কেমন হবে যদি জাপানের মাটিতে বসেই কোনো ভিসা ছাড়াই আস্ত একটা ‘মিনি চীন’ ঘুরে আসা যায়? বাতাসে ভেসে আসা চিলি অয়েলের সুবাস, গরম গরম ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া আর চারদিকের কিউট সব প্যান্ডা বানের মেলা বলছি জাপানের সবচেয়ে রঙিন পর্যটন কেন্দ্র ইয়োকোহামা চায়না টাউন-এর কথা। পেটে যাওয়ার আগে ইনস্টাগ্রাম আর টিকটক রিলসের পেটে জায়গা করে নেওয়া এখানকার স্ট্রিট ফুড কালচার আর ফেং শুই গেটের রহস্য।
এক নজরে ইয়োকোহামা চায়না টাউন
| বিষয় | বিবরণ |
| অবস্থান | ইয়োকোহামা, কানাগাওয়া প্রিফেকচার, জাপান (টোকিও থেকে ৩০ মিনিট) |
| প্রতিষ্ঠাকাল | ১৮৫৯ সাল (১৫০ বছরেরও বেশি প্রাচীন) |
| আকার | এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম বড় চায়না টাউন |
| প্রধান উৎসব | চীনা নববর্ষ এবং লণ্ঠন উৎসব |
| প্রধান আকর্ষণ | কানতেই-ম্যিও মন্দির, ৯টি ফেং শুই গেট, চুকানগাই স্ট্রিট ফুড |
ইয়োকোহামা চায়না টাউনের ইতিহাস শুরু হয় ১৮৫৯ সালে। সেই সময় দীর্ঘদিনের একাকীত্ব বা আইসোলেশন ভেঙে জাপান বিদেশি বাণিজ্যের জন্য তার বন্দরগুলো উন্মুক্ত করতে শুরু করে। ইয়োকোহামা ছিল অন্যতম প্রধান একটি বন্দর।

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ যেমন আমেরিকা ও ব্রিটেনের ব্যবসায়ীরা যখন ইয়োকোহামায় আসতে শুরু করেন, তখন তাদের সাথে দোভাষী, মধ্যস্থতাকারী এবং খাতা-কলমের হিসাব রাখার জন্য প্রচুর চীনা নাগরিকও জাপানে আসেন। যেহেতু চীনাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি জাপানিদের সাথে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, তাই তারা খুব দ্রুত এখানে নিজেদের মানিয়ে নেন।
ধীরে ধীরে এই চীনা অভিবাসীরা বন্দরের কাছে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একত্রিত হয়ে বসবাস ও ব্যবসা শুরু করেন। তারা নিজেদের থাকার জন্য ঘরবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী মন্দির এবং স্কুল গড়ে তোলেন। এটিই পরবর্তীতে ‘ইয়োকোহামা চুকানগাই’ নামে পরিচিতি পায়। তবে এই পথচলা সহজ ছিল না। ১৯২৩ সালের বিধ্বংসী গ্রেট কান্টো ভূমিকম্প, ১৯৩৭ সালের দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বোমাবর্ষণে এই এলাকাটি কয়েকবার প্রায় মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছে এই চায়না টাউন।
ইয়োকোহামা চায়না টাউনে প্রবেশ করার মূহূর্তেই আপনার নজর কাড়বে এর বিশালাকার এবং রঙিন প্রবেশদ্বারগুলো, যেগুলোকে চীনা ভাষায় বলা হয় ‘পাইলো’ বা গেট। প্রায় ৫০০ মিটার বর্গক্ষেত্রের এই ছোট্ট এলাকায় মোট ৯টি ঐতিহ্যবাহী গেট রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান প্রবেশদ্বার ৪টি।
এই ৪টি প্রধান গেট কেবল সৌন্দর্যের জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং এগুলো প্রাচীন চীনা বাস্তুশাস্ত্র বা ‘ফেং শুই’ মেনে তৈরি। বিশ্বাস করা হয়, এই গেটগুলো চারদিকের নেতিবাচক শক্তিকে আটকে রেখে ভেতরে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে।
এই গেটগুলো পার হয়ে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই বহুতল আধুনিক জাপানি ভবনগুলোর জায়গায় চোখে পড়ে ঐতিহ্যবাহী চীনা স্থাপত্যের ছাদ, ঝুলন্ত লাল লণ্ঠন এবং ড্রাগনের মোটিফ।
চায়না টাউনের ঠিক মাঝখানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা রয়েছে, যা এই অঞ্চলের চীনাদের আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস।

১৮৭৩ সালে নির্মিত এই মন্দিরটি চায়না টাউনের প্রধান আকর্ষণ। এটি চীনের বিখ্যাত তিন রাজ্যের বীর এবং বাণিজ্যের দেবতা ‘গুয়ান ইউ’ বা গুয়ান দি-র উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। জমকালো লাল, সোনা আর সবুজ রঙের নিখুঁত কারুকাজে ঘেরা এই মন্দিরটিতে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার উন্নতির জন্য প্রার্থনা করতে আসেন। মন্দিরের ধূপকাঠির সুবাস পুরো আবহাওয়ায় এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে।
২০০৬ সালে নির্মিত এই মন্দিরটি সমুদ্রের দেবী ‘মাসো’-র উদ্দেশ্যে তৈরি। যেহেতু আদি চীনা অভিবাসীরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জাপানে এসেছিলেন, তাই সমুদ্রের নিরাপত্তা এবং সুস্বাস্থ্য কামনায় এই দেবীর আরাধনা করা হয়। এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীও অত্যন্ত চোখধাঁধানো।
ইয়োকোহামা চায়না টাউন বিখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণ যদি একটি শব্দে বলতে হয়, তবে সেটি হলো খাবার । এখানে প্রায় ২৫০টিরও বেশি চীনা রেস্তোরাঁ এবং স্ট্রিট ফুডের দোকান রয়েছে। জাপানি স্বাদের সাথে কিছুটা ফিউশন ঘটিয়ে এখানকার খাবারগুলো তৈরি করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
নিকুমান মূলত একটি বড় সাইজের ভাপে সেদ্ধ করা মাংসের বান বা ডাম্পলিং। তুলতুলে এই বানের ভেতরে গরম গরম শুয়োর বা গরুর মাংসের কিমা ভরা থাকে। শীতের দিনে কামড় বসানোর জন্য এটি সেরা।

শিয়োলংবাও হলো ‘সুপ ডাম্পলিং’। অর্থাৎ, ডাম্পলিংয়ের ভেতরে মাংসের পাশাপাশি সুস্বাদু স্যুপ ভরা থাকে। মুখে দিলেই স্যুপের ফোয়ারা ছোটে! এটি এখানকার অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড।
প্যান্ডা বান বাচ্চাদের এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রিয় খাবার। প্যান্ডার মুখের আকৃতির এই মিষ্টি বানের ভেতরে চকলেট বা লাল শিমের পেস্ট থাকে।
বেইজিং ডাক ক্রিস্পি বা মুচমুচে হাঁসের চামড়া এবং মাংস পাতলা রুটির ভেতরে বিশেষ মসলা দিয়ে রোল করে দেওয়া হয়। অত্যন্ত রাজকীয় এই খাবারের স্বাদ জিভে লেগে থাকার মতো।
আপনি যদি ইয়োকোহামা চায়না টাউনের আসল রূপ দেখতে চান, তবে আপনাকে আসতে হবে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন চীনা নববর্ষ উদযাপিত হয়।
এই সময় পুরো চায়না টাউনকে হাজার হাজার লাল লণ্ঠন এবং আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ঐতিহ্যবাহী লায়ন ড্যান্স এবং ড্রাগন ড্যান্স। ঢোলের তালে তালে বিশালাকার ড্রাগন এবং সিংহের কস্টিউম পরা পারফর্মাররা দোকানের সামনে নাচেন, যা দেখতে লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান। আতশবাজির শব্দ, মানুষের কোলাহল আর রঙের মেলায় এই সময় মনেই হবে না যে আপনি জাপানে আছেন।
দর্শনার্থীদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
- টোকিওর ‘শিবুয়া’ স্টেশন থেকে ‘তোকিউ তোয়োকো লাইন’ ( ধরে সরাসরি কোনো ট্রেন পরিবর্তন ছাড়াই ‘মোতোমাচি-চুকানগাই’স্টেশনে পৌঁছানো যায়। সময় লাগবে মাত্র ৩৫-৪০ মিনিট।
- দুপুরের পর থেকে এই এলাকা জমজমাট হতে শুরু করে। তবে সন্ধ্যার সময় যখন সব লণ্ঠন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তখন এখানকার সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টা এখানে কাটানোর জন্য সেরা।
- খাবারের পাশাপাশি এখানে ঐতিহ্যবাহী চীনা চা, কিউরিও বা স্যুভেনির, চীনা ওষুধি গাছ এবং ভাগ্য গণনাকারী বা পামিস্টদের প্রচুর দোকান রয়েছে।
ইয়োকোহামা চায়না টাউন নিয়ে এমন কিছু দারুণ ও অদ্ভুত তথ্যxa0
১. এই চায়না টাউনে ঢোকার জন্য মোট ৯টি বিশাল তোরণ বা গেট রয়েছে। তবে এগুলো শুধু সাজসজ্জার জন্য নয়; প্রাচীন চীনা বাস্তুশাস্ত্র বা ‘ফেং শুই’ মেনে এগুলোর রঙ এবং দিক নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন পূর্ব গেটটি নীল (সমৃদ্ধির প্রতীক) আর দক্ষিণ গেটটি লাল (সৌভাগ্যের প্রতীক)। বিশ্বাস করা হয়, এই নকশার কারণেই শত বছর ধরে সব দুর্যোগের পরও এই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য সবসময় তুঙ্গে থাকে!

২. এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড হলো ‘শিয়োলংবাও’ বা সুপ ডাম্পলিং। মজার ব্যাপার হলো, এটি সাধারণ মোমোর মতো এক কামড়ে খাওয়া যায় না। কারণ, এর ভেতরে থাকে ফুটন্ত গরম স্যুপ! না জেনে কামড় দিলে মুখ পুড়ে যাওয়া নিশ্চিত।

৩. জাপানিরা পান্ডা ভীষণ পছন্দ করে, আর সেই ক্রেজকে কাজে লাগিয়েছে এই চায়না টাউন। এখানে পা রাখলেই আপনি দেখতে পাবেন প্যান্ডার মুখের আকৃতির নরম তুলতুলে মিষ্টি ‘প্যান্ডা বান’, প্যান্ডা আকৃতির আইসক্রিম, ডাম্পলিং থেকে শুরু করে হরেক রকমের স্যুভেনির।
৪. এই চায়না টাউনটি গত ১৫০ বছরে বহুবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ১৯২৩ সালের কান্টো ভূমিকম্পে এটি মাটির সাথে মিশে যায়, এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাবর্ষণেও ছারখার হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিবারই এখানকার অধিবাসীরা দমে না গিয়ে নতুন করে এটি গড়ে তুলেছেন।
৫. খাবারের দোকানের পাশাপাশি এই চায়না টাউনের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এখানকার ভাগ্য গণনাকারীরা। এখানে ১০০-রও বেশি জ্যোতিষীর দোকান রয়েছে, যেখানে প্রাচীন চীনা পদ্ধতি দেখে ভাগ্য বলা হয়। জাপানি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজেদের প্রেম বা ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ জানতে এখানে আসার এক বিশাল ট্রেন্ড রয়েছে!
Reference:

