Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

মার্কোস আকুনা: কেন সবাই তাকে “ডিম” বলে ডাকে?

ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে মাথায় ডিম তোলা মার্কোস আকুনা যখন বড় হয়ে মাঠের প্রতিপক্ষকে ফিজিক্যাল ট্যাকলে পিসে ফেলা শুরু করলেন, স্ট্রাইকাররা তখন আফসোস করে বলতে লাগল “ভাই, তুমি নিজে ডিম খাও ভালো কথা, আমাদের ক্যারিয়ারটা এভাবে ডিম পোচ কইরো না!” 

মার্কোস আকুনা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ‘অ্যাটাকিং ফুল-ব্যাক’ বা উইং-ব্যাক। দুর্দান্ত গতি, নিখুঁত ক্রস এবং প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো শারীরিক শক্তির কারণে স্কালোনির ‘লা স্কালোনিতা’র অন্যতম ভরসার নাম এই বিশ্বজয়ী আর্জেন্টাইন লেফট-ব্যাক।

মার্কোস আকুনা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম 

মার্কোস হাভিয়ের আকুনা

জন্ম  

২৮ অক্টোবর ১৯৯১ (বয়স ৩৪)

জন্মস্থান 

জাপালা , নিউকেন , আর্জেন্টিনা

উচ্চতা 

১.৭২ মিটার (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি)

পজিশন 

লেফট-ব্যাক / উইং-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

ফেরো ক্যারিল ওয়াস্তে,রেসিং ক্লাব,স্পোর্টিং সিপি,সেভিয়া এবং বর্তমানে রিভার প্লেট এর হয়ে খেলছেন। 

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৬– আর্জেন্টিনা

মার্কোস আকুনা
মার্কোস হাভিয়ের আকুনা- Image Source: fwclive.com

১৯৯১ সালের ২৮ অক্টোবর আর্জেন্টিনার জাপালার নেউকেন প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন মার্কোস হাভিয়ের আকুনা। আর্জেন্টিনার অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার তীব্র ঝোঁক। তবে আর দশটা ফুটবলারের মতো শুরুতেই বড় কোনো একাডেমির নজরে তিনি আসেননি।

আকুনার ফুটবলার হওয়ার পথটা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। স্থানীয় ক্লাব ডন বস্কোতে তার খেলাধুলার শুরু। সেখান থেকে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য তাকে যেতে হতো রাজধানী বুয়েনস আইরেসে, যা তার বাড়ি থেকে ছিল প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে। পরিবারের আর্থিক অনটন এতটাই তীব্র ছিল যে, অনেক সময় ট্রায়ালের ট্রেনের টিকিট কাটার সামর্থ্যও তাদের ছিল না। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে ২০১০ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার ক্লাব ফেরো ক্যারিল ওয়াস্তে-এর যুব দলে সুযোগ পান তিনি।

২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ফেরো-র হয়ে খেলেন আকুনা। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিভাগের এই ক্লাবে তিনি মূলত একজন উইঙ্গার বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। ক্লাবের হয়ে ১১৭টি ম্যাচ খেলে তিনি ১২টি গোল করেন। তার এই পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনার প্রথম বিভাগের ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে।

মার্কোস আকুনা
ফেরোকারিল ওয়াস্তের জার্সিতে মার্কোস আকুনার অভিষেক- Image Source: ferrocarriloeste.org.ar

২০১৪ সালে আকুনা যোগ দেন আর্জেন্টিনার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রেসিং ক্লাব-এ। রেসিং ক্লাবে আসার পরেই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায়। ২০১৪ সালের ট্রানজিশনাল টুর্নামেন্টে রেসিং ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা ছিল দীর্ঘ ১৩ বছর পর ক্লাবটির প্রথম লিগ শিরোপা। রেসিং ক্লাবের সমর্থকরা তার লড়াকু মনোভাবের কারণে তাকে লুফে নেয়। এখানে তিনি ১০৯ ম্যাচে ১৮টি গোল এবং প্রচুর অ্যাসিস্ট করেন।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে আকুনা ইউরোপের ফুটবল বাজারে পা রাখেন পর্তুগিজ জায়ান্ট স্পোর্টিং সিপি-তে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। ইউরোপে আসার পর তার পজিশনে একটি বড় পরিবর্তন আসে। উইঙ্গার থেকে তিনি ধীরে ধীরে একজন পুরোদস্তুর লেফট-ব্যাকে রূপান্তরিত হন।

তার রক্ষণভাগের দক্ষতা এবং একই সাথে আক্রমণে উঠে যাওয়ার ক্ষমতার কারণে তিনি পর্তুগিজ লিগের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়া আকুনাকে চার বছরের চুক্তিতে দলে নেয়। স্পেনের লা লিগায় এসে আকুনা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় পার করেন। সেভিয়ার রক্ষণভাগের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠেন তিনি।

২০২২-২৩ মৌসুমে সেভিয়ার উয়েফা ইউরোপা লিগ জয়ে আকুনার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। সেমিফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও লাল কার্ডের কারণে তিনি ফাইনাল ম্যাচটি মিস করেছিলেন, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে তার অবদান সেভিয়া সমর্থকরা চিরকাল মনে রাখবে।

ইউরোপে দীর্ঘ সফল অধ্যায় পার করার পর ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আকুনা পুনরায় আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে ফিরে আসেন। আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল ক্লাব রিভার প্লেট তাকে দলে ভেড়ায়। অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডার বর্তমানে রিভার প্লেটের রক্ষণভাগ সামলানোর পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দের মেন্টর হিসেবে কাজ করছেন।

মার্কোস আকুনা
রিভার প্লেটের জার্সিতে মার্কোস আকুনা – Image Source: yimg.com

মার্কোস আকুনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল ২০১৬ সালের নভেম্বরে, তৎকালীন কোচ এদগার্দো বাউজার অধীনে। তবে জাতীয় দলে নিজের জায়গা পাকা করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তিনি ছিলেন, কিন্তু সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। আকুনার আসল রূপ দেখা যায় কোচ লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর। স্কালোনির ‘লা স্কালোনিতা’র অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠেন আকুনা।

২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর মিশনে আকুনা ছিলেন লেফট-ব্যাক পজিশনের প্রথম পছন্দ। পুরো টুর্নামেন্টে, বিশেষ করে মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে নেইমারদের রুখে দিতে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর সাথে রোটেশন করে খেলেন তিনি। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে নিরেট রাখতে তার অবদান ছিল অসামান্য।

২০২২ সালের জুনে উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালি এবং কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচেও আকুনা শুরুর একাদশে ছিলেন। ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ট্রফি জেতার ম্যাচে তার ডিফেন্ডিং ছিল নিখুঁত।

মার্কোস আকুনা
ফিনালিসিমা চ্যাম্পিয়ন ২০২২- Image Source: britannica.com

মার্কোস আকুনার ক্যারিয়ারের এবং জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আসে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচে আকুনার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আকুনা পেনাল্টি বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হলে আর্জেন্টিনা একটি পেনাল্টি পায়, যা থেকে মেসি গোল করেন।

কার্ড জটিলতা ও ইনজুরির কারণে কিছু ম্যাচে তাগলিয়াফিকো খেললেও, যখনই আকুনা মাঠে নেমেছেন, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে বদলি হিসেবে নেমে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের আক্রমণ ঠেকাতে তিনি প্রাণপণ লড়াই করেন। বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মাধ্যমে আকুনা ফুটবল ইতিহাসের অমর পাতায় নিজের নাম লেখান।

মার্কোস আকুনা প্রথাগত ডিফেন্ডারদের মতো নন। তিনি একজন আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুল-ব্যাক। আকুনার উচ্চতা খুব বেশি না হলেও (১.৭২ মিটার) তার শরীরের গঠন অত্যন্ত মজবুত। এই কারণেই তার ডাকনাম “এল হুয়েভো” বা ডিম। মাঠে প্রতিপক্ষের উইঙ্গারদের ফিজিক্যাল ট্যাকলে পরাস্ত করতে তিনি ওস্তাদ।

সাবেক উইঙ্গার হওয়ার কারণে আকুনার ক্রসিং অত্যন্ত নিখুঁত। ওভারল্যাপ করে ওপরে উঠে বক্সে থাকা ফরোয়ার্ডদের উদ্দেশ্যে তার বাড়ানো ক্রসগুলো সবসময়ই প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের জন্য বিপজ্জনক হয়। তিনি লেফট-ব্যাক, লেফট উইং-ব্যাক এবং প্রয়োজনে লেফট মিডফিল্ডার হিসেবেও সমান দক্ষতায় খেলতে পারেন। কোচের ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের জন্য তিনি একজন আদর্শ খেলোয়াড়।

মার্কোস আকুনা
মেসির সাথে মার্কোস আকুনা- Image Source: africanfootball.com

এত বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও মার্কোস আকুনা মাঠের বাইরে অত্যন্ত শান্ত এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। তিনি তার স্ত্রী মারিয়া জুলিয়া সিলভা এবং তিন সন্তানকে নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। শৈশবের দারিদ্র্য তিনি ভুলে যাননি, তাই প্রায়শই তার জন্মস্থান জাপালার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিভিন্ন চ্যারিটি ও ফুটবল ক্যাম্পের আয়োজন করে থাকেন।

মার্কোস আকুনাকে নিয়ে আকর্ষণীয় তথ্য

অদ্ভুত ডাকনাম: আকুনার সবচেয়ে বিখ্যাত ডাকনাম হলো “এল হুয়েভো”, স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ “ডিম”। তার শৈশবের কোচ তাকে এই নাম দিয়েছিলেন। কারণ ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে তিনি এত বেশি পড়ে যেতেন এবং চোট পেতেন যে তার মাথায় প্রায়ই ডিমের মতো ফোলা হয়ে থাকত। পরবর্তীতে তার শক্ত-পোক্ত শারীরিক গঠনের কারণেও এই নামটির সার্থকতা প্রকাশ পায়।

টিকিট ছাড়া ১,০০০ কিলোমিটার ভ্রমণ: আকুনার ফুটবলার হওয়ার গল্পটা রূপকথার মতো। আর্জেন্টিনার প্রত্যন্ত অঞ্চল জাপালা থেকে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য তাকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী বুয়েনস আইরেসে যেতে হতো। পরিবারের চরম আর্থিক অনটনের কারণে অনেক সময় ট্রেনের টিকিট কাটার টাকা থাকত না। টিকিট ছাড়াই লুকিয়ে ট্রেনে চড়ে, কঠোর সংগ্রাম করে তিনি ট্রায়াল দিতে যেতেন।

উইঙ্গার থেকে বিশ্বজয়ী ডিফেন্ডার: আকুনা কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে ডিফেন্ডার ছিলেন না। আর্জেন্টিনার ক্লাব ‘ফেরো কারিল ওএস্তে’ এবং ‘রেসিং ক্লাব’-এ তিনি মূলত একজন পুরোদস্তুর অ্যাটাকিং উইঙ্গার বা মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। ২০১৭ সালে পর্তুগিজ ক্লাব স্পোর্টিং সিপি-তে যোগ দেওয়ার পর কোচের সিদ্ধান্তে তিনি লেফট-ব্যাক পজিশনে খেলা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এই পজিশনেই বিশ্বের অন্যতম সেরা হয়ে ওঠেন।

মার্কোস আকুনা
ট্রফি উচু করে মার্কোস আকুনা- Image Source: yimg.com

মেসিকে দেওয়া সেই বিখ্যাত “অ্যাসিস্ট”: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের একটি দৃশ্য ভক্তদের মনে থাকবে। ম্যাচের প্রথমার্ধে লিওনেল মেসি অবিশ্বাস্য একটি নো-লুক পাস দিয়েছিলেন যা থেকে নাহুয়েল মলিনা গোল করেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার জয় নির্ধারণী পেনাল্টিটি আদায় করেছিলেন আকুনা। ডাচ বক্সের ভেতর দুর্দান্ত ড্রিবলিং করে ঢুকে ফাউলের শিকার হন তিনি, যা থেকে মেসি গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ তে এগিয়ে নেন।

Reference:

Related posts

ইতিহাসের আলোকে নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন

সাম্বার ছন্দে ব্রাজিলীয় ফুটবলের এক কালজয়ী নায়ক বেবেতো

আশা রহমান

থালাপতি বিজয়: পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের অনুপ্রেরণা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More