Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

হাচিকো: বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কুকুরের বাস্তব গল্প

নিজের মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠানে হাচিকো নিজেই ‘চিফ গেস্ট’ হিসেবে হাজির! সাধারণত মানুষ মরে যাওয়ার পর তার মূর্তি বানানো হয়, কিন্তু হাচিকো বেঁচে থাকতেই এতোটাই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল যে তাকে নিজের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে হয়েছে !                                                  

জাপানিদের কাছে ‘হাচিকো’ মানেই হলো আনুগত্যের এক নাম। একটি সাধারণ আকিতা জাতের কুকুর কীভাবে তার মালিকের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে সারাবিশ্বের মানুষের চোখের জল ঝরিয়েছিল, সেই গল্প আজ ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা।

হিদেসাবুরো উয়েনোহাচিকোগ – Image Source:ndianexpress.com

গল্পটা ১৯২৪ সালের। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিদেসাবুরো উয়েনোহাচিকোকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। অধ্যাপক উয়েনো প্রতিদিন সকালে ট্রেনের কাজে যেতেন এবং হাচিকো তাকে বিদায় জানাতে শিবুয়া স্টেশন পর্যন্ত যেত। আবার বিকেল হলেই ঠিক সময়ে স্টেশনে হাজির হতো প্রিয় মালিককে স্বাগত জানাতে। এই রুটিন তাদের মধ্যে এক গভীর বন্ধন তৈরি করে।

১৯২৫ সালের মে মাস। প্রতিদিনের মতো হাচিকো স্টেশনে বসে অপেক্ষা করছে তার মালিকের জন্য। কিন্তু সেদিন অধ্যাপক আর ফিরে এলেন না। কর্মস্থলেই হঠাৎ ব্রেইন হেমারেজে তার মৃত্যু হয়। হাচিকো জানত না যে তার প্রিয় মানুষটি আর কোনোদিন ফিরবেন না।

হাচিকো স্টেশন – Image Source:hotstar.com

মালিকের মৃত্যুর পর হাচিকোকে অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলেও সে বারবার পালিয়ে শিবুয়া স্টেশনে চলে আসত। রোদ, বৃষ্টি বা বরফ কিছুই তাকে টলাতে পারেনি। টানা ৯ বছর ৯ মাস ১৫ দিন হাচিকো প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত, এই আশায় যে হয়তো আজ তার মালিক ট্রেন থেকে নামবেন।

স্টেশনের নিত্যযাত্রীরা এই দৃশ্য দেখে অবাক হতেন। প্রথমে অনেকে তাকে অবহেলা করলেও ধীরে ধীরে তার এই নিরব অপেক্ষা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ১৯৩২ সালে জাপানের একটি বিখ্যাত পত্রিকায় তার এই আনুগত্যের কথা ছাপা হলে পুরো দেশে হাচিকো এক হিরোতে পরিণত হয়।

১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে শিবুয়া স্টেশনের কাছেই হাচিকোর মৃতদেহ পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সে তার মালিকের অপেক্ষায় ছিল। হাচিকোর মৃত্যুর পর জাপানে রাষ্ট্রীয় শোকের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাকে তার মালিক অধ্যাপক উয়েনোর কবরের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়, যাতে পরকালে হলেও তাদের আবার দেখা হয়।

শিবুয়া স্টেশন – Image Source:wamiz.co.u

হাচিকোর জীবিত থাকাকালীনই ১৯৩৪ সালে শিবুয়া স্টেশনের সামনে তার একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করা হয় (উদ্বোধনের সময় হাচিকো নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিল!)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধাতুর অভাবের কারণে মূর্তিটি গলিয়ে ফেলা হলেও ১৯৪৮ সালে আবার নতুন করে এটি নির্মাণ করা হয়।

বর্তমানে এই মূর্তিটি টোকিও’র সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘মিটিং পয়েন্ট। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানে এসে ফুল দিয়ে হাচিকোর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

হাচিকোর এই গল্প এতটাই জনপ্রিয় যে এটি নিয়ে জাপানি এবং হলিউডে সিনেমা তৈরি হয়েছে। রিচার্ড গেয়ার অভিনীত ‘Hachi: A Dog’s Tale’ সিনেমাটি দেখলে আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের চোখে পানি চলে আসে।

হাচিকোর গল্প আমাদের শেখায় যে ভালোবাসা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিবুয়া স্টেশনের সেই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অপেক্ষা কখনো কখনো হার মানে না, আর প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনো শেষ হয় না।

Reference:

Related posts

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট – প্যারালাল ইউনিভার্সের প্রমাণ নাকি মস্তিষ্কের ধোঁকা

ইসরাত জাহান ইরা

ভৌতিক গ্রাম কুলধারা: বাস্তবতা নাকি নিছক গল্প!

বিশ্বের নিষ্ঠুরতম মানুষ: আইভান দ্য টেরিবল

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More