রূপকথার দুর্গের মতো লিয়ন শহরের আকাশরেখায় উজ্জ্বল হয়ে আছে ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার। ফোরভিয়ার পাহাড়ের চূড়ায় আসীন এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি যেন পুরো শহরকে পরম মমতায় ওপর থেকে আগলে রেখেছে। কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি লিয়নের মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অনন্ত আশা আর প্রগাঢ় বিশ্বাসের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। ফরাসি স্থাপত্যের জাদুকরী ছোঁয়ায় নির্মিত এই ব্যাসিলিকাটি বিশ্ববাসীর কাছে এক পরম বিস্ময়। এর সুউচ্চ মিনার আর সুবিশাল গম্বুজ শহরের যেকোনো কোণ থেকে উঁকি দিয়ে পর্যটকদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

ফোরভিয়ার পাহাড়টিকে স্থানীয়রা “যে পাহাড় প্রার্থনা করে” বলে ডাকে, কারণ এখানে অনেক প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। এর ঠিক বিপরীতে লিয়নের আরেকটি পাহাড় ‘ক্রোয়িক্স-রুস’-কে বলা হয় “যে পাহাড় কাজ করে”, কারণ সেখানে একসময় সিল্ক শ্রমিকরা রাতদিন কাজ করত।
ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৬৪৩ সালে যখন ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথ বা বিউবনিক প্লেগ মহামারী আকার ধারণ করেছিল, তখন লিয়ন শহরের মানুষ কুমারী মেরির কাছে প্রার্থনা করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, মেরির আশীর্বাদেই শহরটি প্লেগের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৭০ সালে যখন ফ্রান্সে কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং প্রুশিয়ান সেনাবাহিনী লিয়নের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখনও লিয়নের অধিবাসীরা মেরির কাছেই আশ্রয় খোঁজে। শহর রক্ষা পাওয়ার পর, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ১৮৭২ সালে এই বিশাল ব্যাসিলিকাটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যা ১৮৮৪ সালে শেষ হয়।
এই বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ ব্যাসিলিকাটি নির্মাণ করতে সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি; লিয়নের সাধারণ মানুষ এবং ধর্মপ্রাণ দাতাদের ব্যক্তিগত অনুদানেই এর সম্পূর্ণ নির্মাণ ব্যয় বহন করা হয়েছিল।
ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার চমৎকার নকশা করেছিলেন বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি পিয়েরে বোসান। তিনি এই ব্যাসিলিকাটিতে রোমানিস্ক এবং বাইজেন্টাইন স্থাপত্য রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। এর বাইরের অংশটি দেখতে কিছুটা রুক্ষ এবং দুর্গের মতো মনে হলেও, ভেতরের অংশটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। বোসানের মূল ধারণা ছিল যে, ভবনটি বাইরে থেকে মানুষের পার্থিব জীবনের কঠিন সংগ্রামের প্রতীক হবে এবং ভেতরটা হবে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো সুন্দর, স্নিগ্ধ ও আলোকিত। এর বাইরের দেয়ালগুলো সাদা পাথরের তৈরি এবং চারটি অক্টাগোনাল মিনার এটিকে একটি দুর্ভেদ্য প্রাসাদের রূপ দিয়েছে।

স্থপতি পিয়েরে বোসান যখন এই অনন্য ব্যাসিলিকাটির নকশা করেন, তখন তিনি ইতালির পালেরমোতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। শত শত মাইল দূর থেকেই তিনি এই অসাধারণ স্থাপত্যের নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিলেন!
ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার ভেতরে প্রবেশ করলে এর রাজকীয় সাজসজ্জা যেকোনো মানুষকে হতবাক করে দেবে। ভেতরের পুরো অংশটি রঙিন মোজাইক, সোনালী পাতার কাজ, দামি মার্বেল পাথর এবং বিশাল সব স্টেইনড গ্লাস দিয়ে সুসজ্জিত। বাইবেলের বিভিন্ন কাহিনী এবং কুমারী মেরির জীবনের নানা ঘটনা এই মোজাইক ও গ্লাসের মাধ্যমে নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ছাদের কারুকাজ এতটাই সূক্ষ্ম এবং উজ্জ্বল যে, এটি এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মূল বেদীর পেছনের কারুকাজগুলো পর্যটক এবং পুণ্যার্থীদের দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।
এই ব্যাসিলিকাটির একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মূলত দুটি চার্চের সমন্বয়। ওপরের অংশে রয়েছে ঝলমলে এবং সুসজ্জিত মূল ব্যাসিলিকা, আর ঠিক তার নিচেই রয়েছে সেন্ট জোসেফকে উৎসর্গ করা একটি অন্ধকার ও তুলনামূলক সাদামাটা আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চ বা ক্রিপ্ট (Crypt)।
লিয়ন শহরের বিশ্ববিখ্যাত ‘ফ্যাস্টিভ্যাল অফ লাইটস’ বা আলোর উৎসবের সাথে এই ফোরভিয়ার পাহাড় এবং ব্যাসিলিকার এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ১৮৫২ সালের ৮ ডিসেম্বর ফোরভিয়ার পাহাড়ের ওপর কুমারী মেরির একটি সোনালী মূর্তি স্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে বাধা আসে। তখন লিয়নের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের জানালার পাশে মোমবাতি জ্বালিয়ে মূর্তিটিকে আলোকিত করে তোলে। সেই ঐতিহ্য মেনেই প্রতি বছর ৮ ডিসেম্বর লিয়নে আলোর উৎসব পালিত হয়, যেখানে পুরো শহর এবং ব্যাসিলিকাটি নানা রঙের আলোয় সেজে ওঠে।

১৮৫২ সালের ৮ ডিসেম্বরের সেই রাতে বৃষ্টি এতটাই বেশি ছিল যে ক্যাথলিক চার্চ উৎসব বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর হঠাৎ আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেলে মানুষ আনন্দে রাস্তায় নেমে আসে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মোমবাতি জ্বালায়, যা আজ বিশ্বের অন্যতম বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়ার শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং এটি ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো লিয়ন শহরের ঐতিহাসিক অংশটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার মধ্যে এই ব্যাসিলিকাটি অন্যতম প্রধান মুকুট। প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষেরও বেশি পর্যটক এবং দর্শনার্থী এই চমৎকার স্থাপত্যটি দেখতে আসেন। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য পর্যটকরা ফানিকুলার রেলওয়ে ব্যবহার করেন, যা ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।
ব্যাসিলিকায় ওঠার অন্যতম বাহন ফানিকুলার রেলওয়েটি ১৮৬২ সালে চালু হয়, যা বিশ্বের প্রাচীনতম ফানিকুলারগুলোর একটি। লিয়নের স্থানীয়রা আদর করে এই ট্রেনটির নাম দিয়েছে “ফিসেল”, ফরাসি ভাষায় যার অর্থ ‘সুতো’ বা ‘দড়ি’।
ব্যাসিলিকা অফ নটর-ডেম ডি ফোরভিয়া লিয়ন শহরের আকাশরেখাকে যেমন একটি রাজকীয় রূপ দিয়েছে, তেমনি মানুষের বিশ্বাস, আশা এবং কৃতজ্ঞতার এক চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবেও শতকের পর শতক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। যারা ফ্রান্স ভ্রমণে যান, তাদের জন্য লিয়নের এই পবিত্র এবং দৃষ্টিনন্দন ব্যাসিলিকাটি পরিদর্শন করা এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য পর্যটকদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছোঁয়া দিয়ে যায়।
Reference:
- https://www.fourviere.org/en/discover/notre-dame-de-fourviere/basilica-2/
- https://fr.wikipedia.org/wiki/Basilique_Notre-Dame_de_Fourvi%C3%A8re
- https://artsandculture.google.com/story/the-basilica-of-notre-dame-de-fourviere/9gVRAioNwv4yJw?hl=en
- https://www.hotels.com/go/france/la-basilique-notre-dame-de-fourviere-lyon
- https://www.fondation-patrimoine.org/les-projets/basilique-notre-dame-de-fourviere/80349

