Image default
ধর্মীয় স্থাপনাপর্যটন আকর্ষণফ্রান্স

প্রাচীন পাথর ও আলোর খেলা: সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালের জাদুকরী রূপ

ফ্রান্সের লিয়ন শহরের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক অংশ ‘ভিয়্যু লিয়ন’-এর কেন্দ্রস্থলে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল। সোন নদীর তীর ঘেঁষে এবং ফোরভিয়ার পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে অবস্থিত এই ক্যাথিড্রালটি লিয়নের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। এটি শুধু লিয়নের প্রধান গির্জাই নয়, বরং এটি সমগ্র ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় স্থাপনা। শত শত বছর ধরে এটি লিয়নের মানুষের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে এবং বর্তমানে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত।

সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল – Image Source:s3.eu-west-1.amazonaws.com

সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১১৮০ সালে এবং এটি সম্পূর্ণ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩০০ বছর। এটি যেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তিন শতাব্দীর সময় ভ্রমণের সাক্ষী!

এই দীর্ঘ ৩০০ বছরের নির্মাণকালের কারণে সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালের স্থাপত্যশৈলীতে এক অনন্য বৈচিত্র্য দেখা যায়। এর পেছনের অংশ বা বেদী এলাকাটি রোমানিস্ক স্থাপত্য রীতির অনুকরণে তৈরি, যেখানে গোল খিলান ও ভারী দেয়ালের ব্যবহার বেশি। অন্যদিকে, এর সামনের অংশ বা ফ্যাসাড এবং মূল ভবনটি সম্পূর্ণ গথিক শৈলীতে তৈরি। উঁচু এবং চোখা খিলান, বিশাল স্টেইনড গ্লাসের জানালা এবং জটিল কারুকাজ এটিকে এক অপূর্ব নান্দনিকতা দান করেছে। রোমানিস্ক থেকে গথিক যুগে ইউরোপীয় স্থাপত্যের যে বিবর্তন হয়েছিল, তার এক নিখুঁত উদাহরণ হলো এই ক্যাথিড্রালটি।

ক্যাথিড্রালটি যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে খননকাজ চালিয়ে দেখা গেছে যে এটি আসলে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রাচীন কিছু চার্চের ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মিত হয়েছে। এর পাশেই একটি প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানে সেই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করা আছে।

সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালের ভেতরের সবচেয়ে বিস্ময়কর আকর্ষণ হলো এর চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত ‘অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক’। ৯ মিটার উঁচু এই সুবিশাল ঘড়িটি ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং নিখুঁত একটি যান্ত্রিক ঘড়ি। এটি শুধু সময়ই বলে না, বরং চাঁদ ও সূর্যের অবস্থান, নক্ষত্রমণ্ডলী এবং ধর্মীয় উৎসবের তারিখও নির্ভুলভাবে প্রদর্শন করে। প্রতিদিন দুপুর ১২টা, ২টা, ৩টা এবং ৪টার সময় এই ঘড়ির ভেতরের স্বয়ংক্রিয় পুতুলগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং যিশুর কাছে মেরির আবির্ভাবের একটি ছোট্ট দৃশ্য প্রদর্শন করে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক – Image Source:img.atlasobscura.com

এই ঘড়িটি যখন তৈরি হয়েছিল ১৩৮৩ সালের দিকে, তখন মানুষের ধারণা ছিল সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। তাই এই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়িটির নকশাও ‘জিওসেন্ট্রিক’ বা পৃথিবীকেন্দ্রিক, যেখানে পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে সূর্যকে তার চারদিকে ঘুরতে দেখা যায়!

সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এর সুবিশাল স্টেইনড গ্লাস বা রঙিন কাচের জানালাগুলো সবার আগে নজর কাড়বে। বিশেষ করে মূল বেদীর ওপরের রোজ উইন্ডো বা গোলাকার জানালাটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর এক অনবদ্য শিল্পকর্ম। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় যখন এই রঙিন কাচ ভেদ করে সূর্যের আলো ভেতরে প্রবেশ করে, তখন পুরো চার্চের ভেতরে এক মায়াবী এবং স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ক্যাথিড্রালের দুই পাশের দেয়াল এবং স্তম্ভগুলোতে সূক্ষ্ম পাথরের খোদাই করা কারুকাজ রয়েছে, যা তৎকালীন শিল্পীদের চরম নৈপুণ্যের প্রমাণ দেয়।

১৫৬২ সালে ফ্রান্সে ধর্মীয় যুদ্ধের সময় ক্যালভিনিস্টরা সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালে আক্রমণ করে এবং এর সামনের অংশের বহু সুন্দর মূর্তি ও কারুকাজ ধ্বংস করে দেয়। আজও ক্যাথিড্রালের বাইরের দিকে তাকালে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত মূর্তিগুলোর শূন্যস্থান চোখে পড়ে, যা যুদ্ধের নির্মম স্মৃতি বহন করে।

সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল ফ্রান্সের বেশ কিছু যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এখানে পোপের দুটি বড় কাউন্সিল বা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই ক্যাথিড্রালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি হলো ১৬০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরি এবং ইতালীয় রাজকুমারী মেরি ডি মেডিসি -এর রাজকীয় বিবাহ। পোপের বিশেষ সম্মতিতে আয়োজিত এই জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠানটি লিয়নের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

রাজা চতুর্থ হেনরির এই বিবাহ অনুষ্ঠানটি এতটাই বিশাল ছিল যে, পুরো ক্যাথিড্রাল এবং এর আশপাশের এলাকা কয়েক সপ্তাহ ধরে উৎসবমুখর ছিল। এটি ছিল প্যারিসের বাইরে অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজকীয় বিবাহ!

বর্তমানে লিয়নের বিখ্যাত ‘ফ্যাস্টিভ্যাল অফ লাইটস’-এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল। প্রতি বছর ডিসেম্বরের শুরুতে যখন এই উৎসব পালিত হয়, তখন ক্যাথিড্রালের সামনের অংশটিকে একটি বিশাল ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। থ্রিডি প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এর ওপর অসাধারণ সব আলোর খেলা এবং গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রাচীন স্থাপত্যের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির এই অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে ভিড় জমায়।

ফ্যাস্টিভ্যাল অফ লাইটস – Image Source:bworldonline.com

আলোর উৎসবের সময় প্রজেকশনের মাধ্যমে ক্যাথিড্রালের দেয়ালগুলোকে এমনভাবে আলোকিত করা হয় যে, জাদুকরী দৃষ্টিবিভ্রমের কারণে কখনো মনে হয় ভবনটি ধসে পড়ছে, আবার কখনো মনে হয় এটি ফুলে ফেঁপে উঠে এক প্রাচীন রূপকথার প্রাসাদে পরিণত হয়েছে!

পুরনো লিয়নের সরু ও পাথুরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসে যখন আচমকা সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রালটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন এর বিশালতা পর্যটকদের এক লহমায় স্তব্ধ করে দেয়। ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্য অনুরাগী বা সাধারণ দর্শনার্থী সবার জন্যই সেন্ট-জিন ক্যাথিড্রাল ভ্রমণ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

Reference:

Related posts

নুডলস প্রেমীদের মক্কা-মদিনা: কাপ নুডলস মিউজিয়াম!

কুর সলেয়া: নিস শহরের রঙের হাট ও সুগন্ধের মহাকাব্য

আশা রহমান

শপিং মল নাকি আস্ত শহর? দ্য অ্যাভিনিউস মলের ‘গলফ কার্ট’ রহস্য!

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More