পকেটের টাকা খরচ করে আসা দর্শকদের বিনোদন দিতে গিয়ে জঁ-ফিলিপ মাতেতা প্রতি ম্যাচে কর্নার ফ্ল্যাগটাকে যেভাবে লাথি মারেন, দেখে মনে হয় গোল করার চেয়ে ওই বেচারা ফ্ল্যাগটাকে পেটানোর জন্যই তিনি বেশি উন্মুখ হয়ে থাকেন!
জঁ-ফিলিপ মাতেতা মাঠে নামা মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ত্রাস, আর গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের বারোটা বাজানো! তিনি ক্রিস্টাল প্যালেসের ঘরের ছেলে, ভক্তদের আদরের “কিং মাতেতা”। শুরুতে বেঞ্চ গরম করলেও দমে যাননি; কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছেশক্তি দিয়ে আজ নিজেকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা টার্গেট ম্যানে পরিণত করেছেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক সাউথ লন্ডনের এই ফরাসি গোলমেশিনের মহাকাব্যিক উত্থানের গল্প।
জঁ-ফিলিপ মাতেতা’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
জঁ-ফিলিপ মাতেতা |
|
জন্ম |
২৮ জুন ১৯৯৭ (বয়স ২৮) |
|
জন্মস্থান |
সেভরান , প্যারিস মেট্রোপলিটন এলাকা , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৯২ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
স্ট্রাইকার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
শাতোরু, লিয়ন II, লিয়ন, লে হাভ্রে, মাইনৎস এবং বর্তমানে ক্রিস্টাল প্যালেস ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৫– ফ্রান্স |

১৯৯৭ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের সেভন নামক একটি সাধারণ শহরতলিতে জন্মগ্রহণ করেন জঁ-ফিলিপ মাতেতা। তাঁর বাবা ছিলেন কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত একজন সাবেক ফুটবলার এবং মা ফরাসি। ফলে ফুটবলের রক্ত তাঁর ধমনীতে আগে থেকেই বইছিল। তবে মাতেতার শৈশবটা প্যারিসের অন্যান্য অনেক ফুটবলারের মতোই ছিল বেশ কড়া স্ট্রাগলের।
ছোটবেলায় ফ্রান্সের চাতোরাক্স একাডেমিতে তাঁর ফুটবল দীক্ষা শুরু হয়। সেখানে নিজের অসাধারণ উচ্চতা এবং সহজাত গোল করার ক্ষমতার কারণে দ্রুতই স্কাউটদের নজরে আসেন। চাতোরাক্সের মূল দলের হয়ে ফরাসি তৃতীয় বিভাগে লড়াকু পারফরম্যান্স দেখিয়ে ২০১৬ সালে তিনি ফ্রান্সের অন্যতম জায়ান্ট ক্লাব লিঁওতে যোগ দেন। লিঁওর মতো বড় ক্লাবে তখন আলেকজান্দ্রে লাকাজেতের মতো তারকা স্ট্রাইকাররা খেলছিলেন, যার ফলে মাতেতার জন্য মূল একাদশে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মাতেতা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। লোনে লে হাভ্রেতে গিয়ে এক সিজনে ১৭ গোল করে তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনি বড় মঞ্চের জন্যই তৈরি হয়েছেন।

২০১৮ সালে লিঁও ছেড়ে জার্মানির ক্লাব মাইনৎস ০৫-এ পাড়ি জমান জঁ-ফিলিপ মাতেতা। প্রায় ৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে এই দলবদলটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। জার্মানির ফিজিক্যাল এবং হাই-টেম্পো ফুটবলের সাথে মাতেতা নিজেকে চমৎকারভাবে মানিয়ে নেন।
মাইনৎসের হয়ে নিজের প্রথম সিজনেই তিনি বুন্দেসলিগায় ১৪টি গোল করেন, যার মধ্যে ছিল ফ্রাইবুর্গের বিপক্ষে একটি দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। মাইনৎসের হয়ে সব মিলিয়ে তিনি ২২টি গোল করেন এবং ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজরে আসেন।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেস প্রথমে ১৮ মাসের লোনে জঁ-ফিলিপ মাতেতাকে লন্ডনে নিয়ে আসে। সাউথ লন্ডনের ক্লাবটির জন্য মাতেতার প্রোফাইলটি ছিল বেশ লোভনীয়। তবে ক্রিস্টাল প্যালেসের তৎকালীন কোচ রয় হজসনের রক্ষণাত্মক কৌশল এবং ওডসন এদুয়ার্দ ও ক্রিশ্চিয়ান বেনটেকেদের উপস্থিতির কারণে মাতেতাকে বেশির ভাগ সময়ই বেঞ্চে বসে কাটাতে হতো।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে ক্রিস্টাল প্যালেস তাঁর চুক্তিটি স্থায়ী করলেও, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাতেতা কেবল বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবেই বিবেচিত হতেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে লেস্টার সিটির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের এক নাটকীয় জয়সূচক গোল করে তিনি ক্রিস্টাল প্যালেসের টানা ১৩ ম্যাচের জয়হীন খরা কাটান, যা ভক্তদের মনে তাঁর প্রতি ভালোবাসার বীজ বুনে দেয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিস্টাল প্যালেসের ডাগআউটে আসেন অস্ট্রিয়ান মাস্টারমাইন্ড কোচ অলিভার গ্লাজনার। আর এই একটি সিদ্ধান্তই জঁ-ফিলিপ মাতেতার ফুটবল ক্যারিয়ারকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেয়।
গ্লাজনার প্যালেসে এসেই ৩-৪-২-১ ফরমেশন চালু করেন, যেখানে জঁ-ফিলিপ মাতেতাকে বানানো হয় দলের আক্রমণের মূল ফোকাল পয়েন্ট বা ‘টার্গেট ম্যান’। মাইকেল ওলিস এবং এবারিচি এজের মতো ক্রিয়েটিভ উইঙ্গারদের সাথে মাতেতার রসায়ন দারুণভাবে জমে ওঠে। ২০২৩-২৪ মৌসুমের শেষভাগে এসে তিনি ঘরের মাঠ সেলহার্স্ট পার্কে টানা ৭টি ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন!
সেই মৌসুমের শেষ ম্যাচে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে ক্রিস্টাল প্যালেসকে ৫-০ ব্যবধানে জেতান মাতেতা এবং মৌসুম শেষ করেন ১৬টি প্রিমিয়ার লিগ গোল নিয়ে। ভক্তরা ভালোবেসে তাঁকে উপাধি দেন “কিং মাতেতা”। তিনি ক্লাবের সমর্থকদের ভোটে ক্রিস্টাল প্যালেসের ‘প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি যখন তাঁর স্কোয়াডে তিনজন ২৩ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় নেওয়ার সুযোগ পেলেন, তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে জঁ-ফিলিপ মাতেতাকে বেছে নেন। নিজের দেশের মাটিতে অলিম্পিকের মঞ্চে মাতেতা যা করেছিলেন, তা ফরাসি ফুটবল ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে।

পুরো টুর্নামেন্টে ফ্রান্স দলের মূল ভরসা ছিলেন জঁ-ফিলিপ মাতেতা। বিশেষ করে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর করা একমাত্র জয়সূচক গোলটি ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তোলে। এরপর সেমিফাইনালে ইজিপ্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও অতিরিক্ত সময়ে ফ্রান্স হেরে যায় এবং রুপা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে ৫ গোল করে মাতেতা প্রমাণ করেন যে, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর মতো পরিপক্বতা তাঁর চলে এসেছে।
ফুটবল ক্যারিয়ার কখনোই মসৃণ লাইনে চলে না, আর মাতেতার ক্ষেত্রেও ২০২৫-২৬ মৌসুমটি ছিল উত্থান-পতনের এক চরম উদাহরণ। ২০২৪ সালের সেই স্বপ্নের ফর্মের পর ২০২৫ মৌসুমেও তিনি দারুণ খেলছিলেন সব মিলিয়ে লিগে ১৪টি গোল। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোতে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলান তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য সব চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। প্রায় ২৬ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তিতে মিলানে যাওয়ার জন্য মাতেতা মেডিকেল টেস্টও দিতে যান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর হাঁটুর একটি পুরনো ইনজুরির সমস্যার কারণে মিলান চুক্তিটি বাতিল করে দেয়।
এই দলবদল ভেস্তে যাওয়া এবং হাঁটুর ইনজুরির কারণে মাতেতা মানসিকভাবে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিলেন। তবে অলিভার গ্লাজনার তাঁর এই মূল স্ট্রাইকারকে আগলে রাখেন। ইনজুরি কাটিয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে মাতেতা যখন আবার মাঠে ফেরেন, তখন যেন তিনি আরও ক্ষুধার্ত।
২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ জঁ-ফিলিপ মাতেতার জীবনে সবচেয়ে বড় সুসংবাদটি এসেছে। অলিম্পিকের সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এবং ক্লাব ফুটবলের ধারাবাহিকতার পুরস্কারস্বরূপ দিদিয়ে দেশমের ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন মাতেতা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ফরাসি স্কোয়াডে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন এই স্ট্রাইকার। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের নীল জার্সিতে এই ‘কিং মাতেতা’ যখন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড়ে গিয়ে তাঁর ট্রেডমার্ক সেলিব্রেশন করবেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব আরেকবার মুগ্ধ হয়ে দেখবে সাউথ লন্ডনের এই রাজপুত্রের মহাকাব্যিক উত্থান।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Jean-Philippe_Mateta
- https://www.transfermarkt.com/jean-philippe-mateta/profil/spieler/420002
- https://www.espn.com/soccer/player/_/id/241187/jean-philippe-mateta
- https://www.premierleague.com/en/players/231747/jean-philippe-mateta/overview
- https://www.bbc.com/sport/football/articles/c4ngdzgny8jo

