মাতিস বলেছিলেন, এখানকার আকাশ আর আলো এতোটাই পরিষ্কার যে এটি ছবি আঁকার জন্য বিশ্বের সেরা জায়গা।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Nice
- https://www.cia-france.com/french-adults-courses/nice
- https://www.explorenicecotedazur.com/en/explore/towns-villages/nice-the-capital-of-the-cote-dazur/
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B8
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B6

