Image default
কুয়েতপর্যটন আকর্ষণরহস্য রোমাঞ্চ

কুয়েতের ‘ফাইলাকা দ্বীপ’: যেখানে কোনো মানুষ থাকে না

মার্কিন বাহিনীর হাইটেক ড্রোন আর স্ক্রিন প্রযুক্তির তোড়ে ফাইলাকা দ্বীপে ইরাকি সেনাদের দশা এমন হয়েছিল যে, যুদ্ধটা বাস্তবের চেয়ে কোনো রোমাঞ্চকর ‘পাবজি’ বা ‘কল অব ডিউটি’ গেমের লাইভ স্ট্রিম মনে হচ্ছিল!

আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার আর তেলের খনির ঝলমলে আলো পেরিয়ে কুয়েত উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের বুকে জেগে আছে এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে পা রাখামাত্রই ঘড়ির কাঁটা থমকে যায়। আমরা কথা বলছি কুয়েতের রহস্যময় ফাইলাকা দ্বীপ নিয়ে। একদিকে ৪,০০০ বছরের প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, অন্যদিকে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের বুলেট-বোমায় ঝাঁঝরা হওয়া পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাড়ি আর মরিচা ধরা ট্যাংকের সারি সব মিলিয়ে এই দ্বীপটি যেন ইতিহাস আর যুদ্ধের এক জীবন্ত ‘টাইম মেশিন’।

এক নজরে ফাইলাকা দ্বীপ

বিষয় বিবরণ
অবস্থান পারস্য উপসাগর, কুয়েত সিটি থেকে ২০ কিমি দূরে
প্রাচীন নাম ইকারোস (গ্রিক আমল)
ইতিহাসের বয়স প্রায় ৪,০০০ বছর
প্রধান বৈশিষ্ট্য ওপেন-এয়ার যুদ্ধের জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র
যাতায়াত মাধ্যম মারিনা ক্রিসেন্ট বা সালমিয়া থেকে ফেরি বা স্পিডবোট
ফাইলাকা দ্বীপ – Image Source: www.arabtimesonline.com

নামকরণের ইতিহাস

ফাইলাকা দ্বীপের ইতিহাস আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ব্রোঞ্জ যুগে এখানে বিখ্যাত দিলমুন সভ্যতার মানুষের বসবাস ছিল। মেসোপটেমিয়া এবং ভারতের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান ট্রানজিট রুট বা কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই দ্বীপ।

পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪ অব্দে মহান গ্রিক বীর অ্যালেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য উপসাগর জয়ের উদ্দেশ্যে তাঁর নৌবাহিনী পাঠান। গ্রিক নৌসেনারা এই দ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেন। গ্রিক ভাষায় এই দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছিল ‘ইকারোস’, যা গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত চরিত্র ইকারুসের নামানুসারে রাখা হয়েছিল। বর্তমান ‘ফাইলাকা’ নামটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘ফাইলাকিও ’ থেকে, যার অর্থ ‘পাহারা চৌকি’।

প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়

ফাইলাকা দ্বীপকে কুয়েতের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের স্বর্ণখনি বলা যায়। বিগত কয়েক দশকে ফরাসি, ডেনিশ এবং কুয়েতি প্রত্নতাত্ত্বিকদের যৌথ খননকাজের ফলে এখানে এমন সব নিদর্শন মিলেছে, যা ইতিহাসবিদদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে:

গ্রিক মন্দির ও দুর্গ

দ্বীপে হেলেনিস্টিক বা প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার একটি বিশাল দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এবং দুটি গ্রিক মন্দিরের ভিত্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে একটি মন্দির গ্রিক দেবী ‘আর্তেমিস’ (Artemis)-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল।

ফাইলাকা দ্বীপ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন – Image Source: www.arabtimesonline.com

দিলমুন সভ্যতার সিলমোহর

খননকাজের মাধ্যমে এখানে ব্রোঞ্জ যুগের প্রচুর গোলাকার সিলমোহর বা স্ট্যাম্প মিলেছে, যা প্রমাণ করে প্রাচীনকালে এটি একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল।

প্রাচীন মুদ্রা ও শিলালিপি

গ্রিক লিপিতে খোদাই করা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাথরের ফলক বা শিলালিপি এবং আলেকজান্ডারের আমলের মুদ্রা এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যা বর্তমানে কুয়েতের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ

ফাইলাকা দ্বীপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং বেদনাদায়ক মোড় আসে ১৯৯০ সালের ২রা আগস্ট, যখন সাদ্দাম হোসেনের ইরাকি বাহিনী কুয়েত আক্রমণ করে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরাকি সেনারা ফাইলাকা দ্বীপকে তাদের প্রধান সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে বেছে নেয়।

ফাইলাকা দ্বীপের যুদ্ধ – Image Source: archive.roar.media

যুদ্ধের আগে এই দ্বীপে প্রায় ২,০০০ এর বেশি স্থায়ী কুয়েতি নাগরিক স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। এখানে ছিল স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল এবং আধুনিক ঘরবাড়ি। কিন্তু ইরাকি বাহিনী জোরপূর্বক পুরো দ্বীপের সাধারণ মানুষকে মূল ভূখণ্ডে তাড়িয়ে দেয় এবং পুরো দ্বীপটিকে একটি মাইন্ডফিল্ড বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে।

১৯৯১ সালের অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম-এর সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী আকাশপথ থেকে এই দ্বীপে তীব্র বোমাবর্ষণ করে ইরাকি ঘাঁটিকে ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিন দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই দ্বীপটিকে আর আগের মতো আবাসিক এলাকায় রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখানকার বাসিন্দারা কুয়েতের মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী হয়ে যান। ফলে ফাইলাকা রূপ নেয় এক বিশাল ‘ওপেন-এয়ার ওয়ার মিউজিয়াম’ বা যুদ্ধের জীবন্ত জাদুঘরে।

দ্বীপের বর্তমান রূপ

বর্তমানে ফাইলাকা দ্বীপে পা রাখলে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হয়। একদিকে নীল সমুদ্রের শান্ত বাতাস, অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষী। দর্শন্টার্থীদের জন্য এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষণসমূহ হলো:

ফাইলাকা দ্বীপের মানচিত্র– Image Source: kuwaittimes.com

বুলেট ও বোমার আঘাতে ঝাঁঝরা হওয়া ভবন

ফাইলাকা দ্বীপের পুরোনো আবাসিক এলাকায় হাঁটলে দেখা যায় সারি সারি পরিত্যক্ত বাড়ি, স্কুল এবং সরকারি ভবন। প্রতিটি দেওয়ালে বুলেট, মর্টার সেল এবং বোমার আঘাতের শত শত ক্ষতচিহ্ন। ঘরগুলোর ভেতরে এখনো মানুষের ফেলে যাওয়া আসবাবপত্র ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে, যা দেখলে মনে হবে সময় যেন ১৯৯০ সালেই থমকে গেছে।

পরিত্যক্ত ট্যাংকের কবরস্থান

দ্বীপের এক প্রান্তে যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইরাকি সেনাবাহিনীর অসংখ্য ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, সামরিক ট্রাক এবং কামানের ধ্বংসাবশেষ লাইনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মরিচা ধরা এই যুদ্ধাস্ত্রগুলো দেখতে প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক ভিড় করেন।

ফাইলাকা হেরিটেজ ভিলেজ- Image Source: flickr.com

হেরিটেজ ভিলেজ

পর্যটকদের সুবিধার্থে কুয়েত সরকার দ্বীপের একটি অংশকে চমৎকারভাবে সংস্কার করে ‘ফাইলাকা হেরিটেজ ভিলেজ’ তৈরি করেছে। এখানে কুয়েতের ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি ঘর, পুরোনো ধাঁচের হোটেল এবং রেস্তোরাঁ রয়েছে। দর্শনার্থীরা চাইলে প্রাচীন কুয়েতি স্টাইলের রিসোর্টে রাত কাটাতে পারেন।

লেক এবং উটের খামার

ঐতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি এখানে একটি সুন্দর কৃত্রিম লেক রয়েছে যেখানে প্যাডেল বোট চালানো যায়। উটের খামারও রয়েছে এখানে, যেখানে পর্যটকরা উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির রোমাঞ্চ উপভোগ করতে পারেন।

দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন

আপনি যদি কুয়েতের আধুনিক লাইফস্টাইলের বাইরে গিয়ে এক অন্যরকম রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে চান, তবে ফাইলাকা দ্বীপ আপনার জন্য সেরা গন্তব্য।

কুয়েত সিটির ‘মারিনা ক্রিসেন্ট’ বা ‘সালমিয়া’ ক্যাটামারান টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিলাসবহুল কে-কোম্পানির ফেরি এবং স্পিডবোট ফাইলাকা দ্বীপের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সমুদ্রের বুকে ৪৫ মিনিটের এই জার্নিটি অত্যন্ত উপভোগ্য।

মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে কুয়েতের তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করে। তাই ফাইলাকা দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাস (শীতকাল), যখন আবহাওয়া চমৎকার ঠান্ডা এবং মনোরম থাকে।

কুয়েত সিটির ‘মারিনা ক্রিসেন্ট’- Image Source: facebook.com

উপসংহার

কুয়েতের ফাইলাকা দ্বীপ যেন একটি আস্ত টাইম মেশিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সভ্যতা আসে এবং চলে যায় যেমন এসেছিল দিলমুন আর গ্রিকরা; যুদ্ধ সাময়িকভাবে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে কখনো মুছে ফেলা যায় না। একদিকে নীল সাগরের গর্জন, অন্যদিকে প্রাচীন গ্রিক মন্দিরের স্তম্ভ এবং মরিচা ধরা ট্যাংকের সারি সব মিলিয়ে ফাইলাকা দ্বীপ কেবল কুয়েতের নয়, বরং পুরো পারস্য উপসাগরের এক অনন্য এবং অবিস্মরণীয় বিস্ময়।

ফাইলাকা দ্বীপ নিয়ে অবিশ্বাস্য ও কৌতূহল উদ্দীপক তথ্য

১. ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ফাইলাকা দ্বীপে ইরাকিরা কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম কোনো যুদ্ধ যেখানে ড্রোন ও স্ক্রিন প্রযুক্তির এত বড় লাইভ ব্যবহার হয়েছিল, যা দেখতে অবিকল কোনো ভিডিও গেমের মতো লাগছিল!

২. দ্বীপের খননকাজ থেকে জানা গেছে, গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের সেনারা এখানে কেবল মন্দিরই বানায়নি, বরং মাটির চমৎকার সব মূর্তি, তৈজসপত্র এবং মুদ্রা তৈরির একটি বড় কারখানা বা ওয়ার্কশপ গড়ে তুলেছিল।

৩. সাধারণত বিশ্বের যেকোনো সুন্দর দ্বীপেই মানুষের বসতি থাকে। কিন্তু ফাইলাকা হলো বিশ্বের অন্যতম বড় একটি ‘ঘোস্ট টাউন’ বা জনমানবহীন ভুতুড়ে দ্বীপ। ১৯৯০ সালের যুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত কোনো সাধারণ কুয়েতি নাগরিককে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়নি। দ্বীপের মালিকানা এখন সরকারের এবং এটি শুধুই সামরিক ক্যাম্প ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৪. দ্বীপের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে কয়েকশ ধ্বংসপ্রাপ্ত ইরাকি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও কামানের সারি। খোলা আকাশের নিচে মরুভূমির নোনা বাতাসে এগুলোতে মরিচা ধরে এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের এমন খোলা লাইভ মিউজিয়াম বা ট্যাংকের কবরস্থান পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখতে পাওয়া যায়।

৫. দ্বীপের পরিত্যক্ত স্কুল বা ব্যাংকগুলোতে ঢুকলে দেখা যায়, দেওয়ালে ঝুলতে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতা ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসেই আটকে আছে। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের লেখা, ক্যাশবাক্স কিংবা মানুষের ঘরের ভাঙা আসবাবপত্র সবকিছুই সেই যুদ্ধের দিন যেমন ছিল, ঠিক তেমনই রেখে দেওয়া হয়েছে। সেখানে হাঁটলে মনে হবে আপনি আস্ত একটা টাইম মেশিনে চড়ে ১৯৯০ সালের যুদ্ধের ঠিক পরের দিনটিতে ল্যান্ড করেছেন!

Reference:

Related posts

কোদিনহি: পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত Twins Village!

স্প্যানিশদের তৈরি শতবর্ষী দুর্গ ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ

আশা রহমান

পৃথিবীর প্রথম ভিডিও গেমের গল্প

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More